অধ্যায়-০৩: খাদ্য ও পুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যবিধি
সেশন-৩.৩: ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি
- ভিটামিন কী? ভিটামিনের প্রকারভেদ, উৎস এবং ভিটামিনের কার্যাবলী সম্পর্কে লিখুন।
- বিভিন্ন প্রকার ভিটামিনের উৎস, কাজ ও এর অভাবজনিত রোগ সম্পর্কে একটি তালীকা তৈরি করুন।
- খনিজ লবণ, খনিজ লবণের উৎস, খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা ও খনিজ লবণের অভাবের ফল।
- পানি,পানির উৎস, পানির কাজ ও পানির অভাবের ফল।
ভিটামিন কী? ভিটামিনের প্রকারভেদ, উৎস এবং ভিটামিনের কার্যাবলী সম্পর্কে লিখুন।
ভিটামিনঃ
ভিটামিন একটি জৈব রাসায়নিক পদার্থ যা প্রোটিন, শর্করা, চর্বি জাতীয় খাদ্য বিপাকে সাহায্য করে। ভিটামিন আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। দেহকে সুস্থ ও সবল রাখতে এর কার্যকরী ভূমিকা বিদ্যমান। ভিটামিনের চাহিদা খুবই সামান্য অথচ এর অভাবে দেহ স্বাভাবিক অনেকগুলো কর্মক্ষমতা হারায়।
ভিটামিনের প্রকারভেদঃ দ্রবণীয়তার গুণ অনুসারে ভিটামিনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১) স্নেহ জাতীয় পদার্থে দ্রবণীয় ভিটামিন। যেমন- এ, ডি, ই এবং কে।
২) পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। যেমন- ভিটামিন বি এবং সি।
ভিটামিনের উৎসঃ আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনসমূহ আমরা উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ উভয় প্রকার খাদ্যদ্রব্য থেকেই পেয়ে থাকি।যেমন- গাছের সবুজ পাতা, কচি ডগা, হলুদ ও সবুজ বর্ণের সবজি, ফল ও বীজ ইত্যাদি অংশে ভিটামিন থাকে।
ভিটামিনের কার্যাবলীঃ
প্রত্যেকটি ভিটামিনের ভিন্ন ভিন্ন কাজ আছে, তবে সমন্বিত কার্যাবলি নিম্নরূপ-
- দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
- দেহের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- কার্বাহাইড্রেট, ফ্যাট ও প্রোটিন বিপাকে সাহায্য করে।
- পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে।
- স্নায়ুর দৃঢ়তা বজায় রাখে।
- দেহে খনিজ লবণের ব্যবহারে সহায়তা করে।
- সুস্থ শিশু সন্তান জন্মের ক্ষমতা দান করে।
বিভিন্ন প্রকার ভিটামিনের উৎস, কাজ ও এর অভাবজনিত রোগ সম্পর্কে একটি তালীকা তৈরি করুন।
বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, এদের উৎস, কাজ এবং অভাবজনিত রোগ:
| খাদ্য দল | উৎস | কাজ | অভাবজনিত রোগ |
| ভিটামিন এ | ছোট মাছ, মিষ্টি কুমড়া, গাজর, পালংশাক, দুধ, ডিমের কুসুম ইত্যাদি। | দৃষ্টি শক্তির স্বাভাবিকতা বজায় রাখে, সুস্থ ত্বক ও দাঁত গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। | রাতকানা |
| ভিটামিন বি কমপ্লেক্স | মাছ, কলিজা,দানাশস্য, দুগ্ধজাত খাদ্য, মটরশুঁটি, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি। | দেহে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। | বেরিবেরি, মুখে ও জিভে ঘা, অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা |
| ভিটামিন সি | বিভিন্ন শাকসবজি যেমন- টমেটো, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি এবং ফল যেমন- পেয়ারা, আমলকী, কমলা, লেবু ইত্যাদি। | দেহের বৃদ্ধি সাধন করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দেহকে কর্মক্ষম রাখতে সহায়তা করে। | স্কার্ভি, মাড়ির রোগ |
| ভিটামিন ডি | মাছের তেল, ডিমের কুসুম, সূর্যরশ্মি ইত্যাদি | হাড়ে বৃদ্ধি ও গঠনে সহায়তা করে। | রিকেটস বা হাড় বেঁকে যাওয়া। |
| ভিটামিন ই | উদ্ভিজ্জ তেল, বাদাম, কলিজা ইত্যাদি। | রক্ত কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করে। | দুর্বল পেশি, বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। |
| ভিটামিন কে | পাতা বিশিষ্ট সবুজ শাকসবজি, ঢেঁড়স, সয়াবিন ইত্যাদি | কেটে যাওয়া স্থানে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে | যকৃতের রোগ, রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যাওয়া |
খনিজ লবণ, খনিজ লবণের উৎস, খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা ও খনিজ লবণের অভাবের ফল।
খনিজ লবণঃ
দেহকোষ ও দেহ তরলের জন্য খনিজ লবণ একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। আমাদের দেহের ওজনের ১% পরিমাণ লবণ থাকে। ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, আয়োডিন, লৌহ, সালফার ইত্যাদি লবণ জাতীয় দ্রব্য খাদ্যের সাথে দেহে প্রবেশ করে ও দেহ গঠনে সাহায্য করে। এসব উপাদান দেহে মৌলিক উপাদান হিসেবে থাকে না, অন্য পদার্থের সঙ্গে জৈব ও অজৈব রূপে থাকে। প্রধানত দুই ভাবে খনিজ লবণ দেহে কাজ করে। যথা- দেহ গঠন উপাদানরূপে ও দেহ অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
খনিজ লবণের উৎসঃ আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকার উৎস হতেই পাওয়া যায়। মাংস, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি, খাবার লবণ, আঁখের গুড় এবং ফল খনিজ লবণের প্রধান উৎস।
খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তাঃ
- খনিজ লবণ দেহ গঠন ও দেহের অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
- অস্থি, দাঁত, এনজাইম ও হরমোন গঠনের জন্য খনিজ লবণ অপরিহার্য উপাদান।
- স্নায়ু উদ্দীপনা ও পেশি সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে।
- দেহের জলীয় অংশে সমতা রক্ষা করে ও বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখে।
- ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড় গঠনে সহায়তা করে।
- ফসফরাস দাঁত ও হাড় গঠন, ফসফোলিপিড তৈরি করে।
- লৌহ রক্তের লোহিত রক্তকণিকা গঠন, উৎসেচক বা এনজাইমের কার্যকারিতায় সহায়তা করে।
- দেহের জলীয় অংশে সমতা রক্ষা ও বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখার জন্য অপরিহার্য।
খনিজ লবণের অভাবের ফলঃ
- খাদ্যে খনিজ লবণের অভাব হলে হাঁড় ও দাঁতের সমস্যা দেখা দেয়।
- খনিজ লবণের অভাবে ক্রোটিনিজম ও গলগণ্ড নামক রোগ হতে পারে।
- ক্ষেত্রবিশেষে খনিজ লবণের অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
পানি,পানির উৎস, পানির কাজ ও পানির অভাবের প্রভাব লিখুন।
পানিঃ
পানি একটি খাদ্য উপাদান। অক্সিজেন এর পরই পানি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। আমাদের দেহের ৬০-৭০ ভাগই হল পানি। দেহে সকল প্রকার উপাদানকে কাজে লাগাতে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় পানির প্রয়োজন অপরিহার্য। পানির মধ্যে অনেক খনিজ লবণ দ্রবীভূত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেমন- লৌহ, আয়োডিন ইত্যাদি।
পানির উৎসঃ পানি ও পানীয় জাতীয় খাদ্য থেকে পানি পাওয়া যায়। দুধ, শাকসবজি, ফল বিশেষ উৎস।
পানির কাজঃ মানবদেহে পানির কাজ তিন ভাগে করা যায়।
১) দেহের গঠনঃ দৈহিক ওজনের ৪৫%-৬০% পানি। নবজাত শিশুর দেহে ৭৭% পানি থাকে। মস্তিষ্কে পানির পরিমাণ সর্বাধিক। যকৃত ও ত্বকে প্রায় ৭০% পানি থাকে। কোষের ভিতরে ও বাইরে পানি কোষের তরলতার সমতা বিধান করে।
২) দেহের অভ্যন্তরীণ কার্য নিয়ন্ত্রণঃ হজম,বিপাক, সব প্রক্রিয়াতে পানি অপরিহার্য।
৩) দেহ হতে দূষিত পদার্থ নির্গমনঃ পানি দিয়ে প্রস্রাব, মল ইত্যাতি নির্গমন হতে সুবিধা হয়। শরীরের ঘাম ত্বকের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে। ফলে অনেক দূষিত পদার্থও বেরিয়ে আসে।
পানির অভাবের ফলঃ
খাদ্য ছাড়া মানুষের পক্ষে কয়েক সপ্তাহ বাঁচা সম্ভব হলেও পানি ছাড়া কয়েক দিনও বাঁচতে পারে না। দেহে পানির অভাবে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যেমন-
- দেহে পানির অভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
- বিপাক ক্রিয়া ও রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটে।
