অধ্যায়-০৩: যান্ত্রিক উপলব্ধি ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধি
পাঠ-৩.১: যান্ত্রিক উপলব্ধি ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধি
১. যান্ত্রিক উপলব্ধি ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধি উদাহরনসহ ব্যাখ্যা করুন।
২. যান্ত্রিক ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধির পাথর্ক্য লিখুন।
৩. সম্পর্কমূলক উপলব্ধির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করুন।
৪. যান্ত্রিক উপলব্ধির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করুন।
৫. যান্ত্রিক উপলব্ধি ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করুন।
৬. গানিতিক সমস্যা সমাধানে যান্ত্রিক অথবা সম্পর্কমূলক উপলব্ধি কোনটি প্রয়োগে শিক্ষার্থী সঠিক জ্ঞান লাভ করে ব্যাখ্যা করুন।
যান্ত্রিক উপলব্ধি ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধি কী?
যান্ত্রিক উপলব্ধি:
যান্ত্রিক উপলব্দি এমন এক ধরণের শিখন যেখানে শিক্ষার্থীরা মূখস্থ করে সূত্র বা কার্যনীতি (working principle) ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান বের করে থাকে। এখানে শিক্ষার্থী সূত্র কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে পারে না। যেমন- শিক্ষার্থীরা ভগ্নাংশ ও দশমিক ভগ্নাংশের গুণ ও ভাগ করতে পারলেও তা সূত্র মূখস্থ করে সমাধান করে, ফলে তারা ভগ্নাংশের গুণ ও ভাগের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে না।
সম্পর্কমূলক উপলব্ধি:
সম্পর্কমূলক উপলব্ধি এমন এক ধরণের শিখন যেখানে শিক্ষার্থরা গণিতের সূত্র বা নিয়ম ব্যবহার না করে পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সমস্যা সমাধান বা সূত্রে উপনীত হতে সচেষ্ট হয়। যেমন- যান্ত্রিক উপলব্ধিতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ নিয়মে ভগ্নাংশের ভাগ করতে গিয়ে ভাজককে উল্টিয়ে এবং পরে গুণ করে ভাগ করতে হয়। তারা জানে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না এটা কেন এবং কীভাবে হয়। অপরদিকে সম্পর্কমূলক উপলব্দি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই ছোট ছোট বর্গ গণনা করে খুব সঠিক এবং সম্পর্কমূলক উপলব্ধির মাধ্যমে আয়তাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে পারে।
যান্ত্রিক ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধির পাথর্ক্য লিখুন।
যান্ত্রিক ও সম্পর্কমূলক উপলব্ধির পাথর্ক্য:
| যান্ত্রিক উপলব্ধি | সম্পর্কমূলক উপলব্ধি |
| ১. গুণের নামতা টেবিল মুখস্থ বলতে পারে এবং টেবিল ব্যবহার করে গুণ অঙ্ক করতে পারে। | ১. গুণের ভেতর সংখ্যাদ্বয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখে এবং পরে গুণ করে, গুণের নামতা ব্যবহার করে। |
| ২. সমতল আকার-আকৃতি চিহ্নিত করে ক্ষেত্রফল নিণর্য় করে। | ২. সমতল আকার-আকৃতির মধ্যে সম্পর্ক খজুঁতে বিভিন্ন দিক থেকে সহায়তা নেয়। |
| ৩. ভগ্নাংশ ও দশমিক ভগ্নাংশের গুণ ও ভাগ করতে পারে। | ৩. ভগ্নাংশের গুণ ও ভাগের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। |
| ৪. ঐকিক নিয়মের সমস্যা সমাধান করতে পারে। | ৪. সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমানপুাতিক সম্পর্ক সংখ্যার সাথে খুঁজে বের করে। |
| ৫. আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে দৈর্ঘ্য প্রস্থ নির্ণয় করে সমস্যা সমাধান করতে পারে। | ৫. তাছাড়া ছোট ছোট ক্ষেত্রফলের সমষ্টি নির্ণয় করে বড় ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করে। |
| ৬. নিয়ম সংক্ষিপ্ত বলে সময় কম লাগে। | ৬. নিয়মের ধারাবাহিকতা বেশি থাকে বলে সময় বেশি লাগে। |
| ৭. একই সঙ্গে অনেককে জিজ্ঞাসা করা যায়। | ৭. একই সঙ্গে অনেককে জিজ্ঞাসা করা যায় না। |
| ৮. কেবলমাত্র মূখস্থ করতে হয়। যন্ত্রের মতো ব্যবহার করা হয়। | ৮. সমস্যা এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া বুঝতে হয়। সমস্যা সমাধানে তৃপ্তি ও আনন্দ পাওয়া যায়। |
সম্পর্কমূলক উপলব্ধির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করুন।
সম্পর্কমূলক উপলব্ধির সুবিধা:
- শিখনফল স্থায়ী হয়।
- শিক্ষার্থীরা গণিতের বিষয়বস্তুর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে।
- পাঠের প্রতি মনোযোগ ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
- পূর্বের অর্জিত জ্ঞান থেকে সূত্র খুঁজতে সহায়তা করে।
- শিক্ষার্থীদের শিখনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
- নতুন ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে শেখা খুব সহজ।
- মুখস্থ নির্ভরতা কমে।
- সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তা বাড়ে।
সম্পর্কমূলক উপলব্ধির অসুবিধা:
- নতুন কোন কাজ শুরু করতে অধিক প্রস্তুতি ও সময় ব্যয় হয়,
- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষাক্রম/সিলেবাস শেষ করা যায় না,
- আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে গণিতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকট থাকায় সকল বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা যায় না।
- নানা ধরণের উপকরণ ও সামগ্রী দরকার হয় যা আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোতে নিশ্চিত করা যায় না।
- প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একে একে মূল্যায়ন করতে হয়, একসাথে অনেক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করা যায় না।
যান্ত্রিক উপলব্ধির সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করুন।
যান্ত্রিক উপলব্ধির সুবিধা:
- দেশীয় প্রেক্ষাপটে গণিতের অনেক বিষয়বস্তু বুঝতে অনেক সহজ। যেমন- কোন দুইটি ভগাংশের ভাগ যান্ত্রিক উপলব্ধিতে শেখানো খুব সহজ।
- শিক্ষার্থীরা সঠিক উত্তর খুব দ্রুত খুঁজে পায়।
- এতে মুখস্থ করানো খুব সহজ।
- এতে নতুন কাজে খাপ খাওয়ানো খুব সহজ।
- শিক্ষাক্রম বোঝানোর সময় বিদ্যালয়ের যথেষ্ট সময় থাকে না, তাই এটি প্রয়োগযোগ্য।
- যান্ত্রিক উপলব্ধির জন্য শিখনের সময় কম লাগে, এবং সম্পূর্ণ না বুঝে শিক্ষার্থী কম সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তরদানে সক্ষম হয়।
যান্ত্রিক উপলব্ধির অসুবিধা:
- মুখস্থ নির্ভরতা বাড়ে।
- শিখনফল স্থায়ী হয় না।
- শিক্ষার্থীরা গণিতের বিষয়বস্তুর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না।
- আনন্দ ও সৃজনশীলতা না থাকায় একঘেয়েমী লাগে ফলে গণিতের প্রতি ভীতি তৈরি হয়।
- নতুন ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায় না।
- যান্ত্রিক উপলব্ধির জন্য শিখনের সময় কম লাগলেও শিক্ষার্থীরা না বুঝে প্রশ্নের উত্তরদানে সক্ষম হয়।
গানিতিক সমস্যা সমাধানে যান্ত্রিক অথবা সম্পর্কমূলক উপলব্ধি কোনটি প্রয়োগে শিক্ষার্থী সঠিক জ্ঞান লাভ করে ব্যাখ্যা করুন।
গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সম্পর্কযুক্ত উপলব্ধি ও যান্ত্রিক উপলব্ধি- দুইটি অ্যাপ্রোচেরই এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে যে কোনো বিষয় সম্পর্কে শিক্ষক হিসেবে নতুন ধারণা দিতে গেলে প্রথমে সম্পর্কযুক্ত উপলব্ধির ব্যবহারই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যান্ত্রিক উপলব্দির প্রয়োগ করতে শিক্ষকরা বেশী আগ্রহ দেখান কারণ এতে কম সময়ে অধিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়। তাছাড়া শিক্ষাক্রমে নির্ধারিত সিলেবাস নির্ধারিত সময়ে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকে। তবে আমার মতে যে কোন নতুন ধ্যান-ধারণার সাথে শিক্ষার্থীকে গণিতের বিষয়বস্তুর গভীরতা বুঝাতে সম্পর্কমূলক উপলব্ধির প্রয়োগ করা বেশি প্রয়োজন। কেননা নতুনভাবে গাণিতিক কোনো ধারণা প্রদান করতে হলে সম্পর্কমূলক উপলব্ধি প্রয়োগ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ঐ বিষয়ে ধারণা প্রদান করা সহজ হয়। এতে গণিতের প্রতি শিক্ষার্থীর আকর্ষণ বাড়ে এবং সৃজনশীলতা তৈরি হয়। এর থেকে শিক্ষারর্থী নিয়ম/ সূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে এবং পরবর্তীতে যে কোনো পরিস্থিতিতে/পরিপ্রেক্ষিতে এ সকল সূত্র ব্যবহার করতে পারবে। সম্পর্কমূলক উপলব্ধির ব্যবহারে শিক্ষার্থী বাস্তব পরিবেশের কনটেক্স ও কনসেপ্ট সমন্বয়ের মাধ্যমে বুঝে শুনে গাণিতিক সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হতে হয় বলে একটু সময় বেশি লাগাটাই স্বাভাবিক।
পরিশেষে বলা যায় যে, একজন গণিত শিক্ষক গাণিতিক সমস্যা সমাধানে কোন কনটেক্সে কী কী কনসেপ্ট ব্যবহার করে কোন প্রক্রিয়ায় সমস্যাটি সমাধান করবেন তা বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সম্পর্কমূলক উপলব্ধিতে একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও পারদর্শীতা বৃদ্ধি করা গেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যান্ত্রিকভাবে সূত্র ব্যবহার করেও শিক্ষার্থীরা গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হবে।
৩য় অধ্যায়ের MCQ ও এর সমাধান:
