Bangladesh & Global Studies Teaching
অধ্যায়-১: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষণ
১) বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিগত তাগিদসমূহ বর্ণনা করুন।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক জ্ঞানের বিকাশ এবং সামাজিক ও নাগরিক কাজে অংশগ্রহণের দক্ষতা, সমস্যা- সমাধান দক্ষতা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ও বহুবিধ মূল্যবোধ উন্নয়নে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষার তাৎপর্য গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিগত তাগিদসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলোঃ
১) শিক্ষার সর্বস্তরে সাংবিধানিক প্রতিফলন ঘটানো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা রক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা।
২) ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিক্ষার্থীদের মননে, কর্মে ও ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা।
৩) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা ও তাদের চিন্তা-চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং তাদের চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলীর (যেমন-অসাম্প্রদায়িক চেতনা বোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, মুক্তিযুদ্ধের চর্চা , শৃঙ্খলা, সৎ-জীবনযাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ্য, অধ্যাবসায় ইত্যাদি) বিকাশ ঘটানো।
৪) জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা বিকশিত করে প্রজন্ম পরম্পরায় সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা ।
৫) দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনধর্মী, প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন সহায়ক করে তোলা। শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে সহায়তা প্রদান করা।
৬) জাতি, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে আর্থ-সামাজিক শ্রেণি-বৈষম্য ও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানুষে মানুষে সহমর্মিতাবোধ গড়ে তোলা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা।
৭) গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের বিকাশের জন্য পারস্পরিক মতাদর্শের প্রতি সহনশীল হওয়া এবং জীবনমুখী বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে সহায়তা করা।
৮) বিশ্বপরিমন্ডলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিষয়ে উচ্চমানের দক্ষতা সৃষ্টি করা।
৯) শিক্ষাকে ব্যাপকভিত্তিক করার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া, শ্রমের প্রতি শিক্ষার্থীদেরকে শ্রদ্ধাশীল ও আগ্রহী করে তোলা এবং শিক্ষার স্তর নির্বিশেষে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হওয়ার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনে সমর্থ করা।
১০) শিক্ষার্থীদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ সচেতনতা এবং এতদসংক্রান্ত বিষয়ে দক্ষ জন-শক্তি সৃষ্টি করা।
১১) সব ধরনের প্রতিবন্ধীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।
১২) মাদকজাতীয় নেশাদ্রব্যের বিপদ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সতর্ক ও সচেতন করা।
২) “বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” শিখন-শেখানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লিখুন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠন ‘ দ্য ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্য সোস্যাল স্টাডিজ’ এবং বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও সামাজিক বিজ্ঞানে সোশ্যাল স্টাডিজ শিখন- শেখানোর উদ্দেশ্য চিহ্নিত করেছেন। এই উদ্দেশ্যের আলোকে ‘ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ শিখন শেখানোর উল্লেখযোগ্য কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিচে উপস্থাপন করা হলো-
ধারণা সংগঠনঃ
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এর মৌলিক বিষয়বস্তুর ধারণা সংগঠন ও উপলব্ধির বিকাশ এবং তা প্রয়োগে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। যেমন- পরিবারের ধারণা বা পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন ও অনুশীলন সামর্থ্যের বিকাশ সাধনে সহায়তা করা।
সামাজিক বাস্তবতার জ্ঞানভিত্তিক ধারণা উন্নয়নঃ
সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারনার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ ও তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রশংসা করার সামর্থ্যের উন্নয়ন সাধন করা। উদাহরণস্বরূপ- পরিবার, বিদ্যালয়, এলাকা, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে তাদের কার্যকর ভূমিকা পালনের উপলব্ধি বিস্তৃত করা।
সামাজিক ও নাগরিক দক্ষতা এবং সামর্থ্যের উন্নয়নঃ
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এর তথ্যাবলি উপলব্ধি ও ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সামর্থ্যের উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। ব্যাপক অর্থে, একটি কার্যকর সামাজিক জীবনের জন্য যথাযথ জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটানো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলায় ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলি শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার দক্ষতা ও সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো।
মূল্যবোধের বিকাশ সাধনঃ
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস এবং কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মূল্যবোধ অর্জনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। যেমন- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ন্যায়বোধ, বৈষম্যহীনতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক চেতনা ,পরমসহিষ্ণুতা, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ইত্যাদি। একই সাথে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভূমিকা পালনের জন্য তাদের আবশ্যকীয় মূল্যবোধের উন্মেষ ও বিকাশ সাধন করা।
বৈচিত্র্যপূর্ণ,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাঃ
একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ বা বহুসাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলায় সহায়তা করা। সমাজের সদস্য হিসাবে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রথা এবং আচার- আচরণের প্রতি তাদের সহানুভূতিশীল, প্রশংসামূলক ও শ্রদ্ধাশীল মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশসাধন করা।
বৈশ্বিক নাগরিক মনোভাব গঠনঃ
বিশ্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের তাদের কাজের এবং অন্যের ওপর সেই কাজের প্রভাবের দায়িত্বশীলতার চেতনা অর্জনে সহায়তা করা।
পরিবর্তনশীলতা ও প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার সামর্থ্যের উন্নয়নঃ
শিক্ষার্থীদের বিশ্বের পরিবর্তনশীলতার সাথে সামঞ্জস্য বিধান ও যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষম করতে সহায়তা করা। এ বিষয়টি শিখন- শেখানো কার্যাবলী শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ করা।
আত্মকর্মসংস্থানে যোগ্যতা অর্জনঃ
শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তাদের আত্ম-কর্মসংস্থানের যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করা। কায়িকশ্রমসহ যেকোনো সৎ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি ও তা গ্রহণ করার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা। যেমন- বনায়ন কার্যক্রম, মৎস্য চাষ, পশুপালন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক কাজ, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ ইত্যাদি।
৩) “ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” বিষয়টির শিখন-শেখানোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখুন।
প্রতিটি বিষয়ের শিখন শেখানোর নিজস্ব কতগুলো বিশেষত্ব থাকে, যা উক্ত বিষয়ে বিষয়বস্তু উপলব্ধি করতে সহায়তা দান করে। তেমনি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন-শেখানোরও কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা নিম্নরূপঃ
বিষয়বস্তুগত বৈশিষ্ট্য
“বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” এর এক একটি পাঠের বৈশিষ্ট অন্য পাঠের বৈশিষ্ট থেকে স্বাভাবিকভাবে আলাদা হয়। তবে বিষয়টি সমন্বিত হওয়ায় কোন কোন পাঠের বিষয়বস্তুতে বিভিন্ন বিষয়ের উপাদান সংযুক্ত থাকে। শিখন-শেখানো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষককে বিষয়বস্তু এর বৈশিষ্ট্যবলি সমক্যভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
যথাযথ শিখন-শেখানো কলাকৌশল প্রয়োগ
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন-শেখানোর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এ বিষয়ে শিক্ষকের মানসম্মত পেডাগোজিক্যাল কন্টেন্ট নলেজ ।এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাঠের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষক যথাযথ শিখন-শেখানো কলাকৌশল নির্বাচন করে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন।
নির্দেশনা সামগ্রীর প্রকৃতি
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে শিখন শেখানোর সফলতা নির্দেশনার সামগ্রী প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা, শিক্ষক সংস্করণ ও শিক্ষক নির্দেশিকা হল প্রধান প্রধান নির্দেশনা সামগ্রী। বিভিন্ন রেফারেন্স বই, জীবনীগ্রন্থ, সংবাদপত্র ইত্যাদি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো সামগ্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, বিভিন্ন ওয়েবসাইট প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুত্র হতে পারে। এনসিটিবি কর্তৃক প্রণীত নির্দিষ্ট শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যপুস্তক শিখন শেখানোর জন্য নির্দেশনা সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সঙ্গত কারণেই পাঠ্যপুস্তকের একটি নির্দিষ্ট আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। ফলে এতে উপস্থাপিত তথ্য, ইলাস্ট্রেশন ইত্যাদিও পরিমিত হয়। আবার চলতি ঘটনাবলীর বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিবছর পাঠ্যপুস্তকে আসে না। অথচ তার অনেক কিছুই শিক্ষার্থীদের অবহিত না করলে তাদের শিখনের অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো সম্পর্কিত জ্ঞান শিক্ষার্থীর শিখন চাহিদার আলোকে বিভিন্ন প্রকৃতির শিখন সামগ্রীর কার্যকর ব্যবহারের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটায়।
শিক্ষার্থীদের শিখন পারদর্শিতা
শিক্ষার্থীদের ফলপ্রসূ শিখনের ক্ষেত্রে তাদের শিখন পারদর্শিতা তথা সামর্থ্য, আগ্রহ , ধারণ বা গ্রহণ ক্ষমতা, চাহিদা ইত্যাদির তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব আছে। তাই শিক্ষকের শিখন-শেখানো পরিকল্পনা ও অনুশীলনের তাদের এসব বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলী বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া তাদের বয়স, লিঙ্গ , আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিকল্পনার নির্দেশনা
শ্রেণিকক্ষে শিখন শেখানো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরিকল্পনার নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থী ধরন, পাঠের বিষয়বস্তু, শিক্ষাক্রম নির্দেশিত শিখনফল ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। একজন শিক্ষকের সঠিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে কতটুকু কার্যকর ভাবে শিখন-শেখানো কার্যাবলী বাস্তবায়িত হবে। এজন্য পরিকল্পনার নির্দেশনা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
মূল্যায়ন
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর আরেকটি দিক হল এর মূল্যায়ন। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাবে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকের প্রকৃতি অনুযায়ী কি ধরনের টুলস কিভাবে ব্যবহৃত হবে তার নির্দেশনা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ।
৪) বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো তাৎপর্য উল্লেখ করুন।
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়। প্রাথমিক স্তরে শিশুদের সামাজিক বিকাশ সাধন, নাগরিক দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন এবং নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়টি অন্যতম ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর মধ্য দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নাগরিক দক্ষতা তথা জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়াসমূহ এবং গণতান্ত্রিক স্বভাব উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পরিণত সামাজিক ও নাগরিক জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের এ জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
শিক্ষার্থীদেরকে নিজ নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধকরণে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়টি শিখন শেখানো তাৎপর্য অপরিসীম।
সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের সমাজের সদস্য হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়ের শিক্ষকগণকে বিষয়টির শিখন শেখানোর গুরুত্ব উপলব্ধি করা একান্ত প্রয়োজন ।
৫) বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষণের বৈশিষ্ট্যের আলোকে শিক্ষকের প্রয়োজনীয় গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত লিখুন।
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় একটি সমন্বিত বিষয় হওয়ায় এটি শিখন শেখানোর জন্য শিক্ষকের কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোশ্যাল স্টাডিজ শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্য সোশ্যাল স্টাডিস শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা দিয়েছে তাতে এ বিষয়টি শিখন শেখানোর জন্য শিক্ষকের প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যাবলী প্রতিফলিত হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিক্ষক এর জন্য প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যাবলী সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-
অর্থপূর্ণ শিখন শেখানো
শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা , দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারবে ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সমর্থ হবে। তাই বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের একজন সফল শিক্ষকের এ বিষয়টির প্রধান প্রধান প্রত্যয় ও ধারণাসমূহের গভীর জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। শিক্ষককে বিষয়বস্তুগত প্রতিটি ধারণাই অর্থপূর্ণভাবে শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে বিষয়বস্তুগত বিস্তৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি শিক্ষার্থীদের একুশ শতকের ইস্যুসমূহ সম্পর্কে প্রস্তুত করে তোলার জন্য শিক্ষককে গভীর ও চিন্তাশীল অনুধাবনের অধিকারী হতে শেখায়।
সমন্বিত শিখন শেখানো
বিষয়বস্তুকে সংশ্লিষ্ট সকল প্রেক্ষাপটের আলোকে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা, যাতে ঐ বিষয়ে তাদের সামগ্রিক শিখন হয়। তা না হলে শিক্ষার্থীদের শিখন হতে পারে খন্ডিত বা আংশিক। বিষয়বস্তুর এ সমন্বিত উপস্থাপন সংশ্লিষ্ট থিম বা ধারণা সমূহের যোগসূত্রকে গতিশীল করে, অধিকতর অর্থপূর্ণ করে। উদাহরণস্বরূপ- ইতিহাসের বিষয়বস্তু পড়াতে গিয়ে কোন সময় কোন স্থানে কোন অবস্থায় ঘটনাটি ঘটেছে ,ঐ স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ সেই ঘটনার ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল, তখনকার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট কেমন ছিল, সাধারণ মানুষ ঘটনাটিকে কিভাবে দেখেছিল ইত্যাদি সামগ্রিক প্রেক্ষিতের অবতারণা শিক্ষার্থীদের শিখন সমগ্রতা প্রদানে সহায়ক হয়। আবার সংস্কৃতি বিষয়টি উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সময়, ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনশীলতা, মানুষ, স্থান ও পরিবেশ, নাগরিক আদর্শাবলি ও অনুশীলন প্রভৃতি ধারণার উপলব্ধিও প্রয়োজন। সুতরাং শিক্ষার্থীদের শিখনকে সম্পূর্ণতাদানের জন্য একটি সমন্বিত বিষয় হিসেবে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের বিষয়বস্তু সমন্বিতভাবে শিখন-শেখানো কার্যাবলীতে ব্যবহারের দক্ষতা শিক্ষকের থাকা বাঞ্ছনীয়।
মূল্যবোধভিত্তিক শিখন শেখানোঃ
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশ প্রেম, গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতি যথাযথ ভাবে প্রতিশ্রুতিশীল করে গড়ে তোলা। এছাড়াও সত্যবাদিতা , সাম্যবোধ, ন্যায়বোধ, পরমসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, মানবাধিকার, মতামতের স্বাধীনতা, শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সৌজন্যবোধ অর্জনে সহায়তা করা। শিক্ষার্থীদের এসকল মূল্যবোধ বিকাশ এর উদ্দেশ্য হলো পরিবার বিদ্যালয় এলাকা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সচেতন ও সক্রিয় ভাবে সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তোলা । সুতরাং শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসকল প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করার জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয় শিক্ষকের অবশ্যই থাকতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শিখন শেখানো যথার্থ ও কার্যকর হবে।
গণতান্ত্রিক শিখন শেখানো
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাষাতাত্ত্বিক এবং শিখন বৈচিত্র্য বজায় রেখেই শ্রেণিকক্ষে তাদের একীভূতকরণের ওপর অর্থাৎ বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ‘ ওপর জোর দেবেন। সাধারণত শিক্ষার্থীদের গোত্র, জাতিসত্তা, ভাষা, ধর্ম, লিঙ্গ, বিশেষ শিখন চাহিদা এবং অপরাপর শিক্ষামূলক ও ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলির ভিত্তিতে বৈচিত্র সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈচিত্র ও বহুত্বকে চর্চা করার গণতান্ত্রিক লক্ষ্য মূর্তরূপে প্রকাশ পাবে যদি শিক্ষক বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শ্রেণিকক্ষকে গণতন্ত্রের গবেষণাগার হিসেবে তৈরি করতে সমর্থ হন।
প্রতিকূলতা মোকাবেলা সহায়ক উন্নয়নমূলক শিখন শেখানো
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবেশ,। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি নানা অগ্রগতি সাধনে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এছাড়াও আমাদের প্রতিনিয়ত নানা অপ্রত্যাশিত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে আমাদের অবস্থান মজবুত করতে হলে শিশুদের মধ্যে এই প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের এই মনোভাব গড়ে তুলতে শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণীকক্ষের বাইরে নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে শিক্ষককে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
সক্রিয়তা ভিত্তিক শিখন শেখানো
শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় সংশ্লিষ্ট জ্ঞানার্জন দক্ষতা অর্জন, মূল্যবোধ সঞ্চার ও চ্যালেঞ্জিং মনোভাব গড়ে তোলার জন্য সকল ক্ষেত্রেই শিখনের সক্রিয়তা অত্যাবশ্যক। এজন্য শিখন-শেখানো এমন সব শিক্ষামূলক কাজ শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে সকল শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।শিক্ষক যত বেশি কাজে তাদের অংশগ্রহণ করিয়ে শেখাবেন তাদের শিখন তত্ত্ব বেশি টেকসই হবে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের শিখন-শেখানো কার্যাবলী কে শিক্ষার্থীদের নিকট সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করতে উক্ত বিষয়ে শিক্ষকগণকে উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যাবলী ধারণ করে সে অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে অনুশীলন করতে হবে।

