প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস - Proshikkhon

প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস

History of primary education in Bangladesh

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস :

শিক্ষার ইতিহাস সুপ্রাচীন। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় প্রাচীন যুগ থেকেই এর যাত্রা শুরু। কালের বিবর্তনে ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলের মধ্যে দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস বিস্তৃতি লাভ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে কর্মরত সকল ব্যক্তিবর্গের এ সম্পর্কে ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে ইতিহাসকে মূলতঃ ৪টি প্রধান পর্বে ভাগ করা যায়। যথা:

১। প্রাচীন যুগ

২। ইংরেজ আমল

৩। পাকিস্তান আমল এবং

৪। বাংলাদেশ আমল।

১। প্রাচীন যুগ:

প্রাচীনকালে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ধর্মভিত্তিক। এ কারণে এ সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈদিক, বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে দেখতে পাওয়া যায়।

(ক) বৈদিক যুগঃ

বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ-এর ওপর ভিত্তি করে। আদি বৈদিক যুগ কালক্রমে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা যুগ নামে অভিহিত হয়। কালক্রমে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাক্ষেত্রে বর্ণ বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার কারণে নিচু শ্রেণির হিন্দুরা অ¯পৃশ্য বর্ণে পরিণত হয়। হিন্দু ধর্ম চর্চা কেন্দ্রসমূহ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। হিন্দুদের বৈদিক শিক্ষা সর্বজনীন ছিল না, ছিল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত। শ্রবণ ও আবৃতি ছিল শিক্ষার প্রধানতম পদ্ধতি। গুরুগৃহে শিক্ষাকাল ছিল বারো বছর।

(খ) বৌদ্ধ যুগ

কঠোর বর্ণবাদ প্রথার বিরুদ্ধে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের অহিংস নীতির আলোকে বৌদ্ধ শিক্ষার আবির্ভাব ঘটে। প্রায় ১৫০০ বছর পর্যন্ত এ শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বৌদ্ধ শিক্ষা ছিল লোকায়ত ও বর্ণবেদহীন। সাধারণ শিক্ষা গ্রহণকারীগণ বারো বছর পাঠ শেষে মঠ ত্যাগ করত। নালন্দা, তক্ষশীলা, সোমপুর বিহার, শালবন বিহার অঞ্চল এ শিক্ষা কেন্দ্রের প্রাচীন ইতিহাস। বাংলাদেশের ময়নামতি, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় অন্যতম বৌদ্ধবিহার হিসেবে খ্যাত।

বৈদিক ও বৌদ্ধ উভয় পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ৭/৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ গৃহে শিক্ষা লাভ করত। বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সকলের জন্য শিক্ষা সহজলভ্য ছিল না। কিন্তু বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বৈদিকশিক্ষার মাধ্যম ছিল দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষা অপরদিকে বৌদ্ধ শিক্ষার মাধ্যম ছিল সহজ পালি ভাষা। বৈদিকশিক্ষায় গুরু নিজেই বিদ্যালয় পরিচালনা করতেন। অপরদিকে বৌদ্ধ শিক্ষা প্রধান পরিচালক কর্তৃক পরিচালিত হত। বৈদিক শিক্ষার নির্দিষ্ট কোন সিলেবাস ছিল না। কিন্তু বৌদ্ধ  শিক্ষায় নির্দিষ্ট সিলেবাস ছিল।

(গ) মুসলিম যুগ

১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল মূলত মসজিদ কেন্দ্রিক। মসজিদগুলো ব্যবহৃত হত মক্তব হিসেবে। এখানে মুসলিম শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হতো চার বছর বয়সে কালেমা পাঠের মধ্য দিয়ে। মূলপাঠ শুরু হত সাত বছর বয়সে। তখন কুরআন শিক্ষাই ছিল প্রধান। তার পাশাপাশি ছিল পড়ালেখা ও সাধারণ হিসেব নিকেশ। মসজিদের ইমাম ছিলেন মক্তবের শিক্ষক।

২। ইংরেজ আমল (১৯৮৭ পূর্ব):

  • উনবিংশ শতকের শুরুতে উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪) মিশনারি কাজের সাথে এ অঞ্চলে কিছু বাংলা পাঠশালা গড়ে তোলা।
  • মিশনারি উইলিয়াম অ্যাডাম এর ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত তিনবছরে তিনটি     
  • রিপোর্ট প্রকাশ।
  • ১৮৪০ এর ১৮৫০ এর দশকে প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ডেভিড হেয়ার, রামকমল সেন প্রমুখ বাংলাভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য পাঠশালা স্থাপনের উদ্যোগ
  • গ্রহণ।
  • ১৮৫৪ সালে উডের ডেসপ্যাচ বা শিক্ষা প্রস্তাব।
  • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১) শিক্ষা বিস্তারের এক পুরোধা ব্যক্তি।
  • ১৮৮২ সালে উইলিয়াম হান্টারকে চেয়ারম্যান করে প্রথম ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশন
  • গঠন।
  • ১৯১৯ সালে শিক্ষা সংস্কারের আওতায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাশ।
  • ১৯২৯ সালে হার্টগ কমিটির প্রতিবেদনে প্রকাশ।
  • ১৯৩০ বঙ্গীয় পল্লী প্রাথমিক শিক্ষা আইন গৃহীত।
  • ১৯৪৪ সালে সার্জেন্ট কমিশন গঠন।

৩। পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-৭০)

  • ১৯৪৭ সালে ২৭ নভেম্বর থেকে পাঁচদিন ব্যাপী প্রথম র্শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের বিশেষ দিকগুলি:

-পাঁচ বছরের (৬-১১) প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।

-উর্দু পড়া বাধ্যতামূলক

-শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন ও নারী শিক্ষার প্রসার

  • ১৯৫০ সালে জেলা স্কুল বোর্ড বিলুপ্তি ঘোষণা।
  • ১৯৫১ সালে পূর্ববর্তী বঙ্গীয় পল্লী প্রাথমিক শিক্ষা আইনটি পূর্ববঙ্গীয় আইন নামে পরিবর্তন।
  • ১৯৫২ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রস্তাব করে-

          – প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন।

          – প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।

          – প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যূনতম প্রবেশিকা পাসসহ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হওয়া।

  • ১৯৫৪ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচির দ্বিতীয় দফায় প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।
  • ১৯৫৭ সালে ৫০০০ কম্পালসরি বিদ্যালয়সমূহকে মডেল এবং বাকী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নন-মডেল নামকরণ।
  • আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম শিক্ষা কমিশন ১৯৫৯ সালে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ।
  • ১৯৬৫ সালে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় একীভূত করে ‘ম্যানেজড ফ্রি প্রাইমারি স্কুল’ হিসাবে ঘোষণা করা।
  • পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় পাঁচশালা (১৯৬০-৬৫) ও তৃতীয় পাঁচশালা (১৯৬৫-৭০) পরিকল্পনায় প্রাথমিক শিক্ষা উপখাতে অধিক বরাদ্দ ও বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি।

৪। বাংলাদেশ আমল (১৯৭১ পরবর্তী):

  • দেশের নব প্রণীত সংবিধানে সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
  • ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে জাতীয়করণ করেন।
  • বাংলাদেশ সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল; ২০০০ সালের মধ্যে:
    • শিক্ষার্থী ভর্তির হার ৯৫ ভাগে উন্নীত করা।
    • মেয়ে শিশু ভর্তির হার ৯৪ ভাগে উন্নীত করা।
    • প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপন হার ৭০ ভাগে উন্নীত করা।
  • ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়।
  • ১৯৯২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক একটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ সৃষ্টি করা হয়।
  • ১৯৯৩ সালে সারাদেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়।
  • এছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশে বেশ কিছু শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় যার সর্বশেষ অধ্যাপক কবীর চৌধুরি শিক্ষা কমিশন ২০১০।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!