বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (বিষয়জ্ঞান), অধ্যায়-১৩ - Proshikkhon

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (বিষয়জ্ঞান), অধ্যায়-১৩

অধ্যায়-১৩: অধিকার, দায়িত্ব ও মানবাধিকার

১. মানবাধিকার সংরক্ষণে নাগরিকের দায়িত্ব কর্তব্য লিখুন।

অথবা, মানবাধিকার কী? প্রধান প্রধান মানবাধিকার গুলোর বর্ণনা। একজন নাগরিক হিসেবে মানবাধিকার সংরক্ষণের আপনি কী ভূমিকা পালন করবেন ?

অথবা, “মানবাধিকার সংরক্ষণ রাস্ট্র মুখ্য ভূমিকা পালন করে” -এর যথার্থতা ব্যাখ্যা করুন ।

মানবাধিকার :

মানুষ হিসেবে আমাদের সবার সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এ জন্য আমাদের কিছু সুযােগসুবিধা দরকার হয়। যেমন-শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা, স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযােগ। মানুষের ভালােভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়ােজনীয় এসব সুযােগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারগুলােকে বলা হয় মানবাধিকার। মানবাধিকার হলাে সেইসব অধিকার যা নিয়ে মানবশিশু জন্মগ্রহণ করে এবং যা অর্জিত হলে সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে পারে । একজন মানুষকে যেকোনাে সমাজে-রাষ্ট্রে-পরিবারে-শ্রেণিতে-লিঙ্গে সম্প্রদায়ে-ধর্মে-জাতিগােষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করে না কেন, এই অধিকারগুলাে তার ন্যায্য পাওনা। কেউ এগুলাে থেকে তাকে বঞ্চিত করতে পারে না। এগুলাে পাওয়ার ব্যাপারে কারাে উপর কোনাে শর্ত আরােপ করা চলবে। , কারাে বেলায় এগুলাে কমানাে-বাড়ানােরও অবকাশ নেই।

বিশ্বের মানুষের কতগুলাে অভিন্ন অধিকার আছে, যাকে মৌলিক মানবাধিকার বলে । যেমন-সব মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার, শিক্ষা গ্রহণের অধিকার, বিচার পাওয়ার অধিকার, নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, নিরাপত্তা লাভের অধিকার, নিজের মত প্রকাশের অধিকার, সমান মজুরি পাওয়ার অধিকার ইত্যাদি। মানবাধিকার একটি সর্বজনীন অধিকার। এটি মানুষের এমন কিছু সহজাত অধিকার যা ছাড়া মানুষের সত্যিকার বিকাশ সাধন হয় না। মানবাধিকারকে মানুষের জন্মগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চল নির্বিশেষে মানবাধিকার সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। মানুষের শারীরিক, মানসিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি অধিকার মানবাধিকারের অন্তর্গত। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘােষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণায় (The Universal Declaration of Human Rights) বর্ণিত অধিকার গুলি বর্তমানে মানবাধিকার হিসেবে খ্যাত। ৩০টি অনুচ্ছেদে সংবলিত এই ঘােষণায় মােট ২৫টি মানবাধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তার মধ্যে ১৯টি নাগরিক ও রাজনৈতিক এবং অন্য ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কিত অধিকার। এর মধ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭টি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (মণ্ডল ও মণ্ডল, ১৯৯৯)।

 নিচে প্রধান প্রধান মানবাধিকার বর্ণনা করা হলাে :

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার :

বিভিন্ন মানবাধিকার সনদে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকারের অন্যতম অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের মূল বক্তব্য হলাে- জাতি, গােত্র, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের বেশ কিছু নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে। মানুষের 

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে উল্লেখযােগ্য বিভিন্ন অধিকার হলাে : জীবন রক্ষার অধিকার, নির্যাতন ও মানবিক আচরণ হতে মুক্তি, দাসত্ব ও বাধ্যতামূলক শ্রম হতে মুক্তি, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার, আটক ব্যক্তির মানবিক আচরণ পাবার অধিকার, ক্ণের দায়ে কারাবাস না থাকার স্বাধীনতা, চালাচল (বা স্থানান্তর) এবং নিবাস পছন্দের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশিদের খামখেয়ালিভাবে বহিস্কৃত না হবার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ বিচার পাবার স্বাধীনতা, পূর্ব থেকে কার্যকর বলে পরে ঘােষিত কোনাে অপরাধ আইন থেকে রক্ষা পাবার অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবার অধিকার, গােপনীয়তা রক্ষার অধিকার, চিন্তা, বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতামত দান ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যুদ্ধের প্রচারণা ও জাতিগত, গােষ্ঠীগত বা ধর্মীয় ঘৃণা উদ্রেককারী প্রচারণার উপর বিধি নিষেধ, সমবেত সংগঠন করার অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা, বিবাহ ও পরিবার গঠনের অধিকার, শিশুদের অধিকার, রাজনীতি করার অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমান, সংখ্যালঘুদের অধিকার। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারঃ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার মূলত মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও মর্যাদার জন্য অপরিহার্য । সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা পাবার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলাে তার নাগরিকের মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্ব নেয়া। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই মানবাধিকারের মধ্যে বিভিন্ন অধিকার অন্তর্ভুক্ত। সেগুলাে হল: কাজের অধিকার, কাজের যথার্থ ও অনুকূল পরিবেশ পাওয়ার অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও এতে অংশগ্রহণের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার, পরিবার সংরক্ষণ এবং মা ও শিশুর সাহায্য-সহযােগিতা পাওয়ার অধিকার, জীবনযাত্রার যথাযথ মান উপভােগের অধিকার, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রাপ্য সর্বোচ্চ মান উপভােগের অধিকার, শিক্ষালাভের অধিকার এবং এই অধিকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের এবং বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সুযােগলাভের অধিকার। দলীয় অধিকারঃ বিভিন্ন দলীয় অধিকারসমূহ মানবাধিকারের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সমস্ত দলীয় অধিকারের মধ্যে নারীর অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকার, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার, সংখ্যালঘু ভাষিকের অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, অভিবাসন শ্রমিকের অধিকার, প্রতিবন্ধীর অধিকার, সংখ্যালঘু যৌনকর্মীর অধিকার এবং বন্দির অধিকার উল্লেখযােগ্য। মূলত মানবাধিকারের মাধ্যমে এই সমস্ত দলের একদিকে যেমন মানুষ হিসেবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে মানুষ হিসেবে সমাজে তাদের মর্যাদা অক্ষুন্ন ও সমস্ত বৈষম্য নিরসনের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংরক্ষণে নাগরিকের দায়িত্ব কর্তব্যঃ যদিও মানবাধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্র ভূমিকা পালন করে থাকে, তবুও মানবাধিকার যাতে সুরক্ষিত থাকে সেজন্য নাগরিক একদিকে যেমন রাষ্ট্র ও সরকারকে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়ােগ, কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে অন্যের মানবাধিকার সংরক্ষণে ব্যক্তি নিজে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না সে ব্যাপারে সচেতন থেকে মানবাধিকার সংরক্ষণে সার্বিক ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদসমূহ অনুমােদন ও স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানেও মানবাধিকারের বিভিন্ন অধিকারসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ইউএন প্যারিস নীতিসমূহের ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেন। বর্তমানে এই কমিশন মানবাধিকার সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলছে। তবে মানবাধিকার সংরক্ষণে নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য । যদি প্রতিটি নাগরিক অন্যের প্রতি ও রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা যথাযথভাবে পালন করে তাহলে প্রতিটি নাগরিকের যে মানবাধিকার রয়েছে তা পূরণের নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব।

 নিচে মানবাধিকার সংরক্ষণে নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আলােচনা করা হল :

১) মানবাধিকার সংস্কৃতি উন্নয়নে সহায়তা করাঃ 

নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণে মানবাধিকার বানধৰ সমাজ গঠন করা প্রয়ােজন ।সমাজে হদি মানবাধিকার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠে তাহলে শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করে মানবাধিকার সংরক্ষণ করা কঠিন। মানবাধিকার সংস্কৃতি গড়ে উঠার জন্য নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সর্বাধিক। একটি দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক মানবাধিকারের ইসু সমূহের সাথে পরিচিত না হয় তাহলে মানবাধিকারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।

২) সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে ডায়ালগে ও পার্টনারশিপে অংশগ্রহণ করা  :

মানবাধিকারের বিষয়টি একটি যৌধ। প্রচেষ্টা। কোন ব্যক্তি, সংগঠন  রাস্ট্রএককভাবে মানবাধিকার সংরক্ষণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে না। প্রত্যেকটি নাগরিক সংগঠন ও সরকার এর সমন্বিত এবং যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়ােজন  বিভিন্ন ডায়ালগ ও পার্টনারশিপের। নাগরিক হিসেবে একজন ব্যক্তির উচিত এই ডায়ালগ এবং পার্টনারশিপ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ, কর্মপরিকল্পন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।

 ৩) মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাঃ

 মানবাধিকার সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইন রয়েছে। প্রত্যেকটি নাগরিকের অন্যতম দ্যয়িত্ব ও কর্তব্য হল ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মানবাধিকার সংরক্ষণে সহায়তা প্রদান করা ।

৪) মানবাধিকার বিষয়ে সচেতন হওয়াঃ

 প্রত্যেক নাগরিক যদি মানবাধিকার বিষয়ে সচেতন হয় তাহলে মানবাধিকার সংরক্ষণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষত মানবাধিকার বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যসূচিতে অশগ্রহণ নিজেকে সক্রিয় হতে হবে। 

৫) সমাজে গণতান্ত্রিক চর্চা ও উন্নয়নে সহায়তা করা :

 মানবাধিকার সংরক্ষণে সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চার ধারা অব্যাহত রাখা জরুবি। গণতন্ত্রকে মানবাধিকারের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করা হয়। যে সমাজ যতটা গণতান্ত্রিক সে সমাজ ততটা সভ্য। অন্যদিকে সভ্যতা মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় সূচক। 

৬) মানবাধিকার ডিফেন্ডারের পক্ষে ও সহিংসতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়া :

প্রত্যেক নাগরিকের উচিত মানবাধিকার যেই লংঘন করুক। না কেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং তার প্রতিবাদ করা এবং সহিংস আচরণের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে অবস্থান নিয়ে ঐ ব্যক্তিকে সাহস যােগানাে ও মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা করা।

 ৭) মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়া তৈরিতে সহায়তা করা :

মানবাধিকার সংরক্ষণে মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হল মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়া গঠনে অব্যাহত সহায়তা প্রদান।

৮)  ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা:

প্রতিটি সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগােষ্ঠীর পাশাপাশি সংখ্যালঘিষ্ট জনগােষ্ঠী বাস করে। মুসলমান বাংলাদেশে প্রধান ধর্মীয় গােষ্ঠী হলেও এখানে অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেমন- হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদির বসবাস রয়েছে। ফলে প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হল এই সমস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তাদের মানবাধিকার সংরক্ষণে সহায়তা করা।

 ৯ ) নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা : 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার সম্মুখীন হয়। প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নারীর প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ হচ্ছে সে বিষয়ে সচেতন হয়ে বৈষম্য নিরসনে উদ্যোগী ভূমিকা রাখা। 

১০) অন্যের মতামতে শ্রদ্ধাশীল থাকা :

প্রত্যেক নাগরিক অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে তারা  মানবাধিকার সংরক্ষণে শুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্যক্তি যখন অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলবে তখন সমাজে সহিংসতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে।

১১) ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়াঃ 

বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বসবাস রয়েছে। এদের অনেকের মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। নাগরিকের দায়িত্ব হচ্ছে এদের মানবাধিকারের প্রতি যত্নশীল হওয়া। এর ফলে তাদের মানবাধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব।

উপসংহারঃ 

মানবাধিকার রক্ষার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত। মানবতার মুক্তির জন্য এতে কাজ করা হয়। এটি মানবীয় কল্যাণের জন্য নিবেদিত । যার ফলে বিশ্বব্যাপী গঠিত হয়েছে মানবাধিকার কমিশন।

২. অধিকার বলতে কী বােঝায়? শিশুর কী কী অধিকার থাকার প্রয়ােজন? শিশু তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর মনে কী প্রভাব পড়তে পারে? 

অথবা, শিশুর কী অধিকার থাকার প্রয়ােজনা শিশু তার অধিকার থেকে বাঞ্চিত হলে শিশুর মনে কী প্রভাব পড়বে? 

অথবা ,, অধিকার বলতে কি বুঝায়? শিশুর কি কি অধিকার থাকা প্রয়ােজন? শিত তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর মনে কি প্রভাব পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন? 

অধিকারঃ 

অধিকার হলাে সে সকল বাহ্যিত  যা মানসিক পরিপুষ্টি সাধন করে থাকে। আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। মূলত একটি রাষ্ট্রের চরিত্র বােঝা সম্ভব হয় ঐ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কতটুকু অধিকার দিচ্ছে তার মাধ্যমে। রাষ্ট্র কতটুকু জনকল্যানকর তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের নাগরিকেরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার কী পরিমাণ ভােগ করে তার উপর ।রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাস্কির মতে, “প্রত্যেক রাষ্ট্রই পরিচিতি পায় তার প্রদত্ত অধিকার পরিচর্যা ও লালন পালন দ্বারা (ভুইয়া, ১৯৯৭)। প্রচলিত অর্থে অধিকার হলাে মানুষের ইচ্ছা পূরণের ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতা ও

অধিকারের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। অধিকার হলাে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত দাবি। ক্ষমতা তখনই অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে যখন রাষ্ট্র ঐ ক্ষমতা স্বীকৃতি ও অনুমােদন দেয়। অধিকারের বিষয়টি সর্বজনীন। মূলত সমাজের উন্নতি, কল্যাণ সাধন এবং ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্র সমাজে বসবাসরত জনগােষ্ঠীর অধিকার পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করে থাকে।

শিশু অধিকারঃ

 বিভিন্ন ডকুমেন্ট অনুযায়ী শিশুদের অধিকারগুলাে হলাে; ১) শিক্ষার অধিকার; ২) বেঁচে থাকা ও নিরাপত্তা লাভের অধিকার; ৩) খাদ্য, পুষ্টি ও চিকিৎসার অধিকার; ৪) সম্পদের অধিকার; ৫) স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাস ও কাজের অধিকার; ৬) একটি নাম পাওয়ার ও জন্ম রেজিস্ট্রেশনের অধিকার; ৭) ভালাে ব্যবহার পাওয়ার অধিকার; ৮) শারীরিক নির্যাতিত ও যৌন হয়রানির শিকার না হওয়ার অধিকার; ৯) শিশু শ্রমে জড়িত হওয়ার অধিকার; ১০) অল্প বয়সে বিয়ে না করার অধিকার; ১১) খেলাধুলা ও বিনােদনের অধিকার; ১২) ছেলে-মেয়ে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি নির্বিশেষে সবার সমান সুযােগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার; ১৩) আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার; ১৪) মা-বাবার সাথে একসাথে বসবাসের অধিকার; ১৫) অবৈধভাবে বিদেশে পাচার না হওয়ার অধিকার; ১৬) তথ্য পাওয়ার ও মত প্রকাশের অধিকার; ১৭) কর্মক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বীকার না হওয়ার অধিকার; ১৮) অবহেলা, শোষণ ও নির্যাতনের শিকারে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার; ইত্যাদি। 

অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর মনে প্রভাবঃ 

উপরােক্ত অধিকার গুলি থেকে বঞ্চিত হলে শিশু মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে এসব অধিকার বাস্তবায়নের পরিমাণ খুবই কম। এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে শিশুরা নিরাপত্তাহীন, নির্ভরশীল ও অবহেলিত হয়। শিশুরা সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং সুন্দর ব্যক্তিত্ব নিয়ে গড়ে উঠতে পারে না এবং বিভিন্ন ধরণের দৈহিক ও মানষিক ক্ষতির শিকার হয়। শিশু মনে দেখা দেয় অস্থিরতা। শিশুর অধিকারের গৃহীত আইনগুলাের কার্যকারিতাও যৎসামান্য। ফলে আমাদের দেশের শিশুরা প্রতিনিয়ত তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন শিশুর নিজের ক্ষতি করছে, অন্যদিকে শিশুর আদর্শ ও সক্রিয় নাগরিক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এ অবস্থার উত্তরণ প্রয়ােজন।

৩. রাষ্ট্রের প্রতি আদর্শ নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্ণনা করুন।

অথবা, নাগরিকের দায়িত্ব কর্তব্য ব্যাখ্যা করুন।

রাষ্ট্র গঠনের মূল উপাদান হলো নির্দিষ্ট জনসমষ্টি, যাদেরকে রাষ্ট্রের নাগরিক বলা হয়। নাগরিক রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি। নাগরিক রাষ্ট্রকে দিয়ে অধিকার ভোগ করে। আদর্শ নাগরিক রাষ্ট্র প্রদত্ত  অধিকার ভোগ করে রাষ্ট্রের প্রতি যথার্থ দায়িত্ব পালন করে।অধিকারের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকেরই রাষ্ট্রের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। রাষ্ট্রের প্রতি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি রাষ্ট্রব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেক কর্তব্য রয়েছে যেগুলাে আইন কর্তৃক অনুমােদিত এবং এই কর্তব্যসমূহ পালন না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। 

নিচে নাগরিকের প্রধান প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্ণনা করা হলো :

১. রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য :

 নাগরিকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলাে রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংহতি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষিত হয়। আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে নাগরিক অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা ও বৈদেশিক আক্রমণ হতে দেশকে রক্ষায় সহায়তা করে থাকে।

২. আইন মান্য করা

রাষ্ট্রের আইন মানা নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। আইন অমান্য করলে নাগরিককে শাস্তি পেতে হয়। মূলত রাষ্ট্রের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়। দেশের আইন মান্য করাকে সমাজ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়

৩. কর প্রদান

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিককে আয় অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে কর প্রদান করতে হয়। তাই প্রত্যেক নাগরিকের উচিত সময়মত কর প্রদান করা।

৪, ভোটদান করা : 

প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হলাে ভােটাধিকার প্রয়ােগের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা। সততা ও নিষ্ঠার সাথে সৎ ও যােগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধনে নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৫. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করা :

দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রত্যেক নাগরিকের উচিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে প্রয়ােজন অনুযায়ী সার্বিক সহায়তা প্রদান করা। আইন-শৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকলে নাগরিকগণ সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারবে।

৬. অন্যায়ের প্রতিবাদ করা :

 সমাজের বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। অন্যায়ের প্রতিবাদের মাধ্যমে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় ।

৭. সহিষ্ণুতা প্রদর্শন :

 নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হলাে প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা। প্রত্যেকের মতামতকে গুরুত্বসহকারে শােনা এবং যৌক্তিক মতামতকে গ্রহণের মানসিকতা থাকা।

রাষ্ট্রের সুনাগরিক হতে হলে নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। এগুলাে আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে একইভাবে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত-কর্তব্যসমূহ যথাযথ ভাবে পালন করতে হবে।

৪. অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার এর গুরুত্ব বর্ণনা করুন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আইনগত অধিকারসমূহ উল্লেখ করুন।

শিশু অধিকার একটি সার্বজনীন বিষয়। শিশুর প্রতিটি অধিকার প্রত্যেক শিশুর পারিবারিক, সামাজিক ও এবং পরিপূর্ণ সুষম বিকাশের জন্য অপরিহার্য। বিষয়টি অটিস্টিক ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানবিক মর্যাদা শিশুদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অটিস্টিক শিশুর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক ধরনের নিউরাে। ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা। অটিস্টিক ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সাধারণ শিশুদের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। ফলে তাদের অধিকার অনুধাবন ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। পরিবার থেকে শুর করে বিদ্যালয়, কমিউনিটি, সমাজ তথা রাষ্ট্রের সকল সম্ভাব্য জায়গায় যাতে এসব শিশু তাদের সকল ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত বা বৈষম্যের শিকার না হয়, গুরুত্ব সহকারে তা নিশ্চিত করতে হবে।তারা যাতে মর্যাদা সহকারে সমাজে একজন উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এজন্য শিক্ষা ও প্রয়ােজনীয় অন্যান্য দিকের প্রতি আমাদের আন্তরিক ও যত্নশীল হতে হবে ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমঅধিকার, মানবসত্তার মর্যাদা, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এই অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদ ‘United Nations Convention on the Rights of the Persons with Disabilities,2006’ অনুসমর্থন করে। ফলশ্রুতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে এতদসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রহিতক্রমে পুনঃপ্রণয়নের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়ােজনীয় বলে মনে করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জাতিসংঘ সনদের উপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে সমান সুযােগ এবং সব ধরনের বৈষম্য হতে মুক্তি লাভের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে।

এ আইনের ১৫ নং ধারার ১ নং উপ ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যে সকল আইনগত অধিকার লাভ করবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিম্নে কিছু অধিকার তুলে ধরা হলোঃ

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আইনগত অধিকারসমূহ:

@পূর্ণমাত্রায় বেঁচে থাকা;

 @সর্বক্ষেত্রে সমান আইনি স্বীকৃতি এবং বিচারগম্যতা;

@স্বাধীন অভিব্যক্তি ও মত প্রকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তি;

@প্রবেশগম্যতা;

@ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে,প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী, পূর্ণ ও কার্যকর ভাবে অংশগ্রহণ;

@শিক্ষার সকল স্তরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত সুযােগ;

সুবিধা প্রাপ্তি সাপেক্ষে, একীভূত বা সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণ;

@সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মে নিযুক্তি;

@কর্মজীবনে প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তি কর্মে নিয়োজিত থাকিবার, অন্যথায় যথাযথ পুর্নবাসন বা ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি;

@ নিপীড়ন হইতে সুরক্ষা এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এর সুবিধা প্রাপ্তি;

@ প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সর্বাধিক মানে স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি;

@ শারীরিক, মানসিক ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করিয়া সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে একীভূত হইবার লক্ষ্যে সহায়ক সেবা ও পূর্ণবাসন সুবিধা প্রাপ্ত।

এছাড়া উপধারা(২)এ বলা হয়েছে যে, কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে উপ-ধারা (১) এ উল্লেখিত অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা কোন প্রকারের বৈষম্য প্রদর্শন বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার ব্যাপারে এ আইনের ৩২ নং ধারার ১ নং উপধারায় বলা হর “প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনাে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তৃপক্ষ উক্ত ব্যক্তির অন্যান্য যােগ্যতা থাকা সত্তে ভর্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করিতে পারিবেন না। একই সাথে উপধারা নং ২ এ বৈষম্যের শিকার প্রতিবন্ধী

ব্যক্তি উক্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির নিকট অভিযােগ দায়ের করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনরূপ বৈষম্য দূরীকরণের জন্য ৩৫ নং ধারায় বলা হয়ছে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না । অপর দিকে, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা, তাদের বেড়ে উঠা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন, সামাজিকভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের জন্য যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থার তথা মূলধারার বিদ্যালয় বা অবস্থাভেদে বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযােগ উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেয় ।

শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয় বরং আন্তর্জাতিক ভাবে বাংলাদেশ বেশ স্বার্থকতার সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে অটিজম সহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার কারণে উদ্ভূত এবং বৃদ্ধি পাওয়া বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অবদান রাখছে। আজকের শিশু জাতির সােনালী ভবিষ্যতের স্থপতি। সুন্দর কল্যাণকর জাতি গঠনের জন্য প্রয়ােজন এমন সুন্দর পরিবেশ যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ স্থপতিগণ সকল সম্ভাবনাসহ সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে।

অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য এরূপ একটি পরিবেশ গঠন করতে হলে তাদেরকে কারাে অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল করা যাবে না। এজন্য প্রয়ােজন এ ধরনের শিশুদের অধিকার পূরণে উপযুক্ত ও প্রয়ােজনীয় আরও আইন প্রণয়ন এবং সেগুলাে বাস্তবায়নের সম্মিলিত ও কার্যকর উদ্যোগ।

৫. বাল্যবিবাহ ও এর ক্ষতিকর দিক গুলো কী কী? বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উপায় উল্লেখ করে এর আইনগত দিক গুলো বর্ণনা করুন।

বাল্য বিবাহ :

বাল্যবিবাহ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিরােধী। এটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় সমস্যা। বাংলদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাল্য বিবাহ আইন সম্পর্কে অজ্ঞানতা ও অসচেতনতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে সমস্যাটি সমাজে বিদ্যমান। এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রচার ও প্রয়ােগের অভাবও সমস্যাটির অন্যতম কারণ। বাল্যবিবাহ , এর ক্ষতিকর দিক ও এর আইনগত দিকগুলাে সম্পর্কে সকলের জানা প্রয়োজন ।

আমাদের দেশে বর্তমান বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ের সময় যদি পাত্রের বয়স ২১ বছরের নিচে এবং কনের বয়স যদি ১৮ বছরের নিচে হয়, তখন তাদের বিবাহকে বাল্যবিবাহ বলা হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বেআইনী।

বাল্যবিবাহের ফলে কিশাের-কিশােরীদের বিভিন্নভাবে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলাে হলাে:

 ১) এ বয়সের সহজাত উচ্ছাস-বৃদ্ধি ও গতিশীলতাকে থামিয়ে দেয়।

২) দ্রুত শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ে,হোলি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয় ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে না।

 ৩) অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণের ফলে মেয়েদের অপুষ্টি ও গর্ভকালীন বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। এমনকি প্রসবকালে মা ও শিশুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। 

 ৪) শিশুর স্বল্প ওজন হয় ও অপুষ্টিতে ভুগে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাবেড়ে যায়। 

৫) সংসারের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে অপরিপক্ক হওয়ায় দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয় ও নারীরা অধিক মানসিকভাবে ক্ষতির নির্যাতনের শিকার হয়।

 ৬) বাল্য বিবাহের ফলে অল্প বয়সী মেয়ে তালাক প্রাপ্ত হলে তার পরিবারক আর্থিক ও মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।

 ৭) অত্যাচারিত হয়ে অনেক মেয়ে বিপথে চলে যায়, এমনকি আত্মহত্যার মত অপরাধের পথ বেছে নেয়।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের করণীয়: 

বাল্যবিবাহের মত একটি সামাজিক সমস্যাকে প্রতিহত করতে আমাদেরকে নিচের বিষয়গুলাের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা উচিত।

১) জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বিয়ের সময় জন্ম সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

২) কিশােরী ও নারীদের সচেতনতার পাশাপাশি পরিবার-সমাজকে সচেতন করতে হবে।

৩)কাজী ও ইমামদের বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক ও আইনগত বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

৪ ) পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৫) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার বিশেষ করে নির্বাচিত নারী মেম্বারগণ সামাজিক প্রতিরােধ গড়ে

তুলতে সবাইকে সচেতন করবে। বাল্যবিবাহ আইন সম্পর্কে সমাজের সকলকে সচেতন করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়ােগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাল্যবিবাহ রােধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাল্যবিবাহের আইন : 

বাল্যবিবাহ হল অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক বিবাহ। আইনত বিয়ের বয়স ১৮ বৎসর, বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে অভিবাবকের অনুমতি সাপেক্ষে এই বয়সের আগেও বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। যদিও আইন অনুযায়ী বিয়ের বয়স ১৮ বৎসর, তারপরও কিছু কিছু দেশের নিজস্ব প্রথাকেই আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। বাল্যবিবাহে মেয়ে এবং ছেলে উভয়ের উপরই প্রভাব পড়ে। তবে মেয়েরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিশেষত নিম আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে। বেশিরভাগ বাল্যবিবাহে দুজনের মধ্যে শুধু একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। বিশেষত মেয়েরাই বাল্যবিবাহের শিকার বেশি হয়।

“বাল্যবিবাহ নিরােধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী বাল্যবিবাহ অর্থ এইরূপ বিবাহ যাহার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রান্ত বয়স্ক অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনাে পুরুষ এং ১৮ (আঠারাে) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনাে নারী” ।

 বাল্যবিবাহের শাস্তি : 

বাল্যবিবাহ নিরােধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী –

৭। বাল্যবিবাহ করিবার শাস্তি:

(১) প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক  ২(দুই) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

(২) অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে তিনি অনধিক ১ (এক) মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তিযােগ্য হইবেন:

তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ৮ এর অধীন কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা দণ্ড প্রদান করা হইলে উক্তরূপ অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী বা পুরুষকে শাস্তি প্রদান করা যাইবে না। 

(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে শিশু আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ২৪ নং আইন) এর বিধানাবলী প্রযােজ্য হইবে ।

৮ ।বাল্যবিবাহ সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির শাস্তি : 

পিতা-মাতা, অভিভাবক অথবা অন্য কোন ব্যক্তি, আইনগতভাবে বা আইন বহির্ভূতভাবে কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির উপর কর্তৃত্ব সম্পন্ন হইয়া বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করিবার ক্ষেত্রে কোন কাজ করিলে অথবা করিবার অনুমতি বা নির্দেশ প্রদান করিলে অথবা স্বীয় অবহেলার কারণে বিবাহটি বন্ধ করিতে ব্যর্থ হইলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর ও অনন ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দন্ডিত হইবে।

৯। বাল্যবিবাহ সম্পাদন বা পরিচালনা করিবার শাস্তি

কোন ব্যক্তি বাল্যবিবাহ সম্পাদন বা পরিচালনা করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২

(দুই) বৎসর ও অন্য ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদন্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

১০। বাল্যবিবাহ নিবন্ধনের জন্য বিবাহ নিবন্ধনের শাস্তি, :

লাইসেন্স বাতিলকোন বিবাহ নিবন্ধক বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর ও অন্যন ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং তাহার লাইসেন্স বা নিয়ােগ বাতিল হইবে।

ব্যাখ্যা: এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, “বিবাহ নিবন্ধক” অর্থ Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 (Act No. LII of 1974) এর অধীন লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিষ্ট্রার এবং Christian Marriage Act, 1872 (Act No. XV of 1872), Special Marriage Act, 1872 (Act No. III of 1872) ও হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৪০ নং আইন) এর অধীন নিয়ােগপ্রাপ্ত বিবাহ নিবন্ধক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!