বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (বিষয়জ্ঞান), অধ্যায়-২ - Proshikkhon

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (বিষয়জ্ঞান), অধ্যায়-২

অধ্যায়-২: আমাদের পরিবার, বিদ্যালয় ও বিদ্যালয় এলাকা

আলোচ্য বিষয়:

১) পরিবার কাকে বলে? পরিবারের গঠন প্রনালী ব্যাখ্যা করুন।

২) মানব জীবনে একটি পরিবারের ভূমিকা বা কাজ সম্পর্কে আপনার ধারণা ব্যাখ্যা করুন।

৩. পরিবারে শিশু সদস্যদের কাজ এবং বিদ্যালয়ে নিয়ম-কানুন ও কাজ ব্যাখ্যা করুন।

৪. বিদ্যালয়ের উন্নয়ন মূলক কাজে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বর্ননা করুন?

৫. শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্ব বর্ণনা করুন।

৬. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের করণীয় ব্যাখ্যা করুন।

১) পরিবার কাকে বলে? পরিবারের গঠন প্রনালী ব্যাখ্যা করুন।

পরিবারঃ

সাধারণভাবে আমরা বলে থাকি- মা, বাবা, ভাই, বােন নিয়ে পরিবার গঠিত হয়। এটি পরিবারের একটি সরল ধারণা। সমাজবিজ্ঞানীরা এই ধারণার বাইরে আরাে ব্যাপক পরিসরে পরিবারকে দেখে থাকেন। কেউ কেউ জৈবিক কাজের নিরিখে পরিবারের ধারণা উপস্থাপন করেন। যেমন-সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার ও পেজ বলেন, পরিবার হচ্ছে এমন একটি গােষ্ঠী, যাকে সুস্পষ্ট জৈবিক সম্পর্কের দ্বারা সুনির্দিষ্ট করা যায়। এটি সম্ভান-সন্ততির জন্মদান ও তাদের লালন-পালনের একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান (সেন, রঙ্গলাল ও নাথ)। আবার অনেকে শুধু সন্তান-সন্ততির জন্মদান ও লালন-পালনের একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের ধারণার মধ্যে পরিবারের সংজ্ঞা সীমাবদ্ধ রাখেননি। কারণ পরিবারে সন্তান-সন্ততি যেমন থাকে, তেমনি সন্তানহীন পরিবার সন্তান দত্তক নিতে পারেন। অনেক পরিবারে মা-বাবার বা স্বামী-স্ত্রীর রক্তের সম্পর্কে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন বা বাইরের লােকজনও থাকতে পারে। কাজেই দেখা যায়, পরিবারের ধারণাটি পূর্বোক্ত সংজ্ঞার চেয়েও ব্যাপকতর। বর্তমানে ব্যাপক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবারকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। পরিবার সম্পর্কিত সংজ্ঞাগুলাে বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে, পরিবার একটি ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন বা সংঘ। তবে এর সর্বজনীন সংজ্ঞা পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, ‘পরিবার বলতে বােঝায় এমন একটি ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন যেখানে বৈবাহিক এবং রক্ত সম্পর্ক সূত্রে স্বামী-স্ত্রী তাদের অবিবাহিত সন্তানসহ এবং কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে সন্তানের স্ত্রী-পরিজনসহ বসবাস করে । অনেক ক্ষেত্রে চাচা-চাচি, ফুফু, দাদা-দাদি, নানা-নানি, খালা, মামা প্রমুখও পরিবারের সদস্য হিসেবে একত্রে বসবাস করে। বিভিন্ন সমাজে নানা ধরনের পরিবারের অস্তিত্ব রয়েছে, যেমন পিতৃতান্ত্রিক ও মাতৃতান্ত্রিক পরিবার,একপত্নী ও বহুপত্নী পরিবার, যৌথ ও একক পরিবার। কোন কোন সমাজে এক ব্যক্তি পরিবার ও রয়েছে।

পরিবার গঠন প্রণালীঃ

পরিবার গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলাে বিবাহ। আদিম সমাজে বিবাহ ছাড়াই পরিবার গঠিত হতে। সাধারণত একজন পুরুষ ও একজন নারী সমাজ-স্বীকৃত উপায়ে বিয়ে করে পরিবার গঠন করেন। এটিই পরিবার গঠনের ভিত্তি। সময়ের পরিক্রমায় এ পরিবারের সংগে যুক্ত হয় সন্তান-সন্ততি। পরিবারের পরিধি কখনাে থাকে ছোট, আবার কখনাে বা হয় বড়। একটি পরিবার গঠন প্রণালীর বিভিন্ন সামাজিক নিয়ম কানুন ও প্রথাও গুরুত্বপূর্ণ।

২) মানব জীবনে একটি পরিবারের ভূমিকা বা কাজ সম্পর্কে আপনার ধারণা ব্যাখ্যা করুন।

পরিবারের ভূমিকা বা কাজঃ

সমাজের প্রধানতম প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিবার শুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের অন্যতম লক্ষ্য হলাে কনিষ্ঠ সদস্য তথা শিশুদের দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক ইত্যাদি গুণাবলির বিকাশ সাধন। এ লক্ষ্য অর্জনে পরিবারের নানাবিধ কাজ সম্পন্ন করে। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলাে নিম্নরূপঃ

১) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করাঃ মা-বাবা বা অভিভাবকের অন্যতম কাজ হলাে শিশুর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়ােজনমত পুষ্টিমানসম্পন্ন সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সহজলভ্য নানা প্রাকৃতিক ও দেশীয় খাবার খেতে শিশুদের অভ্যস্ত করা প্রয়োজন।

২) রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানঃ শিশুর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই এ বিষয়ে পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে। জন্মের পর থেকেই বৈরী প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে শিশুর নিরাপত্তা বিধান করা। নিরাপদ পরিবেশে জীবন যাপনের সুযােগ সৃষ্টি করা। রোগ ব্যাধি হলে দ্রুত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বান্ধব আনন্দময় পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা। পরিবারে শিশুদের নানাবিধ বিনােদনমূলক সুযােগ সৃষ্টি করা।

৩) পারিবারিক অনুশাসনঃ স্নেহ-ভালোবাসার পাশাপাশি পরিবার শিশুকে বিভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক অনুশাসনের সাথে পরিচয় করায়, এতে শিশু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজে নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনে অভ্যন্ত হয়।

৪) সঙ্গ দেওয়াঃ শিশুকে সঙ্গ দেওয়া পরিবারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিশুর স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত গ্রামীণ পরিবার এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করলে অনেক শহুরে পরিবারের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে শহুরে পরিবারদের সচেতন হওয়া প্রয়ােজন।

৫) মূল্যবোধ অর্জনে সহযোগিতা করাঃ শিশুর সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনে পরিবার ভূমিকা পালন করে। মা-বাবাসহ পরিবারের বয়ােজ্যেষ্ঠ সদস্যদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিশু পারিবারিক মূল্যবোধ অর্জন করে। শিশুর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী, আগ্রহ, অনুভূতি ও মনােভাব বিকাশে পারিবারিক মূল্যবােধ ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

৬) পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করানোঃ শিশুদের বয়স ও পরিণত মন অনুসারে পারিবারিক বিভিন্ন কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযােগ করে দেয়া ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া মা-বাবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিশুর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশনেও (The UN Convention on Child Right শিশুর এই অধিকারের কথা বলা হয়েছে পরিবারে শিশুর মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা দরকার। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও স্বাধীনমত প্রকাশের সুযােগ শিশুকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তােলে।

৭) অর্থনৈতিক কাজঃ পরিবারের বয়ােজ্যেষ্ঠ সদস্যগণ নানাবিধ অর্থনৈতিক কাজে নিয়ােজিত থাকেন। পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে তারা আয়-উপার্জন করেন। আয়-উপার্জন কম থাকলে পরিবার নানাবিধ সমস্যায় পতিত হয়। এরূপ অবস্থায় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুকে কাজ কর্মে নিয়ােজিত হতে হয়, এতে তাদের শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

৮)  শিক্ষামূলক কাজঃ শিশুর অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ঘটে পরিবারে। শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় পরিবার প্রধান ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের সংগে পরিবারের যােগসূত্র সৃষ্টি হয়। এছাড়াও পরিবার শিশুর নাগরিক শিক্ষা ও ধর্ম শিক্ষায় ভূমিকা পালন করে।

৩. পরিবারে শিশু সদস্যদের কাজ এবং বিদ্যালয়ে নিয়ম-কানুন ও কাজ ব্যাখ্যা করুন।

পরিবারে শিশুর বেশ কিছু অধিকার রয়েছে। এসব অধিকার সাধনে পরিবারের কাছ থেকে শিশু নানাবিধ সুযােগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। সাথে সাথে নিজের ও পরিবারের প্রয়ােজনে পারিবারিক বলয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুরও কিছু কাজ করা দরকার।

১) শিশুর প্রাথমিক কাজঃ শিশু নিজের পড়ার টেবিল, বইপত্র, স্কুল ইউনিফর্ম, অন্যান্য পােশাক, জুতা ও খেলার সামগ্রী নিজের গুছিয়ে রাখবে। নিজের শােবার ঘর ও বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখবে। প্রতােক শিশু সদস্য মা-বাবা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সন্মান করবে। তাদের পরামর্শ বা উপদেশ অনুযায়ী কাজ করবে। এছাড়া শিশু পরিবারের নিয়ম-কানুন মেনে চলবে ও মনােযােগ দিয়ে ঠিকমতাে পড়ালেখা করবে।

২) অন্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনঃ  শিশুরা বিভিন্ন কাজে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাধ্যমতাে সহযোগিতা করবে। যেমন-পরিবারের ছোট ছােট কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করবে। শিশুরা পড়ালেখার অবসরে সবমতাে পরিবারের বিভিন্ন আয় রােজগারমূলক কাজে অন্যদের সাহায্য করবে। ছােট ভাই বােন কাপড়, খেলনা ও অন্যান্য জিনিস গুছিয়ে রাখবে। পরিবারের নিজের ও অন্য সদস্যদের কাপড় ধোয়া ও শুকানাের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। পরিবারে দাদা, দাদি, চাচা, ফুপু, নানা, নানি বা মামা ও খালা থাকলে তাদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করবে। যেমন-তাদের অসুখ-বিসুখ হলে সম্ভবত সেবা করবে, সময়মতাে খাবার ও ওষুধ খাওয়াবে।

৩) কাঙ্ক্ষিত আচরণঃ  কোনাে কিছুর দরকার হলে শিশুরা তা মা-বাবাকে জানাবে। এমন কোনাে কিছুর জন্য তাদের আবদার করা সঙ্গত হবে না যা মা-বাবার সামর্থ্যের বাইরে। এতে তারা মনে কষ্ট পাবেন। পরিবারের সকল সদস্যের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। পরিবারে গৃহকর্মী থাকলে তাদের সাথেও ভাল আচরণ করবে। পরিবারের বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য মা-বাবাকে বা বয়ােজ্যেষ্ঠ সদস্যদের জানিয়ে যাওয়া উচিত। একইভাবে বিদ্যালয় থেকে দেরি করে বাড়িতে ফেরা বা মা-বাব্যকে না জানিয়ে কোথাও আড্ডা দেয়া ঠিক নয়।

৪) মতামত প্রকাশ ও সহনশীলতাঃ পরিবারের কোনাে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মা-বাবা যখন ছেলেমেয়েদের মতামত শুনতে চাইবেন, তখন তাদের উচিত হবে মার্জিতভাবে যুক্তিসঙ্গত মতামত উপস্থাপন করা। সবার বক্তব্য শুনে মা-বাবা যে সিদ্ধান্ত নেবেন সবাই তা সন্তুষ্টির সাথে গ্রহণ করবে।

বিদ্যালয়ে নিয়ম-কানুন এবং কাজঃ

প্রতিটি বিদ্যালয়ে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। শিশুর জন্য এগুলাে মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলাে শিশুদের যেমন নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে তেমনি বিদ্যালয়ে কীভাবে লেখাপড়া ও কাজ করতে হবে সে শিক্ষাও দেয়। নিয়ম-কানুন মেনে চলা ও কাজের মধ্য দিয়ে তারা নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, আদব-কায়দা ইত্যাদি গুণাবলি অর্জন করে। শিশুরা স্বভাবগত কারণে মাঝেমধ্যে নিয়ম ভেঙে ফেলে। কাজে, বিদ্যালয়ে ছােট শিশুদের যথাযথ আচরণের উন্নয়ন ও অনুশীলনের জন্য শিক্ষকবৃন্দকে বিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন গুলো তাদের স্পষ্টভাবে শিখনের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। শিশুদের সক্রিয় সামাজিক গুণাবলি বিকশিত করার জন্য শিক্ষকবৃন্দের তত্ত্বাবধানে নিচের ক্ষেত্রগুলােতে শিশুরা শৃঙ্খলা মেনেঃ-

১) চলার অভ্যাস করবে।

২) বিদ্যালয়ে আগমন।

৩) সমাবেশ।

৪) সহপাঠীদের ও অন্য শিক্ষার্থীর সাথে মেলামেশা।

৫) টিফিন সময়।

৬) বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে চলাফেরায়।

৭) বিদ্যালয়ে আয়ােজিত অনুষ্ঠানে খেলার মাঠে।

৮) ওয়াশরুমে লাইব্রেরি ব্যবহারে।

৯) বিদ্যালয় প্রস্থানকালে।

৪. বিদ্যালয়ের উন্নয়ন মূলক কাজে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বর্ননা করুন?

বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিজে যেমন এ উন্নয়নমূলক কাজের অংশীদার তেমনি শিক্ষার্থীদের কাজে নিয়ােজিত করে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ঘটানো প্রয়ােজন। যেমন-বিদ্যালয়ের মাঠের সংস্কার সাধন, বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধ স্থানে মাটি ভরাটের কাজ ইত্যাদি। আমাদের দেশে সরকার ও কিছু বেসরকারি সংস্থা অনেক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। শ্রেণির অপেক্ষাকৃত মেধাবী ও কর্মতৎপর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কতগুলো “শিশু মন্ত্রণালয়” গঠন করে। সেসব মন্ত্রণালয়ের শিশুদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে পাঁচ ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করে। যেমন-সকল শিশুর শিখন নিশ্চিতকরণ। বিদ্যালয় উন্নয়ন কার্যক্রমে আরাে আছেঃ-

১) বিদ্যালয়ের আঙিনায় বাগান তৈরি ও পরিচর্যা।

২) বিদ্যালয় ভবন ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।

৩) বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ।

৪) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপন।

বিদ্যালয় এলাকার (ক্যাচমেন্ট এলাকা) উন্নয়নমূলক কাজঃ

আমাদের প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট এলাকা আছে যাকে বিদ্যালয় এলাকা বা ক্যাচমেন্ট এরিয়া বলে। বিদ্যালয় এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বসবাসের জন্য সবাইকে বিভিন্ন ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। এগুলােকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১) নিয়ম-কানুন মেনে চলার কাজ ও

২) সামাজিক অংশগ্রহণমূলক কাজ।

পরিবার ও বিদ্যালয়ের মতাে এলাকার নিয়ম-কানুন মেনে চলা এবং বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের পরবর্তী জীবনের সামাজিক ও নাগরিক গুণাবলি ও দক্ষতার বুনিয়াদ রচিত হয়। এই উভয় ধরনের কাজে শিক্ষার্থীদের অভ্যাস গড়ে তােলার জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তাদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করবেন এবং যতটুকু সম্ভব তাদের কাজ পরিবীক্ষণ করবেন।

ক) বিদ্যালয় এলাকার নিয়ম-কানুন পালন করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় এলাকার নিয়ম-কানুন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। যেমনঃ

১) এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের যথাযথভাবে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে উদ্বুদ্ধ করা। সমবয়সীদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করতে এবং ছােটদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল ব্যবহার করতে শেখানাে।

২) পাড়া বা মহল্লার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ মিলে যেসব নিয়ম কানুন তৈরি করেছেন সেগুলােকে শ্রদ্ধা করতে ও মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা।

৩) বিদ্যালয়ে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে , বাজারে ও প্রতিবেশীর বাড়ির সামনে বসে আড্ডা দেওয়া নিরুৎসাহিত করা। প্রচার মূলক কাজে এসব স্থানে মাইক, লাউড স্পিকার প্রভৃতি উচ্চ শব্দে ব্যবহার না করতে পরামর্শ দেওয়া। চলর পথে মেয়েদের উত্ত্যক্ত না করা।

৪) এলাকার অন্যান্য বাসিন্দাদের অসুবিধা হয় এমন কাজ করতে নিরুৎসাহিত করা। যেমন-রাস্তার ধারে বা যেখানে-সেখানে গৃহস্থালি কাজের বর্জ্য না ফেলা। নিজ বাড়ির গ্যাস বা পানির লাইন সংস্কার করার জন্য রাস্তা কাটার পর তা তৎক্ষণাৎ ঠিক করে ফেলা ইত্যাদি।

৫) প্রতিবেশী কারাে বাড়ির ঠিকানা কোনাে আগন্তুক জানতে চাইলে বা কোনাে ধরনের সাহায্য চাইলে যথাসম্ভব তাকে সহযোগিতা করা। কারাে সাথে অসদাচরণ না করতে পরামর্শ দেয়া।

সামাজিক অংশগ্রহণমূলক কাজঃ

এলাকাভেদে উন্নয়নমূলক কাজের ধরন বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এর সবগুলো এলাকাবাসীর সমবেত প্রচেষ্টাতে উন্নয়ন করা দুরূহ। তবে এলাকার এমন অনেক কাজ আছে যেগুলাে এলাকাবাসী মিলেমিশে সহজেই সম্পন্ন করতে পারেন। এটি আমাদের নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই এ ধরনের কাজে এলাকার সদস্য হিসেবে মা-বাবা যেমন অংশগ্রহণ করবেন তেমনি পরিবারের সদস্য হিসাবে শিশুদেরকে অনুপ্রাণিত করবেন। বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ব পালন, সচেতনতাবােধ ও কায়িক শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাবােধ সৃষ্টির জন্য মা-বাবা নিজেদের পাশাপাশি সন্তানদেরকেও এসব কাজে নিয়ােজিত করবেন।তবে সাধারণভাবে এলাকায় নিম্নোক্ত ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে শিশুরা অংশগ্রহণ করতে পারেঃ-

১) পাড়া বা মহল্লার ভাঙা রাস্তাঘাট নির্মাণ, সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজে সহযােগিতা করা।

২) পাড়া বা মহল্লার পুল, সাঁকো, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ, সংস্কার ও সংরক্ষণে সাহায্য করা।

৩) ধর্মীয় স্থান, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ সংরক্ষণে সাহায্য করা।

৪) গাছ লাগানো, পরিচর্যা এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা।

৫) এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা। সকলকে ডাস্টবিন অথবা নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলতে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা।

৬) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেওয়া।

৭) নিরাপদ পানি পান সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা। এলাকায় শিক্ষার উন্নয়নের জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ কার্যক্রম গ্রহণ।

৮) এলাকার সামাজিক/রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি না করে সেগুলাে ভালােভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা।

৯) পাড়ায় বা মহল্লায় ছােটখাটো গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা।

১০) এলাকার লােকজনকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করা এবং বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ-পরবর্তী বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা।

৫. শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্ব বর্ণনা করুন।

সাধারণভাবে জীবনযাপন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ও গড়ে তােলা নানা প্রতিষ্ঠানকে সম্পদ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এলাকার সম্পদ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমনঃ-

১) ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পদ।

২) সামাজিক সম্পদ ও

৩) রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

১) ব্যক্তিগত সম্পদঃ

ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে বােঝায় কোনাে বিষয় বা বস্তুর ওপর সমাজ ও আইন স্বীকৃত এমন এক চূড়ান্ত মালিকানা-অধিকার, যার বলে ব্যক্তি ঐ সম্পত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ও ক্ষমতা অর্জন করে যেমন-জমিজমা, ঘরবাড়ি, পুকুর, বাগান, গাড়ি, কলকারখানা, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এসব সম্পদ একজন ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে অথবা নিজে কিনে বা নিজের চেষ্টায় অর্জন করে। অপরের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা সৃষ্টি না করে সে এই সম্পদগুলাে খুশিমতাে ব্যবহার করতে পারে।

২) সামাজিক সম্পদঃ

সামাজিক সম্পদে সমাজের সকল সদস্যের সমান অধিকার থাকে। সমাজের সবাই তা ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়ােজনে রক্ষণাবেক্ষণ করে। সামাজিক সম্পদ সমাজে বসবাসকারী দ্বার সম্পদ। নদী-নালা, খাল-বিল, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, পার্ক, পাঠাগার ইত্যাদি সামাজিক সম্পদের অন্তর্ভুক্ত।

রাষ্ট্রীয় সম্পদঃ 

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদের বাইরে একটি দেশের যাবতীয় সম্পদই রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সেদিক থেকে বিভিন্ন সামাজিক সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের এই সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ-রাস্তাঘাট, সেতু, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন-নদ নদী, খাল বিল, সমুদ্র, বনভূমি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রাষ্ট্র পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ। একইভাবে বিনােদনমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যথা-শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক প্রভৃতিও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অন্তর্গত। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, ব্রিজ, কালভার্ট, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, বিমান, বিমানবন্দর, বাস, রেলগাড়ি, রেলপথ, জলপথ, স্টিমার, ফেরি ইত্যাদি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যেমন- রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতি আমাদের মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে এ সকল সম্পদ ব্যবহৃত হয়।

৬. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের করণীয় ব্যাখ্যা করুন।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দেশের জনগণের সম্পদ। এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এসব সম্পদ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়া এবং সম্পদ ব্যবহার ও সংরক্ষণে সকলকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন নিচের কাজগুলাে করার মধ্য দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সম্পদ ব্যবহার ও সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করতে পারেঃ

১) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে যে কোনাে সম্পদের ক্ষতি বা অপচয় রােধ করা ।

২) প্রয়ােজন শেষে বাতি, পাখা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, রান্নার পর গ্যাসের চুলা, পানির কল ইত্যাদি বন্ধ রাখা।

৩) এলাকার খেলার মাঠ, পার্ক, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদি রক্ষা করতে শিক্ষক নিজে সচেতনভাবে ব্যবহার করবেন ও শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করবেন। যেমন-খােলা জায়গা বা পার্কের যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থান বা ডাস্টবিনে ফেলায় অভ্যন্ত করা।

৪) বিদ্যালয় ও এলাকার পাঠাগারের বই যত্নসহকারে পড়া এবং পাঠাগারের উন্নয়নের জন্য সাধ্যমতাে অবদান রাখা।

৫) খাল বিল, নদ নদীর পানিতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে পানি দূষণমুক্ত রাখা। অন্যরা যাতে পানি দূষিত না করে সে ব্যাপারে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করা।

৬) রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক, তথ্য ও বিনােদনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলাের ক্ষতি হয় এমন যে কোনাে কাজ করা থেকে বিরত থাকা।

৭) যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে ও যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণে সচেতন হওয়া। যেমন-যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি বিরত থাকা ও ক্ষতিসাধন না করা, কোনাে প্রয়ােজনে রাস্তাঘাট কাটতে হলে তা কাজের পর পরই ঠিক করে ফেলা ইত্যাদি।

৮) সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গণসচেতনতামূলক প্রচারণা ও কাজে অংশগ্রহণ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!