ডিপিএড প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষণবিজ্ঞান
অধ্যায়-০৪: প্রাথমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষণ কৌশলসমূহ
সেশন-৪.২: ৫ই মডেল, পিওই ও সহযোগিতামূলক শিখন এবং দলীয় কাজ- গুরুত্ব, বাস্তবায়ন কৌশল
১. 5E মডেল বর্ণনাপূর্বক দেখান যে, এটি শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষণের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর মডেল।
অথবা, বিজ্ঞান ক্লাসকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য 5E মডেলের গুরুত্ব উল্লেখপূর্বক প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ের যে কোনো একটি পাঠ/বিষয়বস্তু উল্লেখপূর্বক 5E মডেলের ব্যবহার করে আপনি কীভাবে শিখন-শেখানো কার্যাবলি পরিচালনা করবেন তা বিস্তারিত লিখুন।
শিখনের তাত্ত্বিক দিকগুলো শ্রেণিকক্ষে অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষকরা নানা ধরনের মডেল ব্যবহার করে থাকলেও বিজ্ঞান শিক্ষার 5E মডেল একটি আধুনিক মডেল। 5E মডেল প্রাথমিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি খুবই কার্যকর মডেল। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখনের জন্য যেমন তাদের নিবিড়ভাবে নিয়োজিত রাখার উৎসাহ পায়, ঠিক তেমনি তাৱা শিখনকে নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করারও সুযোগ পায়। এই মডেল পাঁচটি ভিন্ন কিন্তূ সম্পর্কযুক্ত ধাপে সজ্জিত। নিচে তাদের আলাদা আলাদা করে বর্ণনা দেওয়া হলো:
ক) Engage বা নিবিড়ভাবে জড়িত করা: শুরুতেই শিক্ষক ঐ পাঠের টপিক বা বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ও শিক্ষার্থীদের জীবনঘনিষ্ঠ কোনো ঘটনা উপস্থাপন করে সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন আহবান করে তাদেরকে বিষয়ের প্রতি আগ্রহী ও কৌতুহলী করে তোলা হয়। শিক্ষক পাঠের বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান যাচাই করেন, শিক্ষার্থীদের জন্য শিখন টার্গেট ও মূল্যায়ন নাজিল নির্ধারণ করেন।
খ) Explore বা অনুসন্ধান: এ ধাপে শিক্ষার্থী একটি সমস্যা বা ধারণা সম্পর্কে হাতে কলমে কাজ করে বা তথ্য সংগ্রহ করে বিষয়টি অনুসন্ধান করে। শিক্ষক এই ধাপে শিক্ষার্ণীদের কোনো একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ দেন এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের নির্দেশনায় অনুসন্ধানমূলক প্রশ্ন নির্ধারণ করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।
গ) Explain বা ব্যাখ্যা প্রদান: এ ধাপে শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসন্ধানে সময় লব্দ, পর্যবেক্ষণ এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নতুন ধারণা গঠনে সহায়তা প্রদান করেন। পূর্ববর্তী থাপে দেখানো কাজ/ প্রদর্শন/ পরীক্ষাটির পর্যনেক্ষণকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ব্যাপনের ধারণার সাহায্যে ব্যাখ্যা করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা গঠন করে।
ঘ) Elaborate বা পরিবর্ধন: এ ধাপে শিক্ষার্থীরা যা শিখল তা নতুন পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করেএক্ষেত্রে তারা নতুন অর্জিত ধারণাকে পাকাপোক্ত করে।
ঙ) Evaluate বা মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীরা কী শিখছে তা বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধাপে শিক্ষক তা মূল্যায়ন করে থাকেন। শিক্ষক এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সবগুলো ধাপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় করে বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা তাদের শিখন লক্ষা অর্জন করতে পেরেছে কিনা। শিক্ষক এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আত্ম-মুল্যায়নে সহায়তা করেন এবং ফিডব্যাক দেন। সবশেষে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিখন লক্ষ্য নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করেন।
২। POE পদ্ধতির মাধ্যমে কীভাবে শিক্ষার্থীরা কোনো বিজ্ঞান ঘটনায় গভীরভাবে এবং সুক্ষ্নভাবে চিন্তা করার ব্যাপারে উৎসাহিত হতে পারে?
অথবা, POE এর পূর্ণরূপ লিখুন। এটি কীভাবে কাজ করে? প্রাথমিক বিজ্ঞান (৩য়-৫ম শ্রেণির) বিষয়ের একটি পাঠ নির্বাচন করে পাঠ ঐ POEকৌশলটি প্রয়োগ করে কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কাজ পরিচালনা করবেন তা লিখুন।

POE এর পূর্ণরূপ-
Prediction – (পূর্বানুমান)
Observation – (পর্যবেক্ষণ)
Explanation – (ব্যাখ্যাকরণ)
POE যেভাবে কাজ করে :
প্রথমেই শিক্ষার্থীদের কোনো একটি ঘটনা বর্ণনা করে তা পর্যবেক্ষণ করলে কেমন হতে পারে তা পূর্বানুমান করতে বলা হয়। তাদের উত্তরের পেছনের কারণ জিজ্ঞাসা করতে বলা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো উক্ত ঘটনার সাথে শিক্ষার্গী তার জানা ধারণাগুলো সংযোগ করার সুযোগ পাবে। এ থেকে শিক্ষক প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন নিতে পারে এবং শিক্ষার্থীর ভ্রান্ত বা বিকল্প ধারণা আছে কিনা তা বুঝতে পারবে। এবার শিক্ষার্থীদের ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করতে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাদের পর্যবেক্ষণের সাথে তাদের অনুমানের মিল বা অমিল খুঁজে দেখার সুযোগ পাবে। বেশিরভগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থী পূর্বানুমান এর সাথে পর্যবেক্ষণ মিলবে না। পর্যবেক্ষণের পর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে ঘটনার ব্যাখ্যা দিবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা তাদের শিখনের প্রতি অধিক যত্নবান হবে।
POE কৌশলটি প্রয়োগ করে শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কাজ পরিচালনা: POE হলো শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান শিক্ষার একটি কৌশল। এ কৌশলটি শিক্ষার্থীদের কোন বিজ্ঞান বিষয়ক ঘটনায় গভীরভাবে ও সুক্ষ্ণভাবে চিন্তা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা্থীরা তাদের নিজের চিন্তাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ রার সুযোগ পায়। ফলে নিজের চিন্তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধন করার ব্যাপারে উৎসাহিত হয়। যেমন- বায়বীয় পদার্থ যে জায়গা দখল করতে পারে তা শিক্ষার্থীদের বুঝানোর জন্য নিম্নলিখিত কৌশল ব্যবহার করে সম্পন্ন করা যেতে পারে:
- প্রথমেই একটি শূন্য গ্লাস হাতে নিই।
- গ্লাসের তলায় শুকনো কাগজ গুজে দিই।
- শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করি গ্লাসটিকে খাড়াভাবে উপুড় করে বালতির পানিতে ডুবালে কাগজটি ভিজবে কি না? শিক্ষার্থীদের উত্তরের পক্ষে যুক্তি দিতে বলি। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই বলবে কাগজ ভিজে যাবে।
- কেউ যদি বলে যে কাগজ ভিজবে না, তাহলে সে এর ব্যাখ্যা দিতে হয়তো পারবে না।
- এবার কাগজসহ গ্লাসটিকে উপুড় করে বালতির পানিতে ডুবাই।
- শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ করতে বলি। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পূর্ব ধারণা ধাক্কা খাবে। এরপর আমার পক্ষে বুঝানো খুব সহজ হয়ে যাবে যে, বায়বীয় পদার্থ জায়গা দখল করে।
এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা সহজেই তার পূর্বানুমানের সাথে বর্তমান শিখনের সম্পর্ক নির্ণয়ের মাধ্যমে তার শিখনকে অনেক বেশি স্থায়ী ও কার্যকর করতে পারবে ।
৩। সহযোগিতামূলক শিখন কী? সহযোগিতামূলক শিখনের সুবিধাসমূহ কী কী?
সহযোগিতামূলক শিখন:
শিক্ষার্থীরা যখন কোনো দলে কাজ করে তারা পরস্পরের সাথে ভাবের আদান-প্রদানের সুযোগ পায় এছাড়া কোনো বিষয়ে সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন দিক সমস্যাটিকে দেখার সুযোগ পায়। সহযোগিতামূলক শিক্ষা একটি অ্যাপ্রোচ, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একত্রে তাদের অধিকতর কার্যকর শিখনে নিবিড়ভাবে জড়িত হয়। দলে কাজ কারার ফলে শিক্ষার্থীযা নেতৃত্ব গঠন পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিশ্বাস স্থাপন এমনকি সাংঘাত ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক দক্ষত্রাসমূহ শিখতে পারে। এই সামাজিক দক্ষতাসমূহ শিখন সময়সাপেক্ষ কিন্তু এর কার্যকারিতা দীর্ঘকালের জন্য ফলপ্রসূ।
সহযোগিতামূলক শিখনের সুবিধাসমূহ:
নিম্নে সহযোগিতামূলক শিখনের সুবিধাসমূহ বর্ণনা করা হলো:
অধিকতর কার্যকরী শিখন: শিক্ষার্থীরা দলে সহযোগিতামূলক কাজ করে। তারা ব্যক্তিগতভাবে কাজ করে যেভাবে শিখে তার চেয়ে অধিক কার্যকরীভাবে শেখার সুযোগ পায়। এতে তার উপর অর্পিত কাজের প্রতি বেশ জোরালো মনোভাব সৃষ্টি হয়।
আত্নবিশ্বাসেৱ উন্নয়ন: সকল শিক্ষার্থীই দলগতভাবে কাজ করার ফলে অধিকর সফল হয়, যা কিনা তাদের শিখনের ক্ষেত্রে আত্নবিশ্বাস উন্নয়নে সহায়তা করে।
অধিকতর শ্রেণি ব্যবস্থাপনা: শিক্ষার্থীরা যখন দলগতভাবে কাজ করে তখন তাদের নিজের কাজ সম্পর্কে অধিকতর দায়িত্ববান হয়, ফলে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীরা কিভাব সহযোগিতামূলক কাজে অংশহণ করতে শিখবে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, শ্রেণি ও দলগত কাজের মধ্যে একটা সাম্যতার কথা তথাপিও শিক্ষার্থীদের কার্যকর সহযোগিতামূলক ও দলগত শিখনের দক্ষতাসমূহ অর্জনের জন্য নিয়মিতভাবে দলে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয় ।
যখন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক কাজের পরিকল্পনা করবেন তখন নিচের ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করা যেতে পারে:
১। পছন্দমতো শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধ করতে হবে এবং তাদের নিজের পছন্দের দলে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
২ । বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীদের পারস্পারিকভাবে একত্রে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে।
৩। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য, লিঙ্গ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনতে হবে।
৪। একত্রে কাজ করার সুযোগ দেয়ার জন্য একই দলে বেশ কিছুদিন থাকতে দিতে হবে।
৫। বড় দল তৈরির করার পরিবর্তে ছোট ছোট দল তৈরি করতে হবে।
৬। প্রত্যেক দলের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট কাজের পরিধি নির্ণয় করতে হয়।
৫। সহযোগিতামূলক কাজ ও দলীয় কাজে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব কী?
দলীয় কাজকে ফলপ্রসূ করার জন্য দলীয় প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের আলাদা করে কাজ দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখতে যে, সকলকে প্রত্যেক কাজের সাথে অভ্যন্ত করতে প্রতিটি নতুন কাজেই দলের সদস্যদের দায়িত্ব পরিবর্তন করতে হবে। নিম্নে একটি দলে চারজন শিক্ষার্থীকে কল্পনা করে তাদের বিভিন্ন রকম দায়িত্ব বিবৃত করা হলো:
ব্যাবস্থাপক: দলের ব্যবস্থাপকের কাজ হলো প্রয়োজনীয় উদাহরণ সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ফেরত দেয়া। এই শিক্ষা্থীকে উপকরণাদি সমস্যাগুলো শিক্ষকের নজরে আনাও তার দায়িত্ব।
বক্তা: বক্তার কাজ হলো দলের কাজে যদি কোনো বিঘ্ন ঘটে তবে তার জন্য অন্য দল বা শিক্ষকের সহায়তা নেয়ার ব্যপারে কথা বলা।
পরিচালক: পরিচালকের কাজ হলো সে প্রত্যেক সদস্যকে তার কাজকে সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেয়া এবং প্রত্যেক সদস্য তা সঠিকভাবে অনুসসরণ করছে কিনা তা দেখা।
সমন্বয়কারী: সমন্বয়কারীর কাজ হলো দলের সকল সদস্য যথাযথভাবে রিপোর্ট প্রদানের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ বা কর্মসম্পাদন করছে কিনা তা দেখা।
