অধ্যায়-১১: বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
১. বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরানাে-এই উক্তির আলােকে বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তি ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ধারণা দিন ।
বাংলা ভাষা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা। এ ভাষার সাধু ও চলিত দুটি রুপ রয়েছে। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র বাংলাদেশের ভাষা সাহিত্যের বিকাশ সাধিত হয়েছে। দশম থেকে দ্বাদশ শতকে লিখিত ‘চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরাতন সাহিত্য নিদর্শন। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ এ ভাষায় গীতিপদাবলি রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের গীতিপদাবলি বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে খুবই মূল্যবান। এ পদাবলির মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রাচীন বাংলার ভাষা ও তার ঠিক পূর্বের ভাষার নমুনা পাওয়া যায় তেমনই জানা যায় প্রাচীন বাংলার মানুষের সমাজ, সভ্যতা ও জীবন চিত্র। প্রাচীনকাল হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সাহিত্যকর্ম সংযােজিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং বৈষ্ণব সাহিত্য মধ্যযুগীয় সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন, পনেরাে শতকের শেষ দিকে মঙ্গলকাব্য বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছে। পাশাপাশি মধ্যযুগে লােক সাহিত্যের প্রসার ঘটে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় হতে আধুনিক বাংলা সাহিত্য প্রসার লাভ করে। আধুনিক সাহিত্যে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরােধা রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, লালন গীতি, পল্লি গীতি, বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ধারায় পরিণত হয়েছে। এছাড়াও বাংলার বাউল গান, জারিগান, সারিগান, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, গম্ভীরা, কবিগান, পালাগান, কীর্তন গান – সবকিছুই বাংলা সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর পাশাপাশি ক্ষুত্র নূ-গােষ্ঠীর সংস্কৃতির মধ্যে উল্লেখযােগ্য চাকমা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন। রাধামন ধনুপদি পালা, ‘চাদিগাংছারা পালা ও লক্ষ্মীপালা মধ্যযুগে ‘সাদেংগিরির উপাখ্যান, ‘গােবােন লামা ও ‘বারমাসি উল্লেখযােগ্য। বাংলা সাহিত্যের পাশাপশি বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গােষ্ঠীর সাহিত্যচর্চা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। রামাধন ধনুপদি পালা মধ্যযুগে সাদেংগিরির উপাখ্যান উল্লেখযােগ্য। আধুনিক যুগের ক্ষেত্রে সুগত চাকমা রাঙামাত্যা, দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার পাদারঙ কোচপানা ও সুহ্রদ চাকমার বাগী অন্যতম।
২. বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের বর্ণনা দিন।
বাংলাদেশ বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গােষ্ঠীর বসবাস এ দেশে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ। সে জন্য এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বহুমাত্রিক সংস্কৃতি (ভান সেন্দেল, ১৯৯৮) বলা হয় । হিন্দু, মুসলিম, বৈষ্ণব, বাউল, আশরাফ, আতরাফ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র জাতিগােষ্ঠী—সবই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ এ সমস্ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরাতন।
বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ মুসলিম হলেও এখানে অন্যান্য ধর্মীয় গােষ্ঠী যেমন- হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসে জনগােষ্ঠী বসবাস করে। যে কারণে সমাজজীবনের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ’ মূল্যবােধ গড়ে উঠেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব হলো ঈদ-উল-ফিতর ও ‘ঈদ-উল-আজহা। হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গাপূজা’ প্রধান উৎসব হিসেবে পালন করে। বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় যথাক্রমে বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং ‘বড়দিন’ প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করে। এসব উৎসবে একে অপরের উপস্থিতি এ দেশের সংস্কৃতি বিকাশে সহায়তা করেছে। এছাড়া সামাজিক উৎসব হিসেবে বাঙালি জনগােষ্ঠী বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে। বাংলা সনের প্রথম তারিখে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়। এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। পুরাতনকে বিদায় করে নতুনকে নানা উৎসবের মাধ্যমে বরণ করে নেয়া হয়। নতুন বছরের উৎসবে গ্রামীণ জনগােষ্ঠীর নিবিড় যােগাযােগ। রাজধানী ঢাকাতে “ছায়ানট এর উদ্যোগে নতুন বছরকে আহ্বান করা হয়। বর্ষবরণে বৈশাখী মেলা, বিভিন্ন পিঠা, পান্তা-ইলিশ খাওয়া ও গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযােগিতা যেমন- নৌকা বাইচ, লাঠি খেলার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া নবান্ন উৎসব, পৌষ-পার্বণ ইত্যাদি লােকজ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। প্রার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগােষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব হলাে ‘বিজু-সংগ্রাহ-বৈসুক। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বর্ষ বিদায় ও নববর্ষ আগমন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী এই উৎসব পালন করে থাকে।
৩। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্থাপত্য এবং চিত্রকলার বর্ণনা দিন। অথবা, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং চিত্রকলা ব্যাখ্যা করুন।
বাংলাদেশ বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গােষ্ঠীর বসবাস এদেশে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ। হিন্দু, মুসলিম, বৈষ্ণব, বাউল, আশরাফ, আতরাফ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্ষুদ্র জাতিগােষ্ঠী সবই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এ সমস্ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরাতন। নিচে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ঐতিহ্যের বর্ণনা দেওয়া হলাে :
বাংলাদেশের স্থাপত্য এবং চিত্রকলা : বাংলাদেশে হাজার বছর ধরে স্থাপত্য, চারুকলা ও কারুশিল্পের বিকাশ সাধিত হয়েছে। স্থাপত্য শিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন হলাে এদেশের আপামর জনগােষ্ঠীর বসবাসের জন্য ‘কুঁড়েঘর’ বা খড়ের ঘর। অনেক অঞ্চলে অতি বৃষ্টির কারণে মাটির পরিবর্তে বাশ ও খড় দিয়ে ঘর তৈরি করতে দেখা যায়। আধুনিকতার ছোঁয়ার কারণে বর্তমানে ঘরের ছাদ হিসেবে টিনের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তবে প্রাচীনকালে যে সমস্ত নগরীর বিকাশ হয়েছিল তা ছিল বড় বড় প্রাচীর ও পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। এ সমস্ত নগরীতে বিশাল বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ যেমন-পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার, সোনারগাঁও প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
মধ্যযুগের স্থাপত্যশিল্প বিশেষ বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ সময় বিভিন্ন মসজিদ, মাজার ও খানকাহ গড়ে ওঠে। এর ফলে কারু চারুকলার বিকাশ ঘটে। এ সমস্ত মুসলিম স্থাপত্যে ছােট-বড় বিভিন্ন মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের গায়ে কুলুঙ্গি ও পোড়া মাটির অলঙ্কারের ব্যবহার করা হতাে। মসজিদের পাশাপাশি এ সময়ে মন্দির ও নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরগুলো নির্মাণের সময় বাংলা ঘরের অনুকরণ করা হয়েছিল । নুয়ে পড়া চালা বা বাঁকানাে কার্নিশ মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মােঘল আমলে ঢাকায় বিভিন্ন স্থাপত্য শিল্পের প্রসার লাভ করে। এগুলোর মধ্যে হােসনি দালান, আহসান মঞ্জিল ইত্যাদি অন্যতম।
কার্জন হল, নর্থব্রুক হল, কোর্ট কাচারী, দপ্তর ও জেলখানা ইত্যাদি মােঘল ও ইউরােপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণের নির্মিত। প্রাচীন বাংলার প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসপত্রে চারুকলা ও কারুকলার ব্যবহার লক্ষণীয়। বিভিন্ন আসবাবপত্র, মাটির বাসন-কোসন ছাড়াও ব্রোঞ্জের তৈরি গয়না, বাতি, পােড়ামাটির তৈরি নকশা ও মূর্তি, রুপার মুদ্রা ও অলংকার এবং রত্নালঙ্কার এদেশের সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ইটের তৈরি প্রাচীর পােড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা ও নানারকমের মূর্তির খােদাই বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম বাহন। এ সমস্ত ফলকে বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা লিপিবদ্ধ হয়েছে। চিত্রকলা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। চিত্রশিল্পী যামিনী রায়, জয়নুল আবেদিন, চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের মতাে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর জন্ম এদেশে হয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ চিত্রকর্মটি পৃথিবীজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছিল। চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের চিত্রকলায় এদেশের সাঁওতালদের লোকশিল্প, ধর্মীয় কাহিনি ও প্রাত্যহিক জীবন স্থান পেয়েছে। কামরুল হাসানের চিত্রকলায় বাংলার লােকজ ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে।মাটির তৈরি হস্তশিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান। হস্তশিল্পের পাশাপাশি ঘটচিত্র, সরার চিত্র, শখের হাড়ি,পুতুল ইত্যাদি তৈরির শিল্প এখানে বিদ্যমান। নকশী কাথা’ এদেশের আবহমান সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪. বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে মহাস্থানগড়, উয়ারি বটেশ্বর, পাহাড়পুর এবং ময়নামতি এর বর্ণনা দিন।
ঐতিহাসিক স্থান :
আমাদের দেশে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান এখনও বহু কিংবদন্তি হয়ে আছে, যাদের সাথে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন উপাখ্যান। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি একদিকে যেমন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতির চেয়ে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিল তেমনি কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতেও এ অঞ্চল অন্যান্য জাতিগােষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেছিল। নিচে এদেশের কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থানের বর্ণনা দেয়া হলাে :
মহাস্থানগড় :
মহাস্থানগড় বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার করতােয়া নদীর তীরে অবস্থিত। বগুড়া শহর হতে প্রায় ১০ কি.মি. উত্তরে অবস্থিত মহাস্থানগড় একসময় বাংলার রাজধানী ছিল। পূর্বে মহাস্থানগড়ের নাম ‘পুন্ড্রবর্ধন’ বা ‘পুন্ড্রনগর’ ছিল। এটি বাংলাদেশের অন্যতম পুরাকীর্তি। ঐতিহাসিকদের মতে, মহাস্থানগড় কমপক্ষে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। ভাসু বিহার, ভীমের জাঙ্গাল, বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা, কালিদহ সাগর, জিয়ত কুণ্ড, গোকুল মেধ বা কিংবদন্তির বেহুলা-লক্ষীন্দরের বাসরঘর, খোদাই পাথর ভিটা, মালখালীর কুণ্ড, বন্দুকধারা, কান্তজির মন্দির, হাতিবান্ধা, ধােপার পুকুর, হাতি ডােবা পুকুর, শিলাদেবীর ঘাট, মথুরা চিঙ্গাসপুর, কাঞ্জির ঘাট, ছেলীরধাপ, গােদারকাপ, ধােলাইধাপ প্রভৃতি কালের সাক্ষী হয়ে আছে। মহাস্থানগড় প্রাচীন ও পরিখাবেষ্টিত একটি দুর্গ নগরী ছিল। মহাস্থানগড় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থ স্থান হিসেবে সর্বজনবিদিত।
উয়ারী-বটেশ্বর :
নরসিংদী জেলার বেলাব থানা সদর হতে ৫ কিলোমিটার অদূরে উয়ারী-বটেশ্বর হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের দুটি প্রাচীন গ্রাম। লালমাটি দ্বারা গঠিত উঁচু গ্রাম দুটো টিলার মতাে। তবে স্থানীয় জনগােষ্ঠীর নিকট পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রাচীনকালে ব্রহ্মপুত্র নদ গ্রাম দুটোর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছিল। উয়ারী-বটেশ্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দুদিকে দুটি মাটির প্রাচীর। প্রাচীর দুটি লাল মাটি দ্বারা গঠিত এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৫ কিলােমিটার। প্রাচীরের বাইরে পরিখা আছে। গ্রাম দুটি আয়তনে অনেক বড় এবং ছােট-বড় অনেক ঢিবির সমন্বয়ে গঠিত, দুর্গভূমিতে অজস্র প্রাচীন মৃৎভগ্নাংশ দেখা যায়।
এই স্থানে বহু প্রাচীন ও অতি মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব যেমন, ছাপযুক্ত মুদ্রা, অসংখ্য মূল্যবান পাথরের গুটিকা, লােহার তৈরি হাত কুড়াল পাওয়া গেছে।
পাহাড়পুর :
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারটি সােমপুর বিহার বা মহাবিহার নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ও প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলায় এটি অবস্থিত। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষ দিকে বা নবম শতকের প্রথম ভাগে এই বৌদ্ধবিহারটি নির্মাণ করেন। পুন্ড্রনগর ও কোটিবর্ষের মাঝামাঝি ১০ হেক্টর অঞ্চল জুড়ে এই পুরাকীর্তিটি অবস্থিত। এটির ভূমি পরিকল্পনা চতুর্ভুজ আকৃতির। লৌহজাত পদার্থের উপস্থিতির কারণে এর মাটি লালচে। ভূমি হতে ৩০.৩০ মিটার উঁচুতে পাহাড় সদৃশ স্থাপনা হিসেবে এটি টিকে আছে। ১৯৮৫ সালে পাহাড়পুরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। স্থাবর স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে বিহার কেন্দ্রীয় মন্দির, উন্মুক্ত অঙ্গন, স্নানাগার ও শৌচাগার। এবংঅস্থাবর স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে পােড়ামাটির ফলক, প্রস্তর ভাস্কর্য, চুনবালি সমন্বয়ে গঠিত মাথা, ধাতব মূর্তি, তাম্রশাসন ও শিলালিপ মুদ্রা, মৃন্ময় পাত্র ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য।
ময়নামতি :
ময়নামতি বাংলাদেশের কুমিল্লা শহর হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান এবং একটি প্রাচীন বাংলার নিদর্শনের অন্যতম উৎসস্থল। এটি ময়নামতি লালমাই অঞ্চলের প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শনের অন্যতম। মেঘনা বেসিনের ভাটিতে গোমতী নদীর তীরস্থ ময়নামতি গ্রাম থেকে লালমাই রেলস্টেশনের নিকটে চান্দিমুরা পর্যন্ত এটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৭ কিলােমিটার বিস্তৃত। এর প্রশস্ততম অংশটি ৪.৫ কিলোমিটার চওড়া এবং সর্বোচ্চ চূড়াটি ৪৫ মিটার উঁচু। ময়নামতি প্রাচীন বঙ্গ সমতটের (দক্ষিণপূর্ব বাংলা) স্মৃতিস্তম্ভ, খননকৃত ধ্বংসাবশেষ সম্বলিত। এটি প্রাচীন বাংলার অতীত গৌরবের নিদর্শন। ময়নাতির প্রত্নস্থলের মধ্যে কোটিলা মুড়া, রূপবান মুড়া, চারপত্র মুড়া ও শালবন বিহার অন্যতম।
৫. বাংলাদেশের পুরাকীর্তি হিসেবে শালবন বিহার, সোনারগাঁও, যাটগম্বুজ মসজিদ এবং লালবাগের কেল্লার বর্ণনা দিন।
অথবা, এদেশের পুরনাে স্থাপত্যকীর্তি হিসেবে শালবন বিহার ও সােনারগাঁও এর বর্ণনা দিন।
ঐতিহাসিকভাবে বাঙালিরা একদিকে যেমন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতির তুলনায় এগিয়ে ছিল তেমনি কৃষ্টি ও সভ্যতার বিকাশের ফলে এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগােষ্ঠীকেও দ্রুত আকৃষ্ট করেছিল। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী বঙ্গদেশে অবস্থানের ফলে বিভিন্ন নিদর্শনের সাক্ষ্য রেখেছে। নিম্নে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে শালবন বিহার, সােনারগাঁও, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও লালবাগ কেল্লার বর্ণনা দেওয়া হলাে । শালবন বিহার : ময়নামতির খননকৃত প্রত্নস্থানসমূহের মধ্যে শালবন বিহার গুরুত্বপূর্ণ। শৈলরাজির প্রায় কেন্দ্রে বর্তমানে কোর্ট বাড়িতে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির নিকটস্থ লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝিতে এই বিহারটি অবস্থিত। এটি একটি বৌদ্ধ বিহার বিহারটি শাল-গজারির বন দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় এই বিহারটির নামকরণ করা হয়েছিল শালবন বিহার। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথমভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীবভদেব এই বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। শালবন বিহারের প্রতিটি বাহু ১৬.৭ মিটার দীর্ঘ এবং বিহারের চারদিকে দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু। কক্ষগুলাে বিহারের চারদিকে বেষ্টনি দেয়াল পিট করে নির্মিত। বিহারের প্রবেশ বা বাহির হওয়ার জন্য একটি মাত্র পথ রয়েছে। বিহার প্রাঙ্গনের মাঝখানে কেন্দ্রীয় মন্দির। শালবন বিহারে সর্বমােট ১৫৫ টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি কুলুঙ্গি রয়েছে। এই কক্ষগুলােতে বৌদ্ধ ভিক্ষুকগণ থাকতেন এবং এখানে বিদ্যাশিক্ষা ও ধর্মচর্চা করা হতাে।
সােনারগাঁও :
সােনারগাঁও নগরী ‘সুবর্ণগ্রাম বা ‘সােনার গ্রাম’ নামেও পরিচিত। ঢাকা থেকে ২৭ কিলােমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। প্রাচীনকালে হিন্দু-বৌদ্ধযুগে এই নগরী গড়ে উঠলেও এটি বাংলার মুসলিম শাসকদের অধীনে পূর্ববঙ্গের একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সোনারগাঁও পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী ও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা পরিবেষ্টিত। বার ভুইয়াদের অন্যতম ঈসা খা দীর্ঘদিন যাবৎ সােনারগাঁও শাসন করেছেন। বিডিন্ন নদী দ্বারা বেষ্টিত হওয়ার কারণে শত্রুপক্ষ সহজেই আক্রমণ করতে পারত না। বর্তমানে সােনারগাঁও বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম। এখানে লােক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের যাদুঘর, কারুপল্লী, ঐতিহাসিক পানাম নগর, সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহেব মাজার, পাঁচ পীরের মাজার, গোয়ালদি মসজিদ প্রভৃতি নির্শনীয় স্থান বাংলার ঐতিহ্য ও সভ্যতার স্মারক হিসেবে দাড়িয়ে রয়েছে।
ষাটগম্বুজ মসজিদ :
ষাট গম্বুজ মসজিদ সুলতানী আমলের সর্ববৃহৎ মসজিদ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য। এটি বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। অনুমান করা হয় ১৫ শতাব্দীতে খান-ই-জাহান এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণের বাইরের অংশ প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের অংশ প্রায় ১০৪ ফুট এবং ভিতরের অংশ প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলাে প্রায় ৮.৫ মিটার পুরু। সুলতান নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ-এর আমলে (১৪৩৫-৫৯) খান আল-আমজ উল্লুগ খানজাহান বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে শাসনের ক্ষমতা অর্জন করেন এবং সুলতানের সম্মানে তিনি এই এলাকার নাম খলিফাবাদ রাখেন। তিনি বৈঠক করার জন্য একটি দরবার গড়ে তােলেন যা পরবর্তীতে ষাট গম্বুজ মসজিদে রূপান্তরিত হয়। মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১ টি বিরাট খিলানযুক্ত দরজা ও উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি দরজা রয়েছে। মসজিদের ৪টি কোণ মিনার ও ভিতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার রয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরভাগের পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাজ রয়েছে। এর মাঝখানের মিহরাজটি আকারে বড় ও কারুকার্য খচিত। বিভিন্ন সময় অবহেলায় ঐতিহাসিক এ মসজিদটির অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। তবে ব্রিটিশ সরকার থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সরকারের নানারকম সংস্কারমূলক কার্যক্রমের ফলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থানে পরিণত হয়। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে বাগেরহাট শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়।
লালবাগ কেল্লা :
লালবাগ কেল্লা ঢাকাতে অবস্থিত। এর আদি ও পােশাকী নাম ‘আওরঙ্গবাদ। ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ শাহজাদা আযম এই প্রাসাদ দুর্গ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তবে মারাঠাদের সাথে যুদ্ধে তিনি অংশ নেয়ায় দুর্গ নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে পরবর্তী সুবেদার নওয়াব শায়েস্তা খানের ওপর। শায়েস্তা খানের শাসনামলে ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখে দিলে দুর্গটি পরিত্যক্ত হয়। সে সময় নতুনভাবে এর নামকরণ করা হয় ‘লালবাগ কেল্লা’। এটি সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এতে প্রধান ফটকসহ মােট তিনটি ফটক রয়েছে। দুর্গের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপত্য নিদর্শন হলাে এর দক্ষিণ তােরণ। এই তােরণের সম্মুখভাগের দুই দিক দুটি সুউচ্চ সরু পিলার দ্বারা সুশােভিত। দক্ষিণ ও উত্তর দেয়ালের মাঝামাঝি পূর্বকোণ ঘেঁষে একটি পুকুর রয়েছে। কেল্লার মধ্যে দরবার গৃহ ও হাম্মামখানা রয়েছে। দরবারগৃহের পশ্চিমে শায়েস্তা খানের কন্যা পরীবিবির সমাধি সৌধ রয়েছে যা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পুরাকীর্তি। এই মাজার মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রকমের ফুল, পাতা শােভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃত করা হয়েছে। এ ছাড়াও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট লালবাগ কেল্লা মসজিদ রয়েছে। এ ছাড়া শায়েস্তাখানের বাসভবনের পাশে একটি কামান রয়েছে, যা ঐ সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার করা হতাে।
৬. আবহমানকাল ধরে এদেশের স্থাপত্য চারু ও কারুকলা এদেশের সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ উক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করুন।
বাংলাদেশের হাজার বছর ধরে স্থাপত্য, চারুকলা ও কারুশিল্পের বিকাশ সাধিত হয়েছে। প্রাচীনকালে স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শনের মধ্যে আপামর জনগােষ্ঠীর বসবাসের জন্য ‘কুড়েঘর বা খড়ের ঘর’ ছিল বর্তমানে সেখানে টিনের চালা কিংবা দালান ঘর দেখা যায়। তবে প্রাচীনকালে যে সমস্ত নগরী ছিল তা ছিল বড় বড় প্রাচীর ও পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। বিভিন্ন পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ যেমন : মহাস্থানগড়, ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার, সােনারগাঁও প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। মধ্যযুগের স্থাপত্যশিল্প বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ সময় বিভিন্ন মসজিদ, মাজার, খানকাহ গড়ে ওঠার ফলে কারু ও চারুকলার বিকাশ ঘটে।
এ সমস্ত মুসলিম স্থাপত্যে ছােট-বড় বিভিন্ন মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। বেশ কিছু মন্দিরও এ সময় নির্মাণ করা হয়। ইংরেজ আমলে ইউরােপীয় প্রভাবে ঢাকায় বিভিন্ন স্থাপত্য শিল্প প্রসার লাভ করে। হােসনি দালান, আহসান মঞ্জিল মােঘল স্টাইলে হলেও পরবর্তীতে ইউরােপীয় স্টাইলের সংমিশ্রণে করা হয়। কার্জন হল, নর্থব্রুক হল মােঘল ও ইউরােপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণ।
প্রাচীন বাংলার ব্যবহার্য বিভিন্ন আসবাবপত্র, মাটির বাসন-কোসন ছাড়াও ব্রোঞ্জের তৈরি গয়না, বাতি, পােড়া মাটির নকশা ও মূর্তি, রূপার মুদ্রা ও অলংকার এবং রত্নালঙ্কার এদেশের সংস্কৃতির অন্যতম বাহন। ইটের তৈরি প্রাচীর পােড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা ও নানা রকমের মূর্তির খােদাইয়ে বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বিধায় এটিও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম বাহন। চিত্রকলা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর চিত্রকর্মটি বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছিল। যামিনী রায়ের চিত্রকলায় এদেশের সাঁওতালদের লোকশিল্প, ধর্মীয় কাহিনী ও প্রাত্যাহিক জীবন স্থান পেয়েছে। কামরুল হাসানের চিত্রকলায় বাংলার লােকজ ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। মাটির তৈরি হস্তশিল্প বাংলাদেশের লােকসংস্কৃতির ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান। এ শিল্পের পাশাপাশি ঘটচিত্র, সরার চিত্র, শখের হাড়ি, পুতুল ইত্যাদি শিল্প এখানে বিদ্যমান। নকশীকাথা এদেশের চিরায়ত সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হিসেবে বিবেচতি হয়।
৭. বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রবাসী সরকার শপথ নিয়েছিল কোথায়? মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের বর্ণনা দিন।
মুজিবনগর মেহেরপুর জেলায় অবস্থিত। আছে এই গ্রামটির নাম বৈদ্যনাথতলা ছিল। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এই গ্রামের আম্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ ঘােষণা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার অন্য মন্ত্রীর এখানে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে এই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর রাখা হয়। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছরের ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালন করে। ফলে এই দিন বাঙালি জাতির জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন। বৈদ্যনাথতলার যে জায়গায় মঞ্চ তৈরি করে অস্থায়ী প্রবাসী সরকার শপথ নিয়েছিল সেখানে স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে যা ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ’ নামে পরিচিত।
২৩টি কংক্রিটের ক্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয়ে উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিকে পটভূমি করে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। স্মৃতিসৌধে ছােট থেকে বড় মােট ২৩টি স্তম্ভ আছে, যার অর্থ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর বাংলাদেশ বাংলাদেশ পাকিস্তানের অধীনস্থ ছিল। স্মৃতিসৌধে ৯টি সিড়ি আছে, যার অর্থ বােঝায় ২৬ মার্চ থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস যুদ্ধ কালীন সময়। ৩০ লাখ ছােট ছােট পাথর আছে, যার অর্থ বােঝায় ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর ৩ লাখ বড় পাথর আছে যার অর্থ দেশের ৩ লাখ মা-বােনের ইজ্জতের বিনিময়ে এসেছে সেই মহার্ঘ্য স্বাধীনতা।
মুজিবনগরের প্রবেশ পথে বিশাল গেট আছে যা ‘মুজিবগেট’ হিসেবে পরিচিত। মুজিবনগরে ৬ দফার স্মৃতিমূলক ভিত্তিক ৬ প্রজাতির ২২শ গােলাপ গাছের বাগান, ১৩শ বৃক্ষ শােভিত আম বাগান, বঙ্গবন্ধুর তােরণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকেন্দ্র, টেনিস মাঠ, প্রশাসনিক ভবন, পর্যটন মােটেল, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র, হাসিনা মঞ্চ, শিশুপল্লী ও ডরমিটরি রয়েছে।
