শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ - Proshikkhon

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ

Child Brain Development

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ

প্রারম্ভিক বছরের সার্বিক বিকাশের ওপর মস্তিষ্কের গঠন নির্ভর করে। সাধারণভাবে মস্তিষ্ককে দুভাগে ভাগ করা হয়- ডান মস্তিষ্ক এবং বাম মস্তিষ্ক। বাম মস্তিষ্ক যেমন যুক্তি-তর্ক, ঘটনার বর্ণনা, গণিত, ভাষা দক্ষতা, চিন্তা, ডানদিকের দৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। আবার ডান মস্তিষ্ক সংগীত, কাজের ধারাবাহিকতা, সৃজনশীলতা, কল্পনা শক্তি, শ্রবণ, বামদিকের দৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে।

মস্তিষ্কের বিকাশ:

শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ বছর পর্যন্ত মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে বেশি হয়। মস্তিষ্কের নিউরণের সংযোগ সৃষ্টিতে এবং বৃদ্ধির জন্য শিশুকে উদ্দীপনা (আদর করা, কথা বলা, হাসা, ছড়া, খেলা করা) প্রদান করতে হবে। বিভিন্ন উদ্দীপনা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সংযোজিত হতে সহায়তা করে। একটি শিশুর মস্তিষ্ক পূর্ণতা পায় দুইদিক থেকে যেমন-

আকৃতিগত বৃদ্ধির মাধ্যমে:

আকৃতিগত বৃদ্ধির মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোষের (neuron) সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে:

একটি নিউরনের সাথে আরেকটি ও একাধিক নিউরণের সংযোগ বৃদ্ধি পায় এবং অন্তজাল তৈরি হয় (neural connection & network formation)।  মস্তিষ্কের একটি কোষ সর্বোচ্চ ১৫,০০০ কোষের সাথে সংযোগ করতে পারে। শিশুর  ৩ বছর বয়সের মধ্যে ৭০-৮০% এবং ৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ১০০% সংযোগ স্থাপিত হয়। তাই এই বয়সে যত বেশি পারস্পারিক ক্রিয়া (Interaction) ঘটে তত বেশি সংযোগ তৈরি হয়।

এভাবে শিশুর মাধ্যমে মস্তিষ্ক পূর্ণতা লাভ করে। তাই নিউরণের সংযোগ ঘটাবার সর্বোত্কৃষ্ট সুযোগ (windows of opportunities) হলো জন্ম থেকে ৫ বছর বয়সকাল।আবার, এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে তা হারিয়ে যায় অর্থাৎ এটি ‘ব্যবহার না করলে হারিয়ে ফেলবে’ (use it or lose it) প্রক্রিয়ায় কাজ করে ৫-৬ বছর বয়সের পর নতুন সংযোগ তৈরি না হলেও সংযোগের স্থায়ীত্বের জন্য শিশুর ৮ বছর বয়স পর্যন্ত পারস্পারিক ক্রিয়ামুলক যত্ন (interactive care) চালিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের বিকাশের কিছু মৌলিক তথ্য

  • মস্তিষ্কের নিউরণের সংখ্যা বৃদ্ধির অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো মায়ের গর্ভে থাকাকলীন অবস্থায় এবং সংযোগ বৃদ্ধি ও অন্তজাল তৈরির সময় হলো জন্মের পর।
  • নিউরণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও অন্তজাল তৈরি ছাড়া মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে না।
  • সংযোগ স্থাপন ও অন্তজাল তৈরির পূর্বশর্ত হল নিউরণগুলোর উদ্বীপ্তকরণ (stimulation)।
  • শিশুর সাথে মিথস্ক্রিয়া (interaction) করা ও করার সুযোগ করে দেওয়া নিউরণগুলোকে উদ্দীপ্ত করার একমাত্র উপায়।
  • মস্তিষ্কের এক এক অংশ এক এক ধরনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই মস্তিষ্কের সব অংশের নিউরণগুলোকেই উদ্বীপ্ত (stimulate) করা প্রয়োজন।
  • শিশু তার পাঁচটি ইন্দ্রিয়ই ব্যবহার করার সুযোগ পায় এমনভাবে মিথস্ক্রিয়া করলে মস্তিষ্কের সব অংশের নিউরণ উদ্দীপ্ত (stimulated) হয়ে সার্বিকভাবে নিউরণের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে ও অন্তজাল তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র: Experiences Build Brain Architecture, Center on the Developing Child by Harvard University

নমুনা চিত্র:  মস্তিষ্কের গঠন ও এর বিভিন্ন অংশের সুনির্দিষ্ট কাজ

মস্তিষ্কের বাম ও ডান অংশ:

  • মস্তিষ্ক এর দুই অংশ সমান, আকৃতিগতভাবে দুই অংশ একই রকম, কার্যকারিতা অনুযায়ী দুই অংশ ভিন্ন, দুই অংশই সংযুক্ত।
  • মস্তিষ্ক এর বাম অংশ: যৌক্তিক চিন্তা ও ভাষা পরিচালনা, গণিতে দক্ষতা, ডান দিকের দৃষ্টিক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ কাজ করে।
  • মস্তিষ্ক এর ডান অংশ: স্থান, অবস্থান ও শ্রবণ ধারণা পরিচালনা, সঙ্গীত ও সৃজনশীলতা, বাম দিকের দৃষ্টিক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

মস্তিষ্ক এর বিকাশ:

  • দুইভাবে হয়- আকৃতিগত বৃদ্ধি, সংযোগ বৃদ্ধি
  • আকৃতিগত বৃদ্ধি: মস্তিষ্ক এর কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি।
  • সংযোগ বৃদ্ধি: একটির সাথে কয়েকটি ও একাধিক নিউরণের সংযোগ বৃদ্ধি এবং অন্তজাল তৈরি ।

একটি কোষ সবোর্চ ১৫০০০ কোষের সাথে সংযোগ করতে পারে।

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বিকাশে মা-বাবা, শিক্ষক ও বড়দের করণীয়

শিশু মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় মায়ের খাদ্য, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সর্বোপরি মায়ের ভালো থাকা শিশুর মস্তিষ্কের কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তার জন্য জন্মের পূর্ব থেকেই মায়ের যত্ন নিতে হবে। জন্মের পর থেকেই শিশু শেখার জন্য প্রস্তুত থাকে।

পরিবারে মা-বাবা ও অন্যান্য সদস্য ও শিক্ষকের সঠিক পরিচর্যা, যত্ন ও উদ্দীপনামূলক কাজের মাধ্যমে শিশুর মস্তিষ্কের কোষের সংযোগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। নার্চারিং কেয়ার ফ্রেমওয়ার্কে প্রদত্ত ৫টি উপাদানের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করা যেতে পারে। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তার জন্য মা-বাবা, শিক্ষক ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের কিছু দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে। যেমন-

  • শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা
  • শিশুকে উদ্দীপনা প্রদান করা যেমন-
  • শিশুর সাথে কথা বলা, চোখে চোখ রাখা, হাসা
  • শিশুকে জড়িয়ে ধরা, আদর ও ভালোবাসা দেওয়া
  • শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেওয়া অর্থাৎ শিশুর অঙ্গভঙ্গি, ইশারা, মুভখঙ্গি ইত্যাদি দেখে তাকে সাহায্য করা (সংবেদনশীল যত্ন নেওয়া)
  • প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। যেমন- শিশুর সাথে ছড়া, খেলা করা, খেলার মাধ্যমে প্রাক-গাণিতিক, পরিবেশ-বিজ্ঞানের ধারণা দেওয়া, গান করা ও গল্প শোনানো ইত্যাদি
  • ইতিবাচক ও নিরাপদ শিখন পরিবেশ তৈরি করা
  • বিদ্যালয়ের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা
  • পর্যাপ্ত পরিমান বয়সোপযোগী খেলনা ও উপকরণ রাখা
  • নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা রাখা
  • সৃজনশীলতার বিকাশে বিভিন্ন কাজে শিশুকে উত্সাহিত করা
  • শিশুর প্রারম্ভিক শৈশব ও শৈশবে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ামূলক যত্ন ও উদ্দীপনা (interactive care & stimulation) দেওয়ার মূলনীতি হলো-
  • প্রতিদিন বারবার করা (Everyday Repeatedly)
  • বয়স অনুযায়ী করা (Age Appropriate) 
  • নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে করা (Safe & Enabling Environment)
  • বিভিন্নভাবে (Multiple Ways) যাতে শিশু তার পঞ্চইন্দ্রিয় ও হাত-পা ব্যবহার করার সুযোগ পায়
  • ছেলে-মেয়ে শিশুর সাথে সমানভাবে করা।  

এই মূলনীতিসমূহ বুঝার সুবিধার্থে নিচে কয়েকটির উদাহরণ দেওয়া হলো। যেমন-

বয়স অনুযায়ী:

খাবার পানি রাখার জন্য যদি মাটির কলসি ব্যবহার করতে হলে প্রথমে মাটির কলসি তৈরি করতে হবে। মাটির কলসি তৈরির প্রক্রিয়া হলো:  প্রথমে মাটি পানি দিয়ে মিশিয়ে মন্ড তৈরি করে তারপর কলসির আকৃতি বানিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো, তারপর আগুনে পুড়িয়ে আবার কয়েকদিন রোদে শুকালে পানি রাখা যাবে। এই প্রক্রিয়ায় কেউ যদি রোদে শুকানোর পরই পানি রাখে তাহলে কলসিটি কিছুক্ষণ পর গলে যাবে। তেমনি শিশুর বয়স অনুযায়ী ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কোনোকিছু চাপিয়ে দিলে তা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হবে।

নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ:

শিশুকে খেলনা কিনে দিয়ে খেলনাটি বাক্সে রেখে দিলে বা শিশুকে অন্ধকার ঘরে রেখে দিলে শিশুটি কিন্তু খেলনাটি ব্যবহার করতে পারবে না বা খেলতেও পারবে না। অথবা খেলনা দিয়ে শিশুকে ধমক দিয়ে খেলতে বললে শিশুটি আনন্দ নিয়ে খেলবে না। মাননিক দিক থেকে সে ভালো থাকবে না এবং খেলনা ব্যবহার করতে উত্সাহিত হবে না।

পঞ্চইন্দ্রিয় ও হাত-পা ব্যবহার করার সুযোগ:  

মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন- দেখা পিছনের দিকের নিচের অংশ, শোনা-বলা  নিচের অংশের মধ্যভাগ, স্পর্শ (অনুভব) করা পিছনের দিকের উপড়ের  অংশ, চলন ক্ষমতা  উপড়ের দিকের (তালুর) মধ্যভাগ, চিন্তা/যুক্তি/সমস্যার সমাধান/সিদ্ধান্ত গ্রহণ তালুর সামনের দিক ও কপালের পিছনে উপড়ের অংশ, পরিকল্পনা ও অনুশীলন করা  সামনের দিকের নিচের (কপালের পিছনের) অংশ। তাই শিশুকে শুধু দেখতে বা শুনতে দিলে তার মস্তিষ্কের  যে অংশটুকু দেখা ও শোনা নিয়ন্ত্রণ করে প্রধানত সেই অংশের কোষগুলো সক্রিয় হবে ও সেগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। অন্য অংশের কোষগুলো সরাসরি সক্রিয় হবে না এবং সেগুলোর মধ্যে পুরাপুরি সংযোগ তৈরি হবে না। তাই শিশুকে এমনভাবে উদ্দীপনা ও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ামূলক যত্ন দিতে হবে যাতে মস্তিষ্কের সব অংশের কোষগুলোই উদ্দীপ্ত ও সক্রিয় হয়ে সংযোগ তৈরি করতে পারে। আর এজন্য শিশুকে এমনভাবে পারস্পারিক ক্রিয়ামুলক যত্ন দেওয়া যাতে সে তার পাঁচটি ইন্দ্রিয় যথা: চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের যথাযথ ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

তথ্যসূত্র:

  1. Experiences Build Brain Architecture, Center on the Developing Child by Harvard University
  2. প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, পরিমার্জিত ও সংশোধিত: মার্চ ২০১৪, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

ভিডিও লিংক: Experiences Build Brain Architecture

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!