প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৩ প্রাথমিক চিকিৎসা (শেষ অংশ) - Proshikkhon

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৩ প্রাথমিক চিকিৎসা (শেষ অংশ)

অধ্যায়-০৩: খাদ্য ও পুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি

সেশন-৩.৬: প্রাথমিক চিকিৎসা ও এর প্রয়োজনীয়তা এবং বিভিন্ন ধরণের দূর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা (শেষ অংশ)

৭) পুড়ে যাওয়ার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়সমূহ আলোচনা করুন।

৮) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কী? বিদ্যুৎস্পৃষ্টের কারণ ,প্রতিরোধের উপায় ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা করুন।

৯) বিষ কী? বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিরূপন করুন। বিষক্রিয়া প্রতিরোধের উপায় কী? বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা কী হতে পারে বলে মনে করেন?

১০) কী কারণে হাড় ভেঙে যেতে পারে? হাড় ভাঙা রোধে প্রাথমিক চিকিৎসা কী হতে পারে?

১১) রক্তপাত বন্ধে প্রাথমিক চিকিৎসা কী?

৭) পুড়ে যাওয়ার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়সমূহ আলোচনা করুন।

এটা একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সাধারণত অসাবধানতার কারণে  এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। নিভে পুড়ে যাওয়ার কারণসমূহ দেওয়া হলো-

•        ছোট বাচ্চাদের রান্নাঘরে বা রান্না করার স্থানে খেলতে দেওয়া।

•        যেখানে-সেখানে গরম ছাইবা কয়লা ফেলা।

•        গরম খাবার বা পানি ছোটদের হাতের নাগালের মধ্যে রাখা।

•        কুপি বা মোমবাতি ব্যবহার করা।

•        শিশুদের জ্বলন্ত কিছু নিয়ে খেলতে দেয়া।

•        শীতকালে অনিরাপদ ভাবে আগুন পোহানো।

•        আতশবাকি পোড়ানো।

•        আগুন নিয়ে খেলা।

•        কেমিক্যাল এবং ইলেকট্রিক কারেন্টে পোড়া।

পুড়ে যাওয়ার প্রতিরোধঃ

সামান্য সচেতন থাকলে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। যেমন-

•        কুপিবাতি বা মোমবাতির পরিবর্তে হারিকেন ব্যবহার করা।

•        গরম ছাই পানি দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া।

•        আগুন নিয়ে খেলা যাবে না।

•        গরম কিছু না ধরা।

•        রান্নার জায়গা ঘিরে দিতে হবে যাতে করে শিশুরা ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে।

•        আগুন পোহানোর সময় সতর্ক থাকতে হবে।

•        আগুন, গরম, পানি, গরম চাত, ফেন ইত্যাদি শিশুদের নাগলের বাইরে রাখতে হবে।

৮) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কী? বিদ্যুৎস্পৃষ্টের কারণ ,প্রতিরোধের উপায় ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা করুন।

বিদ্যুৎস্পৃষ্টঃ

যখন কোন মানুষ বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসে, তখন কারেন্ট মানুষের শরীরে হয়ে মাটিতে যায় ফলে হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণ কমতে থাকে তাই রক্তের চলাচল কমে যায়। এতে করে মানুষের বেশি সংকোচন ও শ্বাস কষ্ট হতে থাকে, আর এই অবস্থাকে মুলত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট বলে।

বিদ্যুৎস্পৃষ্টের কারণঃ

বিদ্যুৎ নানা ভাবে আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না। ঘরে আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে কলকারখানা চালানো সর্বস্তরে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের অসতর্কতার জন্য এই বিদ্যুৎ আবার আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া জীবনের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নিম্নে বিদ্যুৎস্পৃষ্টতার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো-

•        বৈদ্যুতিক সংযোগসমূহ ভালোভাবে নিরাপদ টেপ দিয়ে না বাঁধা।

•        শিশুদের হাতের কাছে বৈদ্যুতিক সংযোগ বা প্লাগ স্থাপন করা।

•        ঝড়বৃষ্টির সময় বাইরে থাকা।

•        বৈদ্যুতিক স্থাপনা নিয়ে খেলাধুলা।

•        ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি স্পর্শ করা।

•        খালি পায়ে বৈদ্যুতিক সংযোগের তারে হাত দেওয়া।

•        বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে স্পর্শ করা। 

বিদ্যুৎস্পৃষ্টতা প্রতিরোধের উপায়ঃ

•        বিদ্যুৎ সংযোগ নিরাপদ করা।

•        বৈদ্যুতিক স্থাপনা, সংযোগ বা প্লাগ শিশুদের হাতের কাছে না রাখা।

•        বজ্রপাতের সময় বা বিদ্যুৎ চমকানোর সময় বাইরে না যাওয়া, কেননা এ সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

•        শিশুদের বৈদ্যুতিক তার ও পোলের নিকটে খেলাধুলা করতে না দেওয়া।

•        ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক স্থাপনায় হাত না দেওয়া।

•        বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে খালি হাতে না ধরে শুকনো লাঠি বা কাঠ দিয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে বিচিন্ন করা। মেইন সুইচ বন্ধ করে এটি করা গেলে ভালো।

প্রাথমিক চিকিৎসাঃ

আমরা সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। মানবদেহ বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। তাই একটু অসাবধানতা আমাদের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করতে পারে। কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে তাকে নিম্নোক্ত প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করতে হবে-

•        বিদ্যুৎস্পৃষ্টতার পরে যদি জ্ঞান থাকে তাহলে তাকে চিৎ করে শুইয়ে দিতে হবে। পা দুটো কিছু উপরের দিকে রাখতে হবে।

•        যদি ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যায় তখন তাকে কাত করে শুইয়ে দিতে হবে এবং মাথার নিকটে একটা বালিশ রাখা যেতে পারে।

•        বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির গায়ে কখনোই পানি দেওয়া যাবে না।

•        হাত, পা, শরীর হালকা মেসেজ করে দিতে পারেন।

•        যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৯) বিষ কী? বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিরূপন করুন। বিষক্রিয়া প্রতিরোধের উপায় কী? বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা কী হতে পারে বলে মনে করেন?

বিষঃ

বিষ হচ্ছে এমন একটি বস্তু যা শরীরের ভিতরে প্রবেশ করলে শরীরের ক্ষতিসাধন করে, এমনটি চিকিৎসার অভাবে বা দেরিতে তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাঃ

•        বিষাক্ত বস্তু কোনো খাবারের পাত্রে রাখা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় কোমল পানীয় বোতলে কেরোসিন রাখা।

•        বিষাক্ত দ্রব্য ও বড়দের ওষুধ শিশুদের হাতের কাছে রাখা।

•        ওষুধ বা বিষাক্ত দ্রব্য যেমন এরোসল, পিঁপড়া মারার ওষুধ, ইঁদুর মারার ওষুধ বা অন্যান্য বিষের বোতলে বিষ শব্দটি না লিখে রাখা বা কোনো সতর্ককারী চিহ্ন না দেওয়া।

বিষক্রিয়া প্রতিরোধের উপায়ঃ

•        ওষুধ ও বিষাক্ত দ্রব্য শিশুদের হাতের কাছে না রাখা।

•        বিষাক্ত বস্তু খাবার পাত্র বা পানির বোতলে না রাখা। বিষাক্ত বস্তুর পাত্রের গায়ে বিষ শব্দটি লিখে রাখা অথবা কোনো সতর্ককারী চিহ্ন দিয়ে রাখা।

বিষ আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসাঃ

যখন কোন ব্যক্তি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে হয় তখন সর্বপ্রথম কাজ হবে আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ থেকে বিষ বের করে ফেলা এবং নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। বিষ আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিম্নের পদ্ধতি অনুসারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে-

•        তাকে বমি করাতে হবে, বমি উদ্রেক করে এমন ধরনের সিরাপ যেমন – ইপিকাপ সিরাপ খাইয়ে বমি করানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে সিরাপের মাত্রা হবে শিশুদের জন্য এক টেবিল চামচ এবং বড়দের জন্য হবে দুই টেবিল চামচ।

•        যে পাত্রের বিষ খেয়েছে তা সংরক্ষণ করতে হবে।

•        বমির অংশ সংরক্ষণ করতে হবে।

•        প্রয়োজনে কৃতিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

•        দ্রুত চিকিৎসকের কাছে অথবা হাসপাতালে নিতে হবে।

তবে বিষ আক্রান্ত ব্যক্তি যদি অজ্ঞান থাকে তাহলে বমি করানো যাবে না।

১০) কী কারণে হাড় ভেঙে যেতে পারে? হাড় ভাঙা রোধে প্রাথমিক চিকিৎসা কী হতে পারে?

পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, সহিংসতা ইত্যাদি কারণে শরীরের হাড় ভেঙে যেতে পারে। দেহের হাড় সাধারণত দুইভাবে ভাঙতে পারে।

•        হাড় ভেঙে চামড়া ভেদ করে বাইরে আসতে পারে।

•        চামড়া ভেদ না করেও হাড় ভাঙতে পারে।

হাড় ভাঙার প্রাথমিক চিকিৎসাঃ

হাড় ভাঙার প্রাথমিক চিকিৎসা বেশি জটিল। নিম্নের পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।

•        ক্ষতস্থান এমনভাবে পরিষ্কার করতে হবে যাতে করে ভাঙা হাড় নড়ে না যায়।

•        রক্তক্ষরণ হলে তা দ্রুত বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

•        নরম পরিষ্কার কাপড় বা তুলা দ্বারা ক্ষতস্থান ঢেকে দিতে হবে।

•        একটি পরিষ্কার বাঁশের ফালি বা মসৃণ কাঠের টুকরা দিয়ে ভাঙা হাড়ের নিচে ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে দেওয়া যাতে ক্ষতিগ্রস্থ হাড়টি নড়াচড়া না করে।

•        এরপর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হবে।

•        আঘাত যদি মেরুদণ্ডে হয় তাহলে পিঠের নিচে একটি আরামদায়ক কাঠের টুকরা দিয়ে কোমর ও বুক ভালো করে ব্যান্ডেজ করে কাঠের সাথে বেঁধে দিতে হবে। পরবর্তীতে হাসপাতালে নিতে হবে। হাড় ভাঙার চিকিৎসা দ্রুত করতে হবে। অন্যথায় ব্যথা সহ্যের মাত্রা ছড়িয়ে যেতে পারে।

•        ব্যথা কমানোর জন্য বরফ দিতে হবে।

হাড় ভাঙলে দুটি জরুরি কাজ করতে হবে। প্রথমত রক্তপাত বন্ধ করতে হবে। এবং দ্বিতীয়ত ভাঙা হাড়টি কাঠ বা বাঁশের টুকরা দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে হবে। আর অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

১১) রক্তপাত বন্ধে প্রাথমিক চিকিৎসা কী?

শরীর থেকে রক্তের ক্ষতি বা হ্রাস ঘটলে তাকে রক্তপাত বলা হয়। শরীরের ভিতরের রক্তপাতকে বলা হয় অভ্যন্তরীণ রক্তপাত এবং শরীরের বাইরে রক্তপাতকে বলে বাহ্যিক রক্তপাত। যে কোনো দুর্ঘটনায় রক্তপাত হচ্ছে সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক। রক্তপাতের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে মানুষ মারাও যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে সরাসরি চাপ প্রয়োগে রক্তপাত বন্ধ করা যেতে পারে। পরিষ্কার কাপড়, গজ দিয়ে ব্যান্ডেজ করা যেতে পারে। এ ভাবে যদি রক্তপাত বন্ধ না হয় তাহলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

•        ক্ষতস্থান কাপড়ের প্যাড দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

•        ব্যান্ডেজের উপর বেশ জোরে চাপ দিতে হবে।

•        রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজ তুলে ফেলা যাবে না, বরং ঐ ব্যান্ডেজের উপর আবার নতুন করে ব্যান্ডেজ ঢেকে দিতে হবে। সাথে সাথে চাপ দিয়ে রাখা যতক্ষণ না রক্তপার বন্ধ না হয়।

•        শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি যাতে নাড়াচাড়া করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা।

•        ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গটি উঁচুতে অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের লেভেলের উপর রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!