অধ্যায়-০২: পরিবেশের উপাদান ও পরিবেশ সংরক্ষণ
সেশন-২.৩ পরিবেশের উপাদান: পানি
ক্লাসের আলোচ্যবিষয়:
- বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত পানি সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।
- জীবের জীবনে পানি অপরিহার্য ব্যাখ্যা করুন/ উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করুন। অথবা, ‘পানি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সহজলভ্য তরল’ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তার আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করুন।
- চিত্রসহ পানি চক্র ব্যাখ্যা করুন। অথবা, সূর্যের তাপে পানির যে অবস্থার পরিবর্তন হয় তা চিত্রসহ বর্ণনা করুন।
- দূষিত পানি, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ পানি কাকে বলে?
- পানি দূষণ কাকে বলে? পানি দূষণের কারণসমূহ আলোচনা করুন। অথবা, পানি দূষণের মানবসৃষ্ট কারণসমূহ আলোচনা করুন।
- পানি দূষণের ফলে মানুষ ও পরিবেশের উপর কী কী প্রভাব পড়েছে? অথবা, পানি দূষণের ফলে মানুষ ও পরিবেশের কী ধরনের ক্ষতি হয় তা আলোচনা করুন। অথবা, পানি দূষণের কুফল বা ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ বর্ণনা করুন।
বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত পানি সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।
আমাদের বেঁচে থাকার জন্য পানি প্রয়োজন। আমাদের শরীরে প্রায় ৬৫ ভাগই পানি। পান করা, রান্না করা থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানায় ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে আমরা পানি ব্যবহার করা থাকি। মানুষের মতো অন্যান্য জীবও পানির উপর নির্ভর করে। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোন জীবের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে পানি পেয়ে থাকি। এগুলোর মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক উৎস আর কিছু কৃত্রিম উৎস রয়েছে। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত উৎসসমূহ হচ্ছে- বৃষ্টি, ভূ-গর্ভ, নদী ও সমুদ্র। নিচে এসব উৎস থেকে প্রাপ্ত পানি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
বৃষ্টির পানি:
প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত পানির মধ্যর বৃষ্টির পানিই সবচেয়ে বিশুদ্ধ। আমাদের দেশে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এই পানি ধরে রেখে আমরা পান করতে পারি। বৃষ্টির পানি নদী-নালা,খাল,বিলে সঞ্চিত হয় যা আমরা কৃষি কাজসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকি।
ভূ-গর্ভস্থ পানি(ঝরনার পানি):
বৃষ্টির পানি ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়ে ধীরে ধীরে মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এ সময়য় বালি,মাটি ও পাথর দ্বারা পানি পরিশ্রুত হয়ে ভূ-অভ্যন্তরে জমা হয়। এ ভূ-গর্ভস্থ পানিতে বিভিন্ন খনিজ লবণ দ্রবীভূত থাকে। বিভিন্ন উপায়ে আমরা ভূ-গর্ভস্থ পানি পেয়ে থাকি। যেমন- ঝরনা থেকে,কূপ খনন করে, নলকূপের মাধ্যমে, মোটর চালিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে।
নদীর পানি:
ঝরনার পানি, বৃষ্টির পানি এবং পাহারের বরফ ও তুষারগলা পানি নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। নদীর স্রোত তার গতিপথে অনেক জিনিস নিয়ে নেয়। এর মধ্যে লবণ জাতীয় পদার্থ পানিতে দ্রবীভূত থাকে আর বালি,কাদামিটি,ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি অদ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। নদীর পানি বিশোধন না করে পান করা নিরাপদ নয়। বড় ব অড় শহরে নদীর পানি উত্তোলন করে শোধন করে পানযোগ্য করা হয়।
সমুদ্রের পানিঃ
সমুদ্র পানির প্রধান উৎস । তবে সমুদ্রের পানি লবণাক্ত বলে তা পানের অযোগ্য। নদীর স্রোত লক্ষ লক্ষ বছে দরে তার গতিপথে অনেক লবণ বহন করে সমুদ্রে নিয়ে আসছে। এ কারণে সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। কোনো কোনো দেশে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে পানযোগ্য করা হয়।
উপরে বর্ণিত উৎসগুলো ছাড়াও খাল,বিল ও লেক থেকে আমরা পানি পাই। তবে এসব উৎসের পানি বৃষ্টি,নদী বা ভূ-গর্ভ থেকে আসে।
জীবের জীবনে পানি অপরিহার্য ব্যাখ্যা করুন/ উদ্ভিদ ও প্রাণির জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করুন। অথবা, ‘পানি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সহজলভ্য তরল’ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তার আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করুন।
জীবন ধারণের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী সকলেরই পানি প্রয়োজনীর। পানি ছাড়া কোন জীবের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
উদ্ভিদের জীবনে পানিঃ
- উদ্ভিদের দেহের প্রায় ৯০ ভাগ পানি।
- উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বীজের অঙ্কুরোদগম হতে আরম্ভ করে যত দিন উদ্ভিদ বেঁচে থাকে তত দিন তাদের প্রচুর পানি প্রয়োজন।
- মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ ও বিভিন্ন অংশে পরিবহনের জন্য উদ্ভিদের পানি প্রয়োজন।
- পানি ছাড়া উদ্ভিদ মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে পারে না।
- মাটি থেকে শোষণকৃত পানি বাতাসের কার্বন-ডাই অক্সাইডের সাথে ক্লোরোফিল ও সূর্যালোকের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে গ্লুকোজ তৈরি করে। এ গ্লুকোজ উদ্ভিদের কাণ্ড,পাতা,ফুল ও ফল তৈরি করে। প্রচণ্ড গরমে পানি উদ্ভিদের দেহ শীতল করতে সহায়তা করে।
প্রাণির জীবনে পানিঃ
- মানবদেহের ৬০-৭০ ভাগ পানি। বেঁচে থাকার জন্য প্রাণীদেরও পানি প্রয়োজন।
- জীবদেহে জীবকোষ তৈরিতে পানি প্রয়োজন, জীবকোষের বেশিরভাগই পানি।
- খাদ্য পরিপাকের সময় পানিতে দ্রবীভূত হয়েই খাদ্যের উপাদানসমূহ আমাদের পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে প্রবেশ করে।
- রক্তের পানির মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে খাদ্য উপাদান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিবাহিত হয়।
- পানি দ্বারা পরিবাহিত এ খাদ্য উপাদান আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন ও আমাদের দেহ গঠন করে।
- পানি দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের দূষিত পদার্থ শরীর থেকে নিঃসৃত করে।
এছাড়াও মানুষ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে পানি ব্যবহার করে থাকে। গোসল করতে ও গৃহস্থালি কাজে মানুষ পানি ব্যবহার করে। পানিতে মাছসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ বেঁচে থাকে যাদের উপর মানুষ নির্ভরশীল। কৃষিকাজে পানি অপরিহার্য। ছোটবড় বিভিন্ন কল-কারখানায় প্রচুর পানি ব্যবহার করা হয়। পানি প্রবাহ ব্যবহার করে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। মানুষের জীবনের পানির গুরুত্ব অপরিসীম। পানি ছাড়া মানুষের প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনা করা সম্ভব না। পরিশেষে বলা যায় পানির অপর নাম জীবন। উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের পানির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
চিত্রসহ পানি চক্র ব্যাখ্যা করুন। অথবা, সূর্যের তাপে পানির যে অবস্থার পরিবর্তন হয় তা চিত্রসহ বর্ণনা করুন।
পৃথিবীতে পানি সবসময় এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। সূর্যতাপ ভূ-পৃষ্ঠের ( মাটি, পুকুর, খাল, বিল, নদী ও সমুদ্রের) পানিকে বাষ্পের পরিণত করে। একে জলীয়বাষ্প বলে। জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলের যতই উপরের দিকে উঠতে থাকে ততই ঠাণ্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানিকণায় পরিণত হয়। এভাবে তৈরি হওয়া অসংখ্য পানিকণা একত্র হয়ে আলাশে ঘুরে বেড়ায়। আমরা তখন একে মেঘ বলি। মেঘের পানিকণাগুলো একত্রিত হয়ে আকারে বড় হলে তখন আর বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকতে পারে না,বৃষ্টিরূপে মাটিতে পড়ে। মেঘের পানিকণাগুলো খুব বেশি ঠাণ্ডা হয়ে গেলে তা বরফে পরিণত হয় এবং শিলাবৃষ্টি হিসেবে পৃথিবীতে নেমে আসে। এভাবে ভূ-পৃষ্ঠের পানি থেকে জলীয়বাষ্প, জলীয়বাষ্প থেকে মেঘ,মেঘ থেকে বৃষ্টি হিসেবে পানি আবার মাটি, পুকুর, খাল-বিল, নদী ও সমুদ্রে অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে চক্রাকারে ফিরে আসাকে পানিচক্র বলে। কখনো কখনো বায়ুপ্রবাহের কারণে জলীয়বাষ্প মেঘরূপে উড়ে গিয়ে পর্বতের চূড়ায় পৌঁছায়। সেখানে মেঘের পানিকণা ঠাণ্ডায় বরফে পরিণত হয়। এ বরফ গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে গলে পানি হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে। এভাবে ছোট পাহাড়ি নদীর উৎপত্তি হয়। এ পাহাড়ি নদী বৃষ্টির পানির সাথে মিলে সমতলে বড় নদীতে পরিণত হয়। এ নদীর পানি সবশেষে সমুদ্রে গিয়ে মিশে।

দূষিত পানি, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ পানি কাকে বলে?
দূষিত পানিঃ
পানিতে খুব সহজেই অনেক পদার্থ মিশতে পারে। খাল-বিল, নদ-নদীর পানিতে ময়লা-আবর্জনা,রোগ-জীবাণু ইত্যাদি মিশে থাকে। কোনো কোনো নলকূপের পানিতে আওর্সেনিক নামক ক্ষতিকর খনিজ পদার্থ মিশে থাকে। এসব নলকূপের পানি এবং খাল-বিল,নদ-নদীর পানি পান করা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এরকম পানি দূষিত পানি।
বিশুদ্ধ পানিঃ
যে পানিতে পানি ছাড়া আর কোনো পদার্থ মিশ্রিত বা দ্রবীভূত থাকে না তাকে বিশুদ্ধ পানি বলে। সে হিসেবে প্রকৃতিত্র প্রাপ্ত কোনো পানিই পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়। বৃষ্টির পানি তুলনামূলক বেশি বিশুদ্ধ, তারপর বৃষ্টির পানিতে অক্সিজেন,কার্বন-ডাই অক্সাইড প্রভৃতি গ্যাস দ্রবীভূত থাকে। ভূ-গর্ভস্থ পানিতেও বিভিন্ন খনিজ লবণ দ্রবীভূত থাকে। তাই এ পানিও পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়। কেবল মাত্র ল্যাবরেটরিতেই বিশুদ্ধ পানি তৈরি সম্ভব।
নিরাপদ পানিঃ
যে পানিতে আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু থাকে না তাকে নিরাপদ পানি বলে। যেমন -ঝরনার পানি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো কারণ এতে সোডিয়াম,পাটাশিয়াম ইত্যাদি উপকারী লবণ দ্রবীভূত থাকে। এছাড়াও বৃষ্টির পানি, নলকূপের পানিও আমাদের জন্য নিরাপদ।
পানি দূষণ কাকে বলে? পানি দূষণের কারণসমূহ আলোচনা করুন। অথবা, পানি দূষণের মানবসৃষ্ট কারণসমূহ আলোচনা করুন।
পানি দূষণঃ
পানি দূষণ বলতে পানিতে কোন বিষাক্ত দ্রব্য অথবা দূষিত বর্জ্য পদার্থ মিশ্রণের ফলে মানব ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
পানি দূষণের কারণ:
মানুষের অসাবধানী কর্মকাণ্ডই পানিদূষণের প্রধান কারণ। প্রাকৃতিক কারণেও পানি দূষিত হতে পারে। নিচে পানিদূষণের প্রধান কারণগুলো উল্লেখ করা হলো-
মানবসৃষ্ট কারণসমূহঃ
- পুকুর বা নদীর পানিতে বাসন-কোসন মাজা, গোসল করা,ময়লা কাপড় কাচা, গরু-মহিষ গোসল করানো,পাট পচানো,পায়খানা-প্রসাব করা,প্রাণীর মৃতদেহ ফেলা প্রভৃতি উপায়ে নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরের পানি দূষিত হয়।
- কলেরা,আমাশয়,টাইফয়েড,ডায়রিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীর মলমূত্র, বিছানাপত্র,জামা-কাপড় পুকুর,খাল বা নদীতে ধুলে এ রোগগুলোর জীবাণু পানিতে মিশে পানি দূষিত করে।
- কলকারখানার বর্জ্য পদার্থে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মিশে থাকে যা পরিশোধন না করে নদীতে বা খালে ফেললে তা পানিতে পানিকে দূষিত করে।
- কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করলে তা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে খাল-বিল ও নদীর পানিতে মিশে পানিকে দূষিত করে।
- অতিরিক্ত সার ব্যবহার করলে, অতিরিক্ত সার বৃষ্টি বা সেচের পানির মাধ্যমে নদী ও খাল-বিলের পানিতে মেশে। এর ফলে শৈবালসহ ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ দ্রুত বাড়ে এবং তারা পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করে নেয়। ফলে পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় যা ঐ পানিতে বসবাসকারী মাছ ও অন্যান্য জীবের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে জমিতে অতিরিক্ত সার পানিকে পরোক্ষভাবে দূষিত করে।
প্রাকৃতিক কারণসমূহঃ
প্রাকৃতিক দুর্যোগঃ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পানি দূষিত হয়। বন্যার ফলে গ্রাম ও শহর অঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে করে মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির মলমূত্র পানিতে মিশে পামিকে দূষিত করে। বন্যার এ দূষিত পানি পুকুর, কুয়া ও নলকূপের পানিতে মিশে পানযোগ্য পানিকে দূষিত করে পানের অযোগ্য করে তোলে। একইভাবে, সুনামি এবং জলোচ্ছ্বাসের ফলে সমুদ্রের পানি নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের পানিতে মিশে পানিকে লবণাক্ত করে দূষিত করে ফেলে।
আর্সেনিক দূষণঃ প্রাকৃতিক কারণে মূলত আর্সেনিক দূষণ হয়ে থাকে। ভূ-অভ্যন্তরে আর্সেনিকের খনিজ থাকে। আর্সেনিক ভূ-গর্ভের পানির স্তরের সংস্পর্শে এলে তা পানিতে মিশে পানিকে দূষিত করে।পানিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি আর্সেনিক মিশে থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পানীয়জলে বাংলাধেশের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সঙ্গস্থা সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রো গ্রাম। আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকযুক্ত পানি পাওয়া যায়।
পানি দূষণের ফলে মানুষ ও পরিবেশের উপর কী কী প্রভাব পড়েছে? অথবা, পানি দূষণের ফলে মানুষ ও পরিবেশের কী ধরনের ক্ষতি হয় তা আলোচনা করুন। অথবা, পানি দূষণের কুফল বা ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ বর্ণনা করুন।
পানিদূষণের ফলাফল বা প্রভাব:
পানিদূষণ মানুষ ও পরিবেশের অনেক ক্ষতি করে। নিভে পানি দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব আলোচনা করা হলোঃ
- কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, ডায়রিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের মলমূত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র দ্বারা দূষিত পানি পান করলে আমরা এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারি।
- কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার নদী ও খাল-বিলের পানিকে দূষিত করে ।যা নদী ও খাল- বিলের মাছের বৃদ্ধি ব্যহত করে ও মাছকে বিষাক্ত করে তোলে।
- কলকারখানার বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি ব্যবহার করলে পেটের পীড়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি মাছকে অসুস্থ করে তোলে। এ কারণে অনেক সময় মাছের গায়ে আমরা ক্ষত বা ঘা দেখতে পাই।
- বন্যার ফলে পুকুর,নলকূপ ও কুয়ার পানি পান করলে ডায়রিয়া,আমাশয় ইত্যাদি রোগ হতে পারে। এছাড়া সুনামি ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি লবণাক্ত হওয়ার ফলে মিঠাপানির মাছ ও জলজ উদ্ভিদের জীবন ক্ষতগ্রস্ত হয়।
- আর্সেনিকযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করলে হাত-পায়ে একধরনের ক্ষত বা ঘা তৈরি হয় যা আর্সেনিকোসিস রোগ নামে পরিচিত। এ রোগের সহজ কোন চিকিৎসা নেই।
১৬) পানি দূষণ রোধে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন? এ বিষয়ে আপনার মতামত ব্যাখ্যা করুন।
উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ পানির প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বহুবিধ কারণে পানি দূষিত হচ্ছে। আর এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণি উভয়ের জীবনযাত্রাই দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচার মূল উপায় হচ্ছে পানি দূষণ রোধ। পানি দূষণ রোধ করতে হলে পানি দূষণের কারণগুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করে পানি দূষণ রোধ করা যায়।
- বাড়ির ময়লা-আবর্জনা,প্রাণীর মৃতদেহ, মলমূত্র পানিতে ফেলা যাবে না।
- রান্না ও পান করার কাজে ব্যবহৃত পুকুরের পানিতে কাপড় কাচা ও বাসন-কোসন ধোয়া যাবে না। পুকুর থেকে পানি তুলে ব্যবহার করতে হবে এবং লক্ষ রাখতে হবে যে ব্যবহৃত পানি পুকুরের পানিতে গিয়ে না মেশে।
- কলেরা,আমাশয়,টাইফয়েড,ডাইরিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীকে পুকুর, নদী বা খাল-বিলে গোসল করানো বা ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বিছানাপত্র ইত্যাদি ধোয়া যাবে না।
- জলাশয়ের পাশে খোলা পায়খানা নির্মাণ করা যাবে না।
- কলকারখানার বর্জ্য পরিশোধন না করে নদী বা খালে ফেলা যাবে না।
- কৃষিকাজে জৈব সার ও জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে হবে।
- কুয়া বা পুকুরের চারপাশে উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে যাতে বন্যার সময়য় দূষিত পানি না ঢোকে।
- নলকূপ উঁচু স্থানে বসাতে হবে যাতে বন্যার পানি প্রবেশ করে নলকূপের পানি দূষিত করতে না পারে।
- নলকূপের পানি পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি আছে কি না। বেশি থাকলে নলকূপটিকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে যাতে কেউ এ পানি পান না করে।
- উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে যাতে জলোচ্ছ্বাস ও সুনামির পানি স্থলভাগে প্রবেশ করতে না পারে।
সর্বোপরি পানি দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
