প্রাথমিক বিজ্ঞান (পিকে); অধ্যায়-৫ শিক্ষা উপকরণ - Proshikkhon

প্রাথমিক বিজ্ঞান (পিকে); অধ্যায়-৫ শিক্ষা উপকরণ

ডিপিএড প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষণবিজ্ঞান

অধ্যায়-০৫: প্রাথমিক বিজ্ঞান শিখন শেখানো সামগ্রী

সেশন-৫.১: বিজ্ঞান শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষা উপকরণের ধারণা, শিক্ষা উপকরণের প্রকারভেদ, নির্বাচন ও ব্যবহারের নীতিমালা

১) শিখন সামগ্রী বলতে কী বোঝায়? বিজ্ঞনের শিখন শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষা উপকরণের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।

শিক্ষাক্রমের অন্তর্গত বিষয়বস্তু ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে উপস্থাপনের জন্য যে সকল বাহন বা মাধ্যম ব্যবহার করা হয় তাই শিখন সামগ্রী। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক তার পাঠ উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিখন শেখানো সামগ্রীর প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। শিখন শেখানো সামগ্রী একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষার দিকে মনোযোগী করে অন্য দিকে শিক্ষকের জন্য শিক্ষন কাজ সহজতর হয়ে উঠে। যেমন- লিখিত সামগ্রী অর্থাৎ পাঠ্য পুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা, রেফারেন্স বই ইত্যাদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

শিক্ষা উপকরণের প্রকারভেদঃ

শিক্ষার্থীর শিখনকে স্থায়ী ও সার্থক করার জন্য শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে থাকেন। তবে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর শুধুমাত্র চক বোর্ডকে কেন্দ্র করেই শ্রেণিতে শিখন কাজ পরিচালনা করা হতো। বর্তমানে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের ব্যাপ্তি পেয়েছে। তাই শিক্ষা উপকরণ বিভিন্ন রূপ লাভ করেছে।

বিজ্ঞান শিখন-শেখানোর কাজে ব্যবহৃত উপকরণগুলোকে বিভিন্ন বিবেচনায় শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন-

সংগ্রহের উৎস হিসেবে উপকরণ ৩ প্রকার। যথা:

১. বাণিজ্যিক উপকরণঃ

যেসব উপকরণ বাণিজ্যিকভাবে কারখানায় তৈরি হয় এবং দোকান থেকে কেনা হয় সেসব উপকরণ হলো বাণিজ্যিক উপকরণ। যেমন-চকবোর্ড, মাল্টিমিডিয়া, দেওয়ালে ঝোলানোর উপযোগী বড় পর্যায় সারণি, পোস্টার, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।

২. সহজলভ্য স্থানীয় উপকরণঃ

আশেপাশের পরিবেশ ও সমাজ থেকে সংগ্রহ করা যায় এমন উপকরণ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কর্তৃক সংগৃহীত বা অল্প খরচে স্থানীয়ভাবে তৈরি । যেমন- ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পানির বোতল কেটে ফানেল বা বীকার তৈরি।

৩. সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত উপকরণঃ

আমাদের দেশে সরকারি সংস্থা যেমন- জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে থাকে।আবার কোন মন্ত্রণালয় বা ইউনিসেফের মত প্রতিষ্ঠান বিশেষ কোন পুস্তিকা বিতরণ করে থাকে।

আবার, ব্যবহারের ধরন অনুযাযী উপকরণকে ২ ভাগ ভাগ করা যায়। যথা-

১. প্রক্ষিপ্ত (Projected) ও

২. অপ্রক্ষিপ্ত (Non-projected) উপকরণ।

১) প্রক্ষিপ্ত (Projected) উপকরণ : যে সকল উপকরণ দূর থেকে প্রক্ষেপণের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয় এদের প্রক্ষিপ্ত উপকরণ বলে।

এগুলোকে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা যায় –

ক. দর্শনযোগ্য উপকরণসমূহ (Visual Aids) : ফিল্ম স্ট্রিপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ওভারহেড প্রজেক্টর ইত্যাদি।

খ. শ্রবণযোগ্য উপকরণসমূহ (Auditory Aids) : রেডিও, গ্রামোফোন, সিডি প্লেয়ার ইত্যাদি।

গ. শ্রবণ-দর্শন যোগ্য উপকরণসমূহ (Audio-Visual Aids) : চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, আধুনিক মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে প্রদর্শিত ভিডিও ইত্যাদি।

২) অপ্রক্ষিপ্ত (Non-projected) : যেসব উপকরণকে দূর থেকে প্রক্ষিপ্ত করার মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয় না। এগুলো সবই প্রায় দর্শনযোগ্য উপকরণ, যেমন- চার্ট, গ্রাফ, নকশা, ছবি,ফটোগ্রাফ, অঙ্কিত চিত্র, পাঠ্যপুস্তক, লিফলেট, মডেল, নমুনা।

 উপরিউক্ত ধরনগুলো ছাড়াও বিজ্ঞান শিখন-শেখানোর ক্ষেত্রে উপকরণসমূহকে আরেকটি ধরণে ফেলা যায়। এটি হলো অনুসন্ধানমূলক শিক্ষা উপকরণ। বিজ্ঞান যেমন- রসায়ন শিখন-শেখানো কাজে ব্যবহারিক কাজ তথা অনুসন্ধানমূলক কাজ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রসায়নে অনুসন্ধান পরিচালনা করার জন্য বিশেষ ধরনের উপকরণ প্রয়োজন হয়। নিচে বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা উপকরণের বর্ণনা উদাহরণসহ দেওয়া হলো।

ক) দর্শনভিত্তিক শিক্ষোপকরণ (Visual Teaching Aids): যেসব শিক্ষোপকরণ শুধুমাত্র দর্শনযোগ্য এবং শিক্ষার্থীরা দর্শন ইন্দ্রিয় ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়বস্তু আয়ত্ত করে, তাকে দর্শনভিত্তিক শিক্ষোপকরণ বলে। উদাহরণঃ পাঠ্যপুস্তক, মডেল,কর্মপত্র, বাস্তব নমুনা, বোর্ড, বুলেটিন বোর্ড, হোয়াইট বোর্ড, অঙ্কিত চিত্র, ছবি, মানচিত্র, ধারণা মানচিত্র, ভিপ কার্ড, প্রবাহ চিত্র, ম্যাজিক ল্যান্টার্ন, মোবাইল, চার্ট, ওভারহেড প্রজেক্টর (OHP), ফ্লিপ চার্ট, নির্বাক চলচ্চিত্র।

খ) শ্রবণভিত্তিক শিক্ষোপকরণ (Audio Teaching Aids) : শোনা যায় এবং শুধু শ্রবণ ইন্দ্রিয় ব্যবহৃত হয় এ ধরনের শিক্ষোপকরণকে শ্রবণভিত্তিক শিক্ষোপকরণ বলে। উদাহরণ : রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, টেলিফোন, সিডি প্লেয়ার।

গ) শ্রবণ ও দর্শন ভিত্তিক শিক্ষোপকরণ (Audio-Visual Teaching Aids): দর্শন ও শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের সক্রিয়তার মাধ্যমে যেসব উপকরণ বিষয়বস্তু উপস্থাপনে ব্যবহৃত হয়, তাকে শ্রবণ-দর্শনভিত্তিক শিক্ষোপকরণ বলে। এর উদাহরণ হলো টেলিভিশন, কম্পিউটার (সাউন্ড সিস্টেমসহ) এবং চলচ্চিত্র।

ঘ) অনুসন্ধানমূলক শিক্ষোপকরণ (Investigatory Teaching Aids) : যেসব উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করে, নতুন তথ্য খোঁজ  করে এবং পরীক্ষণমূলক কাজ করে, তাকে অনুসন্ধানমূলক শিক্ষোপকরণ বলে। উদাহরণ : রাসায়নিক সামগ্রী, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, পরিমাপক যন্ত্রসমূহ, পরীক্ষণযন্ত্রসমূহ ও রাসায়নিক পদার্থের বাস্তব নমুনা, রাসায়নিক শিল্প প্রতিষ্ঠান।

২) শিখন-শেখানো কাজে উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহারের নীতিমালা বর্ণনা করুন।

শিখন-শেখানো কাজে উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহারের নীতিমালাঃ

শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের শিখনে সহায়তা করে। তাই শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারকে ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে শিক্ষককে কিছু নীতি অনুসরণ করতে হয়। শিক্ষা উপকরণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন তা নিম্নরূপঃ 

  • উপকরণ নির্বাচনে প্রথমেই যে বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার তা হলো, উপকরণটি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত শিখনফল অর্জনের সহায়তা করবে কিনা। যেমন ধরা যাক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের যে অধ্যায় পড়ানো হচ্ছে তাতে শিখনফল আছে ‘শিক্ষার্থীরা দ্রবণ তৈরি করতে পারবে’। এ ক্ষেত্রে যদি শিক্ষার্থীদের মাপচোঙ ও বীকারের ছবি প্রদর্শন করা হয় তাহলে তা কোন কাজে আসবে না। কিংবা সেই সম্পর্কিত ভিডিয়ো প্রদর্শনও খুব কাজে আসবে না। উল্লিখিত শিখনফল অর্জনের জন্য অবশ্যই শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ও নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে হাতে কলমে কাজ করতে দিতে হবে। অর্থাৎ শিখনফল অর্জনের লক্ষ্যটিকে মাথায় রেখে  যথাযথ শিখন-শেখানো কার্যাবলির সাথে সংগতি রেখা উপকরণ নির্বাচন করতে হবে।
  • শিক্ষার্থীদের শিখন ফলপ্রসূ করার জন্য উপকরণ নির্বাচনে ডেল এর অভিজ্ঞতার কোণ ব্যবহার করা। যে ধরণের উপকরণে শোনা,পড়া,দেখার সমন্বিত ব্যবহার হয় তাতে শিক্ষার্থীদের শিখন ভালো হয়। তবে উপকরণ ব্যবহার করে হাতে কলমে অনুসন্ধান শিক্ষার্থীদের শিখনকে ফলপ্রসূ করে। যেমন হলুদ রঙের সাথে লাল রঙ মেশালে তা কমলা রঙ ধারণ করে এটা হাতে কলমে দেখালে শিক্ষার্থীরা তা ভালো শিখবে এবং শিখনটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
  • স্বল্প ও বিনামূল্যের উপকরণ তৈরি ও ব্যবহারে প্রাধান্য দেওয়া। বিদ্যালয়গুলোতে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই উপকরণ তৈরি বা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেশীয় ও সহজলভ্য কাঁচামাল ও উপকরণ ব্যবহার করা দরকার।
  • উপকরণ যাতে সহজে সংরক্ষণ, সহজে বহন করা ও ব্যবহার করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে নির্বাচন করতে হবে।
  • শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক পরিপক্কতা, চাহিদা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে উপকরণ নির্বাচন করা দরকার। কম বয়সী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে যথাসম্ভব সহজবোধ্য উপকরণ ব্যবহার করা দরকার।
  • নির্বাচিত উপকরণ শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হওয়া দরকার। তবে তা এমন হবে না যাতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিষয়বস্তু থেকে উপকরণে চলে যায়।
  • শিক্ষোপকরণ যেহেতু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই ব্যবহার ও নড়াচড়া করতে হয়,তাই এটি ব্যবহারের জন্য নিরাপদ হওয়া বাঞ্ছনীয়। যে ধরনের উপকরণ দিয়ে বিপদ ঘটতে পারে, যেমন-ধারালো উপকরণে কেটে যাওয়া, বৈদ্যুতিক শক খাওয়া ইত্যাদি পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।
Comments (2)

ভিপ কার্ড কী

ভিপ কার্ড Visualisation in Participatory Planning = VIPP হলো কতকগুলো ভিন্ন রংয়ের কার্ড (লাল/নীল/হলুদ/বেগুনী/সবুজ) যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ বা সভায় গ্রুপভিত্তিক পরিকল্পনা প্রদান বা মতামত নেওয়া হয়। ধন্যবাদ আপনার চমৎকার প্রশ্নের জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!