প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে): অধ্যায়-১ বাস্তুসংস্থান - Proshikkhon

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে): অধ্যায়-১ বাস্তুসংস্থান

অধ্যায়-০১: আমাদের পরিবেশ

সেশন-১.৫: বাস্তুসংস্থান

  • বাস্তুসংস্থান কাকে বলে? বাস্তুসংস্থান কত প্রকার ও কি কি?
  • একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের প্রবাহচিত্র অঙ্কন করুন।
  • একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান বর্ণনা করুন।
  • পুকুরে সবুজ শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ না থাকলে কী সমস্যা হবে?
  • প্রকৃতিতে বাস্তুসংস্থানের কেন প্রয়োজন ব্যাখ্যা করুন।

বাস্তুসংস্থান কাকে বলে? বাস্তুসংস্থান কত প্রকার ও কি কি?

বাস্তুসংস্থানঃ

প্রকৃতির জড় ও জীব উপাদানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলেই পরিবেশে ভারসাম্য বিরাজ করছে। কোনো জিনিসই একেবারে ফি্রিয়ে যাচ্ছে না। প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাকৃতিক চক্রের কাজের ফলেই এটা সম্ভব হচ্ছে। জড় পরিবেশের মূল উপাদান হচ্ছে মাটি,পানি,বায়ু,আলো ও তাপ। এ উপাদানগুলো জীবের আহার ও আশ্রয় যুগিয়ে থাকে। জীবের বেঁচে থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় জীব ও জড়ের মধ্যে গড়ে ওঠে নানা রকম সম্পর্ক। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিবেশে জীব ও জড় উপাদান এবং তাদের সম্পর্ক ও পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতিকে বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম বলে।

পরিবেশ অনুসারে বাস্তুসংস্থান প্রধানত দুই রকম। যথা- জলজ বাস্তুসংস্থান এবং স্থলজ বাস্তুসংস্থান।

একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের প্রবাহচিত্র অঙ্কন করুন

একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের প্রবাহচিত্র নিম্নে দেখানো হলো:

ছক: একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান প্রবাহচিত্র

একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান বর্ণনা করুন।

জলজ বাস্তুসংস্থানের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পুকুর। কারণ পুকুরে বসবাসকারী অজীব ও সজীব উপাদানের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করা যায় এবং ভালোভাবে বোঝা যায়। নিচে একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের বর্ণনা করা হলোঃ

১) জড় উপাদানঃ

জড় উপাদানের মধ্যে রয়েছে মাটি, পানি, খনিজ লবণ, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইড। একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের কার্যকারিতা এসব জড় উপাদানকে জীব উপাদান কেমন করে ব্যবহার করছে তার উপর নির্ভর করে।

২) সজীব উপাদানঃ

বাস্তুসংস্থানের সজীব উপাদানকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়- উৎপাদক, খাদক ও বিয়োজক। নিচে এদের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

ক) উৎপাদকঃ

পুকুরের পানিতে ভাসমান ও কিনারায় অগভীর পানিতে জন্মে থাকা সবুজ উদ্ভিদ (যেমন- শেওলা, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা, টোপাপনা ও পানিমরিচ) পুকুরে বাস্তুসংস্থানের উৎপাদক। পানিতে ভাসমান খুদে জীবদের প্লাংকটন বলে। ভাসমান ক্ষুদ্র প্রাণীদের জুয়োপ্লাংকটন বলে। আর সবুজ প্লাংকটন জাতীয় খুদে উদ্ভিদকে বলে ফাইটোপ্লাংকটন। সবুজ জলজ শেওলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য প্রস্তুত করে বেঁচে থাকতে পারে,তাই এদের উৎপাদক বলে।

খ) খাদকঃ

জলজ কীটপতঙ্গ, লার্ভা, মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, বক, গাংচিল, মাছরাঙা ইত্যাদি প্রাণী খাদক পর্যায়ভুক্ত। খাদক স্তরকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা-

প্রথম স্তরের খাদকঃ

উদ্ভিদভোজী বিভিন্ন প্রকার ভাসমান ক্ষুদে পোকা, মশার শূটকীট, আণুবীক্ষণিক প্রাণী, জুয়োপ্লাংকটন প্রভৃতি প্রথম স্তরের খাদক। এ খাদকগুলো নিজেদের খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে না। এরা সরাসরি উৎপাদককে ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে।

দ্বিতীয় স্তরের খাদকঃ

ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি, ব্যাঙ, কিছু জলজ প্রাণী দ্বিতীয় স্তরের খাদক। এরা নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে না আবার উৎপাদককেও খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে না। এরা প্রথম স্তরের খাদকদের খেয়ে বেঁচে থাকে।

তৃতীয় স্তরের খাদকঃ

যেসব প্রাণী দ্বিতীয় স্তরের খাদক খেয়ে বেঁচে থাকে তারাই তৃতীয় স্তরের খাদক। যেমন- শোল, বোয়াল, চিতল, গজারসহ যেকোন ধরণের বড় মাছ, বক, চিল, ঈগল ইত্যাদি।

গ) বিয়োজকঃ

পুকুরের বসবাসকারী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা বিয়োজকরূপে কাজ করে। বিয়োজক জীবিত অথবা মৃত প্রাণীদের আক্রমণ করে ও পচনে সাহায্য করে, ফলে উৎপাদকের ব্যবহার উপযোগী জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থ পুনরায় সৃষ্টি হয়। এসব বিয়োজিত জৈব ও অজৈব পদার্থ উৎপাদকগুলো ব্যবহার করে থাকে।

পুকুরে সবুজ শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ না থাকলে কী সমস্যা হবে?

যেকোন বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় বাস্তুতন্ত্রে বিদ্যমান সবগুলো প্রজাতির স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা জরুরি। বাস্তুতন্ত্রের কোন একটি প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটা মানে সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। একটি পুকুরে অজীব ও সজীব উপাদান রয়েছে। অজীব উপাদানের মধ্যে রয়েছে মাটি, পানি, খনিজ লবণ, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন। সজীব উপাদানের মধ্যে তিন ধরনের উপাদান রয়েছে। যথা- উৎপাদক, খাদক ও বিয়োজক। পুকুরের পানিতে ভাসমান ও কিনারায় অগভীর পানিতে জন্মে থাকা সবুজ শেওলা ও অন্যান্য উদ্ভিদ সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য প্রস্তুত করে বেঁচে থাকতে পারে তাই এদের উৎপাদক বলে। প্রথম স্তরের খাদক( ভাসমান খুদে পোকা, মশার শূককীট, আণুবীক্ষণিক প্রাণী প্রভৃতি) নিজেদের খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে না। এরা সরাসরি উৎপাদককে ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে। পুকুরে এই সবুজ শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ না থাকলে প্রথম স্তরের খাদকদের খাদ্যাভাব দেখা দিবে। ফলে তাদের সংখ্যা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্তরের খাদক প্রথম স্তরের খাদককে খেয়ে জীবন ধারণ করে তাদের খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে এবং তাদের সংখ্যাও হ্রাস পাবে। এছাড়া পরিবেশে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট হবে যা সমগ্র জীবজগতের ক্ষতির কারণ হবে। ফলে খাদ্যশৃঙ্খল থেকে সবুজ শেওলা জাতীয় উদ্ভিদের অনুপস্থিতি ঘটলে বাস্তুতন্ত্রের একটি বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে এবং বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলে বিপর্যয় দেখা দিবে।

প্রকৃতিতে বাস্তুসংস্থানের কেন প্রয়োজন ব্যাখ্যা করুন

প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য জীব ও জড় উপাদানগুলো একে অন্যের উপর নির্ভর করে। জীব ও জড় পরিবেশের সম্বন্ধ নিবিড়। কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিবেশে জীব ও জড় উপাদান এবং তাদের সম্পর্ক ও পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতিতে বাস্তুসংস্থান তৈরি হয়। জীব ও জড় উপাদানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলেই পরিবেশের ভারসাম্য বিরাজ করছে। প্রকৃতি থেকে কোন উপাদানই একেবারে ফুরিয়ে যাচ্ছে না। বিভিন্ন ধরনের বাস্তুসংস্থানের ফলেই তা সম্ভব হচ্ছে। পরিবেশে বাস্তুসংস্থান একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ একক। যেকোনো পরিবেশে বাস্তুসংস্থান মোটামুটিভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। প্রকৃতিতে যেকোনো জীবের সংখ্যা হঠাৎ করে বেশি বাড়তে পারে না।প্রতিটি জীব একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এরা পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সহজে এর কোনো একটি অংশ একেবারে শেষ হতে পারে না। কোনো একটি পরিবেশে বিভিন্ন স্তরের জীব সম্প্রদায়ের সংখ্যার অনুপাত মোটামুটিভাবে অপরিবর্তিত থাকে। পরিবেশে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটলেও বহুদিন পর্যন্ত প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। যেমন- সূর্য-ভাসমান উদ্ভিদ-ছোট মাছ-বড় মাছ। খাদ্যশৃঙ্খলটিতে ছোট মাছ কমে গেলে বড় মাছের খাদ্যাভাব দেখা দিবে এবং বড় মাছের সংখ্যা কমতে থাকবে। ছোট মাছ কমে গেলে ভাসমান সবুজ উদ্ভিদের পরিমান বেড়ে যাবে। আবার বড় মাছের সংখ্যা কমে গেলে ছোট মাছের সংখ্যা বেড়ে যাবে ও ভাসমান সবুজ উদ্ভিদের পরিমাণ কমতে থাকবে। এভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য জীব ও জড় পরিবেশে বাস্তুসংস্থান প্রয়োজন।

বিয়োজক কী? বিয়োজকের ভূমিকা কী?

বিয়োজকঃ

পুকুরের বসবাসকারী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা বিয়োজকরূপে কাজ করে।

বিয়োজকের ভূমিকাঃ

বিয়োজক জীবিত অথবা মৃত প্রাণীদের আক্রমণ করে ও পচনে সাহায্য করে, ফলে উৎপাদকের ব্যবহার উপযোগী জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থ পুনরায় সৃষ্টি হয়। এসব বিয়োজিত জৈব ও অজৈব পদার্থ উৎপাদকগুলো ব্যবহার করে থাকে।

নিচের বিচিন্ন জীবগুলো দিয়ে একটি খাদ্যজাল তৈরি করুন- মানুষ, খরগোশ, ব্যাঙ, সাপ, ময়ূর, বাঘ, হরিণ, গাছ, শামুক, পোকামাকড় ও গুঁইসাপ।

মানুষ, খরগোশ, ব্যাঙ, সাপ, ময়ূর, বাঘ, হরিণ, গাছ, শামুক, পোকামাকড় ও গুঁইসাপ জীবগুলো দিয়ে একটি খাদ্যজাল চিত্র নিম্নে দেখানো হলো:

চিত্র: খাদ্যজাল।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভূমিকা আলোচনা কর

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভূমিকাঃ

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ই আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর থেকে আমরা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য নানা রকমের উপাদান পেয়ে থাকি। উদ্ভিদ বায়ুতে অক্সিজেন ছাড়ে এবং বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে। উদ্ভিদের জন্যই বায়ুতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাড়তে পারে না।

বায়ুতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি পেলে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর জন্যও তা মারাত্মক হয়। খনিজ লবন প্রাণীদেহের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। উদ্ভিদ মাটি থেকে খনিজ লবন গ্রহণ করে দেহে জমা রাখে। প্রাণী উদ্ভিদজাত খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় খনিজ লবন সংগ্রহ করে। প্রাণীর মৃত্যুর পর খনিজ লবন আবার মাটিতে মিশে যায়। মাটি থেকে উদ্ভিদ পূনরায় খনিজ লবন গ্রহণ করে। এভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!