বাংলা (এসকে); অধ্যায়-৮ নাটক - Proshikkhon

বাংলা (এসকে); অধ্যায়-৮ নাটক

সেশন- ৮.০: নাটকের স্বরূপ, শ্রেণীবিভাগ, উৎপত্তি ও বিকাশ, অবয়ব ও উপাদান

১) নাটক কী? নাটকের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করুন।

নাটক:

দৃশ্যকাব্য ও শ্রাব্য কাব্যের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপিত গতিমান জীবনের প্রতিচ্ছবি হচ্ছে নাটক। নাটক হচ্ছে দেখা ও শোনা এই দুই গুন বিশিষ্ট কাব্য। অর্থাৎ নাটক প্রধানত দৃশ্য এবং সকল প্রকার কাব্যের শ্রেষ্ঠ কাব্য। নাটককে কাব্য শাখার শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নাটকের সামান্য লক্ষণ হচ্ছে, লোকবৃত্তানুকরণ,আর বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে অভিনয়যোগ্যতা। অর্থাৎ নাটক হচ্ছে দৃশ্য ও শ্রবন গুণবিশিষ্ট কাব্য। এ কারণে রঙ্গমঞ্চই নাটকের বিকাশ ও স্ফূর্তির স্থান।

অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র দাশ তাই সঙ্গত কারণে বলেছেন, “আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি অভিনেতা ও অভিনেত্রীর মাধ্যমে রঙ্গমঞ্চে সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভাবে উপস্থাপন করাই নাটক।”

সুতরাং নাটক হচ্ছে- ‘Creation and representation of life in the form of theater.’

নাটকের শ্রেণীবিভাগ:

নাটক প্রধানত ২ধরনের হয়ে থাকে। যথা:

১. ট্রাজেডি বা বিয়োগাত্মক নাটক এবং

২. কমেডি বা ব্যঙ্গাত্মক নাটক।

মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকে জীবনের দুঃখময় উপলব্ধি এবং করুণ রসের প্রকাশ হয়। আর কমেডি নাটকের জীবনের আনন্দ, মিলনাত্মক ভাব ও হাস্যরসের প্রকাশ হয়।

নাটকের মধ্যে অভিজাত শ্রেণীতে পড়ে ট্রাজেডি। কমেডিকে কল্পনাত্বক ভাবপ্রবণ, বাস্তব, অদ্ভুতাত্বক বিদ্রুপাত্মক, সামাজিক ও ভাবপ্রধান এমন ভাবে শ্রেণীকরণ করা যায়।

এছাড়াও নাটকের বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। যেমন-

> সামাজিক নাটক,

> বিদ্রূপাত্মক নাটক,

> বাস্তব নাটক,

> ভাবপ্রবণ নাটক, ইত্যাদি।

সামাজিক নাটক সমাজ জীবনের নানান জটিলতা পারিবারিক জীবনে আদর্শহীনতা, মানবিকতাবোধ, শ্রেণীভিত্তিক চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে রচিত হয়।(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চার অধ্যায়, রাজা, মুক্তধারা ইত্যাদি)।

তাছাড়া রাজনৈতিক নাটক, লৌকিক নাটক, পৌরাণিক নাটক (এ নাটকের বিষয়বস্তু বা প্রাচীন ধর্ম মূলক কাহিনী অবলম্বনে লিখিত। যেমন- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সীতা) ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

২) নাটককে কেন জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা হয়েছে?

নাট্যকারের নাটক রচনায় পূর্বে তার ভেতর একটি থিম কাজ করে, তিনি সমাজের কোন ঘটনাকে রূপদান করবেন।তার লেখনীর মাধ্যমে যেমন সমাজের ইতিবাচক নানা ঘটনা প্রবাহ উঠে আসে ঠিক তেমনি সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন।চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে সমাজের নানা চিত্র নাট্যকার তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নাট্যরূপ প্রদান করেন।

দর্শকগণ নাট্যকারের  থিমের মধ্য থেকে তাদের জীবন বোধ ও জীবন যাপনের হর্ষ-বিষাদ খুঁজে পান।এজন্য নাটককে জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা হয়ে থাকে।

৩) ট্রাজেডি নাটক ও কমেডি নাটকের মধ্যে পার্থক্য কী?

ট্রাজেডি:

১. ট্রাজেডি নাটক এ ব্যক্তিবিশেষের হৃদয় ক্ষরণের হতাশা বা শোক উৎসারিত হয়।

২. ট্রাজেডি নাটক সাধারণত বীর ও করুন রসের হয়ে থাকে।

৩. ট্রাজেডি নাটক অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে পড়ে।

৪. ট্রাজেডি গ্রিক ও শেক্সপিরীয় হয়ে থাকে।

কমেডি:

১. কমেডি নাটক বৃহত্তর সমাজের একটি বা দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজের অসংলগ্নতা তুলে ধরা হয়।

২. কমেডি নাটক সাধারণত হাস্যরসের হয়ে থাকে।

৩. কমেডি নাটক মধ্যম স্তরের সৃষ্টি।

৪. কমেডি কল্পনাপ্রবণ, ভাবপ্রবণ, বাস্তব, বিদ্রুপাত্মক হয়ে থাকে।

পাঠ-৮.১: কবর: মুনীর চৌধুরী

১) ‘কবর’ প্রতিপাদ্য বিষয় কী? আলোচনা করুন।

অথবা, ‘কবর’ নাটকের পটভূমি বিশ্লেষণ করুন।

অথবা, ‘কবর’ নাটকের মূলভাব লিখুন।

‘কবর’ নাটকটির মূলভাব:

কবর নাটকের পটভূমিতে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। দেশ বিভাগের পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের ওপর শাসন-শোষণ আর বঞ্চনার নগ্ন অত্যাচার শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আঘাত হানে বাঙালি জাতির মর্মমূলে।

সুদুরপ্রসারী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে দম্ভভরে তিনি ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নহে। ঐতিহ্য প্রিয় বাঙালি জাতি অযৌক্তিক এ ঘোষণার বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রত্যয়দীপ্ত জনতার মিছিল বের হয় রাজপথে, শুরু হয় চূড়ান্ত আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। এ গুলিতে নিহত হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র-জনতা। এ বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতা যাতে লাশ নিয়ে মিছিল করতে না পারে সে জন্য সারা শহরে জারি করা হয় কারফিউ। কিন্তু এত কিছু করেও শাসকগোষ্ঠী উদ্বেগহীন হতে পারে নি।নেশার ঘোরে তারা দেখেছে কবর থেকে লাশ উঠে আসছে।

‘কবর’ নাটকটি রচিত হয়েছে এ রাজনৈতিক নেতাদের জঘন্যতম ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনাদের হত্যাযজ্ঞে এদেশের পথঘাট, মাঠ, প্রান্তরসহ চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশের দৃশ্য দেখে নাট্যকার কবর নাটকটি রচনা করেন।বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিশিষ্ট নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ একটি ঐতিহাসিক নাটক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নানা ঘটনা নিয়ে জেলখানায় বসে তিনি এ নাটকটি রচনা করেন।

২) ‘কবর’ নাটকের চরিত্রগুলো কীসের প্রতীক?

কবর নাটকের নেতা,হাফিজ, ফকির, গার্ড ও কয়েকটি ছায়ামূর্তি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। চরিত্রগুলো সবাই একই প্রকৃতির নয়। এই নাটকের রাজনৈতিক নেতা ও হাফিজ চরিত্র দুটি স্বৈরাচারী পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক ও শোষক শ্রেণীর চাটুকার ও দোসরদের প্রতীক।

অন্যদিকে মুর্দা ফকির সাহসী, অকুতোভয়, প্রতিবাদী, বাংলার সন্তান, গার্ড চরিত্রটি হাবভাবে নেতার অনুগত কিন্তু স্বভাব-চরিত্র বাঙালিয়ানা ও ধুরন্ধর। মূর্তিগুলো একেকটি মরা লাশের প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!