অধ্যায়-১৪: আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা
১.জাতিসংঘ কি? এর মৌলিক উদ্দেশ্য ও নীতিমালা ব্যাখ্যা করুন।
অথবা, জাতিসংঘ কীভাবে এবং কেন গঠিত হয়েছে ব্যাখ্যা করুন ।
অথবা, জাতিসংঘের মৌলিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সংসদে গৃহীত নীতিমালা গুলো উল্লেখ করুন।
বর্তমান বিশ্বে ১৯৬ টি দেশ রয়েছে। এসকল দেশগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম হলেও নানামুখী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং নিজেদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অন্যের সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সকলের সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা । এসব আঞ্চলিক সংস্থাসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ:
জাতিতে জাতিতে সংঘাত, স্বার্থের দ্বন্দ্ব মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে ।বিশেষ করে গত শতাব্দীতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহতা ,ধ্বংসের ব্যাপকতা এবং ভয়াবহ পরিণতি দেখে বিশ্বের মানুষ যুদ্ধের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিশ্ববাসীকে ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছিল। বিশ্বনেতৃবৃন্দ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা এবং সকলের মধ্যে সহযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি লীগ অফ নেশনস গঠন করেন ।বিভিন্ন কারণে এই সংস্থাটি অকার্যকর হয়ে পড়লে পুনরায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং মানব সভ্যতার স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৫সালের ২৪ অক্টোবর ৫১ টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে এক সনদ বা চার্টার স্বাক্ষরের মাধ্যমে জাতিসংঘ গঠিত হয় ।জাতিসংঘের বর্তমান সদস্য সংখ্যা১৯৩। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর অবস্থিত। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের১৩৭ তম সদস্য।
জাতিসংঘের মৌলিক উদ্দেশ্য:
জাতিসংঘ সনদে উল্লেখিত জাতিসংঘের প্রধান চারটি মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সেগুলো হলো:
১.সারা বিশ্বের শান্তি বজায় রাখা।
২.সকল জাতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়তা করা ।
৩.দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ক্ষুধা,রোগ-ব্যাধি ও অশিক্ষা দূরীকরণ এবং পরস্পরের স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে প্রত্যেক জাতিকে একত্রে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং
৪. লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন জাতির কার্যকলাপের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা।
উপরিউক্ত উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য সনদ অনুযায়ী জাতিসংঘের কতগুলো নীতি রয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ:
- সকল সদস্যকে জাতীয় মর্যাদা দিতে হবে।
- সনদ অনুযায়ী সকল সদস্য রাষ্ট্রই গৃহীত দায়িত্ব পালন করবে।
- আন্তর্জাতিক বিবাদ-বিসম্বাদসমূহ সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্র মিলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
- কোন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করবে না। *আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্রই বল প্রয়োগ করবে না ।
*বর্তমান সনদ অনুযায়ী জাতিসংঘ যেকোন দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলে সকল রাষ্ট্রই যথারীতি সাহায্য করবে এবং *জাতিসংঘের সদস্য নয় এমন সকল রাষ্ট্রও যাতে জাতিসংঘের নির্দেশ মেনে চলে তা লক্ষ্য রাখতে হবে।
২. জাতিসংঘ কয়টি বিভাগ নিয়ে গঠিত? সেগুলোর বিবরণ দিন।
অথবা, জাতিসংঘ কয়টি সংস্থা বা বিভাগ নিয়ে গঠিত? যেকোনো দুটি সংস্থার বিবরণ দিন।
উত্তর জাতিসংঘ প্রধানত ৬টি সংস্থা বা বিভাগ নিয়ে গঠিত। সেগুলো নিম্নরূপ:
১. সাধারণ পরিষদ
২.নিরাপত্তা পরিষদ
৩. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ
৪. অছি পরিষদ
৫.আন্তর্জাতিক আদালত
৬.জাতিসংঘ সচিবালয়
জাতিসংঘের অঙ্গীভূত সংস্থাসমূহের গঠন, কাজ এবং বিশ্ব মানবতার কল্যাণে সংস্থাসমূহের ভূমিকা সম্পর্কে নিচে বিবরণ দেওয়া হলো :
১.সাধারণ পরিষদ:
জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রই সাধারণ পরিষদের সদস্য। সকল সদস্য রাষ্ট্র কোন ইস্যুতে মাত্র একটি করে ভোটদানের অধিকার রাখে। সাধারণ পরিষদের নিয়মিত সভা সাধারণত প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়।এছাড়াও বিশেষ প্রয়োজন অনুসারে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রতি অধিবেশনের শুরুতেই সদস্যদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সভার কাজ পরিচালনা করেন। যে কোনো প্রস্তাব পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। এ পরিষদ প্রধানত মহাসচিব নিয়োগ, জাতিসংঘের বাজেট পাস ,বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে সহায়তা করা ,সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদেয় চাঁদা নির্ধারণ, নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচন, অন্যান্য সংস্থার বার্ষিক রিপোর্ট পর্যালোচনা ,নতুন সদস্য গ্রহণ এবং শর্ত ভঙ্গের কারণে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সদস্য নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এ পরিষদ করে থাকে।
২.নিরাপত্তা পরিষদ:
নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। এই বিভাগ ৫ টি স্থায়ী সদস্য এবং দশটি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ।অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র সাধারণ পরিষদের সদস্যদের ভোটে প্রতি দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ,যুক্তরাজ্য ,রাশিয়া, ফ্রান্স ও গণচীন। নিরাপত্তা পরিষদে ওঠার মত যে কোন প্রস্তাবের সাথে এই পাঁচটি রাষ্ট্র দ্বিমত পোষণ করলে সেটি আর অনুমোদিত হয় না, এ ক্ষমতাকে বলা হয় ভেটো।
বিশ্বশান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব এই পরিষদের ওপর । এই পরিষদ দ্বন্দ্বেরত দেশগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা, মধ্যস্থতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করে। কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৩. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ:
এই পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৫৪ জন ।প্রতি ৩ বছর অন্তর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর গ্রহণ করেন। প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে । সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে যেকোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বছরে কমপক্ষে ২ বার নিউইয়র্ক কিংবা জেনেভায় এই পরিষদের অধিবেশন বসে। পরিষদের প্রধান কাজ হল সদস্য দেশগুলোর মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বেকার সমস্যার সমাধান, শিক্ষার প্রসার ঘটানো, মানবাধিকার কার্যকর করার মাধ্যমে মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন। এছাড়াও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক বিষয়ে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ প্রেরণ করাও এই পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব।
৪.অছি পরিষদ:
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং নির্বাচিত অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে এই পরিষদ গঠিত। এই পরিষদের মাধ্যমে জাতিসংঘ বিশ্বের অনুন্নত অঞ্চল শাসনকার্যে দিক থেকে বিশৃংখল দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব নেয়। অছিভুক্ত অঞ্চলের উন্নতি এবং এলাকার অধিবাসীদের দেশ শাসনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই হচ্ছে অছি পরিষদের কাজ ।
৫. আন্তর্জাতিক আদালত :
১৫ জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক আদালত হল জাতিসংঘের বিচারালয়। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দি হেগ শহরে এটি অবস্থিত। জাতিসংঘের যে কোন সদস্য রাষ্ট্র যেকোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার জন্য এই আদালতে বিচার প্রার্থী হতে পারে। এই আদালতের রায় নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক কার্যকরী করা হয় ।
৬.জাতিসংঘ সচিবালয়
জাতিসংঘ সচিবালয় হল জাতিসংঘের প্রশাসনিক বিভাগ। মহাসচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে এটি গঠিত। মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ৫ বছরের জন্য নিযুক্ত হন। জাতিসংঘ সচিবালয় তার অন্তর্ভুক্ত ৯ টি বিভাগের মাধ্যমে সকল প্রশাসনিক কাজগুলো পরিচালনা করে থাকে।
৩. বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা আলোচনা করুন।
মূলত বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল । প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বে বিরাজমান নানা সমস্যার সমাধানে এ প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে জাতিসংঘের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ববাসীকে যুদ্ধভয় থেকে মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা, বিবাদমান দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ,অকার্যকর চুক্তির পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আইনের পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উন্নতি, প্রগতি এবং সংহতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জাতিসংঘ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর সদস্যগণ জাতিসংঘের বিশ্বশান্তি রক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বীরত্ব ও প্রশংসার সাথে কাজ করে যাচ্ছে ।জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বার্থ, শিক্ষা ,শ্রম, মানবাধিকার সংরক্ষণ প্রবৃত্তি ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে আসছে যা প্রশংসার দাবিদার ।ক্ষুধা-দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ,মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ দূষণ জনিত সমস্যা মোকাবেলা, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ, নারী ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে জাতিসংঘ মানবকল্যাণে শক্তিশালী ভূমিকা রেখে চলেছে।
মোটকথা বিশ্বব্যাপী সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সাধন করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র এবং দুর্বল দেশগুলোর জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতিসংঘ তার অঙ্গীভূত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশু কল্যাণ ,নারী কল্যাণ, জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন, মানবাধিকার বাস্তবায়ন ,শিক্ষা,স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিবাদ সমস্যার সমাধান ইত্যাদি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে।
৪. জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল কি ? এর কাজ কি?
অথবা, ইউনিসেফ শিশুদের জন্য কি কি কাজ করে?
এই সংস্থাটি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় আবাস হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন দেশের সরকার, সম্প্রদায় ও পরিবারকে সাহায্য করে। ১৯৪৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের একমাত্র সংস্থা ইউনিসেফ যা শিশু ও নারী অধিকার নিশ্চিত করতে কঠোরভাবে নিবেদিত । ইউনিসেফের শিশু অধিকার কনভেনশন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়স্ক সকলেই শিশু হিসেবে বিবেচিত। ইউনিসেফ ১৬১ টি দেশে কাজ করে ।সুন্দর জীবন যাপনে উৎসাহিত করা, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ও মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে সহায়তা ,গর্ভধারণ ও শিশু জন্ম নিরাপদ করা, লিঙ্গবৈষম্য প্রতিহত করা ,মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সমাজকে সচেতন করা, কিশোর-কিশোরীদের সমাজের যোগ্য নাগরিক হিসেবে টিকে থাকার জন্য দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা ও তাদের বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া। জরুরি অবস্থায় সাড়া প্রদান যেমন দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহায্য নিয়ে শিক্ষায়তন পুনরায় চালু করা ও শিশুদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করাও ইউনিসেফের কাজ। ইউনিসেফ মানব সেবা মূলক কাজের জন্য১৯৬৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে। এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে।
৫.ইউনেস্কো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নে কি কি ভূমিকা পালন করে তা ব্যাখ্যা করুন?
মানবজাতির মানবতা ,বিচার বুদ্ধি, চিন্তা ও নৈতিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির গড়ে তোলার জন্য ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এর সদর দপ্তর অবস্থিত। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৮৯। এই সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ,বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন এ ৪টি ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে।
ইউনেস্কো কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো শান্তি ও মানব সংস্কৃতির বিকাশ সাধন এবং উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করা। সকলের জন্য শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ -গবেষণার উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য লালনে সহায়তা, বিশ্বের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসার, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুই বছর পর পর ইউনেস্কোর পরিচালনা সভায় সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে গৃহীত কর্মসূচিগুলোর অগ্রগতি তদারকি করেন ।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২৭ অক্টোবর এ সংস্থায় যোগদান করে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ ইউনেস্কো কমিশন গঠন করে।এটি বাংলাদেশ ইউনেস্কোর কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করে থাকে। ইউনেস্কো বাংলাদেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ, বয়স্ক শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়ন , যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ইউনেস্কোর উদ্যোগেই বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুন্দরবন সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (যেমন বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার) সংরক্ষণেও ইউনেস্কো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
৬. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কাজ কি?
১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত হয় ।জেনেভা শহরে এ সংস্থাটির সদর দপ্তর অবস্থিত। ১৯১ মন্তব্য রাষ্ট্র এ সংস্থার সদস্য। বছরে একবারের সভা বসে। এর প্রধানকে বলা হয় মহাপরিচালক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কাজ: এ সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন জাতিসমূহের স্বাস্থ্য- সুরক্ষায় কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করে রোগ প্রতিরোধ ,নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের বিভিন্ন রকম কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করার চেষ্টা চালায় ।বিশ্বের সকল মানুষের জন্য সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য- সুবিধা নিশ্চিত করাই এ সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্য কার্যকরী করার জন্য WHO নিম্নলিখিত কাজগুলো করে থাকে:
- দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে অতিরিক্ত মৃত্যুহার,স্বাস্থ্যহীনতা ,প্রতিবন্ধিত্ব হ্রাস করা ।
- *সুস্থ জীবন বিকাশের পথে স্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশগত,অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আচরণগত যে হুমকি সৃষ্টি হয় তা কমিয়ে আনা।
- এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকাশ ঘটানো যা সুসময ও কার্যকর ।আর্থিক বিবেচনায় ন্যায্য ও সহজপ্রাপ্য ।
- যথাযথ স্বাস্থ্য নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ তৈরী এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ,পরিবেশগত ও উন্নয়ন নীতিতে স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব প্রদান।
WHO বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যেমন-
- এদেশ থেকে সংক্রামক ব্যাধি দূরীকরণে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে
- এদেশের শিশুদের ৬ টি মূল রোগ যথা: ডিফথেরিয়া, হাম, টিটেনাস, যক্ষ্মা, পোলিও হুপিং কাশি দূরীকরণ ও প্রতিরোধে WHO বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।
- এছাড়াও এদেশ থেকে ম্যালেরিয়া দূরীকরণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পয়নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য সংস্থাটি কাজ করছে।
৭. জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি এর কাজ কি?
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা এবং জাতিসংঘের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে থাকে। সংস্থাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের জন্য বছরে মোট ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ দিয়ে থাকে। এটি জাতিসংঘের সবচেয়ে বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই সংস্থা সম্পদ ও সহযোগিতার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারের জন্য সকল অংশীদারদের নিয়ে একযোগে কাজ করে থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে এই সংস্থা বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ইউএনডিপি সদর দপ্তর অবস্থিত।
৮ .আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা ILO কি? এর কাজ কি?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা যা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার উত্তরণের প্রচেষ্টায় কাজ করে । আইএলও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি ও কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে একটি আন্তর্জাতিক শ্রমমান গড়ে তুলে, যা এসব নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। এসব নীতিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারকে কারিগরি সহযোগিতা, বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের সহায়তা এবং এসব কর্মসূচির সার্থক বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, গবেষণা প্রভৃতি কাজে আইএলও সহায়তা করে। আইএলও শ্রম প্রসঙ্গে যেকোনো নীতিনির্ধারণ ও সরকারের শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর সদর দপ্তর জেনেভায় অবস্থিত।
৯. বিশ্ব ব্যাংক কি বা WB কি?
বিশ্ব ব্যাংক :বিশ্ব ব্যাংক হচ্ছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের একটি গোষ্ঠী। দরিদ্র দেশসমূহের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য হ্রাস করাই হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের সাধারণ লক্ষ্য । এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সহায়তাদান। প্রত্যেক সদস্য দেশের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত একটি পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক বিশ্বব্যাংক পরিচালিত হয়। এর প্রধানকে বলা হয় প্রেসিডেন্ট এবং সদর দপ্তর ওয়াশিংটনে অবস্থিত।
১০. সার্কের মূল নীতিগুলো উল্লেখ করুন।
সার্কের মূলনীতি:সার্কের মূলনীতি সমূহ নিম্নরূপ:
- এ সংস্থার যেকোন সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ভাবে গৃহীত হবে।
- দুটি দেশের মধ্যকার বিরোধ সংক্রান্ত কোন সমস্যা এ সংস্থায় আলোচনা করা যাবে না।
- সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিকতা, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক কল্যাণকে সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হবে এবং
- এ অঞ্চলের দেশগুলোর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি লক্ষ্য রেখে সার্ক ভূমিকা গ্রহণ করবে।
১১. সার্ক গঠনের উদ্দেশ্য কি?
সার্ক গঠনের উদ্দেশ্য:
১. সার্কভুক্ত দেশগুলোর জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা;
২. এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন ও সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করা;
৩. দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে জাতীয়ভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
৪. এ অঞ্চলের রাষ্ট্র গুলোর সাধারণ স্বার্থে সহানুভূতি ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা;
৫. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন ;
৬. আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া;
৭. সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান সমস্যা দূর করে পারস্পরিক সমঝোতা সৃষ্টি করা;
৮. দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখণ্ডতার নীতি মেনে চলা; এবং
৯. অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
১২. আঞ্চলিক সহযোগিতা সংগঠন হিসেবে সার্ক এর উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব উল্লেখ করুন।
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংগঠন হিসেবে সার্ক এর উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব :সার্ক বিভিন্নভাবে অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে। বিভিন্ন সার্কভুক্ত দেশগুলো একে অপরের উন্নয়নে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সার্ক অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো অভিন্ন স্বার্থ নিয়ে কাজ করছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর বেশকিছু অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। যেমন: নিরক্ষরতা ,পরিবেশ দূষণ, সন্ত্রাস, শিশু ও নারী পাচার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভিন্ন নদীর পানি বন্টন, বিদ্যুৎ শক্তির সংকট ,খাদ্য সমস্যা ইত্যাদি।
সার্ক এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এটাই সার্কভুক্ত দেশগুলোর জনগণের প্রত্যাশা।
এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে মানব পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা ধরনের যৌথ উদ্যোগ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সার্কভুক্ত দেশগুলো অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।
সর্বোপরি অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে অর্থনৈতিক ,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সার্ক এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।
