প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৬ পৃথিবী - Proshikkhon

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৬ পৃথিবী

অধ্যায়-০৬: আমাদের মহাবিশ্ব, আবহাওয়া এবং জলবায়ু

সেশন-৬.৩: আমাদের বাসভূমি পৃথিবী

ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:

৮) পৃথিবী পৃষ্ঠের গঠন বর্ণনা করুন। পৃথিবী পৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান ও সময় নির্ণয় করুন।

৯)  পৃথিবীর আহ্নিক গতি কাকে বলে?  আহ্নিক গতির ফলাফল সম্পর্কে লিখুন।

১০) পৃথিবীর বার্ষিক গতি কাকে বলে? বার্ষিক গতির ফলে পৃথিবীর কী হয়?

১১) “ লাটিমের মতো পৃথিবীর দুই ধরনের ঘূর্ণন রয়েছে” – এর পক্ষে আপনার যুক্তি লিখুন।

১২) পৃথিবীতে দিন-রাত কীভাবে সংঘটিত হয়,তা একটি পরীক্ষার সাহায্যে বর্ণনা করুন।

৮) পৃথিবী পৃষ্ঠের গঠন বর্ণনা করুন। পৃথিবী পৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান ও সময় নির্ণয় করুন।

পৃথিবী পৃষ্ঠের গঠনঃ

সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে একটি গ্রহ হচ্ছে পৃথিবী। পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গ্রহের গঠন বর্ণনা থেকে আমরা জানি গ্রহসমূহ সাধারণত গোলকাকৃতির। কিন্তু পৃথিবী পুরোপুরি গোলাকার নয়, কমলালেবুর মতো উত্তর-দক্ষিণ দিকে কিছুটা চাপা। পৃথিবীপৃষ্ঠের চারভাগের তিনভাগ তরল পানি দিয়ে আবৃত এবং একে ঘিরে রয়েছে গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল। পৃথিবী তার মধ্যাকর্ষণ বলের মাধ্যমে তার পৃষ্ঠের সব কিছুকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টেনে ধরে-এর ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠে অবস্থানকারী কোনো কিছুই পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে না।

পৃথিবী পৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান ও সময় নির্ণয়:

পৃথিবীর উপর অনেকগুলো রেখা কল্পনা করা হয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে ভূকেন্দ্রকে ছেদ করে সরাসরি উত্তর দক্ষিণে যে রেখা কল্পনা করা হয় তাকে অক্ষ বা মেরুরেখা বলে। অক্ষের উত্তর প্রান্তবিন্দুকে উত্তরমেরু বা সুমেরু ও দক্ষিণ প্রান্তবিন্দুকে দক্ষিণমেরু বা কুমেরু বলে। দুই মেরু থেকে সমান দূরে পৃথিবীর উপর পূর্ব পশ্চিমে যে রেখা কল্পনা করা হয় তাকে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বলে। এই রেখা পৃথিবীকে পূর্ব- পশ্চিমে পূর্ণবৃত্তরূপে বেষ্টন করে আছে। নিরক্ষরেখা পৃথিবীকে উত্তর-দক্ষিণে দুইটি সমানভাগে ভাগ করেছে। উত্তরভাগের নাম উত্তরগোলার্ধ এবং দক্ষিণভাগের নাম দক্ষিণ গোলার্ধ। নিরক্ষরেখার সমান্তরালে নিরক্ষরেখার উত্তরে ও দক্ষিণে অনেকগুলো রেখা কল্পনা করা হয়েছে এগুলোকে সমাক্ষরেখা বা অক্ষরেখা বলে। নিরক্ষরেখা হতে উত্তরে বা দক্ষিণে কোন স্থানের কৌণিক দূরত্বকে ঐ স্থানের অক্ষাংশ বলে। নিরক্ষরেখার অক্ষাংশ ০◦ । গড়ে এক  ডিগ্রী অক্ষাংশের রৈখিক ব্যবধান ১১১ কিলোমিটার।

বিষুবরেখা থেকে ২৩.৫◦ উত্তর অক্ষাংশকে কর্কটক্রান্তিরেখা ও ২৩.৫◦ দক্ষিণ অক্ষাংশকে মকরক্রান্তিরেখা বলে। আবার বিষুবরেখা থেকে ৬৬.৫◦ উত্তর এবং ৬৬.৫◦ দক্ষিণ সমাক্ষরেখাদ্বয়কে যথাক্রমে সুমেরুবৃত্ত এবং কুমেরুবৃত্ত বলা হয়। সমাক্ষরেখা থেকে পূর্ব বা পশ্চিমে কোন স্থানের অবস্থান জানার জন্য পৃথিবীর দুই মেরুকে সংযুক্ত করে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত অনেকগুলো রেখা কল্পনা করা হয়েছে এগুলোকে দ্রাঘিমারেখা বা মধ্যরেখা বলে। মধ্যরেখাগুলো একে অন্যের সমান কিন্তু সমান্তরাল নয়। লন্ডনের উপকণ্ঠে গ্রীনিচ শহরে জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত মানমন্দিরের উপর দিয়ে যে মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে তাকে মূলমধ্যরেখা বলা হয়। মূলমধ্যরেখার মান ০◦। এই মূলমধ্যরেখা হতে পূর্ব বা পশ্চিমে কোন স্থানের কৌণিক দূরত্বকে সে স্থানের দ্রাঘিমা বলা হয়। আমরা জানি, পৃথিবী ৩৬০◦ ঘোরে ২৪ ঘণ্টায়। সুতরাং পৃথিবী প্রতি ঘণ্টায় ১৫◦ ও প্রতি ৪ মিনিটে ১◦ পথ অতিক্রম করে। এভাবে,পৃথিবীপৃষ্ঠে কোন স্থানের অবস্থান ও সময় নির্ণয় করা যায়।

৯)  পৃথিবীর আহ্নিক গতি কাকে বলে?  আহ্নিক গতির ফলাফল সম্পর্কে লিখুন।

পৃথিবীর আহ্নিক গতি:

পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে নিজ অক্ষে ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড বা ২৪ ঘণ্টা সময়ে অনবরত পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে। এই সময়কে সৌরদিন এবং আবর্তনকে আহ্নিক গতি বা দৈনিক গতি বলা হয়। আহ্নিক গতির মূল কারণ হলো- পৃথিবীর আবর্তন এবং পৃথিবীর আকৃতি। পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার হলেও উভয় মেরুতে কিছুটা চাপা ও নিরক্ষরেখা বরাবর কিছুটা স্ফীত। নিরক্ষরেখা বরাবর পৃথিবীর ব্যাস সর্বাপেক্ষা অধিক হওয়ায় এই অঞ্চলে আহ্নিক গতির বেগও সর্বাপেক্ষা অধিক। এই গতিবেগ ক্রমশ কমতে কমতে দুই মেরুর নিকটবর্তী স্থানে প্রায় স্তিমিত হয়ে যায়।

আহ্নিক গতির ফলাফল:

  • দিন-রাত্রি সংঘটনঃ পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে নিজ অক্ষে পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তনের জন্য আহ্নিক গতি বা দিবা-রাত্রি সংঘটিত হয়। আবর্তনরত পৃথিবীর যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে সি অংশ আলোকিত হয় অর্থাৎ সেই অংশে দিন এবং অপর অংশে অন্ধকারাচ্ছন্ন বা রাত থাকে।
  • জোয়ার-ভাটাঃ নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আহ্নিক গতির জন্য সমুদ্রে প্রতিদিন দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা হয়।
  • বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টিঃ আহ্নিক গতির কারণে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।

১০) পৃথিবীর বার্ষিক গতি কাকে বলে? বার্ষিক গতির ফলে পৃথিবীর কী হয়?

পৃথিবী নিজ অক্ষের চারদিকে ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তন করার পাশাপাশি পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ও নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড একবার আবর্তন করে। পৃথিবীর এইরূপ আবর্তনকে বার্ষিক গতি বলে।

বার্ষিক গতির ফলাফল: বার্ষিক গতির ফলে পৃথিবীতে দিন-রাতের হ্রাস বৃদ্ধি এবং ঋতু পরিবর্তন হয়।

১১) “ লাটিমের মতো পৃথিবীর দুই ধরনের ঘূর্ণন রয়েছে” – এর পক্ষে আপনার যুক্তি লিখুন।

সকালে সূর্য পূর্ব দিকে উঠে,সন্ধ্যা বেলায় পশ্চিম দিগন্তে ডুবে যায়। পরদিন সকালে সূর্য আবার পূর্বদিক থেকে উঠছে। এ থেকে মনে হয় সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরছে। আগের দিনে মানুষরা তাই ধারণা করতো যে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে এবং পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপরও আবর্তন করে বা পাক খায়। এখন প্রশ্ন হলো লাটিম কীভাবে ঘোরে? লাটিমের সরু আলের উপর দাঁড়িয়ে নিজে নিজে ঘোরে। একই সাথে মাটির উপর বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে এক স্থান থেকে অন্য স্থান হয়ে ঘুরে আসে। এভাবে লাটিমটির দু’ধরনের গতি রয়েছে। একটি হলো নিজ অক্ষের উপর আবর্তন করে। আরেকটি হলো মাটির উপর দিয়ে ঘুরে আসা। লাটিমের মতো পৃথিবীর দুই ধরনের ঘূর্ণন রয়েছে। একটি হলো সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী নিজ অক্ষে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করে, এটি পৃথিবীর আহ্নিক গতি। দ্বিতীয়টি হলো পৃথিবী নিজ অক্ষে অবিরাম ঘুরতে ঘুরতে একটি নির্দিষ্ট উপ-বৃত্তাকার কক্ষপথে, নির্দিষ্ট দিকে এবং নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারদিকে পরিক্রমণ করছে, এটি পৃথিবীর বার্ষিক গতি। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে পৃথিবী ও লাটিমের ঘূর্ণন প্রক্রিয়া একই রকম। সুতরাং “লাটিমের মতো পৃথিবীর দুই ধরনের ঘূর্ণন রয়েছে”- কথাটি যুক্তিযুক্ত।

১২) পৃথিবীতে দিন-রাত কীভাবে সংঘটিত হয়,তা একটি পরীক্ষার সাহায্যে বর্ণনা করুন।

আহ্নিক গতির কারণে পৃথিবীতে দিন-রাত সংঘটির হয়। এ গতির ফলে পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের সামনে থাকে সে অংশে আলোকিত বা দিন হয় এবং অন্যান্য অংশ অন্ধকার থাকে বা রাত হয়। পৃথিবীতে কীভাবে দিন-রাত সংঘটিত হচ্ছে তা নিম্নের পরীক্ষার মাধ্যমে দেখানো হলো-

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ

  • একটি গ্লোব,
  • একটি মোমবাতি/টর্চ/ কুপিবাত,
  • অন্ধকার কক্ষ।

পরীক্ষাঃ

প্রথমে গ্লোবটিকে ভালোভাবে লক্ষ করি। এর মাঝ বরাবর একটি শলাকা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেছে। এটিকে পৃথিবীর অক্ষরেখা হিসেবে কল্পনা করি, যাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী আবর্তন করে। একটি টেবিল বা সমতল মেঝের উপর বাতিটি জ্বালিয়ে রাখব। এবার একটু দূরে ভূ-গোলকটিকে রাখি। কক্ষটির আলো নিভিয়ে দিই বা দরজা-জালানা বন্ধ করে ঘরটি অন্ধকার করি। বাটিকে সূর্য এবং ভূ-গোলকটিকে পৃথিবী হিসেবে বিবেচনা করি। এবার ভূ-গোলকটির দিকে তাকাই। লক্ষ করি নিশ্চয়ি ভূ-গোলকটির অর্ধেক অংশ আলোকিত আত অন্য অর্ধেক অন্ধকারাচ্ছন্ন। এবার ভূ-গোলকটি আস্তে আস্তে ঘোরাই । দেখা যাচ্ছে অন্ধকার অংশে আস্তে আস্তে আলোকিত হচ্ছে এবং আলোকিত অংশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হচ্ছে। কিন্তু সবসময় ভূ-গোলকটির অর্ধেক অংশ আলো পাচ্ছে এবং বাকি অর্ধেক অংশ আলো পাচ্ছে না। এভাবে পৃথিবীর এক অর্ধেকাংশে দিন এবং বাকি অর্ধেক অংশে রাত চলতে থাকে।

ভূ-গোলকটির একটি নির্দিষ্ট স্থান বাতিটির সামনে রাখে ধীরে ধীরে একদিকে ঘোরাতে থাকলে ঐ আলোকিত সংশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে হতে একসময় পুরোপুরি অন্ধকার (রাত) হয়ে যাবে। একই দিকে আরো ঘোরাতে থাকলে আবার ঐ নির্দিষ্ট স্থানটি আলোকিত হতে শুরু করে এবং একসময় পুরোপুরি আলোকিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ঐ স্থানে আবার দিন ফিরে আসে।

এ পরীক্ষাটিতে যেভাবে দেখা গেল সেভাবে পৃথিবী তার নিজ অক্ষে আবর্তন করে, ফলে আমরা দিন,তারপর রাত ; আবার দিন, আবার রাত; আবার দিন এ রকম পরিবর্তন হতে দেখি। সুতরাং পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে দিন-রাত পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ এভাবেই পৃথিবীতে দিন-রাত সংঘটিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!