বাংলা (এসকে) Archives - Proshikkhon

Category "বাংলা (এসকে)"

28Sep2020

পাঠ-৯.০: বাংলা ভাষার উপাদান ধ্বনি, শব্দ, ও বাক্য

১. ধ্বনি উচ্চারণের বিভিন্ন  প্রত্যঙ্গগুলোর নাম লিখুন।

ধ্বনি  উচ্চারণের জন্য বাগযন্ত্রের যেসব প্রত্যঙ্গগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলোর নাম নিচে দেওয়া হলো:

১. ঠোঁট (ওষ্ঠ ও অধর)

২. দাঁতের পাটি।

৩. দন্তমূল, অগ্রদন্তমূল।

৪. অগ্র তালু,অগ্র দন্তমূল।

৫. পশ্চাৎ তালু,নরম তালু,মূর্ধন্য।

৬. আলজিভ।

৭. জিহ্বাগ্র।

৮. সম্মুখ জিহ্বা।

৯. পশ্চাৎ জিহ্বা বা জিহ্বামূল।

১০. নাসা-গহ্বর।

১১. স্বর-পল্লভ, স্বরতন্ত্রী।

১২. ফুসফুস।

২. শব্দ কাকে বলে? গঠন অনুযায়ী  শব্দের শ্রেণিবিভাগ করুন।

ধ্বনি যেমন ভাষার ক্ষুদ্রতম একক তেমনি শব্দ বাক্যের ক্ষুদ্রতম একক। অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে আমরা শব্দ বলি। তুমি,আমি,ফুল,পাখি এসবগুলোই শব্দ। আবার যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির অর্থ নেই তাকে আমরা শব্দ বলতে পারিনা। নতুন নতুন শব্দ ভান্ডারই ভাষার সম্পদ।গঠন অনুসারে বাংলা শব্দকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ

১. মৌলিক শব্দ

২. সাধিত শব্দ

মৌলিক শব্দঃ

যেসব শব্দকে ভাঙা বা বিশ্লেষণ করা যায় না সেগুলোকে মৌলিক শব্দ বলে। মৌলিক শব্দ ভাঙতে চাইলেও তার ভগ্ন বা বিশ্লিষ্ট অংশের  কোন অর্থ হয়না। যেমনঃ ঘোড়া, ফুল, মা ইত্যাদি। এ শব্দগুলোকে ভাঙলে ভাঙা অংশের কোন অর্থ হয়না।

সাধিত শব্দঃ

যে সকল শব্দকে ভাঙা যায় এবং ভাঙা অংশেরও অর্থ থাকে তাকে সাধিত শব্দ বলে।মৌলিক শব্দ থেকেই সাধারণত সাধিত শব্দ গঠন করা হয়।।একাধিক শব্দের সমাস হয়ে কিংবা প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগ হয়ে সাধিত শব্দ গঠিত হয়। যেমনঃ বিদ্যালয় (বিদ্যা+আলয়),দম্পতি (জায়া ও পতি)।সাধিত শব্দ সাধারণত চারটি উপায়ে গঠিত হয়। যেমন-

১. সন্ধির সাহায্যে

২. সমাসের সাহায্যে

৩. উপসর্গ যোগে

৪. প্রত্যয় যোগে।

৩. বাক্য কাকে বলে? একটি সার্থক বাক্যের কয়টি লক্ষণ/বৈশিষ্ট্য/গুণ রয়েছে? উদাহরণসহ বর্ণনা করুন।।

পর পর একাধিক শব্দ বা পদ মিলে যদি কোন অর্থপূণ মনোভাব প্রকাশিত হয় তাহলে তাকে বাক্য বলে।তবে শব্দ বা পদগুলো যথেচ্ছা মিলিত হলেই বাক্য হয় না,তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে হয়।

একটি সার্থক বাংলা বাক্যের তিনটি গুণ। যথাঃ

১. আকাঙ্ক্ষা

২. আসত্তি

৩. যোগ্যতা।

১. আকাঙ্ক্ষাঃ

কোন একটি বাক্য শুরু করার পর শ্রোতার পুরো বাক্যটি শোনার ইচ্ছা জাগে।যদি বলা হয় আজ সারাদিন ধরে…….। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় আজ সারাদিন ধরে কি? রোদ? বৃষ্টি?  নাকি তার অপেক্ষা করে আছি? অর্থাৎ বাক্যের যে গুণ বা বৈশিষ্ট্য আগ্রহকে পরিতৃপ্ত করে তাকে আকাঙ্ক্ষা বলে।

২. আসত্তিঃ

আসত্তি মানে হলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ততা বা নৈকট্য। একটি বাক্যে শব্দ বা পদ যথাযথভাবে না  সাজালে মনোভাব সঠিকভাবে প্রকাশ পায় না। তাকে সম্পর্কক্রমে সাজাতে হয়।বাক্যের সুশৃঙ্খল ক্রমসজ্জাকে আসত্তি বলা হয়। যেমনঃকাল সারারাত ছিল স্বপনের রাত-গানের কলিটি যদি লিখি রাত স্বপনের সারা কাল ছিল রাত তাহলে গানের কলি হওয়াতো দূরের কথা,বাক্যই হয় না।

৩. যোগ্যতাঃ

বাক্যের শব্দসজ্জা ও সম্পূর্ণতা সবই ঠিক আছে,কিন্তু অর্থটি ঠিক না থাকলে বাক্য সার্থক হয়না।যেমনঃজল দিয়ে আগুন জ্বালাই।বাক্যটি ব্যাকরণগতভাবে সঠিক হলেও যৌক্তিকতা প্রতিফলিত করছে না। অর্থাৎ বাক্যের অন্তর্গত ও ভাবগত মেলবন্ধনকে যোগ্যতা বলে।

৪.বাংলা ভাষার ধ্বনির বৈশিষ্ট্যসমূহ কি কি?

বাংলা ভাষার ধ্বনির বৈশিষ্ট্যসমূহ হলোঃ

ক. ধ্বনিগুলো অর্থপূর্ণ আওয়াজ।

খ. ধ্বনিগুলো শব্দের ক্ষুদ্রতম একক।

গ. ধ্বনি হলো ভাষার মূল উপাদান।

ঘ. ধ্বনি অবিভাজ্য। একে বিভাজন করা যায় না।

ঙ. বাংলা ভাষার ধ্বনিসমূহ বৈজ্ঞানিকভাবে সুবিন্যস্ত।

চ. ধ্বনিগুলো স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনি নামে পরিচিত।

৫.গঠন অনুসারে বাক্য কয় প্রকার ও কি কি?

গঠন অনুসারে বাক্য তিন প্রকার। যেমনঃ

১. সরল বাক্যঃ যে বাক্যে একটি মাত্র কর্তা এবং একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে,তাকে সরল বাক্য বলে। যথাঃ সাজ্জাদ বই পড়ে। এখানে সাজ্জাদ কর্তা এবং পড়ে সমাপিকা ক্রিয়া।

২. জটিল বাক্যঃ যে বাক্যে উদ্দেশ্য ও বিধেয় যুক্ত মূখ্য অংশ ব্যতীত, এক বা একাধিক অপ্রধান খন্ডবাক্য বা বাক্যাংশ থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে।যেমনঃ যে পরিশ্রম করে সেই সুখ লাভ করে। এখানে যে পরিশ্রম করে নিভরশীল বাক্য এবং সেই সুখ লাভ করে প্রধান খন্ড বাক্য।

৩. যৌগিক বাক্যঃ দুই বা ততোধিক সরল ও জটিল বাক্য সংযোজক  অব্যয় দ্বারা সংযুক্ত  হয়ে একটি পূর্ণ বাক্যগঠন করলে তাকে যৌগিক বাক্য বলে। যেমনঃ লোকটি ধনী, কিন্তু অসুখী।

28Sep2020

সেশন- ৮.০: নাটকের স্বরূপ, শ্রেণীবিভাগ, উৎপত্তি ও বিকাশ, অবয়ব ও উপাদান

১) নাটক কী? নাটকের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করুন।

নাটক:

দৃশ্যকাব্য ও শ্রাব্য কাব্যের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপিত গতিমান জীবনের প্রতিচ্ছবি হচ্ছে নাটক। নাটক হচ্ছে দেখা ও শোনা এই দুই গুন বিশিষ্ট কাব্য। অর্থাৎ নাটক প্রধানত দৃশ্য এবং সকল প্রকার কাব্যের শ্রেষ্ঠ কাব্য। নাটককে কাব্য শাখার শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নাটকের সামান্য লক্ষণ হচ্ছে, লোকবৃত্তানুকরণ,আর বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে অভিনয়যোগ্যতা। অর্থাৎ নাটক হচ্ছে দৃশ্য ও শ্রবন গুণবিশিষ্ট কাব্য। এ কারণে রঙ্গমঞ্চই নাটকের বিকাশ ও স্ফূর্তির স্থান।

অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র দাশ তাই সঙ্গত কারণে বলেছেন, “আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি অভিনেতা ও অভিনেত্রীর মাধ্যমে রঙ্গমঞ্চে সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভাবে উপস্থাপন করাই নাটক।”

সুতরাং নাটক হচ্ছে- ‘Creation and representation of life in the form of theater.’

নাটকের শ্রেণীবিভাগ:

নাটক প্রধানত ২ধরনের হয়ে থাকে। যথা:

১. ট্রাজেডি বা বিয়োগাত্মক নাটক এবং

২. কমেডি বা ব্যঙ্গাত্মক নাটক।

মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকে জীবনের দুঃখময় উপলব্ধি এবং করুণ রসের প্রকাশ হয়। আর কমেডি নাটকের জীবনের আনন্দ, মিলনাত্মক ভাব ও হাস্যরসের প্রকাশ হয়।

নাটকের মধ্যে অভিজাত শ্রেণীতে পড়ে ট্রাজেডি। কমেডিকে কল্পনাত্বক ভাবপ্রবণ, বাস্তব, অদ্ভুতাত্বক বিদ্রুপাত্মক, সামাজিক ও ভাবপ্রধান এমন ভাবে শ্রেণীকরণ করা যায়।

এছাড়াও নাটকের বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। যেমন-

> সামাজিক নাটক,

> বিদ্রূপাত্মক নাটক,

> বাস্তব নাটক,

> ভাবপ্রবণ নাটক, ইত্যাদি।

সামাজিক নাটক সমাজ জীবনের নানান জটিলতা পারিবারিক জীবনে আদর্শহীনতা, মানবিকতাবোধ, শ্রেণীভিত্তিক চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে রচিত হয়।(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চার অধ্যায়, রাজা, মুক্তধারা ইত্যাদি)।

তাছাড়া রাজনৈতিক নাটক, লৌকিক নাটক, পৌরাণিক নাটক (এ নাটকের বিষয়বস্তু বা প্রাচীন ধর্ম মূলক কাহিনী অবলম্বনে লিখিত। যেমন- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সীতা) ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

২) নাটককে কেন জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা হয়েছে?

নাট্যকারের নাটক রচনায় পূর্বে তার ভেতর একটি থিম কাজ করে, তিনি সমাজের কোন ঘটনাকে রূপদান করবেন।তার লেখনীর মাধ্যমে যেমন সমাজের ইতিবাচক নানা ঘটনা প্রবাহ উঠে আসে ঠিক তেমনি সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন।চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে সমাজের নানা চিত্র নাট্যকার তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নাট্যরূপ প্রদান করেন।

দর্শকগণ নাট্যকারের  থিমের মধ্য থেকে তাদের জীবন বোধ ও জীবন যাপনের হর্ষ-বিষাদ খুঁজে পান।এজন্য নাটককে জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা হয়ে থাকে।

৩) ট্রাজেডি নাটক ও কমেডি নাটকের মধ্যে পার্থক্য কী?

ট্রাজেডি:

১. ট্রাজেডি নাটক এ ব্যক্তিবিশেষের হৃদয় ক্ষরণের হতাশা বা শোক উৎসারিত হয়।

২. ট্রাজেডি নাটক সাধারণত বীর ও করুন রসের হয়ে থাকে।

৩. ট্রাজেডি নাটক অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে পড়ে।

৪. ট্রাজেডি গ্রিক ও শেক্সপিরীয় হয়ে থাকে।

কমেডি:

১. কমেডি নাটক বৃহত্তর সমাজের একটি বা দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজের অসংলগ্নতা তুলে ধরা হয়।

২. কমেডি নাটক সাধারণত হাস্যরসের হয়ে থাকে।

৩. কমেডি নাটক মধ্যম স্তরের সৃষ্টি।

৪. কমেডি কল্পনাপ্রবণ, ভাবপ্রবণ, বাস্তব, বিদ্রুপাত্মক হয়ে থাকে।

পাঠ-৮.১: কবর: মুনীর চৌধুরী

১) ‘কবর’ প্রতিপাদ্য বিষয় কী? আলোচনা করুন।

অথবা, ‘কবর’ নাটকের পটভূমি বিশ্লেষণ করুন।

অথবা, ‘কবর’ নাটকের মূলভাব লিখুন।

‘কবর’ নাটকটির মূলভাব:

কবর নাটকের পটভূমিতে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। দেশ বিভাগের পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের ওপর শাসন-শোষণ আর বঞ্চনার নগ্ন অত্যাচার শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আঘাত হানে বাঙালি জাতির মর্মমূলে।

সুদুরপ্রসারী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে দম্ভভরে তিনি ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নহে। ঐতিহ্য প্রিয় বাঙালি জাতি অযৌক্তিক এ ঘোষণার বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রত্যয়দীপ্ত জনতার মিছিল বের হয় রাজপথে, শুরু হয় চূড়ান্ত আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। এ গুলিতে নিহত হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র-জনতা। এ বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতা যাতে লাশ নিয়ে মিছিল করতে না পারে সে জন্য সারা শহরে জারি করা হয় কারফিউ। কিন্তু এত কিছু করেও শাসকগোষ্ঠী উদ্বেগহীন হতে পারে নি।নেশার ঘোরে তারা দেখেছে কবর থেকে লাশ উঠে আসছে।

‘কবর’ নাটকটি রচিত হয়েছে এ রাজনৈতিক নেতাদের জঘন্যতম ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনাদের হত্যাযজ্ঞে এদেশের পথঘাট, মাঠ, প্রান্তরসহ চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশের দৃশ্য দেখে নাট্যকার কবর নাটকটি রচনা করেন।বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিশিষ্ট নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ একটি ঐতিহাসিক নাটক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নানা ঘটনা নিয়ে জেলখানায় বসে তিনি এ নাটকটি রচনা করেন।

২) ‘কবর’ নাটকের চরিত্রগুলো কীসের প্রতীক?

কবর নাটকের নেতা,হাফিজ, ফকির, গার্ড ও কয়েকটি ছায়ামূর্তি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। চরিত্রগুলো সবাই একই প্রকৃতির নয়। এই নাটকের রাজনৈতিক নেতা ও হাফিজ চরিত্র দুটি স্বৈরাচারী পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক ও শোষক শ্রেণীর চাটুকার ও দোসরদের প্রতীক।

অন্যদিকে মুর্দা ফকির সাহসী, অকুতোভয়, প্রতিবাদী, বাংলার সন্তান, গার্ড চরিত্রটি হাবভাবে নেতার অনুগত কিন্তু স্বভাব-চরিত্র বাঙালিয়ানা ও ধুরন্ধর। মূর্তিগুলো একেকটি মরা লাশের প্রতীক।

28Sep2020

পাঠ- ৭.০: প্রবন্ধের স্বরূপ, শ্রেণিবিভাগ ও তাৎপর্য

১.  প্রবন্ধ বলতে কী বুঝায়?

প্রবন্ধ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছ।    প্রবন্ধ হচ্ছে কথাসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্রবন্ধ শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় ‘প্র+বন্ধ’। প্র অর্থ এখানেপ্রকৃষ্ট। বন্ধ’ অর্থ বন্ধন। অর্থাৎ প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন বা বাঁধা। কোনাে বিষয় সম্পর্কে লেখকের বক্তব্যকে যুক্তি, তর্ক, তত্ত্ব, তথ্য দৃষ্টান্ত, প্রয়ােজনীয় উদ্ধৃতি সহযােগে বিভিনড়ব দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামাের মধ্যে প্রকৃষ্টরূপে উপস্থাপনের নামই প্রবন্ধ। প্রবন্ধে সাধারণত কোনাে বিষয় সম্পর্কে লেখক তার নিজস্ব ভাবনার প্রকাশ ঘটান। প্রবন্ধকে সাধারণভাবে রচনা বলা হয়ে থাকে।

বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ শব্দটির অনেকগুলাে প্রতিশব্দ আছে যেমন সংগ্রহ, সন্দর্ভ, রচনা ইত্যাদি। সাহিত্যে প্রবন্ধের উৎপত্তিই ঘটেছে চিন্তা এবং যুক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। প্রতিটি প্রবন্ধ সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক।

যথেষ্ট প্রমাণ, উপযুক্ত তথ্য-তত্ত্ব প্রয়ােগ করে ভাষার চিন্তায় সেই বিষয়ের প্রতিষ্ঠা করাই হলাে প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম শাখা। কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে লেখক কোনাে বিষয় সম্বন্ধে সচেতনভাবে যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য সৃষ্টি করেন তাকেই প্রবন্ধ বলে।

কোনাে বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিমূলক গদ্যরীতির সাহিত্যিক সৃষ্টিকে প্রবন্ধ বলা হয়। যেকোনো বিষয় অবলম্বনে মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিপূর্ণ ও সুচিন্তিত গদ্য রচনাকে প্রবন্ধ বলে।

সাধারণত কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করে লেখক কোনাে বিষয় নিয়ে আত্মসচেতন, যুক্তিসিদ্ধ, যথাযথ বাক্য বন্ধনে আবদ্ধ যে সাহিত্য রূপ সৃষ্টি করেন, তাকে প্রবন্ধ বলা হয়।

প্রবন্ধের সংজ্ঞা:

 “কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় করিয়া লেখক কোন বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতনতামূলক নাতিদীর্ঘ সাহিত্যরূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলা হয়। প্রবন্ধের ভাষা ও দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে বৈচিত্র্য থাকিলেও ইহা সাধারণত গদ্যে এবং নাতিদীর্ঘ করিয়া লিখিতে হইবে। কোন তত্ত্ব, তথ্য বা চিন্তাকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে আদি মধ্য অন্তভাবে বিন্যস্থ করে প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়।

সাহিত্য সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাসের ভাষায় সাধারণত: কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় করিয়া লেখক কোন বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতন নাতিদীর্ঘ সাহিত্যরূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলা হয়”। “অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবন্ধ ব্যাখ্যা করেন ‘চিন্তামূলক তথ্যবহুল গদ্য রচনা হিসাবে।

২. প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য লিখুন।

প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:

* মূলত গদ্যরীতিতে রচিত,

* সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক,

* আত্মসচেতনতা,

* প্রমাণক তত্ত্ব-তথ্য সংবলিত > চিন্তার সুশৃঙ্খলতা,

* যৌক্তিক উপস্থাপনা,

* ভাষার প্রাঞ্জলতা (প্রবন্ধের ভাষা হবে সহজ সরল। যার অর্থ সহজবোধ্যতা। অর্থাৎ লেখকের বক্তব্যের বিষয় পাঠক পড়ামাত্র বুঝতে পারলে তাকে ‘প্রাঞ্চলতা’ বলে।প্রবন্ধ হবে নাতিদীর্ঘ অর্থাৎ আকৃতির দিক থেকে প্রবন্ধ যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হবে। তবে প্রতিপাদ্য বিষয়ের ব্যাপকতারকারণে দীর্ঘ হতে পারে।) যে কোন বিষয়বস্তু প্রবন্ধের উপজীব্য হতে পারে।

* মননশীলতা প্রবন্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। (মননশীল: বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তায় অভ্যস্ত বুদ্ধিদীপ্ত বিচার শক্তি সম্পন্ন।লেখকের যৌক্তিক চিন্তা বা বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার প্রতিফলন।

* নৈর্ব্যক্তিকতা প্রবন্ধে থাকা বাঞ্ছনীয় (নৈর্ব্যক্তিকতা বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা,ব্যক্তি নিরপেক্ষ)।

৩. প্রবন্ধের প্রকারভেদ বা বৈচিত্র্যতা উল্লেখ করুন। 

প্রবন্ধের প্রকারভেদ বা বৈচিত্র্য:

বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে প্রবন্ধকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

(ক) বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ এবং

(খ) ব্যক্তিগত প্রবন্ধ।

(ক) বস্তুনিষ্ঠ বা তন্ময় প্রবন্ধ:

যে প্রবন্ধে বিষয়বস্তুর প্রাধান্য থাকে তাকেই তনুয় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলে।  বিষয়বস্তুর প্রাধান্য বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের মূল বৈশিষ্ট্য। ইংরেজিতে বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের Impersonal Prose, Formal Essay, Discourse ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধে পাঠশেষে বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রয়ােগ করে পাঠক কোনাে বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি বিকাশের সুযােগ পায়। শ্রীশচন্দ্র দাশের মতে, বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ আমাদের বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণতর, দৃষ্টিকে সমুজ্জ্বল ও জ্ঞানের পরিধিকে প্রশস্ত করে তােলে। অনাদিকে যুক্তি, উপাত্ত, প্রমাণ দ্বারা কোনাে বিষয়ের প্রতিষ্ঠাই বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের লক্ষ্য। অর্থাৎ যুক্তিতর্কের বাইরে লেখকের নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের সুযােগ বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধে নেই। যেমন- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাঙ্গালার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শব্দতত্ত্ব ইত্যাদি। তন্ময় প্রবন্ধ অনেকরকম হয় যেমন:

১. বিবৃতিমূলক প্রবন্ধ (কাহিনীর বিবরণ বিস্তৃত থাকে)।

২. ব্যাখ্যামূলক (মত ও তত্ত্ব আলােচনা এই প্রবন্ধের আসল উদ্দেশ্য)।

৩. বর্ণনামূলক (বিষয় বস্তুর বর্ণনা পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়ে থাকে)।

৪. বিতর্কমূলক (মতবাদের বিশ্লেষণ এবং পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি)।

৫. চিন্তামূলক: (বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়ের পরিচিতি নির্ণয়।

৬. তথ্যমূলক (বিবিধ তথ্যের মাধ্যমে রচিত প্রবন্ধ)।

৭. নীতি কথামূলক (প্রচলিত নীতিকথা এতে স্থান পায়)।

বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:

অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের কতগুলাে বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যা নিম্নরূপ :

১। তত্ত্ব, তথ্য ও বস্তুভার,

২। বিষয়বস্তুর প্রাধান্য,

৩। যুক্তি তর্কসংবলিত,

 ৪। প্রমাণনির্ভর,

৫। তত্ত্বকথা বা সমস্যার আলােচনার প্রাধান্য।

(খ ) ব্যক্তিগত বা মন্ময় প্রবন্ধ:

যে প্রবন্ধে ব্যক্তি হৃদয়ের প্রাধান্য থাকে তাকে ব্যাক্তিগত বা মন্ময় প্রবন্ধ বলে। মন্ময় বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধ জ্ঞানের বিষয়কে হাস্যরসমন্ডিত বা কোমলতা দান করে উপস্থাপন করা হয়। ব্যক্তিগত প্রবন্ধকে Essay Literature, Personal Essay, Informal Essay ইত্যাদি নামে অভিহিত করা যেতে পারে। ব্যক্তিহৃদয়ের প্রাধান্য ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের মূল বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ যুক্তি, তর্ক, তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণাদি ইত্যাদির তুলনায় ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধে ব্যক্তি হৃদয়ের যুক্তি ও আবেগ, অনুভূতি, সৌন্দর্যবােধ ইত্যাদি বিষয় গুরত্ব পায়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ সাহিত্যের বিভিনড়ব রূপ (Form), অর্থাৎ গল্প, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদির সমতুল্য।

ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ পাঠশেষে পাঠক লেখকের উপস্থাপিত বিষয়ের আবেগ, সৌন্দর্য ইত্যাদির সাথে একাত্মবোধ করেন এবং সৃষ্ট সৌন্দর্যের রস-আস্বাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “ব্যক্তিগত প্রবন্ধে যুক্তিতর্কের বাঁধুনির চেয়ে একটি মনের বিশেষ মুহূর্তের মুড বা মেজাজ অধিকতর উপভােগ্য হয়। জীবনচরিত, আত্মচরিত, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত ইত্যাদি ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত।  বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’ ইত্যাদি তার প্রমাণ।

ব্যক্তিগত প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:

১।  ভাব প্রধান,

২। বিষয়বস্তু ব্যক্তি হৃদয়ের রসসিঞ্চিত,

৩। নাতিদীর্ঘ থেকে বৃহদাকার অবয়ববিশিষ্ট,

৪। বিভিন্ন সাহিত্য রূপ এর তুল্য (জীবনচরিত, আত্মচরিত, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত ইত্যাদি)

৫। নৈর্ব্যক্তিক প্রামাণ্য চেয়ে ব্যক্তিগত চিন্তার যুক্তি ও সৌন্দর্য-দৃষ্টিসম্পন্ন প্রবন্ধ বলে।

৩) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের পরিচয়   এবং এর ধারা বর্ননা করুন।   

৪. বাংলা প্রবন্ধের পরিচয় ও এর বিভিন্ন ধারাসমূহের বর্ণনা দিন।

বাংলা প্রবন্ধের পরিচয়:

বাংলা প্রবন্ধের সূচনা ধর্মীয় বাক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে। উনিশ শতকের শুরুতে খ্রিষ্টান মিশনারীরা এদেশে ধর্ম ও শিক্ষা প্রচারে ব্রতী হলে তারা বাইবেল অনুবাদ, বাইবেলের মাহাত্মাসূচক নিবন্ধ, প্রচারপত্র ও পাঠ্যপুস্তক রচনায় হাত দেন। এ কাজে তারা গদ্য ব্যবহার করেন। ফলে বাংলা গদ্য যেমন বিকাশ লাভ করে তেমনি বাংলা প্রবন্ধও গড়ে ওঠে। এ কাজে শ্ৰীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান অনীকার্য। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা গদ্য চর্চায় রত হয়। তারা গদ্যে বাংলা পাঠ্যপুস্তকে, ব্যাকরণ, ইতিহাস, উপকথা রচনা করেন। ফলে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য গড়ে ওঠে। রাজা রামমোহন রায়ও এ সময় প্রবন্ধ নিবন্ধ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে বেদান্ত সূত্র, বেদান্তসার, প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে ঋদ্ধ করে তোলেন।

বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের ধারা:

বাংলার প্রবন্ধ সাহিত্যকে ৩ টি পর্যায়ে বিভাজিত করে আলোচনা করা যেতে পারে। যথা:

১. উন্মেষ পর্ব,

২. বিকাশ পর্ব এবং

৩. বাংলাদেশ পর্ব।

১. উন্মেষ পর্ব:  

উনিশ শতকের শুরুতে গদ্যের সুত্রপাতের সাথে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের সূচনা সম্পর্কিত। এ সময় সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম নানা বিষয়ে চর্চা শুরু করেন। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য মূলত ঐ চিন্তন প্রক্রিয়ার লিখিত রূপের ফল । বিশেষত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, অর্থাৎ উইলিয়াম কেরী, রামরাম  বসু, মৃত্যনঞ্জয় বিদ্যালংকারের হাতে প্রবন্ধের গোড়াপত্তন   ঘটে। তবে এ সময়ের রচনায় প্রবন্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অনেকাংশ অনুপস্থিত এবং প্রধানত দেশি-বিদেশি উপকথার অনুবাদ, ঐতিহাসিক কাহিনী, পাঠ্যপুস্তক, ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীকালে রাজা রামমোহন রায়ের উপযুক্ত ভাষাশৈলী ও যুক্তিনিষ্ঠ রচনাসমূহের মধ্যে প্রবন্ধ সাহিত্যের শৈল্পিক জোয়ার লক্ষ্য করা যায়। সমকালীন সাময়িক পত্রসমূহে সমাজ ও ধর্মবিষয়ক বিচিত্র বিষয়ের অবতারণাও প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভূদেব মুখোেপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ প্রবন্ধ সাহিত্যের উন্মেষে বিশেষ অবদান রাখেন।

২. বিকাশ পর্ব:

প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বিষয় বৈচিত্র্য। বিকাশ পর্বে অসংখ্য সৃজনশীল প্রাবন্ধিকের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ে প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশ সাধিত হয়। উপন্যাসিক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত জাতীয় জীবন ও সংস্কৃতি বিষয়ক অসংখ্য প্রবন্ধ এ ধারায় উৎকর্ষ অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এ-পর্বের অন্যান্য প্রাবন্ধিকের মধ্যে কালীপ্রসন্ন ঘােষ, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, মীর মােশাররফ হােসেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোেগ্য। এ-সময়ে রচিত অধিকাংশ প্রবন্ধই কনিষ্ঠ প্রবন্ধের পর্যায়ভুক্ত। পরবর্তীকালে সাহিত্যের অন্যান্য ধারার মতই প্রবন্ধ সাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনী স্পর্শে শৈল্পিকতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে।

৩. বাংলাদেশের প্রবন্ধ:

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকে বর্তমান বাংলাদেশের পরিসীমায় রচিত প্রবন্ধ সাহিত্য বিষয় ও আঙ্গিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এ অঞ্চলের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলিম সমাজের জন্য পথনির্দেশের প্রয়ােজনে বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য এই ভিন্ন মাত্রিক নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সঙ্গত কারণেই ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রবন্ধ   সাহিত্যের বিষয়।

বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যকে দুই পর্বে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা:

১. মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী প্রবন্ধ এবং ২. মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রবন্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী প্রাবন্ধিকদের মধ্যে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মােতাহার হোসেন, আব্দুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাঠ-৭.১: কাবুল যাত্রা (সৈয়দ মুজতবা আলী)

১. দেশে-বিদেশে প্রবন্ধটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরুন।

দেশে বিদেশে হচ্ছে কথা-সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত একটি ভ্রমণ কাহিনী।শান্তিনিকেতনে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আফগানিস্তান সরকারের অনুরােধে “কাবুল কৃষি কলেজে” ফার্সি এবং ইংরেজী ভাষার শিক্ষক হিসেবে যােগদান করেন। “দেশে বিদেশে” ভ্রমন কাহিনীটি শুরু হয় তার কোলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। এই বইটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়; অন্য কোন ভ্রমণ কাহিনী আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে এর মতাে এতােটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। একটি ভ্রমণ কাহিনী হওয়া স্বত্ত্বেও এটি আফগানিস্তানের লিখিত ইতিহাসের একটি অনবদ্য দলিল।লেখকের রম্য রসাত্মক বর্ণনা, বিভিন্ন পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষের সাথে রসালাপ, ভ্রমণের সময় বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা এবং শেষ পর্যায়ে এসে আফগানিস্তান ছেড়ে আসার করুন কাহিনী অসাধারনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই ভ্রমণ কাহিনী।

দুই খন্ডে প্রকাশিত দেশে বিদেশের প্রথম খন্ড হচ্ছে কলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাত্রার এক চমৎকার বিবরণ। ভ্রমনকারীর ভঙ্গিতে লেখক সেখানে তুলে ধরেছেন তার যাত্রাপথের সঙ্গী বিচিত্র সব চরিত্র। চলার পথে তিনি যেসব এলাকা অতিক্রম করে সেসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য, পােশাক-আশাক, সংস্কৃতি, কৌতুকবােধ কোনাে কিছুই তার সরস কলমে বাদ পড়েনি। শুরু হয়েছে কলকাতার ফিরিঙ্গি সহযাত্রীকে নিয়ে। পরে তা বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও পেশােয়ারের পথের শিখ সর্দারজি ও পাঠান সহযাত্রীদের কথা। দ্বিতীয় খন্ড অন্যরকম। প্রথম খন্ড পড়ে যারা ধারণা করবেন দেশে-বিদেশে হচ্ছে একটি ত্রমণকাহিনি, দ্বিতীয় খন্ড পড়ে তাদের হোঁচট খেতে হবে। সেখানে কোনাে ভ্রমণবৃত্তান্ত নেই। আছে লেখকের নতুন কর্মস্থল আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা। সেখানকার প্রগতিশীল শাসক আমানুল্লাহর আধুনিক আফগানিস্তান গঠনের স্বপ্ন, মােল্লাতন্ত্রের বিরোধিতা, প্রতিবিপ্লবে আমানুল্লার পতন তথা আফগানিস্তানের উত্থান-পতনের বিবরণ। তিনি কাবুলে মানুষের সহজ সরল জীবনযাত্রা, চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়ায় যে ঐতিহ্য সব কিছুই নিপুণ শিল্পীর মতাে তুলে ধরেছেন।

২. কাবুল যাত্রার মূলভাব বর্ণনা করুন।

পাঠের অংশটুকু সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে-বিদেশে’ নামক রচনার ৭ম পরিচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে। প্রচুর শ্রেণি-প্রকৃতি নিয়ে মতবিরােধ থাকলেও সাধারণভাবে এটিকে ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে দেশে-বিদেশে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাংলা ভাষায় দেশভ্রমণকে অবলম্বন করে রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্যে দেশে-বিদেশে অন্যতম সেরা রসসৃষ্টি। লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি, প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণের অসাধারণ দক্ষতা, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে বিশেষ কৌতূহল এবং সর্বোপরি বর্ণনার রসগ্রাহিতা এই রচনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। এসব বিবেচনায় দেশে বিদেশে সাধারণ ভ্রমণ-কাহিনির তুলনায় অসাধারণ সাহিত্যে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের সূক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং শিল্পোত্তীর্ণ পরিবেশনায় এটি বিশেষ স্থানের প্রামাণিক দলিলে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অংশটুকু সম্পর্কে উপর্যুক্ত মতামত সর্বাংশে প্রয়ােগযােগ্য। এ কারণে দেশে-বিদেশে ভ্রমণকাহিনি হলেও তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রের আর্থ সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাঠে লেখকের পেশাওয়ার থেকে বাসে কাবুল ভ্রমণের অংশটুকু বিবৃত হয়েছে। জনৈক পাঠান আহমেদ আলীর গৃহে এক সপ্তাহের আতিথ্য গ্রহণ শেষে লেখক বাসে কাবুল যাত্রা করেন। পথে খাইবারপাস সড়কের বর্ণনা, প্রসঙ্গক্রমে আফগান আইনি পরিস্থিতি, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রসঙ্গ অবতারণা লেখকের বর্ণনাকে পাঠকের কাছে তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রের একটি সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরে। সর্বোপরি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের তীক্ষ দৃষ্টি এবং প্রকাশের দক্ষতায় রুক্ষ পথের বর্ণনাতেও পাঠক রসের সন্ধান পান। চলিত রীতিতে ক্রিয়া ও সর্বনামপদ অক্ষুন্ন রেখেও তিনি অবাধে আরবি-ফারসি-আঞ্চলিক ইংরেজি শব্দের প্রয়ােগ করে বর্ণনাকে একদিকে যেমন শুতিমধুর করেছেন, অন্যদিকে নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র স্টাইল। ফলে পাঠককে বর্ণনার মাধ্যমে চিত্রকল্প তৈরি করে নিতে বেগ পেতে হয় না।

৩. কাবুল যাত্রায় লেখকের ভ্রমনবৃত্তান্ত বর্ণনা করুন।

সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯২৭ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আফগানিস্তান সরকারের অনুরােধে কাবুল কৃষি কলেজে ফারসি এবং ইংরেজী ভাষার শিক্ষক হিসেবে যােগদানের উদ্দেশ্যে কাবুল যাত্রা করেন। লেখক কলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ভ্রমনের আগের দিনের তাপমাত্রা ছিল ১১৪ ডিগ্রী। কাবুলের উদ্দেশ্যে লেখক একাকী একটি বাসে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সাথে বাসে ড্রাইভার শিখ সর্দারজি কাবুল বেতার কেন্দ্রের একজন সরকারী কর্মচারী এবং কাবুলের একদল ব্যবসায়ীর সাথে আলাপচারিতা হয়। যেহেতু তাপমাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি সেজন্য ভ্রমনটা সুখকর ছিলনা। কাবুল বেতারের সরকারী কর্মচারী নিজেকে সবভাষায় তার দখল আছে বলে দাবী করলেও আসলে এক ফারসী ছাড়া অন্য কোন ভাষা তিনি জানেন না। লেখক ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারেন আফগান শিল্প মাত্র ৩ টি বস্তু প্রস্তুত করেন, বন্দুক গােলাগুলি এবং শীতের কাপড়। আর বাদবাকী সবকিছুই আমদানী করতে হয়। যাত্রাপথে লেখক পর্যবেক্ষন করলেন কোন কিছু ঝলসে গেলে যা হয় দেশটির অবস্থাও ঠিক তাই। কোথাও কোন সবুজের ছায়া নাই। একসময় লেখক খাইবার গিরিপথ প্রবেশ করেন। খাইবার গিরিপথের বর্ননা অত্যন্ত চমৎকার ভাবে বর্ননা করেছেন। দুদিকে হাজারফুট উচু পাথরের নেড়া পাহাড়। মাঝখানে খাইবারপাস। একজোড়া রাস্তা একে বেকে অন্যের গা ঘেঁষে চলেছে কাবুলের দিকে যেকোন জায়গায় দাড়ালে চোখে পড়ে ডানে-বামে, সামনে পিছনে পাহাড় আর পাহাড়। এখানে  সূর্য যেন নেমে এসেছে। সূর্যের প্রচণ্ড তাপে হঠাৎ বাসের টায়ার ফেটে যায়। এসময় সরদারজী বাসের যাত্রীদের বললেন বাস থেকে না নামতে কারন খাইবার পাসের রাস্তা সরকারের হলেও দুপাশের জমি পাঠানদের। সেখানে নেমেছ কি মরেছ। প্রায় আধাঘন্টার পর টায়ার ঠিক হল কিন্তু লেখকের কাছে মনে হয়েছে দুঘন্টা কারন প্রচন্ড গরমে তিনি নাজেহাল হয়ে পড়েছিলেন। অতপর বর্ডার ক্রস করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করলেন। খাইবার গিরিপথের রাস্তাটি ছিল পিচঢালা কিন্তু আফগানিস্তানে প্রবেশ করে দেখলেন রাস্তার অবস্থা ভয়ানক খারাপ ফলে যাত্রাটিও অনেক পীড়াদায়ক ছিল। এসময় লেখক পর্যবেক্ষন করলেন যেদিকে চোখ যায় শুধু নুড়ি আর নুড়ি যেখানে নুড়ি নাই সেখানে আবছায়া পাহাড়। এভাবে চলতে চলতে একসময় দক্কার কাছে পৌছালেন। দক্কার সামনে বাম পাশে লক্ষ্য করলেন কাবুল নদীর পানি ছলছল করে বয়ে চলছে তার ডান দিকে এক ফালি সবুজ আচল লুটিয়ে পড়েছে। এ দেখে লেখক একধরনে প্রশান্তি অনুভব করলেন। এ প্রবন্ধে লেখক তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। রচনায় তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার অসাধারন দক্ষতা,সাধারন মানুষ সম্পর্কে বিশেষ কৌতুহল এবং সর্বোপরি বর্ণনার রস গ্রহিতা এই প্রবন্ধটিকে ভিন্নমাত্রা দান করেছে।

৪. খাইবারগিরি পথের বর্ণনা দিন।

খাইবার গিরিপথ পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে অবস্থিত । খাইবার গিরিপথ (উচ্চতাঃ ১,০৭০ মিটার অথবা ৩,৫১০ ফুট) একটি পার্বত্য গিরিপথ। এটি স্পিন ঘার পর্বতের উত্তরাংশকে ছেদ করে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। এটি প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো এবং এটি পৃথিবীতে ব্যবহৃত প্রাচীনতম গিরিপথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতিহাস থেকে জানা যায় এটি মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিলো। এই গিরিপথের সীমানা পাকিস্তানের ৫ কিলোমিটার (৩.১ মাইল) ভেতরে লান্ডি কোটাল পর্যন্ত।

গিরি মানে হল পাহাড়, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। গিরিপথ হলো পর্বত প্রণালী বা পর্বতের ঢালে অবস্থিত সড়ক পথ। গিরিপথ অনেকক্ষেত্রে শুধু মানুষের গমনযােগ্য হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষ যানবাহন উভয়েই চলতে পারে। পৃথিবীর অনেক পর্বতমালা মানুষের যাতায়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, তাই এসব ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরে গিরিপথ মানুষের চলাচলে সাহায্য করেছে। গিরিপথ সাধারণত পর্বতের নিচু অংশ, ধার দিয়ে নির্মিত হয়। দুই পর্বতের মধ্যবর্তী অংশ দিয়ে সাধারণত গিরিপথ হয়। খাইবার গিরিপথ হল পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংযােগ রাস্তা/পথ/বাইপাস । এটি একটি প্যাঁচানাে রাস্তা যার পর্বতের উত্তরাংশকে ছেদ করে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। এই গিরিপথের দৈর্ঘ্য ৫৬ কিলোমিটার।

পাঠ-৭.২: সুবেহ সাদেক (বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন)

১. সুবেহ সাদেক প্রবন্ধের মূল বক্তব্য আলোচনা করুন।

বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) বাঙালি নারীদের বিশ্বের সাথে  তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাঁর সুবহে সাদেক প্রবন্ধে যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি বাস্তালি নারীদের পশ্চাৎপদভার কর এবং তা থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন। সুবহে সাদেক লেখকের অন্যধর্মী একটি জাগরণমূলক প্রবন্ধ। লেখক তার প্রবন্ধে অজান্ত সিদ্ধহস্ত লেখকের মতে নানা ব্যঞ্জনধর্মী শব্দ প্রয়ােগের মাধ্যমে আমাদের নারী জাতিকে সমস্ত কুসংস্কার, দাসিবৃত্তিপনা প্চাব অন্গ্রসরতা পেছনে ফেলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জেগে উঠে সামনের দিকে যাওয়ার জন্য এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

সুবহে সাদেক কথাটির অর্থ হলাে ভাের বা প্রত্যুষ। প্রত্যুষ একটি দিনের ‍সূচনা নির্দেশক। দিনের শুরুতে যেমন, পূর্বাকাশে সুর্য উঠে রাতের অন্ধকার কেটে যায় এবং মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি শুনে মুসলমান নর-নারী জেগে ওঠে এবং সমস্ত দিন কাজকর্মে নিজেদের ব্যস্ত রাখে ঠিক তেমনি রােক্সেয়া বাঙালি নির্বোধ, অবুঝ ললনাদের দাসিবৃত্তি পরিহার করে জেগে উঠতে বলেছেন। লেখক মনে করেন প্রত্যুষের মতােই নারী জাতির জন্য নতুন একটি যুগের সূত্রপাত হয়েছে। মানুষ যেমন রাতের অন্ধকার পেছনে ফেলে দিনের আলােয় সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে পা বাড়ায় তেমনি এই নতুন দিনের সূচনালগ্নে নারী জাতির আহ্বান এই প্রবন্ধে বার বার সমস্বরে উচ্চারিত হয়েছে। গৃহ কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি জীবন না কাটিয়ে শয্যা ত্যাগ করে এবং সামাজিক সকল প্রকার অত্যাচার, অনাচার, উৎপীড়ন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আহ্বান ধ্নিত হয়েছে আলােচ্য প্রবন্ধে।

প্রাবন্ধিক বিশ্বাস করেন নারীরা একবার জেগে উঠলে কেউ তাদের অবদমিত করে রাখতে পারবে না। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন, প্রথমে নারীকেই বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ অংশের অর্ধেক। প্রবন্ধে ঘরের চার দেয়ালের অবরুদ্ধ মুসলমান নারী সমাজের অধােগতির কারণ, জাগরণের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সমাধানের উপায় সম্পর্কে বাস্তবডিত্তিক আলােচনা করা হয়েছে। কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন নারী জাতির অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধান করে বলেন, তারা নিজেদের জন্য যাবতীয় অভিসম্পাত বিরাজ করে রেখেছেন, তারা সময়ের গতির সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হন না। অজ্ঞ ও মুর্থ বাজির মতাে অন্যায় বিচারের প্রতিবাদ করেন না; চারদিকে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সকল ধরনের অন্যায়-অত্যাচার কাঠের পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়ে সহ্য করে যান। নারীরা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট নন। তাদের মনে রাখতে হবে কেউ কারো অধিকার হাতে তুলে দেয় না। নিজের প্রাপ্য অধিকারটুকু নিজেকেই ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাবতে লজ্জা হয়; পুরুষেরা তাদেরকে দামিরূপে, অলংকারস্বরূপ মনে করেন কিং পশু তুল্য চাবলেও তাদের বােধােদয় হয় না বরং তারা গৌরববােধ করেন। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমান নারী সমাজে প্রচলিত প্রথা নারীকে কীভাবে মানসিক দাসত্ব দান করেছেন এবং সমাজের সার্বিক মঙ্গল ও উন্নতিতে মুসলমান নারীরা কী ভূমিকা পালন করতে পারে ইত্যাদি প্রসঙ্গে রােকেয়ার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ এই প্রবন্ধে বিবৃত হয়েছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ‘সুবহে সাদেক বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

প্রায় শতবর্ষ পূর্বে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও কালের সীমা অতিক্রম করে বর্তমান বাংলাদেশ এটি সমানভাবে সমাদৃত। নারী মুক্তি কিংবা নারীর ক্ষমতায়নের সােপানগুলাে সম্পর্কে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অবগত। নিঃসন্দেহে এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়। রোকেয়া যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষা বিস্তার ব্যতীত এ অবস্থার পরিবর্তন কিংবা নারী উন্নয়নের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। এই শিক্ষার স্বরূপ মানবিক ও শারীরিক হওয়া উচিৎ।

২. রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন তাঁর সুবেহ সাদেক প্রবন্ধে মুসলমান নারীদের অনগ্রসতার কী কী কারণ চিহ্নিত করেছেন? এই অবস্থার   পরিবর্তন কিভাবে করা যায়-বিশ্লেষণ করুন।

 অথবা, ঔপনিবেশিক আমলে বঙ্গনারী সমাজের অবস্থা কেমন ছিল ব্যাখ্যা করুন। 

বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার সুবেহ সাদেক প্রবন্ধে বাংলার মুসলিম নারী র পশ্চাৎপদতার মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন এবং তা থেকে সমাধানের পথ নির্দেশ করেছেন। যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের আলােকে সমগ্র ভারতবর্ষের নারীকে আলাের পথ দেখিয়েছেন।

নেত্রী সমাজের অনগ্রসরতার কারণ :

রােকেয়া বলেছেন, বাংলার মুসলিম নারীরা মানসিক দাসত্বে বন্দি। জন্মাবধি পুরুষের দাসত্ব মেনে চলতে চলতে তারা নিজেদের পুরুষের দাসী মনে করে। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘আমরা জন্মিয়াছি দাসী চিরকাল দাসী, যাকবি দাসী, তার মানসিক দাসতুই নারীদের সমাজে পিছিয়ে রেখেছে।

নারী সমাজের অনগ্রসর অন্যতম কারণ হলাে নারী শিক্ষার অভাব। পুরুষ শাসিত সামজে নারীদের বান্তবভিত্তিক শিক্ষা-দীক্ষা। বাইরের আলাে-বাতাস ও তাদের জ্ঞান অনুশীলনীর চর্চা থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। নারীদের পুরুষেরা গৃহ কারাগারে অন্ধকার

স্যাতসেতে মেঝেতে আটকে রেখেছিল।পুরুষ সমাজ কথনােই নারী সমাজের প্রতি প্রদ্ধাশীল নয়, বরং নারীদেকে তারা নানাভাবে উপক্ষো করে। নারীদের অবলা, নাকেসুল আকেল বলে দুনিয়ার সমস্ত দেশ তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়। নারীদের প্রতি পশুর ন্যায় পুরুষের ব্যবহার করে। আর নারীরা এতে গৌরববােধ করে।পুরুষেরা নারীদের ভােগের সামগ্রী মনে করে। পুরুষরা নারীদের মূল্যবান অলংকারের শামিল মনে করে।

ধর্মীয় বিধনে নারীদেরকে পুরুষের অর্ধেক হিসেবে দেখানাে হয়েছে। ফলে ধর্মের দােহাই দিয়ে পুরুষেরা নারীদেরকে ব্যবহার কে। নারীকে যে পুতুল হিসেবে খেলা করতে ভালােবাসে। নারীদেরকে তারা হাতের ক্রড়ানকে পরিণত করেছিল। নারী সমাজের গতির পক্ষে লেখকাে মতামত দেশের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকে অণ করতে হবে। রোকেয়া মনে করেন, একটি গাড়ির যেমন দুটি চাকা খাকে এবং দুটি চাকার সাহায্যে গাড়িটি সুন্দর চলতে পারে, তেমনি আমাদের সমাজ উন্নয়নের স্বার্থে পুইরুষের সাথে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কখনাে উন্নতি সম্ভব নয়। আাই বােজে নারী সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণগুলো চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। নিম্নে সেই পদক্ষেপগুলো তুলে ধরা হলো:

 ১. তিনি নারীদেরকে জেগে ওঠার আহবান জানিয়েছেন। আর এতকাল নারীরা ঘুমিয়ে থাকবে। নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে সে অধিকার আদায়ে তীব্র প্রতিবাদী হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে।

২. রােকেয়া নারীদেরকে মনের সকল কুসংস্কার, জড্তা, ভয়, লজ্জা মুছে ফেলে মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

৩. নারীর গতিকে সমাজ গতির জন্য প্রয়ােজনীয় যা যা করা দরকার তা সবই সরকারকে করতে হবে।

 ৪, ধর্ম প্রকৃত অর্থে নারীদেরকে যেসব অধিকার ও সম্মান দিয়েছে সমাজ ব্যবস্থায় তার সবই বাস্তবায়ন করতে হবে।

৫. নারীদেরকে পুরুষের অর্থ অধ্যাঙ্গী বিবেচনা করতে হবে।

৬. নারীরা যেহেতু সৃষ্টি জগতের মাতা, তাই নিজেদের দাবি-দাওয়া রক্ষার জন্য নারী সমিতি গঠন করতে হবে

৭. সর্বোপরি নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে, নারী সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের যেসব পথ তিনি দেখিয়েছেন তা অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ ও বৈজ্ঞানিক তার মতে, সমাজ জীবনের অগ্রগতি ও কল্যাণ সাধনের জন্য নারী জাগরণ এবং সেই সাথে পুরুষ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিকল্প নেই।

৩. বেগম রোকেয়া নারী সমাজের অত্যাচার নিবারণের জন্য কোন ধরনের শিক্ষার কথা বলেছেন? আলােচনা করুন।

নারী সমাজের অন্যায়-অত্যাচার, অনাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন প্রভৃতির বিরুদ্ধে রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন শিক্ষা বিস্তা একমাত্র মহৌষধ বলে মনে করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্তত পক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে। তিনি শিক্ষা অর্থে প্র সুশিক্ষার কথা বলেছেন। রােকেয়া মনে করেন, গােটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দুছিত্র কবিতা লিখতে পারা শিক্ষা নয়। তিনি ম সেই শিক্ষা, যা তাদেরকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করবে, তাদেরকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং অশ মাতা রূপে গঠিত হবে।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীদের মানসিক ও শারীরিক উভয় বিধ শিক্ষার কথা বলেছেন। নারীরা ইহজগতে সুদৃশ্য শাড়ি, ক্লিপ ও বহুমূল্য রত্মলংকার পরে পুতুল সাজার জন্য আসে নাই; বরং তারা জগতে বিশেষ কর্তব্য সাধন করার জন্য নারীরূপে জুলভ করেছে। তাদের জীবন শুধু পতি দেবতার মনােরঞ্জনের জন্য জন্ম হয় নি। রােকেয়া বলেছেন, নারীর যেন অন্নবস্ত্রের জন্য বরের গতহ না হয়

শারীরিক শিক্ষার জন্য তিনি বলেছেন, লাঠি ও জুয়া খেলা, টেকির সাহায্যে ধান ভানা, জাঁতায় আটা প্রস্তুত করা এবং যাবতীয় গৃহকর্ম শিক্ষা দেওয়া উচিত। রোকেয়া মনে করেন, এই কাজ সাধিত হলে একদিকে ধান ভানা ও জাতা চালনায় দেশের সর্ববৃহৎ খাদ্য সমস্যা পূরণ হইবে। অন্যদিকে মানুষ চেকি ছাটা চাউল ও জাতায় পেশা আটার অভাবে দেশের লােক মৃত্যুশ্রোতে ভেসে যাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, শুধু লখ্ষ-ঝম্প, নৃত্য অপেক্ষা উপরােক্ত শরীর চর্চা শতগুণ শ্রেয়। খােলা মাঠে প্রাতঃ্ভ্রমণ অত্যন্ত বাসনীয়। সরকার এখন শিশু শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন, ভালাে কথা, কিন্তু প্রথমে তিনি শিশুর মাতার রক্ষা করার কথা বলেছেন।

পাঠ-৭.৩: একাত্তরের চিঠি

১. ‘একাত্তরের চিঠি’ গ্রন্থের কয়েকটি চিঠির অনুসরণে মুক্তিযুদ্ধের একটি রেখাচিত্র অঙ্কন করুন।

অথবা, একাত্তরের চিঠি’র অনুসরণে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করুন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতীয় জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সে স্বাধীনতার বীজ রােপিত হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের পরিসমাপ্তি ঘটে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের মূল সত্তা। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধ মিশেছে বাংলাদেশের সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির অঙ্গনে। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, পত্রপত্রিকা, সাহিত্য মুক্তিযুদ্ধকে আবিষ্কার করেছে। বর্তমান পাঠে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে প্রবন্ধের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশেছিল মৃত্যু ভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব দেশ মাতৃকার বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযােদ্ধারা তাদের পরিবারকে স্মরণ করেছেন। প্রতিনিয়ত চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন তাঁদের আবেগের কথা। এ ধরনের চিঠির সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশনীর উদ্যোগে প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’ শীর্ষক বইতে। আবেগের অসাধারণ প্রকাশে এর প্রতিটি চিঠি হয়ে ওঠেছে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক দলিল, অসাধারণ এক একটি রচনা।

২. ‘একাত্তরের চিঠি’ প্রবন্ধ অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশপ্রেম এবং পারিবারিক মমত্ববােধের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা লিখুন।

‘একাত্তরের চিঠি’ মুক্তিযোদ্ধারা আবদুর রহিমের স্মৃতিচারণমূলক রচনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতীয় জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার যে বীজ রােপিত হয়েছিল, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার সফল পরিণতি ঘটে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের মূলে প্রােথিত সত্তা, আমাদের অস্তিত্বের অংশবিশেষ।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংগীত-সংস্কৃতির মূল বিষয়-আশয়। মুক্তিযুদ্ধকে বারবার আবিষ্কার করা হয়েছে গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, কবিতায়, পত্রসাহিত্যে। বর্তমান পাঠে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে একটি বিশেষ আঙ্গিক-চিঠিপত্রের মাধ্যমে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশেছিল মৃত্যুভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব, দেশমাতৃকার প্রতি অপরিসীম ভালােবাসা এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রবল বাসনা। তবু আত্মীয়- স্বজনদের প্রতি তাঁদের মমতৃবােধ বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযােদ্ধারা তাদের পরিবারকে স্মরণ করেছেন। প্রতিনিয়ত চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন তাদের আবেগের কথা। একাত্তরের চিঠিতে মুক্তিযােদ্ধা মাে. আবদুর রহিম তাঁর মায়ের কাছে যুদ্ধের বিভীষিকার কথা বর্ণনা করছেন। তিনি তাঁর ছেলেবেলার কথা স্মরণ করে বলছেন, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যুদ্ধে যােগদান করেন। পঁচিশ সদস্যের একটি প্লাটুন নিয়ে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়, যার মাঝে তিনিও ছিলেন। তাঁরা জনৈক তােফায়েলউদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন আক্রমণের জন্য। কিন্তু তােফায়েল উদ্দিনের এক গৃহকর্মী পাকসেনাদের তাঁদের অবস্থানের কথা জানিয়ে আসে। পাকবাহিনী তাঁদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করে। আক্রমণে তােফায়েল উদ্দিনের শিশুপুত্র ছাড়া সবাই মারা পড়ে। বীর মুক্তিযােদ্ধা মাে. আবদুর রহিমের সহযােদ্ধারা শহীদ হন। তিনি আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তাঁর এক বন্ধু তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি তাঁর মাকে নিরাপত্তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে চিঠিটি সাবধানে পড়তে বলেছেন।

এ রচনাতে ১৯৭১ সালের বাঙ্গালিদের মধ্যে প্রবল দেশপ্রেম ও পারিবারিক স্নেহ মমতার এক বিচিত্র আখ্যানভাগ ফুটে উঠেছে। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালীন স্বজনপ্রীতি, দেশপ্রম মুখ্য হয়ে উঠেছে। দেশকে কতটা ভালোবাসলে একজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে যায় তা সত্যিই অবাক করার মতাে। যুদ্ধের সময়ে চোখের সামনে একটি বাড়ির সবাইকে মরতে দেখা এবং সেই বাড়ির চার মাসের বেঁচে যাওয়া শিশু সবই রহিমের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়এদেশের অসংখ্য যুবক, তরুণ ও লােকজন দেশমাতৃকার টানে স্ত্রী, কন্যা, পুত্র, ভাই-বােন, মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ্যে তাদের একটিই আর তা হলাে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকের অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে দেশকে মুক্ত করা। একাত্তরের চিঠি’ তে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে এক বিশেষ আঙ্গিকে চিঠিপত্রের মাধ্যমে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশে ছিল মৃত্যু ভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব, দেশ মাতৃকার প্রতি অপরিসীম ভালােবাসা এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রবল বাসনা। তবুও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি তাদের মমতৃবােধ বিন্দুমাত্র কমে নি। স্বৈরাচারী পাক বাহিনীর দীর্ঘদিনের শাসন আর শােষণে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের মানুষকে পরাধীনতার গ্লানি মােচন করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দেবার জন্য মুক্তিযােদ্ধারা নিজ জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছিল এক অজানা পথে। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস এক রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বীর বাঙালি পাক সেনাদের পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করে। আমরা পেলাম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

পরিশেষ়ে বলা যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশপ্রেম এবং পারিবারিক মমত্ববোধের চিত্র ‘একাত্তরের চিঠি’-তে ফুটে উঠেছে।

28Sep2020

পাঠ-৬.০: ছোটগল্পের স্বরূপ ও তাৎপর্য

১. ছোটগল্প কি? ছোটগল্পের শ্রেণীবিভাগ লিখুন।

উত্তরঃ বাংলা সাহিত্যের  সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রাণোচ্ছল শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। ছোটগল্পের আকৃতিগত বিবেচনা মূখ্য নয় বরং  প্রকৃতিগত ও মর্মগত  দিক বিচারই সাহিত্যের অন্যান্য শাখা হতে এটিকে আলাদা করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কাব্যের বর্ষাযাপন কবিতার অংশবিশেষ ছোটগল্পের সংজ্ঞা নিরুপনের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যময়-

ছোট প্রাণ,  ছোট ব্যাথা, ছোট  ছোট  দুঃখ কথা

নিতান্তই সহজ সরল

সহস্ত্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি তারি দু-চারিটি অশ্রুজল ।

নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা

নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ ।

অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে

শেষ হয়ে হইলো না শেষ।

ছোটগল্পের সংজ্ঞা:

জনৈক ছোটগল্পকার বলেছেন, “যে গল্প এক নিমিষে পড়ে শেষ করা যায় তাকে ছোটগল্প বলে।”

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, “ছোটগল্প হচ্ছে প্রতীতিজাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্য কাহিনী যার একতম বক্তব্য কোন ঘটনা বা কোন পরিবেশ বা কোন মানবিকতাকে অবলম্বন করে ঐক্য সংকটের মধ্য দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।”

ছোটগল্পের শ্রেণীবিভাগ:

জীবনের বিচিত্র খন্ডচিত্র নিয়ে  ছোটগল্পের ভূবন আবর্তিত বলে ছোটগল্প স্বতন্ত্র ও বৈচিত্রে বিন্যস্ত। এ কারণে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীকরণে  ছোটগল্পকে ধরা দুরুহ। তবুও বিভিন্ন আলোচক ও সমালোচক নিম্নোক্তভাবে ছোটগল্পকে শ্রেণীকরণ করেছেন।

১. রোমান্টিক প্রণয়ের গল্প,

২. সমাজসমস্যা ও সমাজসংকটধমী গল্প,

৩. দাশনিক ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প,

৪. প্রকৃতি ও মানবজীবনের গল্প,

৫. রূপক বা সাংকেতিক গল্প,

৬. পরাবাস্তব বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ক গল্প,

৭. জাদুবাস্তবতাধর্মী গল্প,

৮. ব্যঙ্গরস বা হাস্যরসাত্মক গল্প,

৯. ঐতিহাসিক বা কল্পবজ্ঞানিক গল্প,

১০. রহস্য বা গোয়েন্দা গল্প ইত্যাদি।

২. ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করুন।

ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য:

‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’ এই পঙক্তিটির  মধ্যে ছোটগল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত হয়েছে। এছাড়া ছোটগল্পে নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষণীয়:

ক) ব্যঞ্জনাধর্মীতা: সাধারণত কবিতার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলেও ছোটগল্পের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

খ) সুসংবদ্ধতা: ছোটগল্পের  ভাষা, চরিত্র ও ঘটনার বিন্যাস হয়ে থাকে সুসংবদ্ধ ও সুদৃঢ়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন ঘটনা ও চরিত্রের  স্থান ছোটগল্পে একেবারেই থাকে না।

গ) সংবেদনশীলতা: ছোটগল্প জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পরূপ। এতে লেখকের সংবেদনশীল  মানসিকতার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটে থাকে। জীবনের খন্ড অংশ ছোটগল্পের ক্যানভাসে মূর্ত হয় বৃহৎ জীবনপ্রবাহের একটি  রসঘন মুহূর্ত। আর এ মুহূর্তটির বহমানতা হয়ে থাকে দ্রুতগতিসম্পন্ন।

ঘ) চরম মুহূর্ত: নাটকের তৃতীয় ওকে নাটকের তৃতীয় অংকে যেমন  ঘটনার চরম উৎকর্ষ বা ক্লাইম্যাক্স রূপ পায়  ছোটগল্পেও তেমনি একটি চরম মূহূর্ত লক্ষ করা যায়। এই পর্যায়ে পাঠকের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে পরবর্তী পরিণতি জানার প্রত্যাশায়।

ঙ) আকাঙ্ক্ষার অতৃপ্তি: এই বৈশিষ্ট্যটি দৃষ্টিগোচর হয় গল্পের শেষ পরিণতিতে। গল্পটি শেষ হয়ে গেলেও একটি অতৃপ্তি থেকেই যায় এরপর কী হলো কী হতে পারে? এ বিষয়ে পাঠক ভাবতে শুরু করে। এটি ছোটগল্পের সার্থক প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৩. একজন শিক্ষক হিসেবে ছোটগল্প পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশলগুলো আলোচনা করুন।

বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক জনপ্রিয় শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। ছোটগল্প লেখক আত্মসচেতন সৃষ্টি।ছোট গল্পের বর্ণনা ভঙ্গিতে শব্দগুচ্ছ বা  বাক্য তার অর্থকে ছড়িয়ে গভীর ভাব ব্যঞ্জনায়  মূর্ত হয়ে উঠে। একজন শিক্ষক হিসেবে ছোটগল্প পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশল:একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ক্লাসে ছোটগল্প পাঠদানের সময় নিম্নলিখিত দিকগুলো বিবেচনায় রাখবো:

১. ছোটগল্পের কাঠামোগত দিক।

২. প্রধান ও পার্শ্ব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য সমূহ।

৩. গল্পের আদর্শগত দিক বা নীতিমালা।

৪. সমধর্মী অন্য গল্পের সঙ্গে তুলনা করা।

৫. গল্পে বর্ণিত শৈল্পিক ও তাৎপর্যমণ্ডিত বক্তব্য ।

৬. লেখক পরিচিতি আলোচনা।

৭. শব্দার্থ ব্যাখ্যা ও  টিকা আলোচনা।

৮. বিভিন্ন চরিত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় ।।

৯. লেখকের জীবনানুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি।

১০. সমাজ  বাস্তবতার স্বরূপ।

গল্পটি পাঠদানের সময় আমি উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখবো। তবে এটাও খেয়াল রাখব যে গল্পটি পাঠদানের সময় কোন অবস্থাতেই যেন গল্পের পঠন-পাঠনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়।

পাঠ-৬.১: তোতা কাহিনী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তোতা কাহিনী’ গল্পের মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন– এ মন্তব্যের আলোকে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার পরিচয় তুলে ধরুন।

বাংলা ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘তোতা কাহিনী’ গল্পে রূপকের আড়ালে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন।  এদেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ নেই। কেবল মুখস্তবিদ্যা এদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রেখেছে। প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলেমেয়েদেরকে কেবল শরবত এর মত বিদ্যা গেলানো হয়। এ শিক্ষাব্যবস্থা অন্তঃসারশূন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচলিত  এই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। মানুষের সহজাত এবং সৃজনশীল চেতনা বিকাশে যে ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে ধরনের শিক্ষার পক্ষে।  রবীন্দ্রনাথ তার তোতা কাহিনী গল্পে কাহিনী প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তোতা পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার নামে  এ গল্পে যেসব ঘটনা উপস্থাপিত হয়েছে তা খুবই মর্মান্তিক। শেষ পর্যন্ত পাখির জীবন প্রদীপই নিভে গেল। মূলত অন্তঃসারশূন্য শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি দেখানো হয়েছে এ গল্পে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন বিদ্যালয়ে সেরকম পদ্ধতিতে  শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়া দরকার যে পদ্ধতি শিশুর কল্পনাকে প্রসারিত করে যুক্তিকে শাণিত করে, বুদ্ধিকে  পরিশীলিত করে। স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দদায়ক পদ্ধতিতে যে শিক্ষা লাভ করা যায় সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতি এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলেছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তায়।

২. ‘তোতা কাহিনী’ গল্পের বিষয়বস্তু সাথে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার যে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় সে বিষয়ে আপনার মতামত লিখুন।

অথবা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’ গল্প অবলম্বনে তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মিল বর্ণনা করুন।

বাংলা ছোটগল্পের সার্থক শ্রেষ্ঠ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।তার জাদুকরী হাতের স্পর্শে সবকিছু স্বর্ণময় হয়ে উঠেছে। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ,দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও ছোটগল্পকার। ‘তোতা কাহিনী’ তার অনন্য ছোট গল্প। এ গল্পে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত উপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার এক নিদারুন হতাশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শিক্ষায় প্রবেশ করেছিলেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সৃজনশীলতাহীন ও মুখস্থনির্ভর।এই মুখস্ত নির্ভরশীল শিক্ষা শিশু রবীন্দ্রনাথকে ব্যতীত করেছিল। তিনি এই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর খুব বিরক্ত হয়ে পালিয়ে বেঁচে ছিলেন। তখন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ ছিল না। কেবল মুখস্থ নির্ভরতা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রেখেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্তঃসারশূন্য  এ শিক্ষাব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি এ শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর সমালোচক  হয়ে ওঠেন। ‘তোতা কাহিনী’ গল্প এর প্রতিক্রিয়ায় লেখা।

এই গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় প্রাণহীন মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আমরা একটি প্রাণচঞ্চল  পাখিকে সংগীত শিক্ষার নামে খাঁচায় বন্দী করে পুতির শুষ্ক বুলি গিলিয়ে শেষ পর্যন্ত হত্যার চিত্র দেখতে পাই। শিক্ষার এ অবস্থার  মাধ্যমে মূলত স্কুল নামক চার দেয়ালে বন্দি শিশুদের মুখস্ত বিদ্যা শেখানোর মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সৃজনশীলতাকে পাখির মতো হত্যা করা হয়। পাশাপাশি রাজদরবারের অপচয়, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির চিত্র ফুটে উঠেছে  তোতা পাখি গল্পে।

পরিশেষে বলা যায় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তক এর ত্রুটি কারিকুলামের  সীমাবদ্ধতা, শিক্ষাদানের নানা অসঙ্গতি, শিক্ষাখাতে দুর্নীতি সহ নানা কাহিনী এ গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পাঠ-৬.২: পুঁইমাচা (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

১. মৃত ক্ষেন্তি যেন জ্যোৎস্নারাতে সজীব পুঁইমাচার ভেতর দিয়ে অন্নপূর্ণার সংসারে ফিরে এসেছে ব্যাখ্যা করুন।

প্রকৃতির নানা বিষয় নিয়ে ছোট গল্প রচনাতে কালজয়ী ছোটগল্পকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ।  পুঁইমাচা তাঁর একটি বিখ্যাত ছোটগল্প। তাঁর রচনা, প্রকৃতিচেতনা ,সমাজ বাস্তবতা বর্ণনায় বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। গল্পটি এর ব্যতিক্রম নয়।

পুঁইমাচা গল্পে লেখক প্রতীকী রূপে মৃত ক্ষেন্তির ফিরে আসার বিষয়টি অত্যন্ত  দক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক এর দৃষ্টিতে মৃত ক্ষেন্তিই আবার পুঁইশাক হয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।জন্মান্তরবাদে  বিশ্বাসী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে ক্ষেন্তির পুনরায় পুঁইশাক রূপে ফিরে আসার কথা বলেছেন।পুঁইশাক  ক্ষেন্তির খুবই প্রিয় ছিল। কিন্তু নিত্য অভাব-অনটনে  বাবা মায়ের সংসারে ক্ষেন্তির ইচ্ছেপূরণের কোন সুযোগই ছিল না । ক্ষেন্তি  রায়দের বাড়ি থেকে উচ্ছিষ্ট পুঁইশাক নিয়ে আসে । ক্ষেন্তির মা এগুলো দেখে ভীষণ রেগে যান। কিন্তু পরক্ষনে মেয়ের করুন মুখখানি মনে পড়ে। পুঁইশাকের প্রতি মেয়ের ভীষণ  দুর্বলতার কথা মনে করে মেয়েকে পুঁইশাকের চচ্চড়ি খাওয়ান। ক্ষেন্তি একটা পুই ডাটা রোপন করে পুঁইগাছ জন্মাবে বলে প্রতিদিনই খুব যত্ন করতো। এদিকে ঘটনাক্রমে অল্প বয়সেই ক্ষেন্তির বিয়ে হয়ে যায়।শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ক্ষেন্তির বসন্ত রোগ হয় এবং শ্বশুরবাড়ির অযত্ন-অবহেলায় একসময় বিনা যত্নে এক আত্মীয়র বাড়িতে ক্ষেন্তির করুন মৃত্যু হয় । এদিকে ক্ষেন্তির লাগানো প্রিয় পুই ডাটা থেকে পুঁই গাছের  চারা সজীব হয়ে জন্মাতে   থাকে।

লেখকের  দক্ষতায়, কল্পনার বুনিয়াদি উপস্থাপনায় পুঁইশাকের গজিয়ে ওঠা কে ক্ষেন্তির ফিরে আশার প্রতীক হয়ে পাঠকের মনে সান্ত্বনা জাগায়।ক্ষেন্তির খুবই প্রিয়  পুঁইগাছটি যেভাবে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে বেড়ে উঠেছে তাতে পুঁই গাছটিকে দেখে ক্ষেন্তির উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। মনে হয় যেন ক্ষেন্তি মরে গিয়ে পুঁইগাছ হয়ে পৃথিবীতে হাস হাস্যজ্জল ভাবে  ফিরে এসেছে। তাই বলা যায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি  যথার্থরূপেই সার্থক।

২. ‘পুঁইমাচা’ গল্পের মূলভাব লিখুন।

কালজয়ী ছোটগল্পকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ছোটগল্প পুঁইমাচা। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে তার প্রকৃতি চেতনা সমাজ বাস্তবতা ও দারিদ্র্যের নিখুঁত বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে গল্পটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। সহায়হরির সহায়হীন হতদরিদ্র পরিবারের করুন কাহিনী,নারীদের প্রতি অবহেলা, যৌতুক প্রথা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ বাস্তবতায় ক্ষেন্তির করুণ মৃত্যু ,হতদরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দারিদ্র্যের নিদারুণ অবহেলায় পুঁইমাচা প্রতীকের ভেতর দিয়ে ক্ষেন্তির ফিরে আসা ইত্যাদি বাস্তবিক বিষয় লেখক অত্যন্ত সমাজ সচেতন ভাবে তার লেখনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘পুঁইমাচা’ গল্পে দরিদ্র সহায়হরির একমাত্র মেয়ে  ক্ষেন্তি। অনেক কষ্টে অভাব-অনটনে সংসার চলে সহায় হরির। দারিদ্র্যের সাথে প্রতিদিন চলে তাদের  বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কিন্তু তার আদরের একমাত্র মেয়ে । সহায় সম্বলহীন পরিবারের প্রতি সমাজ এতটাই অসহযোগী আচরণ করল যে অসহায় অসহায় হরি একমাত্র মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। বাবার সংসারে কখনও সুখের মুখ দেখেনি মেয়েটি। ভালো কোন খাবার খায়নি,ভালো কোন কাপড় পরিধান করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। পুঁইশাক ছিলো ক্ষেন্তির প্রিয় খাবার।  বিয়ের পর সমাজ-সংসারের অনাদর অবহেলায় শ্বশুরবাড়ি ক্ষেন্তির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ক্ষেন্তির বসন্ত রোগ হয় এবং শ্বশুরবাড়ির অযত্ন-অবহেলায় একসময় বিনা যত্নে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ক্ষেন্তির মৃত্যু হয়।

এ গল্পে বর্ণিত দারিদ্র ও মৃত্যুর পথে লড়াই এবং হতদরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম গ্রামবাংলার প্রেক্ষাপটে পাঠকের মনকে বেদনায় অশ্রুসিক্ত করেছে।মূলত সহায়হরির পরিবারের করুন শূন্যতাই এ গল্পের মূল বিষয়বস্তু। দারিদ্র্যের কারণে অনাদর অবহেলায় ক্ষেন্তির মৃত্যু এবং পুঁই মাচা বা পুইশাকের ভেতর দিয়ে তার পরিবারে ফিরে আসার বিষয়টি ‘পুঁইমাচা’ গল্পের মূলভাব।

পাঠ-৬.৩: নিমগাছ (বনফুল)

১. নিম গাছের উপকারিতা বর্ণনা করুন।

অথবা, নিমগাছ গল্পের মূল বক্তব্য আলোচনা করুন।

অথবা. নিম গাছের সাথে বাড়ির লক্ষী বউটির তুলনামূলক একটি চিত্র অংকন করুন।

বাংলা ছোটগল্প রচনায় বনফুল এক ভিন্ন জগৎ সৃষ্টি করেছেন ।তিনি মূলত রূপক ধর্মী ছোটগল্প রচনা করে সমাজের মানুষের সচেতন করেছেন। বনফুল একজন সমাজ সচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক । নিমগাছ তার একটি রূপক ধর্মী ছোট গল্প । গল্পে নিমগাছটির আবর্জনার স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণ হলো নিমগাছের কেউ যত্ন নেয় না। অর্থসহ নিমগাছ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কত রকমের না কাজে আসে । মানুষ নির্মমভাবে  নিম গাছের উপকারি গুণসমূহ কাজে লাগায়। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের কাছে নিমগাছ তাই হয়ে উঠেছে একটি অত্যাবশ্যকীয় গাছ। কিন্তু নিমগাছটি থেকে উপকৃত হলেও এ গাছটির প্রতি মানুষের কোন যত্ন নেই ।গাছটি দারুন অবহেলায় আবর্জনার মধ্যে বেড়ে উঠে ।

নিমগাছটির আবর্জনার স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকার দ্বারা লেখক এ  বিষয়টি বুঝিয়েছেন যে, যারা উপকারি তারা সমাজ-সংসারে উপযুক্ত মূল্যায়ন পায়না ।তারা নিজেদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার পায় না। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন একজন গৃহবধূ পরিবারের সকলের কাজে আসেন কিন্তু বিনিময়ে তিনি কোন মূল্য পান না ।সংসারের শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে তাকে পরিবারে থাকতে হয়। উপকারী নিম গাছ থেকে যেমন আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তেমনি পরিবারের সকল সুখের কান্ডারী একজন গৃহবধূর স্থান হয় উচ্ছিষ্ট ভরা রান্না ঘরে। 

লেখক মূলত নিমগাছটির প্রতীকের বাংলার গৃহবধূদের  দুর্দশা ও বঞ্চনার দিকটি বোঝাতে চেয়েছেন। মোটকথা  একজন গৃহবধূ যেমন সংসারের জন্য নানা ত্যাগ স্বীকার করেও শুধু বঞ্চনা আর অবহেলা পান, ঠিক তেমনি নিমগাছও মানুষের শত উপকার করে পায় শুধু অযত্ন আর অবহেলা।

২. নিমগাছ গল্পের সার্থকতা বিচার করুন।

ছোটগল্প লেখক এর আত্মসচেতন সৃষ্টি । শেষ হয়েও হইল না শেষ এর মধ্যে ছোটগল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বৈশিষ্ট্যের আলোকে নিমগাছ সার্থকতা লাভ করেছে। গল্পে নিম গাছ এর শেষ পরিণতি গৃহস্থ বাড়ির গৃহকর্মীর সাথে  তুলনা করে লেখক চমক সৃষ্টি করেছেন। তাতে পাঠককুলের যেন আগ্রহের শেষ নেই । ছোট গল্পের বর্ণনা ভঙ্গিতে শব্দ বা বাক্য তার অর্থ কে ছাড়িয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি করে।

‘নিমগাছ’ গল্পে নিম গাছের উপকারিতা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নানা উপকার করে থাকে। নিম গাছের উপকারী গুণ গুলো  মানুষ কাজে লাগায়। যেমন: নিম গাছের পাতা , বাকল, কাঠ মানুষের উপকারী । মানুষ তবুও নিম গাছের যত্ন নেয় না বরং অনাদরে নোংরা আবর্জনায়  ফেলে রাখে। তদ্রুপ বাড়ির  গৃহকর্মী নিপুনা লক্ষ্মী বউটারও একই দশা।গৃহবধূ পরিবারের সকলের কাজে আসে কিন্তু বিনিময়ে পরিবার থেকে কোন ভালোবাসা পায় না। এদিক থেকে নিম গাছ একটি সার্থক ছোটগল্প । ছোট গল্পের চরিত্র গঠন বিন্যাস হয়ে তাকে সুসংবদ্ধ ও সুদৃঢ়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো ঘটনা, চরিত্র একেবারেই থাকে না। এদিক  থেকেও নিমগাছ সার্থক ছোটগল্প । ‘নিমগাছ’ ছোটগল্পের ভাষা অত্যন্ত আঁটসাঁট এবং চলিত ভাষা। চরিত্রও খুব একটা বেশি নয় ।

নিমগাছ প্রতীকী  চরিত্রের অন্তরালে গৃহবধূর সামাজিক অসঙ্গতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাঠকরা  তখনই বুঝতে পারে লেখক শেষ পর্যন্ত কি বলতে চাচ্ছেন । নিম গাছের রূপক এ লেখক একজন বাঙালি বধূর পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছেন। ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য হলো জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পরূপ। এ দিক বিবেচনায় নিমগাছ গল্পটি সার্থক। কেননা নিমগাছ গল্পে নিমগাছের উপকারিতার বদলে সমাজের মানুষের কাছে কোন আদর-যত্ন পায়নি বরং চিরদিন ময়লা-আবর্জনায় রয়ে গেছে। তদ্রুপ গৃহস্থ বাড়ির বউ ও সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারকে সেবা দিয়ে যায় কিন্তু প্রতিদানে পরিবার থেকে সে ভালবাসার পরিবর্তে পায় অবহেলা আর অবজ্ঞা।

ছোটগল্পে জীবনের কোনো এক খন্ডাংশ গড়ে তোলা হয় নিমগাছ গল্পটিতেও বৃহৎ পরিবারের একজন গৃহবধূ পারিবারিক নির্যাতনের চিত্র  লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। ছোটগল্পের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে পরবর্তী প্রত্যাশায়। নিমগাছ গল্পেও নিমগাছ এবং গৃহবধূর শেষ পরিণতি কি জানার আগ্রহ রয়ে যায়। ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পাঠকের মনে ব্যঞ্জনার অতৃপ্তি রয়ে যায়। নিমগাছটিও লেখকের সঙ্গে চলে যেতে চায় কিন্তু মাটির সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের কারণে তা পারে না । গৃহবধূও পরিবারের মায়া মমতার বন্ধন এর জন্য পরিবার ছেড়ে যেতে পারেনা ।

পরিশেষে বলা যায় একটি ছোট গল্পের যতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার সব বৈশিষ্টই নিমগাছ গল্পে রয়েছে । তাই ‘নিমগাছ’ নিঃসন্দেহে একটি সার্থক ছোটগল্প।

28Sep2020

পাঠ-৫.০: কবিতার স্বরূপ, শ্রেণিবিভাগ, তাৎপর্য

১) কবিতা কী? কবিতার শ্রেণিবিভাগ ব্যাখ্যা করুন।

কবিতা

কবি চিত্তে যে ভাবাতুর আবেগ তৈরি হয়, কবিতা সেই আবেগের রসায়নে সৃষ্ট আনন্দ বেদনার ফসল। তাই বলা হয়ে থাকে, কবি বেদনাবিদ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্মভূমি। আত্মগত ভাব- বিহ্বলতা কবিতা নয়, বরং বহিজর্গতের রুপ-রস-গন্ধ স্পর্শ, বস্তুজগত ও মনোজগতের সম্মিলনে যখন কবিমন আন্দোলিত হয়, তখন সেই আবেগকে কবি তাঁর অনুভূতি সিগ্ধ কল্পনায় অনন্য অবয়ব দান করে কবিতা সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ ভাবনাকে যথার্থ শব্দমালা দিয়ে কবি ছন্দরূপে ধারণ করেন। তাই বলা যায়, অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাণী বিন্যাসই কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,

‘অন্তর হতে আচরি বচন,

আনন্দলোক কবি বিরচন,

গীত রস ধারা করি সিঞ্চন,

সংসার ধূলিজালে।

কবিতার শ্রেণিবিভাগ

কবিতা অনেক রকম হয়ে থাকে।তবে রস ও রূপ তত্ত্বের বিচারে কবুতার ২ প্রকার। যথাঃ

[…]
27Sep2020

পাঠ-৪.০: ছড়া, ছড়ার প্রকারভেদ, বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্ব

১. ছড়া বলতে কী বুঝায়? ছড়ার প্রকারভেদ লিখুন। বলে?

ছড়া হলো সাহিত্যের এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শাখা। শিশু সাহিত্যে ছড়ার ভূমিকা অনন্য। ছড়ার আদি উৎস লৌকিক। সাহিত্যের একটি বিশেষ জনপ্রিয় শাখা হলো ছড়া। এর প্রচার বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই হয়ে থাকে। বাংলার এমন কোনো ঘর নেই যেখানে দু’ দশটি ছড়ার প্রচলন নেই। ছড়া শব্দটির উৎপত্তি ছট  ধাতু থেকে। ধারণা করা হয় ছড়ার ভাব বা চিত্ররাশি ছড়ানো-ছিটানো থাকে।তা থেকেই উৎপত্তি বলে অনুমান করা হয়।

ছড়ার সংজ্ঞা:

[…]
27Sep2020

পাঠ-৪.২: দুরের পাল্লা (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)

১. ‘দূরের পাল্লা’ ছড়া অবলম্বনে নদী তীরের দৃশ্যের বর্ণনা দিন।

ছন্দের যাদুকর নামে খ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা কবিতায় দৃশ্যপট অঙ্কনে শিল্পমনের পরিচয় দিয়েছেন। প্রকৃতি নির্ভর কবিতা রচনাতে তিনি স্বহস্তে যে সব দৃশ্যের অবতারণা করেছেন, তা সত্যিই তাকে একজন সব্যসাচী শিল্পী বলা যায়। তার দূরের পাল্লা কবিতায় নদীতীরের দৃশ্যের এক নান্দনিক অবতারণা ঘটেছে। নদীর পাড়ে ঝোপঝাড়, নদীর জলে শৈবাল, আর নদীর বাঁকে বাকে রয়েছে চর। জলে রয়েছে পানকৌড়ি, ক্ষেতে আছে রূপালি ধান, এখানে এভাবেই পল্লিবাংলার এক অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নদীতীরের অপূর্ব নান্দনিক রূপ সৌন্দর্য কলমের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এ দৃশ্য যেকোনা শিল্পমনা মানুষের মনকে আন্দোলিত করবে তাতে কোনাে সন্দেহ নেই।

২.  সত্যেন্দ্রনাথের ‘দুরের পাল্লা’ কবিতাটির ভাববস্তু ও বিষয়বস্তু আলোচনা করুন।

[…]
27Sep2020

পাঠ-৪.১: ষোলো আনাই মিছে (সুকুমার রায়)

১. সুকুমার রায় তাঁর ‘ষোলাে আনাই মিছে’ কবিতায় রূপকের অন্তরালে এক গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ করেছেন”-আলােচনা করুন।

বাংলা ছড়ার জগতে সুকুমার রায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তাঁর জাদুকরী হাতের স্পর্শে ছড়াকে মানুষের মনিকোঠায় পৌছে দিয়েছেন। শুধু আনন্দদানই তাঁর ছড়ার মূল লক্ষ্য নয় বরং তিনি কিছু কিছু ছড়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি জীবনযাত্রা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ছড়া হলাে “ষোলাে আনাই মিছে”। এ ছড়াটির মধ্য দিয়ে তিনি হালকা চালের মধ্য দিয়ে বাঙালি সাহেবদের চারিত্রিক মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ছড়াটির সাধারণ অর্থ হলাে লেখাপড়া জানা এক বাবু মশাই শখের বশে এক মাঝির নৌকায় চড়ে বসেন। নৌকায় ওঠার পর মাঝির সঙ্গে তার কথােপকথন হয়।

[…]
27Sep2020

পাঠ-৩.০: শিশুতোষ সাহিত্যের স্বরূপ, শ্রেণিবিভাগ ও তাৎপর্য

০১. শিশুতোষ সাহিত্য কি? শিশুতোষ সাহিত্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।

অথবা, ভাষা দক্ষতা বিকাশে শিশুতোষ সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা করুন।

শিশুতোষ সাহিত্য

শিশুতোষ কথাটির দুটি অংশ, ‘শিশু’ এবং ‘তোষ’। ‘শিশু’ কথাটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত, আর ‘তোষ’ এর অর্থ হলো আনন্দ বা খুশি। সাহিত্য হলো মানুষের চিন্তাধারা ও কল্পনার সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত লিখিত রূপ। প্রকৃতপক্ষে গল্প, ছড়া, কবিতার মাধ্যমে লেখকের চিন্তাধারা ও কল্পনার যে লিখিত রূপ দেখা যায়, তাই হলো সাহিত্য।

শিশুতোষ সাহিত্য হলো অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় লিখিত ছড়া, কবিতা ও গল্প যা শিশুর বয়স উপযোগী, চাহিদা অনুযায়ী লেখা হয়েছে এবং যা পড়ে শিশুরা আনন্দ পায় এবং খুশি হয়।।সহজ করে বললে শিশুদের উপযোগী সাহিত্যই হলো শিশু সাহিত্য।

ভাষা দক্ষতা বিকাশে শিশুতোষ সাহিত্যের ভূমিকা বা শিশুতোষ সাহিত্যের তাৎপর্য

[…]
27Sep2020

অধ্যায়-০৩: শিশুতোষ সাহিত্য

পাঠ-৩.৭- যদু মাস্টার

১. সৎ মানুষ কিভাবে পুরস্কৃত হয় যদু মাস্টার গল্প অবলম্বনে আলোচনা করুন।

অথবা, যদু মাস্টার গল্পের মূল বক্তব্য তুলে ধরুন।

সততা মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। এটি এমন এক পরশ পাথর যার স্পর্শে খারাপ মানুষও সৎ হয়ে উঠে। শত বিপদ আপদেও সৎ মানুষ কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেয় না। এমন একজন সৎ মানুষ হলেন যদু মাস্টার। তিনি তার পেশাগত জীবনে কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি ।সততাই ছিল তার চরিত্রের বড় অহংকার।

[…]

Ad

error: Content is protected !!