ডিপিএড প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষণবিজ্ঞান
অধ্যায়-০৪: প্রাথমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষণ কৌশলসমূহ
সেশন-৪.১: ব্রেইনস্টর্মিং, কনসেপ্ট ম্যাপিং বা ধারণা মানচিত্র এবং মাইন্ডম্যাপিং
১. ব্রেইন স্টর্মিং কী? এটি কীভাবে কাজ করে?
ব্রেইন স্টর্মিং:
ব্রেইন স্টর্মিং হলো একটি কৌশল, যার দ্বারা শিক্ষক কোনো বিষয়ে শিক্ষাথীদের বিষয় সংশ্লিষ্ট পূর্বজ্ঞানের ধারনা সমূহ সংগ্রহ কাতে পারেন। এটি একটি সৃজনশীল ও সমস্যা সমাধান কৌশল। এটি মূলত কোনো পাঠ শুরুর পূর্বে শিক্ষার্থীদেরপূর্বজ্ঞান যাচাইয়ে ব্যবহৃত হয়।
ব্রেইন স্টর্মিং যেভাবে কাজ করে:
প্রথমে একটি বিষয় নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের এই সম্পর্কে পূর্বে থেকে কি জানে তা চিন্তা করার সুযোগ দেয়া হয়। যেমন কোনো উদাহরণ জানতে চাওয়া হলে কেবল একটি উদাহরণই চিন্তা করতে বলতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক কোনো ধারণার জন্য সমালোচনা কর যাবে না। এখানে যখন শিক্ষার্থীরা যার যার মতামত দেবে তখন সহযোগিতার মাধ্যমে অন্যের মতামত থেকেও শিখনের সুযোগ থাকে। শিক্ষার্থী যেভাবে বলবে সেভাবেই বোর্ডে লিখতে হবে এবং শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পূর্ব ধারণার মধ্যে কোনো ভ্রান্ত বা বিকল্প পারণা আছে কিনা? এই ধারণা থেকে শিক্ষক পাঠটি নির্মাণে জন্য প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন ও তথ্য পেতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শক্তির উৎস পড়াবেন বলে ঠিক করেছেন। সেক্ষেত্রে-
- প্রথমে নিজে না বলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে কেবল একটি করে শক্তির উৎসের নাম খাতায় লিখতে বলতে হবে।
- এবার প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
- দেখা যাবে, আনেকাংশ প্রায় সব শক্তির উৎসের নামই চলে এসেছে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, কোনো শিক্ষার্থী যদি কোনো শক্তির উৎসের নাম যথাযথ ভাষায় না বলতে পারে তাও গ্রহণ করতে হবে। কারণ এখানে শিক্ষক পাঠটি নির্মাণের জনা প্রয়োজনীয় তথ্য ও ফলাবর্তন নিচ্ছেন।
- তবে শিক্ষক যদি এখানেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রকম ধারণার সমালোচনা বা মূল্যায়ন করতে যান তাতে শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারে। বরং পরবর্তীতে শিক্ষকের পাঠকে উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজ থেকেই তার ধারণা সংশোধনের সুযোগ পাবে।
২. কনসেপ্ট ম্যাপিং বা ধারণা মানচিত্র কী? শিক্ষক হিসাবে আপনি শ্রেণিকক্ষে কীভাবে কনসেপ্ট ম্যাপিং করবেন তা ব্যাখ্যা করুন।
বিজ্ঞান শিখন-শেখানো কার্যক্রমে কনসেপ্ট ম্যাপিং একটি বহুল প্রচলিত কৌশল। কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যম মূলত শিক্ষার্থীদের একটি মানচিত্র উপস্থাপন করতে বলা হয় যার দ্বারা কতগুলো পরষ্পর সম্পর্কিত ধারণার মধ্যে সংযোগ ও সম্পর্কসমূহ তুলে ধরা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান উপস্থাপন করার সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি তাদের সেই ধারণায় কোন ভ্রান্ত বা বিকল্প ধারণা রয়েছে কিনা সে সম্পর্কে শিক্ষক অবগত হতে পারেন।
শ্রেণিকক্ষে কনসেপ্ট ম্যাপিং করার কৌশল:
কনসেপ্ট ম্যাপিং এমন একটি কৌশল কৌশল যেখানে সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। এর জন্য করণীয় ধাপগুলো নিম্নরূপ:
- প্রথমে মূল বিষয় সম্পর্কিত সকল মূল ধারণাগুলো সাধারণভাবে তাদের ভাবতে বলতে হবে।
- ধারণাগুলোর নোট খাতায় কিংবা বোর্ডে বক্স আকারে লিখতে হবে।
- শিক্ষার্থীরা ঐ ধারণাগুলো তীর চিহ্নযুক্ত রেখা দ্বারা সংযুক্ত করবে এবং তীর চিহ্নের উপরে ও নিচে ধারণাগুলোর মধ্যে সম্পর্কসমূহ উল্লেখ করবে।
- এভাবে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধারণাসমূহের মধ্যে সম্পর্ক চিহ্নিত ও লেবেলিং করে কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করতে পারবে।
কনসেপ্ট ম্যাপিং ধারণাটিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো:
- ধরা যাক শ্রেণিকক্ষে ‘শক্তি’ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। তাহলে প্রথমেই বোর্ডে শক্তি’ বিষয়টি লিখতে হবে এবং চার পাশে একটি বৃত্ত আঁকতে হবে।
- এরপর শিক্ষার্থীদেরকে জিজ্ঞাসা করতে হবে ‘শক্তি’র সাথে আর কী কী ধারণা সম্পর্কযুক্ত রয়েছে।
- শিক্ষার্থীরা যখন বলবে তখন শব্দগুলো বোর্ডে লিখতে হবে এবং প্রত্যেকটি শব্দকে একটি বক্স দ্বারা আবদ্ধ করতে হবে। এরপর শক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন শব্দগুলো হবে শক্তি, খাবার, ধানগাছ, কাজ, সূর্য ইত্যাদি। এরপর ধারণাগুলো রেখা দ্বারা যুক্ত করতে হবে। ধারণাগুলোকে সংযুক্ত করার পর এটিকে দেখতে মনে হবে একটি নেটওয়ার্ক বা মানচিত্রের মতো।
- এভাবে পুরো ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ধারণা মানচিত্র তৈরি করা যাবে।
উল্লেখ্য যে, কনসেপ্ট ম্যাপিং একক কাজ বা দলগত ভাবেও এটি করা যায়। তাই কনসেপ্ট ম্যাপিং শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা যায়। আবার পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা নতুন ধারণা কতটুকু গ্রহণ করতে পেরেছে তাও বের করা যায়। এভাবে শিক্ষার্থীরা প্রথম ধারণাচিত্র ও শেষের ধারণাচিত্র তুলনা করে নিজেরাও বুঝতে পারবে তাদের ধারণার কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে।
৩. মাইন্ডম্যাপিং কী? মাইন্ড ম্যাপিংয়ের সুবিধা লিখুন।
মাইন্ড ম্যাপিং:
মাইন্ড ম্যাপিং হল আপনার মস্তিষ্কে এবং মনের ভেতরে ক্রমাগত বয়ে চলা তথ্যের প্রবাহকে উন্নত করার একটি উপায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এটি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নতুন আইডিয়া বা ধারণা সৃষ্টি, প্রয়োগ ও পরিবর্ধনে ব্যবহৃত হয়।
মাইন্ডম্যাপিং এর সুবিধা:
- মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে মাইন্ডম্যাপিংয়ের অনুশীলন করা যায়।
- এর দ্বারা কোনো তথ্য শেখা, মনে রাখা এবং এগুলো নিয়ে কাজ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
- এছাড়াও ছোট ছোট সমস্যার জায়গায় বৃহৎ পরিসরে পুরো ব্যাপারটা দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- কোন একটি ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে কোন সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করতে পারে, নতুন পরিস্থিতিতে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে।
৪. শ্রেণিকক্ষে মাইন্ডম্যাপিং করার কৌশল বর্ণনা করুন।
শ্রেণিকক্ষে মাইন্ডম্যাপিং করার কৌশল:
কোন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পূর্ব ধারণা যাচাই বা প্রদানের ক্ষেত্রে কৌশল হিসাবেন মাইন্ড ম্যাপিং খুবই কার্যকরি। নিম্নে শ্রেণিকক্ষে ‘পরিবেশ দূষণ’ বিষয়টিকে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করে মাইন্ড ম্যাপিং করার কৌশল বর্ণনা করা হলো:
- প্রথমে বোর্ডের মাঝখানে ‘পানি দূষণ রোধ’ কথাটি লিখতে হবে।
- এরপর ‘পানি দূষণ রোধ’ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত একটি ধারণা দেওয়া যেতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা কীভাবে মাইন্ড ম্যাপিং করবে সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে হবে।
- শিক্ষকের নির্দেশনা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা নিজের খাতায় একটি পৃষ্ঠার মাঝখানে ‘পানি দূষণ রোধ’ লিখবে এবং এই মূল ধারণাটির চারদিকে পানি দূষণ রোধে পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের আইডিয়া বা ধারণা লিখবে।
- মনে রাখতে হবে মাইন্ডম্যাপিং তৈরির ক্ষেত্রে একটি মূল ধারণাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন আইডিয়া (বা সমাধান) সৃষ্টি করে। মূল ধারণাকে কেন্দ্র করে যে আইডিয়া সৃষ্টি হয় সেটির আবার ছোট ছোট অংশ থাকতে পারে।
৫. কনসেপ্ট ম্যাপিং ও মাইন্ডম্যাপিং এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
কনসেপ্ট ম্যাপিং ও মাইন্ডম্যাপিং এর মূল পার্থক্য:
কনসেপ্ট ম্যাপিং ও মাইন্ডম্যাপিং এর মূল পার্থক্য হলো ধারণা মানচিত্রে অনেকগুলো ধারণার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হয় আর মাইন্ডম্যাপে একটি মূল ধারণাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন আইডিয়া সৃষ্টি করতে হয়।
