History of Research
গবেষণার ইতিহাস বা বিকাশ
বিগত কয়েক দশকে সারা বিশ্বে নানান মাত্রায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতির অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের নিরন্তর গবেষণা। বিশেষ করে বিজ্ঞান গবেষণার সাফল্যের জন্য প্রযুক্তির বিকাশ এত বেশি হয়েছে যে সারা বিশ্বকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ এখন বলা হয়। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল হতে শুর করে অষ্টাদশ শতকের দার্শনিক জন ডিউই পর্যন্ত সকলেই উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার সন্ধান করেছেন। যুগের উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের নানার পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন। সুতরাং গবেষণার ইতিহাস বা বিকাশ সুদীর্ঘ।
সারা পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে গগবেষণার ইতিহাস বা বিকাশ বা সুত্রপাতকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যেমন-
১) গবেষণার প্রাচীনযুগ
২) গবেষণার মধ্যযুগ
৩) গবেষণার আধুনিকযুগ।
১) গবেষণার প্রাচীনযুগ:
গুহা মানবেরা তাদের নিজ প্রয়োজনে সুতা কাটার সূচনা করে। গুহার দেয়ালে দাগ কেটে রাখত, পশুদের ছবি এঁকে বর্ষা নিক্ষেপ করে অনুশীলন করত। প্রাচীন মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিরন্তর অনুসন্ধান চালাত অন্ন, বস্ত্র ইত্যাদির জন্য। বলা যায় গবেষণার সূচনা তখন থেকেই শুরু হয়। তবে গবেষণা বলতে আমরা যা বুঝি তার সূচনা হয়েছে মূলত বিজ্ঞান গবেষণার হাত ধরেই। প্রাচীনকাল থেকেই যুগে যুগে মানুষ অন্মেষণ করেছে নতুন পদ্ধতি ও কৌশলের যা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে জড়িত। প্রাচীন মিশরীয় দলিলাদি জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও ঔষধশাস্ত্রে অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতি বর্ণনা করে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক থেলিস প্রাকৃতিক অভ্যাসের অতি প্রাকৃতিক, ধর্মীয় ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন, তিনি দাবি করেন যে প্রত্যেকটি ঘটনারই একটি প্রাকৃতিক কারণ থাকে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্য অবরোহী যুক্তির (deductive reasoning) সূচনাটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরিস্টটলের হাতেই খুব সম্ভবত অভিজ্ঞতাবাদের জন্ম হয়েছিল, তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই মাধ্যমে সর্বজনীন সত্য লাভ করা সম্ভব। যা প্রায় ১০০ বছর চলমান ছিল।
পরীক্ষাভিত্তিক ও পরিমাপভিত্তিক কর্মপদ্ধতি আরব অঞ্চলের মুসলমান বিজ্ঞানীদের কর্মেই প্রথম পরিলক্ষিত হয় যা তাঁরা বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রকল্পের মাঝে পার্থক্যকরণের জন্য ব্যবহার করেন, আল-হাসানের “বুক অব অপটিক্স”(১০২১)-এ বর্ণিত তাঁর পরীক্ষাগুলোর মধ্যে এর নিদর্শন দেখা যায়। সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদয় ঘটে। ফ্রান্সিস বেকন তাঁর নোভাম অরগানাম গ্রন্থে, যা এরিস্টটলের অরগানন এর অভিসন্দর্ভ, সহানুমান (syllogism) নামক এক পুরনো দার্শনিক প্রক্রিয়ার উন্নয়নের লক্ষ্যে এক নতুন ধরণের যুক্তির অবতারণা করেন। এরপর ১৬৩৭ সালে রনে দেকার্ত তাঁর ‘ডিসকোর্স অন মেথড’ গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পথপ্রদর্শক নীতিগুলোর অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন। আল-হাসান, বেকন এবং দেকার্তের লেখালেখির পাশাপাশি জন স্টুয়ার্ট মিলের কর্মকেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ঐতিহাসিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়।
২) গবেষণার মধ্যযুগ
অষ্টাদশ শতাব্দীতে Charles Darwin (1809) তাঁর ‘Theory of the Species’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে গবেষণার নতুন দিক উম্মোচন করেন। এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যে চার্লস ডারউইন এক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। তিনি আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতির সমন্বয় করে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন সেখানে তিনিই প্রথম গবেষেণায় হাইপোথিসিসের (Hypothesis) কথা বলেন। পরবর্তীতে John Dewey (1859) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধানের ছয়টি ধাপ নির্ধারণ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর অগ্রভাগে চার্লস স্যান্ডার্স পার্স এমন একটি ছক প্রস্তাব করেন যা বর্তমানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োগ করেন। ১৮১৯ সালে উইলহেল্ম ওয়ান্ড প্রথম মনোবিজ্ঞানসম্মত গবেষণার অবহারণা করেন। ফ্রান্সিস গ্যালটন ও কার্ল পিয়ারসন ইংল্যান্ডে পরিসংখ্যানমূলক পদ্ধতি চালু করেন যা পরবর্তীতে গবেষণার জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হিসেবে পরিচিতি পায়। বিশ্বখ্যাত হার্বাড, কলম্বিয়া, মিসিগান ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গবেষণায় যথেষ্ট অবদান রাখে। ১৯৬৯ সালে আমেরিকার শিক্ষক সমিতি গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার সুপারিশ করে। ১৯৮৮ সালে ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. স্ট্যানলিহল ও ১৮৯০ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়াম হার্পার গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এখান থেকেই আধুনিক গবেষণার যাত্রা শুরু বলা যায়।
৩) গবেষণার আধুনিক যুগ
Pierce (1839) বিভিন্ন ক্ষেত্রের অগ্রগতিকে ত্বরাম্বিত করেন। ‘How to make our ideas clear’ (১৮৭৮) গ্রন্থে পার্স একটি নৈর্ব্যক্তিকভাবে (objective) যাচাইযোগ্য পদ্ধতি প্রস্তাব করেন যার মাধ্যমে অনুমিত জ্ঞানের সত্যতা পরীক্ষা করা যাবে আরোহী ও অবরোহী যুক্তিকে ভিত্তি করে। এভাবে তিনি আরোহী ও অবরোহী যুক্তিকে প্রতিযোগী থেকে সহযোগীতে রুপান্তরিত করেন (অষ্টদশ শতকের মধ্যভাগে হিউমের সময় হতে আরোহী ও অবরোহী যুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হত)। পার্স প্রকল্প পরীক্ষার পদ্ধতিও প্রস্তাব করেন যা এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। কার্ল পপার প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। পপার মনে করেন জ্ঞান অন্বেষণের জগতে শুধু একটি পদ্ধতিই আছে তা হলো ‘Trial and Error’ । বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, শিল্প প্রভৃতি মানব মনের সৃষ্টি থেকে শুরু করে প্রাণের বিবর্তনও এই পদ্ধতি মেনে চলে। ১৯৩০ এর দিকে তিনি যুক্তি দেখান যে প্রায়োগিক তত্ত্বগুলোকে অবশ্যই মিথ্যা-প্রতিপাদনযোগ্য হতে হবে এবং আরোহী যুক্তি বলে আসলে কিছু নেই। পপারের মতে বিজ্ঞানের সব অনুমিতি আসলে প্রকৃতিগতভাবে অবরোহী।
গবেষণা সম্পর্কে অন্যান্য পোস্ট নিচে দেখুন:
- গবেষণা (Research) বলতে কী বুঝায়?
- গবেষণার ইতিহাস বা বিকাশ
- গবেষণার উপাদান ও বৈশিষ্ট্য
- ঐতিহাসিক গবেষণা কী? ঐতিহাসিক গবেষণার উৎস ও সমালোচনা।
- বর্ণনামূলক গবেষণা (Descriptive Research)
- কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research)
- কেইস স্টাডি (Case Study) কী? কেইস স্টাডি কীভাবে লিখবেন?
- পরীক্ষণমূলক গবেষণার সুত্রাবলি
- জরিপ গবেষণার প্রকারভেদগুলো
- মৌলিক গবেষণা ও সামাজিক গবেষণার মধ্যে পার্থক্য
- পরিমাণগত ও গুণগত গবেষণার মধ্যে পার্থক্য কী?
- গবেষণা প্রস্তাবনা কী?
- গবেষণা প্রতিবেদন কী?


