প্রাথমিক গণিত (পিকে); অধ্যায়-১ - Proshikkhon

প্রাথমিক গণিত (পিকে); অধ্যায়-১

ডিপিএড প্রাথমিক গণিত শিক্ষণবিজ্ঞান

সেশন-১.১: প্রাথমিক গণিত শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:

১. প্রাথমিক গণিত শিক্ষার লক্ষ্য কী?

২. প্রাথমিক গণিত শিক্ষার উদ্দেশ্য কী কী?

৩. গণিত শিক্ষার ব্যবহারিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করুন।

৪. গাণিতিক সাক্ষরতা বলতে কী বোঝায়?

৫.গাণিতিক সাক্ষরতা পরিমাপের মানদন্ডগুলো ব্যাখ্যা করুন।

১. প্রাথমিক গণিত শিক্ষার লক্ষ্য কী?

প্রাথমিক গণিত শিক্ষার লক্ষ্য হলো এই স্তরের শিক্ষার্থীদের কল্পনা, কে․তুহল, সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশে প্রয়োজনীয় গাণিতিক ধারণা ও দক্ষতা অর্জন এবং যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারা। গণিত শিক্ষার লক্ষ্য মূলত: ৩ ধরনের ব্যাপক উদ্দেশ্যকে ধারণ করে।

২. প্রাথমিক গণিত শিক্ষার উদ্দেশ্য কী কী?

প্রাথমিক গণিত শিক্ষার উদ্দেশ্য ৩টি। যথা:

১। ব্যবহারিক উদ্দেশ্য

২। সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উদ্দেশ্য

৩। শৃঙ্খলামূলক ও যৌক্তিক উদ্দেশ্য

৩. গণিত শিক্ষার ব্যবহারিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করুন।

গণিত শিক্ষার ব্যবহারিক উদ্দেশ্য :

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকার সমস্যায় পড়ি যেগুলোর সমাধানে গণিতের ভূমিকা অতুলনীয়। গণিত শিক্ষার ব্যবহারিক উদ্দেশ্যগুলে নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

১. দৈনন্দিন প্রয়োজনে গণিতের ব্যবহার:

প্রতিদিনের জীবন নির্বাহে প্রতিনিয়তই গণিতের ব্যবহার করা হয়। ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় বাজেটে, সময়, দূরত্ব, মজুরি, কমিশন ইত্যাদি নির্ধারণে এবং গবেষণা ও পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে গণিতের ব্যবহার অনস্বীকার্য। যেমন- বিভিন্ন ধরণের গণনা, জিনিসপত্র পরিমাপ, আকার আকৃতি প্রকাশ, ক্রয়-বিক্রয়সহ নানান প্রকার আর্থিক লেনদেনে গণিতের ব্যবহার করা হয়।

২. যোগাযোগ বা ভাবের আদান প্রদান ও যাতায়াতে গণিতের ব্যবহার:

বর্তমান যুগের প্রায় সবধরণের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গণিত জড়িয়ে রয়েছে। যেমন- রেডিও, টেলিফোন, ই-মেইল, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ব্যবস্থা, সংবাদপত্র ইত্যাদির মূ চালিকাশক্তি হলো গণিত। বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রযুক্তির যে বিস্ফোরণ ঘটেছে এর মূলেও রয়েছে গণিত। যাতায়াত ও যোগাযোগ মাধ্যমের সকল প্রকার আর্থিক ও সাধারণ হিসাব নিকাশে গণিতের সহায়তা দরকার।

৩. পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে গণিতের ব্যবহার:

গণিতের জ্ঞান ছাড়া কোন পেশাতেই উৎকর্ষ লাভ করা যায় না। জীবন যাপনের জন্য যে সকল পেশায় নিয়োজিত থাকে তার প্রায় সবকিছুতেই গণিতের ব্যবহার রয়েছে। যেমন- কৃষিকাজে বীজ ও সারের পরিমাণ, জমির মাপ, উৎপন্ন ফসলের হিসাব, ব্যবসাবাণিজ্যে, ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি, সঞ্চয়, মূলধন, লাভ-লোকসান নির্ধারণ, চাকুরির ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা, বোনাস, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ইত্যাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণিতই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

৪. অন্যান্য বিষয় শিখনের সাথে গণিতের ব্যবহার:

শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ভূগোল ইত্যাদি নানান বিষয়ের সাথে গণিতের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি নিয়ম কানুন ও সূত্র গণিতের সঠিক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথেও গণিতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। যেমন- সাষা শিক্ষার বর্ণ, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি গঠনে গণিত কাজে লাগে। চারু ও কারুকলার বিভিন্ন কাজে গাণিতিক জ্ঞান অপরিহার্য। নানা রকম হাতের কাজে গাণিতিক জ্ঞান কাজে লাগানো হয়। সঙ্গীতের সুর, তাল, লয়, ছন্দ ইত্যাদি গাণিতিক নিয়মে আবদ্ধ। শারীরিক শিক্ষায় খেলার সামগ্রী, খেলারমাঠ, খেলোয়াড়ের সংখ্যা, খেলার নিয়ম কানুন ইত্যাদির সাথে গণিতের সম্পর্ক অত্যন্ত বেশি।

৪. গাণিতিক সাক্ষরতা বলতে কী বোঝায়?

গাণিতিক সাক্ষরতা:

সাক্ষরতা বলতে সাধারণত অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নতাকেই বোঝায়। একজন শিক্ষার্থীর ভাষাগত সাক্ষরতা (Language Literacy) এর পাশাপাশি গাণিতিক সাক্ষরতা বা Mathematical Literacy অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণে গণিতের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সক্ষমতাই গাণিতিক সাক্ষরতা।

গাণিতিক সাক্ষরতার ৩টি ক্ষেত্র রয়েছে। যথা:

১. অনুধাবন,

২. বিশ্লেষণ ও

৩. প্রয়োগ।

একজন শিক্ষার্থী যখন তার গাণিতিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনুধাবনের সাথে সাথে সবধরণের গাণিতিক ধারণার যৌক্তিক বিশ্লেষণ করতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়, তখনই সে গাণিতিক ভাবে সাক্ষর (Mathematically Literate) বলে বিবেচিত হয়।

সুতরাং গাণিতিক সাক্ষরতা বলতে বোঝায়:

  • গাণিতিক ধারণা অনুধাবনের সক্ষমতা,
  • নম্বর, গ্রাফ, প্রতীক, চিত্র সম্বলিত তথ্যের যৌক্তিক বিশ্লেষণ সক্ষমতা,
  • গাণিতিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন দক্ষতা
  • গাণিতিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা

৫. গাণিতিক সাক্ষরতা পরিমাপের মানদন্ডগুলো ব্যাখ্যা করুন।

গাণিতিক সাক্ষরতা পরিমাপের ৩টি মানদন্ড রয়েছে। যেমন-

(১) স্থানিক সাক্ষরতা (Spatial Literacy)

(২) সংখ্যাগত সাক্ষরতা (Numeracy)

(৩) পরিমাণবাচক সাক্ষরতা (Quantitative Literacy)

স্থানিক সাক্ষরতা:

Sinton 2014 এর মতে, স্থানিক সাক্ষরত হলো- ‘প্রতিদিনের জীবন, সমাজ এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং সমস্যাসমূহের সমাধান করার জন্য মানচিত্র, ম্যাপিং এবং অবস্থানগত (Spatial) চিন্তার দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসের ব্যবহার।’

স্থানিক সাক্ষরতা অর্জনের প্রারম্ভিক লক্ষ্যে জ্যামিতিক জ্ঞান ও চিন্তন দক্ষতা অর্জনে সহায়তার জন্য প্রাথমিক গণিত শিক্ষাক্রমে বিন্দু, রেখা, তল, লম্ব, সমান্তরাল রেখা, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও বৃত্ত সর্ম্পকিত বিভিন্ন প্রাথমিক ধারণা সংগঠন করা হয়।

সংখ্যাগত সাক্ষরতা:

গণিতে এমন কিছু দক্ষতা জড়িত থাকে যার সবকিছু শ্রেণিকক্ষে শেখানো সম্ভব হয় না। শ্রেণিতে শেখা সংখ্যা গণনা ও পড়া, জোড় ও বিজোড়, মানসংখ্যা ও ক্রমসংখ্যা, প্রাথমিক চার নিয়ম, লসাগু ও গসাগু, ভগ্নাংশের ধারণা ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সকল গাণিতিক শিক্ষা পদ্ধতির ব্যবহার করার আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতার সাথে ব্যবহার করার সক্ষমতাই হলো সংখ্যাগত সাক্ষরতা।  সংখ্যাগত সাক্ষরতার মাধ্যমে ব্যক্তির সংখ্যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজনিত ধারণা অনুধাবন, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োগজনিত সক্ষমতা প্রকাশ পায়।

পরিমানবাচক সাক্ষরতা:

ব্যক্তির পরিমানবাচক সাক্ষরতা বলতে বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যকার পরিবর্তন ও সর্ম্পক সংশ্লিষ্ট ধারণা অনুধাবন, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োগজনিত সক্ষমতা বোঝায়- যার মধ্যে সম্ভাব্যতার ধারণাও অর্ন্তভুক্ত। সংখ্যাগত সাক্ষরতা ও পরিমানবাচক সাক্ষরতার মধ্যে আন্ত: সর্ম্পক রয়েছে। পরিমানবাচক সাক্ষরতা অর্জনের প্রারম্ভিক লক্ষ্যে প্রাথমিক গণিত শিক্ষাক্রমে ঐকিক নিয়মে গাণিতিক সমস্যার সমাধান; শতকরার ধারণা, শতকরাকে ভগ্নাংশে এবং ভগ্নাংশকে শতকরায় রূপান্তর এবং শতকরার ব্যবহার (জনসংখ্যা, লাভ-ক্ষতি, মুনাফা); উপাত্ত উপস্থাপনে উপাত্ত সংগ্রহ ও বিন্যস্তকরণ, বিন্যস্ত ও অবিন্যস্ত উপাত্ত লেখচিত্রে (স্তম্ভচিত্র) উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ, জনসংখ্যা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধান এবং সমস্যা তৈরি ও সমাধান; ক্যালকুলেটর ও কম্পিউটারের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়।

MCQ প্রশ্ন ও সমাধান:

১. গণিত শিক্ষার লক্ষ্য কয় ধরণের উদ্দেশ্যকে ধারণ করে?

– ২/৩/৪/৫ ধরণের।

২. গণিত শিক্ষার সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উদ্দেশ্য কোনটি?

– যৌক্তিক চিন্তার বিকাশে গণিত/ সভ্যতার বিকাশে গণিত/পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে গণিত/দৈনন্দিন প্রয়োজনে গণিত।

৩. কোনটি গাণিতিক শিক্ষার শৃঙ্খলামূলক ও যৌক্তিক উদ্দেশ্য নয়?

– সরলতা ও সততায় গণিত/মৌলিক চিন্তার বিকাশে গণিত/নৈতিক ও আধ্যাত্মি মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গণিত/ আত্ম-মূল্যায়ন ও আত্ম-সমালোচনায় গণিত।

৪. গাণিতিক সাক্ষরতা পরিমাপের মানদন্ড কয়টি?

– ‍দুইটি/ তিনটি/ চারটি/ ছয়টি।

৫. নীচের কোনটি স্থানিক সাক্ষরতার উদাহরণ?

– জনসংখ্যা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধান/ জ্যামিতিক জ্ঞান/ভগ্নাংশের ধারণা/প্রাথমিক চার নিয়ম।

৬. নীচের কোনটি সংখ্যাগত সাক্ষরতার উদাহরণ?

– জনসংখ্যা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধান/ জ্যামিতিক জ্ঞান/ভগ্নাংশের ধারণা/ লেখচিত্র উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ।

৭. নীচের কোনটি পরিমাণবাচক সাক্ষরতার উদাহরণ?

– ঐকিক নিয়মে গাণিতিক সমস্যার সমাধান/ জ্যামিতিক জ্ঞান/ভগ্নাংশের ধারণা/ লেখচিত্র উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ।

MCQ এর সঠিক উত্তর:

১) ৩ ধরণের, ২) সভ্যতার বিকাশে গণিত , ৩) নৈতিক ও আধ্যাত্মি মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গণিত , ৪) তিনটি , ৫) জ্যামিতিক জ্ঞান , ৬) ভগ্নাংশের ধারণা , ৭) ঐকিক নিয়মে গাণিতিক সমস্যার সমাধান ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!