অধ্যায়-১২: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
১. গারো জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রণালীর বর্ণনা দিন।
গারো:
‘গারো ‘ নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস: বাংলাদেশ বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হল গারো ।এ গোষ্ঠী কারো নামে বহুল পরিচিত হলেও এরা নিজেদের কে আচিক মান্দে বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ,শেরপুর, জামালপুর, সুনামগঞ্জ ,সিলেট, গাজীপুর জেলায় গারোদের বসবাস। তবে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনা জেলার দূর্গাপুর, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় অধিকাংশ গারোদের বসবাস। মেঘালয় রাজ্য ও গারোদের বসবাস রয়েছে।
দৈহিক গঠন:
গারোদের মুখমণ্ডল গোলাকার ও সমতল। চুল ও চোখের রং কালো। ছোট চোখ ও নাক চ্যাপ্টা, ছোট কপাল ,বড় কান ও ঠোঁট মোটা হয়ে থাকে । চুল সাধারণত ঢেউ খেলানো ও কোঁকড়ানো ।পুরুষের মুখে পাতলা দাড়ি গজাতে দেখা যায়। গারোরা উচ্চতার দিক থেকে খুব একটা লম্বা হয় না ।তবে শারীরিকভাবে খুবই শক্তিশালী ও কর্মঠ হয়ে থাকে।
পরিবার ব্যবস্থা:
গারো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। মাতা পরিবারের প্রধান ও সমস্ত সম্পত্তির মালিক। স্বামী-স্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করে ।পারিবারিক কাজ কর্ম সম্পাদন করার দায়িত্ব স্বামীর উপর। মায়ের পরিচয় সন্তানের পরিচয়। কন্যা সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যা রীতি অনুযায়ী সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে ,যদি না মাতা অন্য কোন কন্যাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে থাকে ।উত্তরাধিকারী কন্যাকে বলা হয় নোকনা ।আর অন্য কন্যারা এগেট নামে অভিহিত হয় ।নোকনা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে ।পরিবারের ছেলে সদস্যরা বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে চলে যায় ।গারো বিয়েতে কোন যৌতুকের প্রচলন নেই ।গারোদের একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ ।এই সমাজে এক বিবাহ প্রথা বেশি লক্ষণীয়।
ধর্মীয় ব্যবস্থা:
গারোদের ধর্মের নাম সংসারেক। বাংলাদেশে অবস্থিত গারোদের বেশিরভাগ খ্রিষ্টান। কিছু গারো সর্বপ্রাণবাদ এ বিশ্বাসি ।এরা দেবতার প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন বস্তু ও শক্তিপূজা করে থাকে ।নিজেদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। এদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে ওয়াঙগালা। সমগ্র গারো সম্প্রদায় এই উৎসবে মাতোয়ারা হয় ।গারো যুবক-যুবতীরা বিশেষ পোশাক পরিধান করে উদ্দাম নৃত্য পরিবেশন করে ।এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা তাদের স্বামী বা স্ত্রীকে পছন্দ করে নেয়। নাচের সাথে মহিষের শিংয়ের বাঁশি ও ড্রাম বাজানো হয়। দুষ্টু আত্মাকে ভয় দেখানোর জন্য ছেলেরা নৃত্য করে থাকে ।এটি সংসারেক ধর্ম পালনের একটি অংশ।
২. চাকমা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রণালীর বর্ণনা দিন।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বৃহত্তম হচ্ছে চাকমা জনগোষ্ঠী ।পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এরা প্রধানত বাস করেন । ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশ চাকমা জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২,৫৩,০০০ জন। এদের মধ্যে ৯০%- এর বেশি বাস করে রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলায়।
বৈবাহিক অবস্থা: চাকমাদের নিজস্ব বংশে বা গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ। বহু-বিবাহ অনুমোদিত। তবে এর প্রচলন দেখা যায় ।বিধবা বিবাহ প্রথা রয়েছে ।চাকমা ছেলেরা অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকেও বিয়ে করতে পারে ।তবে চাকমা মেয়েদের বিয়ে চাকমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতেই হয়ে থাকে ।চাকমা বিয়েতে বর কনের বাড়িতে যায় না। বরং বর পক্ষের লোকজন গিয়ে কন্যাকে নিয়ে বরের বাড়িতে ফিরে আসে এবং বরের বাড়িতে বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বিয়ের পর নবদম্পতি পিতার গৃহে অথবা স্বামীর নিজ গৃহে জীবন শুরু করে।
চাষাবাদ:
জুম চাষ হল জীবিকার প্রধান উৎস। নরম মাটিতে ধান, শসা ,ঢেঁড়স ,ভূট্টা, তুলা ইত্যাদি সকল ফসল উৎপাদন করে। এছাড়া অনেকেই মোরগ-মুরগি ও শুকর পালন করে ।বন থেকে শাকপাতা সবজি সংগ্রহ করে বাঁশ ও বেত দিয়ে কুটির শিল্প সামগ্রী তৈরি করে ।তারা নিজেদের কাপড় নিজেরাই তাঁতে বুনে নেয় ।চাকমা পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি পরিশ্রমী ।বর্তমানে অনেক চাকমা পুরুষ ও মহিলা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে।
প্রধান খাদ্য:
চাকমাদের প্রধান খাদ্য হলো ভাত, মাছ ,সবজি। প্রধান পানীয় হিসেবে নিজেরাই তৈরি করে নেয়। চাকমারা মাটি থেকে উঁচুতে মাচার উপর ঘর নির্মাণ করে। এর সাহায্যে ঘরে ওঠে। চাকমা সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করার রীতি প্রচলিত। চাকমা সমাজে সাধারণত মৃতদেহ পোড়ানো হয়। তবে বাচ্চাদের মৃতদেহ কবর দেয়ার নিয়ম আছে। এরা যেহেতু পুর্নজন্মে বিশ্বাসী সেহেতু আত্মার কল্যাণে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে।
৩.মনিপুরী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রণালীর বর্ণনা দিন।
মনিপুরী:
মনিপুরিরা সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের মনিপুরী সংখ্যা ২৫,০০০।মনিপুরী সমাজ বিভিন্ন দল ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নিচে মণিপুরীদের জীবনযাপন প্রণালী বর্ণনা করা হলো:
১) ভাষা: মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য অতি প্রাচীন ।এর অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি ইতিহাস কোথায় রয়েছে। মানবদেহের বিভিন্ন নামের মণিপুরী ভাষা প্রতিটি বর্ণের নামকরণ করা হয়েছে। মানবদেহে বিভিন্ন অঙ্গের আকার ও বর্ণের আকার একই রকম।
২) ধর্ম: মণিপুরীদের ধর্ম বৈষ্ণব ধর্ম। একদা মনিপুরী অঞ্চলে ব্রাত্যধর্ম প্রচলিত ছিল । মনিপুরিরা সনাতন ধর্মের অনুসারী ।মৈ তৈ পাঙন নামে একটি মুসলিম মণিপুরী জনগোষ্ঠীও আছে।
৩) জীবিকা: মণিপুরীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষিকাজ ।মনিপুরী পুরুষ ও মহিলারা একত্রে কৃষিক্ষেত্রে কাজ করেন ।পুরুষেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি তৈরি করেন। তাতে বীজ বপন করা মহিলাদের কাজ ।ফসল লাগানো ও ফসল কাটার কাজটিকে তারা উৎসব হিসেবে উদযাপন করেন ।নারীরা কাপড় বোনায় অত্যন্ত দক্ষ।
৪) বাসস্থান: মণিপুরীদের ঘরবাড়ি ছাউনি ঘেরা বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি। তবে বিত্তবানরা দালান তৈরি করেন। তারা ঘরবাড়ি খুব পরিষ্কার রাখেন ।বাড়ির আঙ্গিনায় বিভিন্ন ফুল ফলের গাছ লাগান ।তাদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবার এবং মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার পিতার সম্পত্তির উপর নির্ভর করে।
৫) খাদ্যাভ্যাস: মণিপুরীদের প্রধান খাদ্য ভাত, মাছ শুটকি, সবজী। বৈষ্ণবধর্মে মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ বলে তারা মাংস খান না ।শুটকি ভর্তা খুবই প্রিয় খাদ্য। এছাড়া কতিপয় কাঁচা সবজির কচি পাতা দিয়ে ‘সিবেই’ (সালাদ) খেতে পছন্দ করেন। খাবারে তুলনামূলকভাবে তেল-মসলা কম খেয়ে থাকেন।
৬) পোশাক: মনিপুরিরা ভদ্র, শান্তশিষ্ট ও আত্মনির্ভরশীল সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। পুরুষেরা ধুতি, পাঞ্জাবি ,আর মেয়েরা লাহিং পরিধান করে এবং অলংকার মেয়েদের খুবই পছন্দ ।মনিপুরী সকল মেয়েরাই অলংকার পরিধান করেন।
৭) উৎসব: মনিপুরিরা মনিপুরিরা প্রায় সারা বছরই উৎসবে মেতে থাকেন। নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তারা আনন্দ করেন ।এছাড়া রথযাত্রা, দোলযাত্রা ,হোলি উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি ,রাস পূর্ণিমা ইত্যাদি উৎসব পালন করেন ।কার্তিক মাসে রাস উৎসব তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এসব উৎসবে তারা মদ পান করেন।
৮) বিবাহ: বর্ণাঢ্য প্যান্ডেল তৈরি করা হয় তাদের বিয়েতে। বর ও কনে- এর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকলে বয়োজ্যেষ্ঠরা তাদের উপর ধান দূর্বা সিটি আশীর্বাদ করেন।
উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় আমাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে মনিপুরী জাতিসত্তা অন্যতম। এদের সংস্কৃতি অনেক উন্নত । এরা আমাদের সিলেটের পূর্বাঞ্চলে বসবাস করলেও এরা ভারতের মনিপুরী রাজ্যের অধিবাসীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরা বর্তমানে লেখাপড়া করে উন্নত জীবনযাপন করছেন।
৪. মারমা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রণালী বর্ণনা দিন।
মারমা:
জনসংখ্যার দিক দিয়ে চাকমাদের পরে অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানে আছে মারমা ।মারমা সম্প্রদায় প্রধানত রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলায় বাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের মারমা অধিবাসীর সংখ্যা ১,৫৭,৩০১ জন। কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় কিছু মারমা এখনো বাস করে। মারমারা মঙ্গোলীয় মিলি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
১) আকৃতি:এরা সাধারণত খাটো আকৃতির হয়ে থাকে। গালের হাড় উঁচু, গায়ের রং ফর্সা । কালো চুল, ছোট চোখ এবং চ্যাপ্টা নাক এদের সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্য।
২) ভাষা: মারমারা আরাকানি উচ্চারণে কথা বলেন এদের ভাষা বার্মিজ হরফে লিখিত হয়। বর্তমানে শহর এবং এর কাছাকাছি অঞ্চলে বসবাসরত মারমারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে ।বাংলা ভাষা মারমা জনগোষ্ঠী আয়ত্ত করেছেন।
৩) পোশাক: মারমা নারী-পুরুষের পোশাক হচ্ছে ‘থামি’ ও ‘আনগি’। বর্তমানে নারী-পুরুষেরা আধুনিক পোশাক পরেন।
৪) বাসস্থান: মারমাদের বাড়ি সাধারণত মাটি থেকে উঁচুতে কাঠ অথবা বাশের পাটাতন বা মাচাং এর উপর নির্মিত হয়। ঘর তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে বাঁশ, খড় ও বুনো ঘাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি ঘর একই সাথে সবার জন্য এবং ভাঁড়ার-ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোথাও কোথাও মাচা ব্যতীত সমতল জায়গায় মাটির ঘর দালান দেখা যায়।
৫) ধর্ম: মারমা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বর্তমানে তারা ধর্মান্তরিত হতে চলেছে। বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান তারা আগ্রহ ভরে পালন করে। তারা সর্বপ্রাণবাদ এ বিশ্বাসী। তাদের বিশ্বাস যে,তাদের জন্ম মৃত্যু এবং জীবনের সকল কর্মকান্ড এক অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন দেবদেবীর অনুগ্রহ লাভের জন্য পূজা করে থাকেন।
৬) খাদ্যাভ্যাস: ভাত, মাছ ও মাংস সিদ্ধ শাকসবজি হচ্ছে মারমাদের প্রধান খাবার। তবে নাপ্পি নামক শুটকি মাছের মন্ড মারমাদের অতি প্রিয়। মারমারা রোড ও ভাত থেকে তৈরি মদ পান করেন। রান্নার জন্য তারা মাটির পাত্র ব্যবহার করেন। এছাড়া বাঁশ ও কাঠের তৈরি জিনিসপত্র তারা ব্যবহার করে থাকেন।
৭) সমাজ ব্যবস্থা: মারমাদের মধ্যে একক পরিবারের প্রচলন দেখা যায়। স্বামীরা যদিও পরিবারের প্রধান, তথাপি নারীদের পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
৮) জীবিকা: কৃষিকাজ মারমাদের প্রধান পেশা, বিশেষ করে জুম চাষ। এছাড়া মারমারা বিভিন্ন গাছের পাতা,মূল ও কান্ড জাতীয় খাবার বন থেকে সংগ্রহ করে থাকে। মারমা নারীরা তাঁত বোনার কাজ ও করে। বর্তমানে মারমারা ব্যবসা-বাণিজ্য দিকে ঝুঁকছে।
৯) বিবাহ: সামাজিক জীবনে বিবাহ তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহুবিবাহ ও এক বিবাহ প্রচলিত আছে ।তবে তাদের মধ্যে বাল্য বিবাহ নিষিদ্ধ।
মারমা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। প্রতি মাসে তারা ‘ল্যাব্রে’নামে একটি উৎসব পালন করে। বর্মী ভাষায় ‘ল্যাব্রের’ অর্থ হলো পূর্ণচন্দ্র বা পূর্ণিমা। জলের উৎসব তাদের আরও একটি অনুষ্ঠান ।তারা বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন ‘সাগ্রেইন’ উৎসব পালন করেন।
৫. বাংলাদেশের খাসি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রণালী বর্ণনা দিন।
খাসি:
মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত খাসি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাতৃতান্ত্রিক সম্প্রদায়। আদি বাসভূমি তিব্বত থেকে তারা আসাম ও সন্নিহিত অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছেন। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ,তাহিরপুর এবং অঞ্চলে খাসি জনগোষ্ঠী বাস করে।১৯৯১ সালের গণনা অনুযায়ী প্রায় ১২,৩০০ খাসি বাংলাদেশে বাস করে।
১) সমাজ ব্যবস্থা: খাসি সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। স্ত্রী গৃহে স্বামী বসবাস করার রীতি থাকলেও ২-৩ টি সন্তান হওয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। খাসিয়া পরিবারে মেয়েদের কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা অনেক বেশি। খাসিদের নিজেদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ।
২) জীবিকা: খাসি সাধারণত কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে একটি জনগোষ্ঠীর ‘নার’ বা ‘প্রার’ যাদের লোকসংখ্যার বেশিরভাগই পান চাষ করে। মৌমাছি চাষ ও তাদের জীবিকার অংশ।
৩) বাসস্থান: তারা বাঁশ বা কাঠের মাচার উপর বাড়ি তৈরি করে ।সামনে কিছুটা জায়গা খোলা রাখে, যা বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় প্রতিটি বাড়ি সংলগ্ন শূকরের খোয়ার দেখা যায় ।খাসি গ্রাম ‘পুঞ্জি’ বলা হয়। বাড়ির আঙিনায় ফুল ফলের গাছ থাকে। তারা প্রায় ই এক পুঞ্জী থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে নতুন পুঞ্জী গড়ে তোলে । পুঞ্জি প্রধান কে ‘সিয়েম’ (মন্ত্রী )বলা হয়। তারা নিজস্ব সংস্কৃতিতে জড়িত।
৪) ধর্ম: খাসি ধর্ম অনেক পুরাতন। এটি দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। প্রত্যেক পুঞ্জির ই নিজস্ব গির্জা রয়েছে। একেশ্বরবাদী হলেও ঈশ্বরের রূপ হিসেবে বিভিন্ন জড়বস্তুকে পূজা করেন। খাসিদের প্রধান দেবতার নাম ‘উব্লাই নাংযউ’। তাকে তারা পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা মনে করেন ।তারা পিতাকে দেবতা মনে করে পূজা করেন ।এরা ইদানিং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছে। এদের কোন ধর্ম গ্রন্থ নেই। এরা প্রথা ও ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করেন।
৫) ভাষা: খাসিদের কোন বর্ণমালা নেই। এর দ্বিভাষী। তারা খাসিয়া এবং বাংলা উভয় ভাষায় ব্যবহার করেন। খাসিয়া ভাষায় বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে তারা আধুনিক বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করছে।
৬) উৎসব: খাসিদের সমাজে নাচ গান খুবই প্রিয়। সকল ধরনের অনুষ্ঠান যেমন -পূজা-পার্বণ, বিয়ে, খরা , অতিবৃষ্টি, ফসলহানি ,মৃতের সৎকারে তারা নাচ ও গান উৎসবের আয়োজন করে।
৭) বিবাহ: খাসিদের সমাজে নারী- পুরুষের বিবাহ বাধ্যতামূলক। ছেলে মেয়েরা বড় হলে পিতা-মাতা বিয়ের ব্যবস্থা করেন ।এতে বিয়ের উৎসব ও সম্মিলিতভাবে গান গাওয়ার সাধারণ রীতি রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, খাসি জনসমাজে নারী -পুরুষ উভয়েই সমানতালে গৃহস্থালির কাজ করে। নারীরা অধিক পরিশ্রম করে। পরিবারে মায়ের প্রাধান্য থাকায় সন্তান মায়ের পরিবারে বড় হয়। এদের সাংস্কৃতিক জীবন যাপন একটু উন্নত। বর্তমানে এরা লেখাপড়া করে আধুনিক জীবন যাপন করছে।
৬. সাঁওতাল জনগোষ্ঠী হিসেবে সাঁওতালদের জীবন যাপন বর্ণনা করুন।
সাঁওতাল: বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হচ্ছে সাঁওতাল।বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহী ,রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চলের সাঁওতালরা বসবাস করেন।১৯৯১ এর আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশ সাঁওতাল জনসংখ্যা দুই লক্ষের অধিক।
১) আকৃতি: সাঁওতালদের গায়ের রং কালো মাঝারি উচ্চতার কোঁকড়ানো কালো চুল ,পুরু ঠোঁট, লম্বা গলা ও নাক প্রশস্ত এদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য।
২) ভাষা: সাঁওতালি ভাষা অস্ট্রিক ভাষা থেকে উদ্ভূত। সাঁওতালদের ভাষা লেখার জন্য কোন বর্ণমালা নেই। বর্তমানে তারা বাংলা ও সাঁওতালি ভাষায় কজথা বলে। সাঁওতালদের কোন লিখিত সাহিত্য নেই। তবে তারা ঐতিহ্য প্রবণ।
৩) সমাজ ব্যবস্থা: সাঁওতাল জাতিসত্তা ১২ টি গোত্রে বিভক্ত। একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ।সাঁওতাল সমাজ যদিও পুরুষশাসিত, তবুও নারীদের ভূমিকা কম নয়। সাঁওতাল মেয়েরা খামারে কাজ করে থাকে। এদের ঘরগুলো ছোট হলেও এদের আঙিনা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
৪) বাসস্থান:সাঁওতালদের ঘরগুলো খুব ছোট হলেও এদের আঙিনা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখা যায়। ঘরের মাটির দেয়ালে চিত্রকর্ম সাঁওতাল মেয়েদের শিল্পী মনের পরিচয় বহন করে। এদের বাড়িঘর সাধারণত ছন ও খড়ের তৈরি। ঘরে কোনো জানালা থাকে না। বাঁশের চাটাই, খাটিয়া ও কাঁসার বাসন প্রধান আসবাব হিসেবে ব্যবহার করেন।
৫) পোশাক: সাঁওতালদের পোশাক-আশাক খুবই সাধারণ। সাঁওতালরা খুবই পরিশ্রমী নারীরা মোটা ধরনের রঙিন শাড়ি খাটো করে পরিধান করে ,চুলের খোপায় ফুল গুজতে পছন্দ করে ।পুরুষদের সাধারণ পোশাক ধুতি ও গামছা। সাঁওতাল পুরুষ ও নারীর প্রথাগতভাবে শরীরে উল্কি আঁকেন।
৬) খাদ্যাভ্যাস: ভাত, মাছ ,মাংস, সবজি সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য। এছাড়া কাঁকড়া, মুরগি, গরু ও কাঠবিড়ালের মাংস এদের অতি প্রিয়। পাট পাতা, হাঁস মুরগির ডিম, বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং কাছিম তাদের খাদ্যতালিকায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৭) উৎসব: সাঁওতালরা উৎসবপ্রিয় জনগোষ্ঠী। বাঙালি হিন্দুদের মত এদেরও বারো মাসে তেরো পার্বণ। এদের বছর শুরু হয় ফাগুন মাস থেকে জাঁকজমকপূর্ণ নাচ , গান ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে। প্রতি মাসেই এদের বিভিন্ন রকম উৎসব পালিত হয় ।”শিয়ালসেই “ফাল্গুন মাসের শুরুতে নববর্ষ হিসেবে এবং “সহরাই” উৎসব পৌষের শেষে উদযাপিত হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা সাঁওতাল। কৃষিকাজ এদের প্রধান পেশা।বর্তমানে এরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উন্নত জীবনযাপন করছে। এরা খুবই সাধারণ এবং মিশুক প্রকৃতির। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা এদের প্রধান পেশা।
এমসিকিউ :
১.গারোদের সমাজ ব্যবস্থা কি?
ক) মাতৃতান্ত্রিক
খ) পিতৃতান্ত্রিক
গ) জাতি তান্ত্রিক
ঘ) ভ্রাতৃতান্ত্রিক
উত্তর:ক) মাতৃতান্ত্রিক
২.গারোরা কোন ধর্মের অনুসারী?
ক) ওয়াংগালা
খ) সাংসারেক
গ) খ্রিষ্টান
ঘ) বৌদ্ধ
উত্তর:খ) সাংসারেক
৩. বাংলাদেশে কতটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে?
ক)২০টি
খ)৩০টি
গ)৪০টি
ঘ)৪৫টি
উত্তর:ঘ)৪৫টি
৪. চাকমারা কোন ভাষায় কথা বলে?
ক) তিব্বতি -বর্মী
খ) ইন্দো-ইউরোপীয়
গ) বাংলা ভাষা
ঘ) হিন্দি ভাষা
উত্তর:ক) তিব্বতি -বর্মী
৫. জুম চাষ কোন নৃ-গোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উৎস?
ক) মারমা
খ) চাকমা
গ) ম্রো
ঘ) মনিপুরী
উত্তর:খ) চাকমা
৬. বাংলাদেশ মণিপুরীদের সংখ্যা কত?
ক)২৩,০০০
খ)২৪,০০০
গ)২৫,০০০
ঘ)৩০,০০০
উত্তর:গ)২৫,০০০
৭. মনিপুরিরা কোন ধর্মে বিশ্বাসী?
ক) বৈষ্ণব
খ) হিন্দু
গ) বৌদ্ধ
ঘ) খ্রিষ্টান
উত্তর:ক) বৈষ্ণব
৮. মারমারা বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উপলক্ষে কি উৎসব উদযাপন করেন?
ক) সাংগ্রাই
খ) পানি খোলা
গ) জল উৎসব
ঘ) দুর্গাপূজা
উত্তর:ক) সাংগ্রাই
৯. বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গুলোর মধ্যে বৃহত্তম অংশ হচ্ছে-
ক) গারো
খ) চাকমা
গ) মনিপুরী
ঘ) খাসি জনগোষ্ঠী
উত্তর:খ)চাকমা
১০. ত্রিপুরা কোন ধর্মের অনুসারী?
ক) খ্রিষ্টান
খ) বৌদ্ধ
গ) সনাতন
ঘ) বৈষ্ণব
উওর:গ) সনাতন
১১. বাংলাদেশের লোকসংগীত কোনটি?
ক) রবীন্দ্র সংগীত
খ) নজরুল সংগীত
গ) লালনগীতি
ঘ) বাউল সংগীত
উত্তর:ঘ) বাউল সংগীত
১২. মনিপুরী পুরুষরা পরিধান করে-
ক)দামি
খ)পাহাতি
গ)লাফিং
ঘ) লুঙ্গি
উত্তর:খ)পাহাতি
১৩. স্থানীয়ভাবে গারোদের ভাষাকে বলা হয়?
ক) মান্দি
খ) আচিক
গ)বৌদ্ধিক
ঘ) তান্ত্রিক
উত্তর:ক) মান্দি
১৪. সাঁওতাল নৃগোষ্ঠী বিভক্ত-
ক)১০
খ)১১
গ)১২
ঘ)১৩ টি গোত্রে
উত্তর:গ)১২
১৫. ‘পুঞ্জি ‘যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সমাজ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত তা হল-
ক) মারমা
খ) খাসি
গ) মনিপুরী
ঘ) সাঁওতাল
উত্তর:খ) খাসি
