অধ্যায়-০৩: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা (প্রথম অংশ)
যে বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে:
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কাকে বলে?
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করুন।
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য কী?
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো লিখুন।
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের মূলনীতিসমূহ উল্লেখ করুন।
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র (ELDS) কয়টি ও কী কী?
- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে শিখনক্ষেত্র (learning area) কয়টি ও কী কী?
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কাকে বলে?
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর অংশগ্রহণের এই প্রস্তুতিকালকেই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বলা হয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার একটি বিস্তৃত পরিসরের সূচনার অংশ হলো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুর শারীরিক, মানসিক, আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক অবস্থান নির্বিশেষে শিশু-বান্ধব পরিবেশে আদর যত্ন, স্নেহ ভালবাসা, খেলাধুলা ও বিনোদনের মাধ্যমে ৫+ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করাই হল প্রাক-
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করুন।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম যা শিশুর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ও আজীবন শিখনের ভিত্তি ক্সতরি এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম সোপান ও প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করে। একটি শিশুর জন্মের পর তার মধ্যকার যে সত্ত্বা আছে তাকে বিকশিত করার জন্য এবং তাকে সারা জীবনের শিক্ষা ও প্রস্তুতির জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য। নিম্নে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো:
- শিশুর উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে;
- সামাজিক দক্ষতা বাড়ে;
- বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বাড়ে;
- বিদ্যালয়ে শিশুর পারদর্শিতা বাড়ে;
- ঝড়ে পড়া হার কমে;
- প্রত্যাশিত দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে;
- উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণের হার কমে;
- সামাজিক ও কল্যাণমূলক অন্যান্য সেবার উপর নির্ভরতা কমে;
- সামাজিক অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
- শিক্ষা ব্যয় কমে;
- মাথাপিছু আয় বাড়ে;
- উৎপাদনশীলতা বাড়ে,
- আর্থ-সামাজিক ক্সবষম্য দূর হয়,
- শিশুরমানসিক বিকাশ ঘটে ফলে যুক্তিপূর্ণ চিন্তা করতে শেখে, নতুন পরিবেশে নিজকে খাপ-খাওয়াতে শেখে,
- ভাষার বিকাশ ঘটে,
- সামাজিক বিকাশ ঘটে,
- আবেগীয় বিকাশ ঘটে,
- শারীরিক ও অঙ্গসঞ্চালনের বিকাশ যেমনঃ ছবি আঁকা, খেলাধুলা, সাইকেল চড়া,
- ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে,
- প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা হিসেবে ভূমিকা রাখে।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য
আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বয়সী শিশুদের (৫+ বছর) বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, সামাজিক, নান্দনিক, বুদ্ধিবৃত্তীয় ও ভাষাবৃত্তীয় তথা সার্বিক বিকাশে সহায়তা দিয়ে আজীবন শিখনের ভিত্তি রচনা করা এবং প্রাথমিক শিক্ষার অঙ্গনে তাদের সানন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিষেক ঘটানো।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো বর্ণনা করুন।
ক) আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশে বিভিন্ন খেলা ও কাজের মাধ্যমে শিশুর সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা;
খ) শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করা;
গ) শিশুর সৌন্দর্য, নান্দনিকতাবোধ ও সুকুমারবৃত্তি বিকাশে সহায়তা করা;
ঘ) শিশুকে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা;
ঙ) নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার, কৃষ্টি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি এর চর্চায় উৎসাহিত করা;
চ) নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতি বিকাশে সহায়তা করা;
ছ) শিশুর স্থুল ও সূক্ষ্ণপেশী তথা চলনশক্তির বিকাশে সহায়তা করা;
জ) স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিরাপত্তা বিধানে সহায়তা করা;
ঝ) শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করা;
ঞ) প্রারম্ভিক গাণিতিক ধারণা, যে․ক্তিক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করা;
ট) পরিবেশের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কারণ ও ফলাফল সম্পর্ক অনুধাবনে সহায়তা করা;
ঠ) শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত কল্পনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বিকাশে সহায়তা করা;
ড) শিশুর আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বিকাশে সহায়তা করা এবং নিজের কাজ নিজে করতে উদ্বুদ্ধ করা;
ঢ) আবেগ বুঝতে পারা ও তার যথাযথ প্রকাশে সহায়তা করা;
ণ) শিশুকে পারস্পরিক সমঝোতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগি করতে সহায়তা ও উদ্বুদ্ধ করা;
ত) শিশুকে প্রশ্ন করতে আগ্রহী করে তোলা ও মতামত প্রকাশে উৎসাহিত করা;
থ) শিশুকে বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের মূলনীতিসমূহ উল্লেখ করুন।
শিশুর সার্বিক বিকাশে নানানিধ উপাদানের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় শিশুকে পরিপূর্ণভাবে বুঝে এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। রচিত শিক্ষাক্রমের উপর ভিত্তি করেই শিশুর সুপ্ত সম্ভাবনার সার্বিক বিকাশে সহায়তা করার পাশাপাশি তার পরবর্তী জীবনের শিক্ষার জন্য শক্ত ভিত রচিত হয়। নিম্নে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের মূলনীতিসমূহ উল্লেখ করা হলো:
১. শিশু কেন্দ্রিকতা,
২. সক্রিয় শিখন,
৩. পরিবারের সম্পৃক্ততা,
৪. স্কুল-সক্রিয় সামাজিক প্রতিষ্ঠান,
৫. একীভূততা,
৬. দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যনির্ভর শিখন,
৭. অন্যদের সাথে শিশুর সম্পর্ক,
৮. পারিপার্শ্বিক পরিবেশ,
৯. পরিবেশ বান্ধবতা।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র (ELDS) কয়টি ও কী কী?
জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি ও কারিগরি সংস্থার সহায়তায় শিশুর প্রারম্ভিক শিখন ও বিকাশের ৪টি Domain বা ক্ষেত্রকে প্রমিত মান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এক্ষেত্রগুলো Early Learning Development Standards বা ELDS নামে পরিচিত। এগুলোকে ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা:
১. শারীরিক ও চলন ক্ষমতার বিকাশ,
২. সামাজিক ও আবেগিক দক্ষতার বিকাশ,
৩. ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ,
৪. বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে শিখনক্ষেত্র (learning area) কয়টি ও কী কী?
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারী, আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রম, গবেষণা ও দলিল পর্যালোচনা করে শিশুদের প্রারম্ভিক শিখন ও বিকাশের এই ৪টি ক্ষেত্রকে ৮টি শিখন ক্ষেত্রে (learning area) বিভাজন করা হয়েছে। শিশুর বিকাশের এ ৪ টি ক্ষেত্র অনুযায়ী ৮টি শিখন ক্ষেত্র নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. শারীরিক ও চলনক্ষমতা,
২. সামাজিক ও আবেগিক,
৩. ভাষা ও যোগাযোগ,
৪. প্রারম্ভিক গণিত,
৫. সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতা,
৬. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,
৭. পরিবেশ,
৮. স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা।
