বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (শিক্ষণবিজ্ঞান), অধ্যায়-৩ - Proshikkhon

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (শিক্ষণবিজ্ঞান), অধ্যায়-৩

অধ্যায়-৩: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

১) বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর জন্য উপযোগী পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে বর্ণনা করুন।

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর জন্য উপযোগী পদ্ধতি সমূহঃ পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তুর ধারণা শিশুদের মাঝে সুন্দর ও সুচারুরূপে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন যথাযথ শিখন শেখানো পদ্ধতি ও কৌশলের  ব্যবহার।  শিক্ষার্থীদের সমকালীন জীবনের চাহিদা, তাদের আগ্রহ, তাদের সক্রিয়তা, অংশগ্রহণ ও সৃজনশীলতাকে বিবেচনায় রেখে “বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” বিষ্যের কিছু কার্যকর শিখন শেখানো পদ্ধতি হলো- 

  • আলোচনা পদ্ধতিঃ শ্রেণি পাঠ পরিচালনায় আলোচনা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আলোচনায় সাধারণত মতামত প্রকাশ করা হয়, যা সমস্যা সমাধানের পক্ষে খুবই মূল্যবান।  আলোচনার সূত্রপাত হয় কোন সমস্যা কে কেন্দ্র করে। সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা জোড়ায় অথবা দলে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যপুস্তকে অনেক বিষয় আছে যা আলোচনা পদ্ধতি প্রয়োগ করে উপস্থাপন করা যায়। যেমন- আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব, সমাজে পরস্পরের সহযোগিতা , সমাজের বিভিন্ন পেশা, নাগরিক অধিকার, এলাকার উন্নয়ন, জলবায়ু ও দুর্যোগ, নারী-পুরুষ সমতা ইত্যাদি।
  • প্রশ্ন-উত্তর পদ্ধতিঃ  বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পাঠ উপস্থাপনে প্রশ্ন-উত্তর একটি বহুল ব্যবহৃত শিখন শেখানো পদ্ধতি। কখনো কখনো এ পদ্ধতি পুরো পাঠ উপস্থাপনে আবার কখনো একটি পাঠ এর অংশবিশেষ উপস্থাপনে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শ্রেণিকক্ষে বিষয় উপস্থাপনে এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগ নির্ভর করে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয় শিক্ষকের  যথার্থ পরিকল্পনা ও দক্ষতার উপর।  এ পদ্ধতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কে পাঠ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেয়।  উত্তরের সূত্র ধরে শিক্ষক আবার প্রশ্ন করেন অন্যদের কাছ থেকেও উত্তর জানতে সচেষ্ট হন। আর এভাবে প্রশ্নোত্তর আলোকে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।
  • পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিঃ   আমাদের পরিবেশ ও সমাজে কিছু বিষয় বিদ্যমান যা  সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে ঐ বিষয়গুলো ভালভাবে অবলোকন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয় এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যা সম্পর্কে অনুপুঙ্খ জ্ঞান আহরণের জন্য শিখন শেখানো পদ্ধতি হিসেবে  পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ ও সংরক্ষণ, সমাজের বিভিন্ন পেশা, এলাকার উন্নয়ন, কাজের মর্যাদা,বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর জীবনধারা ইত্যাদি বিষয়বস্তু সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন এবং  তার  আলোকে নিজেদের কাঙ্খিত মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার জন্য শিখন শেখানো পদ্ধতি হিসেবে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার করা যেতে পারে।   পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোকে বাস্তব ক্ষেত্রে সশরীরে হাতে কলমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবলোকন করার মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যা শিক্ষার্থীদের শিখন ও অর্জনকে  স্থায়ী ও বাস্তবমুখী করতে সহায়তা করে।
  • ভূমিকাভিনয় পদ্ধতিঃ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের অনেক পাঠই  আছে যা উপস্থাপনে ভূমিকাভিনয় ব্যবহার করে শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা পাঠকে শিশুদের কাছে শুধু আনন্দদায়কই করে না বিষয়বস্তুকে সহজে অনুধাবনযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনার  জীবন্তরূপ তথা  বাস্তব রূপ এ পদ্ধতির মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব হয়। যেমন- সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ,দুর্যোগে আমাদের করণীয়,পরিবার ও বিদ্যালয়ে আমাদের দায়িত্ব- কর্তব্য ইত্যাদি বিষয়কে বাস্তবরূপে শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপনের জন্য এ পদ্ধতির প্রয়োগ খুবই ফলপ্রসূ। তবে এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগ নির্ভর করে বিষয়বস্তুর আলোকে ভূমিকা অনুযায়ী কথোপকথন সম্বলিত ধারা বর্ণনা তৈরি,  শিক্ষার্থীদের সে অনুযায়ী  প্রস্তুতকরণ ও প্রয়োগের ওপর।
  • অনুসন্ধান শিখন শেখানো পদ্ধতিঃ শিশুকে চিন্তাশীল,সৃজনশীল ও স্বপ্রণোদিত শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান শিখন শেখানো পদ্ধতি ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করার মাধ্যমে শিখন কৌশলই এর মূল মন্ত্র। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়-এ অনুসন্ধান এমন একটি প্রক্রিয়ার যার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন ও উত্তরের  মাধ্যমে সমাজ শিক্ষার মূল ধারণা গুলো লাভ করা। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা বিষয়ের আলোকে প্রশ্ন প্রণয়ন করে  এবং সে অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ ও সংগঠন করে। সংগৃহীত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে প্রশ্নের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনুসন্ধান শিখন প্রক্রিয়ায় নানা  রকমফের থাকলেও মূল ধাপগুলো   একই বার্তা প্রতিফলিত করে।  আর তা হলো- সমস্যা নির্ধারণ,তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ ও সাধারণীকরণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

২) বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে শিখন কৌশলসমূহ কী কী? 

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে শিখন কৌশলঃ  বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়বস্তু শ্রেণীতে সফল ভাবে উপস্থাপনের জন্য শিখন শেখানো পদ্ধতির পাশাপাশি সংগতিপূর্ণ কৌশল ব্যবহার করে শিখন-শেখানো আনন্দদায়ক ও কার্যকরী তথা  শিক্ষার্থীর  পুরোপুরি শিখন নিশ্চিত করা সম্ভব। এ বিষয়ের শিখন শেখানো কার্যাবলীতে ব্যবহার উপযোগী বিশেষ কতগুলো শিখন কৌশল হলো-

  • মাথা খাটানো
  •  মন চিত্রায়ন
  •  ধারণা চিত্রায়ন
  •  চিত্র বিশ্লেষণ ৬ ক
  •  সহযোগিতামূলক শিখন
  • তালিকাকরণ

৩) মাথা খাটানো কী? উদাহরণসহ বর্ণনা করুন।

মাথা খাটানো বা ব্রেইন স্টার্মিংঃ

শিখন শেখানোর যে কৌশলে শিক্ষার্থীদের একটি সমস্যা দেয়া এবং সে সম্পর্কে চিন্তা করে তাদের মতামত বলতে দেয়া হয় তাকে ব্রেইন স্টর্মিং বা মাথা খাটানো বলা হয়।  সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মধ্যে মাথা খাটানো বা চিন্তার ঝড় সৃষ্টি করা হয় বলে একে ব্রেইন স্টার্মিং বলা হয়। যেমন-  জলবায়ু কী? জলবায়ু পরিবর্তনে  পরিবেশের ওপর কি প্রভাব পড়ে? এ ধরনের প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করে তাদের মতামত দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে কিভাবে শিখন শেখানো কার্যক্রমে  ব্রেইন স্টর্মিং বা  মাথা খাটানো কৌশল ব্যবহার করা যায় তা উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

  • প্রথমত শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করতে হবে যেমন- ভালো মানুষ কাদের বলে?
  • শিক্ষার্থীদের ২/৩ মিনিট চিন্তা করার সময়  দেয়া এবং প্রয়োজনে তাদের খাতায় নোট করতে  বলতে হবে।
  • শিক্ষার্থীদের একজন একজন করে তাদের মতামত প্রকাশ করতে বলতে হবে এবং প্রাপ্ত মতামতগুলো বোর্ডে লিখতে হবে। সকল মতামত গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ভুল শনাক্ত করা বা সংশোধন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • মতামত গুলো সহজ ও সংক্ষিপ্ত ভাবে লিখতে হবে।
  •  সকলের ধারণা পাওয়ার পর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

এভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় -এর বিষয়বস্তু প্রাথমিক ধারণা/পূর্ব অভিজ্ঞতা ব্যবহার এ কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে। 

৪) মন চিত্রায়ন কী?  বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এর বিভিন্ন বিষয়বস্তু কিভাবে  মন চিত্রায়নের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়? উদাহরণসহ বর্ণনা দিন। 

মন চিত্রায়ন/ মাইন্ড ম্যাপিং:

কোনো একটি বিষয় নিয়ে নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করে যে উত্তরগুলো পাওয়া যায় তার রূপচিত্রই হলো মাইন্ড ম্যাপিং। যেমন শিক্ষার্থীদের বলা হলো বায়ু দূষণের কারণ কী কী?  প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের ভাবতে বলা হলো। এ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা সংগ্রহ করে বিষয়বস্তু তৈরি করা হলো। শিখন শেখানোর এ পদ্ধতি মাইন্ড ম্যাপিং।  

উদাহরণসহ বর্ণনাঃ  বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে কিভাবে শিখন শেখানো কার্যক্রমে মাইন্ড ম্যাপিং ব্যবহার করা যায় তা উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

 চতুর্থ শ্রেণি অধ্যায়-৪, সামাজিক অধিকার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।

 নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে আমরা মাইন্ড ম্যাপিং কৌশল ব্যবহার করতে পারিঃ

  • বোর্ডের মাঝামাঝি স্থানে সামাজিক অধিকার শব্দটি লিখে শিক্ষার্থীদের সামাজিক অধিকার সম্পর্কে ভাবতে  বলবো। যেমন কোনগুলো সামাজিক অধিকার? উদাহরণ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার এর কথা বলে বোর্ডে  চিত্ররূপ লিখব।
  • এবার বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কি কি অধিকার প্রয়োজন? প্রশ্নটিই করে শিক্ষার্থীদের ভাবতে বলবো। প্রয়োজনে সহায়তা করব। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ সম্পর্কিত ধারণা সংগ্রহ  করে বেঁচে থাকার অধিকার এর শাখা তৈরি করব।
  •  এভাবে আবার ধাপ-২ থেকে পুনরাবৃত্তি করে অন্যান্য অধিকারের শাখা ম্যাপ তৈরি করব। 

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এর বিভিন্ন বিষয়বস্তু এভাবে মাইন্ড ম্যাপিং এর মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়।

চিত্র ডিপিএড রিসোর্স বুক, পৃষ্ঠা-২৩৫

৫) ‘ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়ে শিখন-শেখানো কার্যাবলিতে রাউন্ডরবিন কৌশল বর্ণনা করুন।

রাউন্ডরবিন কৌশল:

সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল এর একটি উদাহরণ হল রাউন্ড-রবিন কৌশল। এ কৌশল প্রয়োগ করে কোন বিষয়বস্তু সম্পর্কে  দলের সদস্যদের ধারণা  ও মতামত প্রকাশ  করা যায়। 

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলো-

  • শিক্ষার্থীদেরকে ৫/৬  জনের দলে ভাগ করতে হবে।
  • “ তুমি কিভাবে তোমার পরিবারকে সাহায্য করো?” এভাবে প্রশ্ন করে প্রত্যেক দলে দিতে হবে।
  • প্রথমে দলের একজন তার পাশের জনকে প্রশ্ন করবে।  সে উত্তর মুখে বলবে ও খাতায় লিখে রাখবে। যে উত্তর দিলো এবার সে তার পাশের জনকে প্রশ্নটি করবে এবং  ঠিক একইভাবে সে  উত্তরটি বলবে ও খাতায় লিখবে। এভাবে প্রত্যেক সদস্য  প্রত্যেককে প্রশ্ন করবে ও যাকে প্রশ্ন করবে সে উত্তর দিবে।  সকল সদস্যের অংশগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত   কাজটি চলবে।
  • এভাবে একই সময়ে প্রত্যেক দলের কাজ চলবে ও যাতে সকলে দলের কাজ একই সময়ে শেষ হয় সেটি লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • দলের প্রত্যেক সদস্য যেন তাদের ধারণা ও মতামত ব্যক্ত করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • এবার প্রত্যেক দলের কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করে তা বোর্ডে লিখতে হবে।
  • আলোচনা  করে সারসংক্ষেপ করতে হবে।

৬) ধারণা চিত্রায়ন কী? কীভাবে ধারণা-চিত্র  তৈরি করা যায়? উদাহরণসহ বর্ণনা করুন।

ধারণা চিত্রায়ন বা Concept Mapping:

শিখন শেখানো কৌশল হিসেবে ধারণা চিত্রায়ন একটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল। ধারণা চিত্রায়ন ধারণা ও মতের মধ্যকার সম্পর্ককে  চিত্ররূপে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করেন। ধারণাগুলোকে কতগুলো শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দ্বারা  একে অপরের সাথে আন্তঃসম্পর্ক রূপে প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীদের চিন্তাকে সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ করে তথ্য সম্পর্কে অধিক ধারণা পেতে সহায়তা করে এবং মূল ধারণার সাথে উপ-ধারণা বা সম্পর্কযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধারণার সম্পর্কে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারে। অর্থাৎ ধারণা চিত্রায়ন হল একটি শৃংখলাবদ্ধ সংগঠিত চিত্ররূপ যা কোন বিষয়বস্তু সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণাসমূহের  দৃশ্যমান উপস্থাপন প্রক্রিয়া। 

শিখন-শেখানো কার্যাবলী তে শিক্ষার্থীদের  পূর্ণ জ্ঞানকে  কার্যকরভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে  ধারণা চিত্রায়ন একটি উপযোগী কৌশল। শুধু বিষয়বস্তু উপস্থাপনে জন্যই নয়, শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তুগত বোধগম্যতার  মাত্রা যাচাই করার ক্ষেত্রেও ধারণা চিত্রায়ন খুবই কার্যকর।

ধারণা-চিত্র তৈরি করার কৌশনঃ

  • বিষয়বস্তুর আলোকে মূল ধারণা দিয়ে শুরু করাঃ  বিষয়বস্তু সম্পর্কে এমন প্রশ্ন করতে হবে বা মূল ধারণা এমন ভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
  • মূল ধারণা চিহ্নিতকরণঃ  শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিষয়বস্তু আলোচনার প্রেক্ষিতে মূল ধারণাটি চিহ্নিত করতে হবে। মূল ধারণার আলোকে সম্পর্কযুক্ত সুনির্দিষ্ট ধারণাটির প্রতি শিক্ষার্থীদেরকে ইঙ্গিত দিতে হবে । মূল ধারণা কে কেন্দ্র করে তার চারপাশে উপ-ধারণা, সম্পর্কযুক্ত ধারণাগুলো লিখতে হবে।
  • ধারণাগুলোকে শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দিয়ে প্রকাশ এবং সম্পর্ক রেখা টেনে শেষকরণঃ  এক্ষেত্রে রেখা টেনে মূল ধারণার সাথে উপ-ধারণা ও সংশ্লিষ্ট আরও সুনির্দিষ্ট ধারণার সম্পর্ক তৈরি করা এবং শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে সম্পর্কযুক্ততার কারণ তুলে ধরা। 

উদাহরণঃ পঞ্চম শ্রেণির অধ্যায়-৬ এর বিষয়বস্তু ‘ জলবায়ু পরিবর্তন’। প্রথমে জলবায়ু সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন করে বিষয়ের অবতারণা করি। 

  • প্রশ্নোত্তর  আলোচনার মাধ্যমে মূল ধারণা ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নির্ধারণ করে বোর্ডের  মূল ধারণাটি  লিখি। বোর্ডে এমন স্থানে মূল ধারণা লিখব যাতে সম্পর্কযুক্ত ধারণাগুলো লিখে সম্পর্ক রেখা টেনে চিত্ররূপ উপস্থাপন করা যায় ।
  • জলবায়ু পরিবর্তন কি এবং কেন বা কিভাবে হচ্ছে তার সূত্রপাত করে শিক্ষার্থীদের ভাবতে বলবো। 
  • সরাসরি উত্তর প্রদান না করে প্রয়োজনে কিছু উদাহরণ দিয়ে  তাদেরকে ভাবতে উৎসাহিত করবো। 
  • শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে এক এক করে কারণ গুলো যেমন যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প কারখানার ধোয়া ইত্যাদি বের করে নিয়ে আসবো ।এ কারণগুলো “জলবায়ু পরিবর্তন” এর চতুর্দিকে চিত্ররূপ লিখে ও রেখা টেনে তাদের সম্পর্ক তৈরি করবো। 
  • জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কী কী প্রভাব পড়ে তা নিয়ে ভাবতে  বলবো। ভাবনাগুলোকে সংগ্রহ করে চিত্রের ন্যায় বোর্ডে লিখে উপস্থাপন করবো।
  • এবার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রেখা টেনে সম্পর্ক তৈরি করে এবং সম্পর্ককে শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে সম্পর্কের কারণের ধারণাকে মূর্ত করে তুলবো।

সবশেষে তৈরিকৃত ধারণাচিত্রটি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আলোচনা করে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ধারণা স্পষ্ট করবো। 

চিত্র: রিসোর্স বুক, পৃষ্ঠা ২৩৮

৭) ৬ক বলতে কি বুঝায়? চিত্র বিশ্লেষণে ৬ক এর ব্যবহার সম্পর্কে লিখুন।

‘ ৬ক’ দ্বারা ‘ক’ বর্ণ দিয়ে শুরু এমন ৬টি প্রশ্নবোধক পদকে বুঝানো হয়। এগুলো হলো-

১) কে বা কারা?

২) কী?

৩) কোথায়?

৪) কখন?

৫) কেন?

৬) কীভাবে?

ধারণাচিত্রের ক্ষেত্রে চিত্রের আলোকে কে, কী, কোথায়, কখন, কেন, কীভাবে-এই প্রশ্নবোধক শব্দ বা পদ ব্যবহার করে প্রশ্ন তৈরি করে শিখন-শেখানো যায়।

চিত্র বিশ্লেষণে ৬ক এর ব্যবহারঃ  বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য, দৃশ্যমান  ও মূর্ত এবং আকর্ষণীয় করতে পাঠ্যপুস্তকে ছবি /চিত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে।  এই ছবি বা চিত্র ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদেরকে বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দেয়া যায়। আবার শিক্ষার্থীরা চিত্র বিশ্লেষণ করে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা যেমন অনুমান করতে পারে, তেমনি বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে সে ধারণার প্রয়োগ করতে পারে।  আর তাই চিত্র বিশ্লেষণ শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।  এ কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিরোনামহীন চিত্র ব্যবহার করতে হবে। চিত্রের কে, কী, কোথায়, কখন, কেন ও কিভাবে ব্যবহার করে প্রশ্নগুলো তৈরি করতে হবে। 

৮) উদাহরণসহ শিখন-শেখানোয় আলোচনা পদ্ধতির প্রয়োগ কৌশল বর্ণনা করুন।

আলোচনা পদ্ধতি:

শ্রেণি পাঠ পরিচালনায় আলোচনা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আলোচনায় সাধারণত মতামত প্রকাশ করা হয় যা সমস্যা সমাধানের পক্ষে খুবই মূল্যবান।  আলোচনার সূত্রপাত হয় মূলত কোনো সমস্যা কে কেন্দ্র করে। সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা জোড়ায় অথবা দলে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যপুস্তকে অনেক বিষয় আছে যা আলোচনা পদ্ধতি প্রয়োগ করে উপস্থাপন করা যায়। যেমন- আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব, সমাজে পরস্পরের সহযোগিতা, সমাজের বিভিন্ন পেশা, নাগরিক অধিকার, এলাকার উন্নয়ন জলবায়ু ও দুর্যোগ, নারী -পুরুষ সমতা ইত্যাদি।

উদাহরণঃ চতুর্থ শ্রেণি, অধ্যায়-২, বিষয়বস্তুঃ নারী ও পুরুষ

  • বিষয়বস্তু সম্পর্কে শিশুদের পূর্বধারণা ব্যবহার করে আলোচনার সূত্রপাত করতে হবে।
  • শিক্ষার্থীদের ৫/৬ জনের কয়েকটি দলে ভাগ করে প্রত্যেক দলে একজন দলনেতা নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে দলে যেন সব ধরনের শিক্ষার্থীই থাকে।
  •  প্রত্যেকটি দলে  কিছু সমস্যা সমাধান করতে দিতে হবে।  যেমন-

  সমস্যা: ১) কোন কাজ গুলো শুধু  পুরুষদের করতে দেখা যায়?

               ২)  কোন কাজগুলো শুধুমাত্র নারীদের করতে দেখা যায়?

               ৩)  কোন কাজগুলো নারী-পুরুষ উভয়কে করতে দেখা যায়?

  • শিক্ষার্থীদের কে দলে আলোচনা করে মতামত তালিকাবদ্ধ করতে বলতে হবে।
  • দলীয় কাজের সময় শিক্ষককে ঘুরে ঘুরে কাজ পরিবীক্ষণ করতে হবে, প্রয়োজনে সহায়তা করতে হবে যেন তারা আলোচনার মূল বিষয়বস্তু থেকে বিচ্যুত না হয়।
  • প্রত্যেক দলকে তাদের দলীয় উপস্থাপন করতে হবে এবং সুষ্ঠু ভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
  • পাঠ্যবইয়ে প্রদত্ত  ছক  অনুযায়ী তথ্যগুলো বোর্ডে লিখতে হবে।
  • সকল দলের তথ্য লেখা শেষ হলে বিষয়বস্তু সম্পর্কে শিক্ষার্থীদেরকে ফিডব্যাক প্রদান করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সহায়তা করতে হবে। 

error: Content is protected !!