অধ্যায়-০২: পরিবেশের উপাদান ও পরিবেশ সংরক্ষণ
সেশন-২.১: পরিবেশের উপাদান, পরিবেশ পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ
ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:
- পরিবেশের অংশসমূহ বা উপাদানগুলোর নাম লিখুন।
- উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনধারায় পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করুন।
- পরিবেশ সংরক্ষণ বলতে কী বুঝায়?
- পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা আলোচনা করুন।
পরিবেশের অংশসমূহ বা উপাদানগুলোর নাম লিখুন।
চারপাশের ভৌত অবস্থা, জলবায়ু ও প্রভাব বিস্তারকারী অন্যান্য জীব ও জৈব উপাদান ইত্যাদির সামষ্টিক রূপই হলো পরিবেশ। পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের দ্বারাই একজন ব্যক্তি বা প্রাণী এমনকি উদ্ভিদ প্রভাবিত হয়ে থাকে। এই প্রভাবকসমূহের মধ্যে থাকে প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পারিপার্শ্বিক উপাদানসমূহ। পরিবেশের অংশসমূহ বা উপাদানগুলোর নাম নিম্নরূপঃ
- বায়ুমণ্ডল (Atmosphere)
- বারিমণ্ডল (Hydrosphere)
- শিলামণ্ডল (Lithosphere)
- জীবমণ্ডল (Biosphere)
- মানবমণ্ডল (Anthrosphere)
উপরিউক্ত অংশগুলোর মধ্যে জীবমণ্ডল ও মানবমণ্ডল বাকি তিনটি অংশের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। আবার মানুষ তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দ্বারা বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও শিলামণ্ডলকে প্রভাবিত করে।
উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনধারায় পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করুন।
পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী বসবাস করে। এসকল উদ্ভিদ ও প্রাণী নানা কারণে পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনধারায় ব্যাপক বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সেগুলো হলো:
- ঝড়, বন্যা এবং করার মতো প্রাকৃতিক কারণে এবং মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের জন্য পরিবেশের ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে।
- পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
- এর ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণী বিপন্ন বা বিলুপ্ত হচ্ছে।
- পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সবচেয়ে বড় উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে লাল শির ও জাভা গন্ডার এবং রাজ শকুন বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে তালি পাম গাছ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায় বিপন্ন।
পরিবেশ সংরক্ষণ বলতে কী বুঝায়?
পরিবেশে বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য উপাদান একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল। পরিবেশের কোনো একটি জড় বা জীব উপাদান যদি বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় তাহলে পরিবেশের অন্য উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখা খুব জরুরি। পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষাই হলো পরিবেশ সংরক্ষণ। পরিবেশের ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই সংরক্ষিত হয়ে থাকে। তবে প্রধানত মানুষের নানান কর্মকাণ্ডই পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে থাকে। পৃথিবীতে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জীবনযাপন করতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা দরকার।
পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা আলোচনা করুন।
পৃথিবীতে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক। পরিবেশ সংরক্ষণের মূলনীতি হলো পরিবেশের উপাদানগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখা। পরিবেশ সংরক্ষণে নিম্নের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।
জীব উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা:
কোন জীবই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। প্রতিটি জীবই কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। যেমন- সাপ আমাদের কাছে বিষধর,ভয়ংকর কিন্তু সাপ ইঁদুর মেরে ফসল রক্ষা করে। মানুষ না জেনে অনেক জীবকে মেরে ফেলছে। অনেক জীবই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের খেয়াল করতে হবে কোনো জীবই যাতে বিলুপ্ত হয়ে না যায়।
জড় উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা:
আমরা আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিবেশকে নানাভাবে ব্যবহার করে থাকি। বিনা পরিকল্পনায় বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে পরিবেশের কোনো উপাদানকে কমিয়ে ফেলি বা বাড়িয়ে ফেলি,পরিবেশে নতুন উপাদান যোগ করি। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বিগত কয়েক শতাব্দীতে মানুষ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কীটনাশক, রাসায়নিক সার ইত্যাদি ব্যবহার করেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত বর্জ্য, ধোঁয়া এবং কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক পরিবেশে যোগ হয়েছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। জড় উপাদানের ভারসাম্য রক্ষায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি-
- কলকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করে তারপর পরিবেশে নির্গত করতে হবে
- গৃহস্থালি বর্জ্য পদার্থ নির্দিষ্ট জায়গাতে ফেলতে হবে এবং তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে ( যেমন- বর্জ্যকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কম্পোস্ট সারে পরিণত করা যায়)।
- কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও আগাছানাশক ওষুধের ব্যবহার কমিয়ে সমন্বিত বালাইদমন ব্যবস্থা নিতে হবে।
- জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
- স্বাভাবিকভাবে পচে না এমন দ্রব্যের (যেমন পলিথিন) পরিবর্তে পচনশীল দ্রব্য যেমন পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
- অপরিকল্পিত বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং বেশি করে গাছ লাগিয়ে বন সৃষ্টি করতে হবে।
- পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্বন্ধে জনসাধারণকে অবহিত করার মাধ্যমে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
