প্রাথমিক বিজ্ঞান (পিকে); অধ্যায়-৩ শিখনতত্ত্ব - Proshikkhon

প্রাথমিক বিজ্ঞান (পিকে); অধ্যায়-৩ শিখনতত্ত্ব

অধ্যায় ৩: শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান শিখন: সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ

সেশন-৩.১: গঠনবাদী শিখনতত্ত্ব, সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিখনতত্ত্ব বা সামাজিক গঠনবাদ তত্ত্ব এবং ধারণা পরিবর্তন মডেল

১) গঠনবাদী শিখনতত্ত্ব কাকে বলে ? গঠনাবাদী শিখনতত্ত্বে মূল কথাগুলো কী?

গঠনবাদী শিখনতত্ত্ব

শিশুদের পূর্ব-জ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার ফসল হলো গঠনবাদী শিখনতত্ত্ব। কোন ধারণা বা অর্থ গঠনে অর্থাৎ শিক্ষার্থীর শিখনে শিক্ষার্থীর নিজের ভূমিকাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে তার শিক্ষক, সহপাঠী, পরিবার বা সমাজের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। মূলত একেই ব্যক্তিগত গঠনবাদ বলা হয়।

রাশিয়ান মনোবিজ্ঞানী লেভ ভিগটস্কির ব্যক্তিগত গঠনবাদের সমালোচনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশি সমর্থন পাওয়ার ফলে গঠনবাদের ফোকাস ব্যক্তিগত অর্থগঠন থেকে শিখনকে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার দিকে সরে আসে। যা সামাজিক গঠনবাদ হিসেবে খ্যাত। সামাজিক গঠনবাদের ফোকাস হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে যে সামাজিক প্রক্রিয়া কাজ করে তার ওপর। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক তার শ্রেণিতে একটি বিজ্ঞান কম্যুনিটি গড়ে তুলে তিনি ও তার শিক্ষার্থীরা সকলে মিলে একসঙ্গে একটি সম্মিলিত অর্থ গঠন করেন। গঠনবাদী শিখনতত্ত্ব অনুসারে শ্রেণিকক্ষে একটি বিষয় সম্পর্কে সম্মিলিত অর্থ গঠন করাই হলো বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্য।

গঠনাবাদের মূল কথাগুলো নিম্নরূপ-

  • পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে কোন কিছুর সক্রিয় অর্থ গঠন করাই হলো শিখন।
  • শিশুর শ্রেণিকক্ষে দেখে, শুনে বা অন্যভাবে অভিজ্ঞতা থেকে যে অর্থ গঠন করে তা শিক্ষকের ইস্পিত ধারণা থেকে ভিন্ন হতে পারে, শিশুর গঠনকৃত অর্থ বা ধারণা তাদের পূর্ব ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ পূর্ব-ধারণা কখনও কখনও নতুন ধারণা গঠনে সহায়ক হতে পারে, আবার কখনও বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
  • শিখনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর-ই। শিক্ষকের ভূমিকা এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর শিখনের সুযোগ সৃষ্টি ও সহায়তা করা।

২) লেড ভিগটস্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিখনতত্ত্ব বা সামাজিক গঠনবাদ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন।

সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ান মনোবিজ্ঞানী লেভ ভিগটস্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিখনতত্ত্ব বা সামাজিক গঠনবাদ তত্ত্ব বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ভিগটস্কি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। যেমন- শিক্ষার্থীর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব।

সামাজিক গঠনবাদ হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে যে সামাজিক প্রক্তিয়ায় কাজ করে তার ওপর। অর্থাৎ শিক্ষক তার শ্রেণিতে একটি বিজ্ঞান কম্যুনিটি গড়ে তুলে তিনি ও তার শিক্ষার্থীরা সকলে মিলে একসঙ্গে একটি সম্মিলিত অর্থ গঠন করে। যেমন-

  • পানিকে বাষ্পে পরিণত করা যায় কী?
  • ব্যক্তিগত গঠনবাদে –বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত প্রকাশ করবে।
  • সামাজিক গঠনবাদে-পরীক্ষা শেষে সকলে একটি মতে আসবে।

৩) ধারণা পরিবর্তন মডেল কাকে বলে? ধারণা পরিবর্তন মডেলের মূল ধাপগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।

অথবা, গঠনবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে শিখনতত্ত্বের ধারণা পরিবর্তন মডেলের ধারাবাহিকতা আলোচনা করুন।

ধারণা পরিবর্তন মডেল

ধারণা পরিবর্তিন মডেল হচ্ছে শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান/ পূর্বধারণাকে উদঘাটন করে তার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা বের করে নতুন ধারণা নির্মাণ এবং সবশেষে শিক্ষার্থীর ধারণা কতটুকু পরিবর্তিত হয়েছে তার মূল্যায়ন বা অনুচিন্তন।

ধারণা পরিবর্তন মডেলের মূল ধাপসমূহ

ওরিয়েন্টেশন বা বিষয়ের সাথে সম্পৃক্তকরণঃ

শুরুতেই ঐ পাঠের টপিক বা বিষ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট ও শিক্ষার্থীদের জীবনঘনিষ্ট কোন ঘটনা উপস্থাপন কয়রা হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের এই ঘটনার কারণ, ধরণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করে তাদেরকে বিষয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়।

শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান/ বিকল্প ধারণা উদঘাটনঃ

এই ধাপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পাঠের বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান শ্রেণিকক্ষে উন্মোচন করা। কুইজ, ব্রেইন স্টর্মিং, ধারণা মানচিত্র এসবের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বা একদল শিক্ষার্থীর বিকল্প ধারণা উদঘাটন কয়রা যায়।

শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পুনর্গঠনঃ

এ ধাপটি কতগুলো ছোট ধাপে বিভক্ত। ছোট ধাপগুলোর মধ্যে ধারণা স্পষ্টীকরণ ও বিনিময়, শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞানকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় ফেলা, নতুন ধারণা নির্মাণ ও মূল্যায়ন উল্লেখযোগ্য।

ক) ধারণা স্পষ্টীকরণ ও বিনিময়ঃ

এই ধাপে শিক্ষার্থীদের একে অন্যের সাথে তাদের পূর্বজ্ঞানক্র বিনিময়ের মাধ্যমে স্পষ্টীকরণ করার সুযোগ দেওয়া হয়য়। জোড়ায় বা দলগত আলোচনার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে।

খ) শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞানকে সাংঘর্ষিক আবস্থায় ফেলাঃ

এই ধাপে শিক্ষার্থীরা কিছু কাজে অংশ নেবে যেটি তাদের পূর্বজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি করবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান ধারণার সোমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা ধরা পড়বে। POE (পূর্বানুমান-পর্যবেক্ষণ-ব্যাখ্যা), বিতর্ক ইত্যাদি কৌশল অবলম্বন করে এই ধাপটি সম্পন্ন করা যায়। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্বজ্ঞানের দুর্বলতা উপলব্ধি করে নতুন ধারণা নির্মাণে উদ্ধুদ্ধ হবে।

গ) নতুন ধারণা নির্মাণঃ

এই ধাপে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানসম্মত ধারণা গঠনের জন্য শিক্ষক সহায়তা করবেন। আগের ধাপে সৃষ্ট সাংঘর্ষিক অবস্থায় পড়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতিফলন, একক চিন্তন ও দলগত আলোচনার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত সঠিক ধারণা গঠন করতে পারে। শিক্ষার্থীর সঠিক ধারণা গঠনে শিক্ষক সহায়তা করবেন, পক্ষান্তরে শিক্ষার্থীরা ধারণা গঠনে ভুলদিকে অগ্রসর হলে তাদের সঠিক দিকে এগোনোর নির্দেশনা দিবেন।

ঘ) মূল্যায়নঃ

এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের গঠনকৃত ধারণা সঠিক হলো কিনা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে তা মূল্যায়ন করবে। যেমন:

১. নতুন ধারণার প্রয়োগ ও বর্ধনঃ এই ধাপে শিক্ষার্থীদের সুযোগ দিতে হবে যাতে তারা নতুন ধারণা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে পুনর্গঠিত ধারণাকে শক্তিশালী ও বর্ধিত করতে পারে। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে যাতে করে তারা তাদের পুনর্গঠিত জ্ঞান দ্বারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের কোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে।

২. শিক্ষার্থীর ধারণা পরিবর্তন পর্যালোচনাঃ এই ধাপে শিক্ষার্থী অনুচিন্তনের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করবে বিষয়টি সম্পর্কে তার পূর্বধারণা কীভাবে ও কতটুকু পরিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষার্থীর পূর্বধারণা যথেষ্ট পরিবর্তন হলে সে পরবর্তী শিখনে উৎসাহিত হবে আর ধারণার পরিবর্তন যথেষ্ট না হয়ে থাকলে শিক্ষার্থী নিজেই বুঝতে পারবে তার কী করা উচিত। তাই বিজ্ঞান শিক্ষাবিদেরা এই শেষ ধাপটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে থাকেন।

৪) ধারণা পরিবর্তন মডেলে শিক্ষকের ভূমিকা আলোচনা করুন।

ধারণা পরিবর্তন মডেলে শিক্ষকের ভূমিকা

এই মডেলে একজন শিক্ষকের ভূমিকা সনাতন বক্তিতাধর্মী শিক্ষাদানের চাইতে জটিলতর। সাধারণ ভাবে এই মডেলে একজন শিক্ষকের ভূমিকা নিম্নরূপঃ

  • কৌতূহল উদ্রেককারীঃ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠের বিষয়টি সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করবেন। এজন্য শিক্ষককে এমন ধরনের কাজ্র পরিকল্পনা করবেন যাতে শিক্ষার্থীরা বিস্মিত হয় ও উদ্দীপ্ত হয়য়।
  • চ্যালেঞ্জারঃ শিক্ষক তার কাজ ও প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করবেন। শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করবেন তাদের পূর্বজ্ঞানকে গভীর সমালোচনামূলক ভাবে চিন্তা বা প্রশ্ন করতে। তাদের পূর্বধারণাকে যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করতে।
  • তথ্যজ্ঞ ব্যক্তিঃ শিক্ষার্থী বিভিন্ন চাহিদা থাকে। তাদের এই নানামূখী জ্ঞানমূলক চাহিদা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন একজন তথ্যজ্ঞ ব্যক্তি যিনি মূলত মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতে সমর্থ হবেন।
  • অগ্রজ সহ অনুসন্ধানকারীঃ তথ্যানুসন্ধানের জন্য একজন মেন্টর থাকবেন যিনি শিক্ষার্থীদের সাথে প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করবেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জন সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে।
  • সু-আলোচক ও সু-সংগঠকঃ শ্রেণিতে যে সব কার্যাবলি সম্পন্ন হয়েছে তার ব্যাপারে আলোচনা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধারণাকে যুক্তি সহকারে বিশ্লেষণে ও সুন্দরভাবে উপস্থাপনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

ধারণা পরিবর্তন মডেলের ক্ষেত্রে শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে বিশেষজ্ঞের ভূমিকা ত্যাগ করতে হবে। এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং তবে আওবশ্যই ঝুঁকি নেয়ার উপযোগী একটি কাজ।

৫) ধারণা পরিবর্তন মডেলে শিক্ষক হিসেবে আপনার ভূমিকা কী?

ধারণা পরিবর্তন মডেলে শিক্ষক হিসেবে আমার ভূমিকা কেমন হতে তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

  • পাঠের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করবো। শিক্ষার্থীরা যাতে উদ্দীপ্ত ও বিস্মিত হয় সেভাবে পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলবো।
  • শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করা যায় এমনভাবে কর্মকৌশল ও প্রশ্ন তৈরি করবো। তাদের পূর্বজ্ঞানকে গভীরভাবে চিন্তা ও প্রশ্ন করতে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করবো।
  • শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের চাহিদা মেটাতে বা প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখবো। প্রয়োজনীয় সামগ্রী বা কাজের ব্যবস্থা করবো।
  • নিজে তথ্যজ্ঞ ব্যক্তি না থেকে একজন অগ্রজ ব্যক্তি নিযুক্ত করবো ‍যিনি শিক্ষার্থীদের সাথে প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করবেন।
  • শ্রেণিকক্ষে আলোচিত সকল বিষয় ও ধারণাকে বিশ্লেষণ করে যুক্তি সহকারে উপস্থাপনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবো।

error: Content is protected !!