ডিপিএড প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষণবিজ্ঞান
অধ্যায়-০৬: প্রাথমিক স্তরে বিজ্ঞান শিখন মূল্যায়ন
সেশন-৬.১: শিখন মূল্যায়ন, শিখন ফল, শিখন কার্যাবলি ও মূল্যায়নের গঠনমূলক সম্পর্ক
১) মূল্যায়নের উদ্দেশ্য উল্লেখ করে শিখনফল, শিখন কার্যাবলি ও মূল্যায়নের গঠন মূলক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করুন।
মূল্যায়ন হলো একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখনের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শিক্ষক কোন একটি কার্যকর প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের শিখন প্রত্যক্ষ করেন এবং এই প্রত্যক্ষন থেকে বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা তাদের জন্য পপরিকল্পিত কতটুকু শিখন অর্জন করেছে এবং কীভাবে তারা তাদের শিখনে উন্নয়ন ঘটাতে পারে। এরপর শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন দিয়ে থাকেন। সাধারণভাবে তিনটি উদ্দ্যেশ্যে মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হলো –
১) উদঘাটনমূলকঃ শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান ও বিকল্প ধারণা উদঘাটন করা যাতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান ধারণার উপর নতুন ধারণা নির্মাণ করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প ধারণা পরিমার্জন করতে পারেন।
২) গাঠনিকঃ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে ফলাবর্তন বা ফিডব্যাক দেয়া যার ভিত্তিতে শিখন শেখানো কার্যবলি এগিয়ে নেওয়া যায়।
৩) সামষ্টিকঃ শিক্ষার্থী শিখনফল কতটুকু অর্জন করেছে তা নির্নয় বা শিক্ষার্থীর পারদর্শিতার সনদ দেয়া বা পরবর্তী শ্রেণিতে অধ্যায়নের যোগ্যতার সনদ দেয়া।
এছাড়াও কোন শিক্ষা কার্যক্রম বা শিক্ষাক্রমের মূল্যায়নের জন্য ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন হয়ে থাকে।
শিখনফল, শিখন কার্যাবলি ও মূল্যায়নের গঠনমূলক সম্পর্কঃ
একটি কার্যকর শিক্ষ ন শিখনের জন্য দরকার প্রত্যাশিত শিখনফল, শিখন কার্যাবলি ও মূল্যায়নের মধ্যে একটি স্বার্থক ও গঠনমূলক আন্তঃসম্পর্ক। শিক্ষক কে একটি পাঠের পরিকল্পনা করতে হয় এ সম্পর্ক বজায় রেখে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনের জন্য শ্রেণি কার্যাবলি এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হয় যা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনের জন্য নতুন ধারণাব গঠন শিক্ষক কে পরিকল্পনা করতে হয় তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের শিখন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন যা দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিখন অর্জিত হয়েছে তা যাচাই করা যাবে।
নিচের চিত্রটির মাধ্যমে আমরা বিষয়টিকে আরও পরিস্কারভাবে তুলে ধরতে পারবো।
শিখনফল, শিখন কার্যাবলি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছ। এখানে শিখন শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান উদঘাটন ও তার উপর ভিত্তি করে।

ডায়াগনস্টিক মূল্যায়নের কৌশলঃ
নিচে ডায়াগনস্টিক মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশল উল্লেখ করা হল–
১) উন্মুক্ত প্রশ্ন করাঃ উন্মুক্ত প্রশ্ন করন প্রক্রিয়াটি একটি শ্রেণিকক্ষে ব্যাপকভাবে ব্যাবহৃত হয়। শিক্ষক এ ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রশ্ন পর্যায়ক্রমে করে শিক্ষার্থীদের কে আজকের পাঠের সাথে সংশ্লিষ্ট পূর্বজ্ঞানসমুহ প্রকাশের মাধ্যমে বর্তমান পাঠের সুযোগ করে দেন। এ সংযোগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞানের সাথে সাথে নতুন জ্ঞানের সংযোগ করেন।
২) চিত্রসহ পোস্টার প্রদানঃ এ কৌশলটিতে কোন বিষয়র উপরে ডায়াগনস্টিক মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি চিত্রসহ পোস্টার তৈরি করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চিত্রগুলো সম্পর্কে অভিমত নেওয়া হয়। এতে বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান বের হয়ে আসে। কখনো হয়তোবা এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভ্রান্ত ধারণার প্রকাশ পায়। এ চিত্রসহ প্রদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে তাদের শিখনের প্রতি উদ্দিপ্ত করা হয়।
উপসংহারঃ পরিশেষে বলতে হয় মূল্যায়নের উদ্দেশ্য, শিখনফল, শিখন কার্যাবলি এবং মূল্যায়নের গঠনমূলক সম্পর্ক অতি নিবিড়। শিখনফলের ওপর ভিত্তি করে পঠন পাঠন কার্যাবলি পপরিচালিত হয়। আর মূল্যায়নের উদ্দেশ্যের উপর করে শিক্ষার্থীর অর্জন দক্ষতার গঠনমূলকমূল্যায়ন করা হ। যা শিক্ষার্থীর শিখন অঅগ্রগতি নির্ধারণ করে।
২. পরিবেশ পরিচিতি বিষয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতির বর্ণনা দিন।
প্রাথমিক স্তরে ১ম ও ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ে সমন্বিত শিক্ষক সহায়িকা প্রণয়ন করা হয়েছে। কেননা পরিবারের বাইরে নতুন পরিবেশে শিশুর শিক্ষা শুরু হয় তার চারপাশের পরিবেশ থেকে। আর এই পরিবেশের মধ্যে রয়েছে তার পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ। সমাজ ও প্রকৃতিকে পৃথক করে উপলব্ধি করার সামর্থ্য শিশু বয়সে গড়ে ওঠে না। তাই শ্রেণিকক্ষে পরিবেশ ও এর উপাদান সম্পর্কে শিশুকে শেখানো হয়।
১ম ও ২য় শ্রেণিতে পরিবেশ পরিচিতি (সমন্বিত) বিষয়টি অনুসরণে করে একজন শিক্ষককে পাঠ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এই বিষয়টির মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সমাজ, পরিবেশ, দেশ ও প্রকৃতির ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারবে, উপলব্ধি করবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার জ্ঞান ও দক্ষতা প্রকাশ ও প্রয়োগ করতে সমর্থ হবে। পাঠদান কার্যক্রমটিকে সফল করার জন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠের অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য পাঠ চলাকালীন শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
১ম ও ২য় শ্রেণির পরিবেশ পরিচিতি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ২ ভাবে মূল্যায়ন করা যায়। যথা:
১. ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment)
এবং (২) সামষ্টিক মূল্যায়ন (Summative Assessment)।
শিখন শেখানো কার্যাবলির সাথে সমন্বিত করে শিক্ষার্থীদের শিখন মূল্যায়ন খুবই কার্যকরি ব্যাপার। কেননা শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কীভাবে শিখছে, তাদের শিখন ফলপ্রসূ হচ্ছে কিনা, তা যাচাইয়ের মাধ্যমে শিখন অগ্রগতি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ফিডব্যাক প্রদান ও পুনর্মূল্যায়ন করা সম্ভব।
অন্যদিকে সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখন সংঘটিত হয়েছে কিনা, শুধু তা যাচাই করা হয়। মূল্যায়নের জন্য সম্পূর্ণ একাডেমিক বছরকে তিনটি প্রান্তিকে বিভক্ত করা হয়েছে – ১ম প্রান্তিক, ২য় প্রান্তিক এবং ৩য় প্রান্তিক। প্রত্যেক প্রান্তিকে নির্দিষ্ট পাঠক্রমের ভিত্তিতে শিখনফল নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।
৩. প্রাথমিক স্তরে পরিবেশ পরিচিতি বিষয়ের মূল্যায়নের ক্ষেত্র ও বিবেচ্য বিষয়সমূহ ব্যাখ্যা করুন।
প্রাথমিক পর্যায়ে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে অন্তর্ভূক্ত পরিবেশ পরিচিতি বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য ৩টি বৃহৎ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। যথা:
১) বিষয়জ্ঞান,
২) সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণ দক্ষতা এবং
৩) সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ।
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত মূল্যায়ন ক্ষেত্র তিনটি শিক্ষাক্রম-২০১২ এর আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞানমনষ্কতা কিংবা বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের এই তিন ক্ষেত্রেই শিখন আবশ্যক। এই তিনটি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শিখন কী ধরনের হতে পারে বা কী ধরনের সুনির্দিষ্ট আচরণ শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষক প্রত্যাশা করতে পারেন, তা ‘বিবেচ্য বিষয়’ কলামে সংযোজন করা হয়েছে।
পরিবেশ পরিচিতি বিষয়ে ১ম-২য় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন মূল্যায়নের জন্য ২ ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো হলো:
ক) মৌখিক মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং
খ) পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি।
প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের বিষয়জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য মৌখিক পদ্ধতি এবং সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণ দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ যাচাইয়ের জন্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
৪. প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য একটি মৌখিক ও লিখিত মূল্যায়ন চেকলিস্ট তৈরি করুন।
প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ের মৌখিক মূল্যায়ন চেকলিস্ট:
১. আমাদের শ্রেণিকক্ষে কী কী আছে বল?
২. এগুলোর মধ্যে কোনগুলো মানুষের তৈরি বল?
৩. আমরা কীভাবে পরিবেশের শ্রেণিবিন্যাস করতে পারি?
৪. প্রাকৃতিক পরিবেশের ৫টি উপাদানের নাম বল।
৫. মানুষের তৈরি পরিবেশ কী?
প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ের লিখিত মূল্যায়ন চেকলিস্ট:
১. পরিবেশকে কীভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়?
২. প্রাকৃতিক ও মানুষের তৈরি পরিবেশের মধ্যে ৩টি পার্থক্য লেখ।
৩. নিচের কোনগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদন?
চেয়ার, নদী, বাড়ি, ডিম, মাটি, আসবাবপত্র, গাছ, নৌকা, পাহাড়, জামা, বিদ্যালয়, ফুল।
৫. মূল্যায়ন কী? প্রাথমিক স্তরে বিজ্ঞান বিষয়ে মূল্যায়নের গুরুত্ব বর্ণনা করুন।
মূল্যায়ন
মূল্যায়ন হলো এমন একটি কৌশল যার মাধ্যমে শিক্ষার সামগ্রীক উদ্দেশ্য বা শিখনফল অর্জনে শিক্ষার্থীরা কতটুকু এগিয়েছে তা নিরূপণ করা। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়াও বটে। মূল্যায়ন (Evaluation) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছুর মূল্য আরোপ করা। কোনো বিষয়ের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীরা কতটুকু আয়ত্ত করতে পেরেছে তা নিরূপণের জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, বিচার বিশ্লেষণ ও প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যায়ন বলে।
প্রাথমিক স্তরে বিজ্ঞান বিষয়ে মূল্যায়নের গুরুত্ব:
শিক্ষায় লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হল তা জানতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসক ও অভিভাবককে মূল্যায়ন সহায়তা করে থাকে। নিম্নে মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:
- বিজ্ঞান বিষয়ক প্রেষণা সৃষ্টি করা।
- বিজ্ঞান শিক্ষার লক্ষ্যকে ব্যাখ্যা ও সুস্পষ্টকরণে উত্তম মূল্যায়ন পদ্ধতির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
- বিজ্ঞান ভীতি দূর করার পাশাপাশি মূল্যায়নকে শিক্ষার্থীদের নিকট আনন্দদায়ক করে তোলা।
- শিক্ষার্থীর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়ন করা।
- প্রক্রিয়াকরণ দক্ষতা যাচাই কররে বৈজ্ঞানিক ধারণা পরিস্কারভাবে শিক্ষার্থীদের জানতে উদ্বুদ্ধ করা যায়।
- শিক্ষার্থীর শিখন দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার্থীর অর্জন ও অগ্রসরতা যাচাই করা।
- ফলাবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে।
