পাঠ-৬.০: ছোটগল্পের স্বরূপ ও তাৎপর্য
১. ছোটগল্প কি? ছোটগল্পের শ্রেণীবিভাগ লিখুন।
উত্তরঃ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রাণোচ্ছল শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। ছোটগল্পের আকৃতিগত বিবেচনা মূখ্য নয় বরং প্রকৃতিগত ও মর্মগত দিক বিচারই সাহিত্যের অন্যান্য শাখা হতে এটিকে আলাদা করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কাব্যের বর্ষাযাপন কবিতার অংশবিশেষ ছোটগল্পের সংজ্ঞা নিরুপনের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যময়-
ছোট প্রাণ, ছোট ব্যাথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল
সহস্ত্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি তারি দু-চারিটি অশ্রুজল ।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইলো না শেষ।
ছোটগল্পের সংজ্ঞা:
জনৈক ছোটগল্পকার বলেছেন, “যে গল্প এক নিমিষে পড়ে শেষ করা যায় তাকে ছোটগল্প বলে।”
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, “ছোটগল্প হচ্ছে প্রতীতিজাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্য কাহিনী যার একতম বক্তব্য কোন ঘটনা বা কোন পরিবেশ বা কোন মানবিকতাকে অবলম্বন করে ঐক্য সংকটের মধ্য দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।”
ছোটগল্পের শ্রেণীবিভাগ:
জীবনের বিচিত্র খন্ডচিত্র নিয়ে ছোটগল্পের ভূবন আবর্তিত বলে ছোটগল্প স্বতন্ত্র ও বৈচিত্রে বিন্যস্ত। এ কারণে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীকরণে ছোটগল্পকে ধরা দুরুহ। তবুও বিভিন্ন আলোচক ও সমালোচক নিম্নোক্তভাবে ছোটগল্পকে শ্রেণীকরণ করেছেন।
১. রোমান্টিক প্রণয়ের গল্প,
২. সমাজসমস্যা ও সমাজসংকটধমী গল্প,
৩. দাশনিক ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প,
৪. প্রকৃতি ও মানবজীবনের গল্প,
৫. রূপক বা সাংকেতিক গল্প,
৬. পরাবাস্তব বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ক গল্প,
৭. জাদুবাস্তবতাধর্মী গল্প,
৮. ব্যঙ্গরস বা হাস্যরসাত্মক গল্প,
৯. ঐতিহাসিক বা কল্পবজ্ঞানিক গল্প,
১০. রহস্য বা গোয়েন্দা গল্প ইত্যাদি।
২. ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করুন।
ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য:
‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’ এই পঙক্তিটির মধ্যে ছোটগল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত হয়েছে। এছাড়া ছোটগল্পে নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষণীয়:
ক) ব্যঞ্জনাধর্মীতা: সাধারণত কবিতার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলেও ছোটগল্পের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
খ) সুসংবদ্ধতা: ছোটগল্পের ভাষা, চরিত্র ও ঘটনার বিন্যাস হয়ে থাকে সুসংবদ্ধ ও সুদৃঢ়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন ঘটনা ও চরিত্রের স্থান ছোটগল্পে একেবারেই থাকে না।
গ) সংবেদনশীলতা: ছোটগল্প জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পরূপ। এতে লেখকের সংবেদনশীল মানসিকতার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটে থাকে। জীবনের খন্ড অংশ ছোটগল্পের ক্যানভাসে মূর্ত হয় বৃহৎ জীবনপ্রবাহের একটি রসঘন মুহূর্ত। আর এ মুহূর্তটির বহমানতা হয়ে থাকে দ্রুতগতিসম্পন্ন।
ঘ) চরম মুহূর্ত: নাটকের তৃতীয় ওকে নাটকের তৃতীয় অংকে যেমন ঘটনার চরম উৎকর্ষ বা ক্লাইম্যাক্স রূপ পায় ছোটগল্পেও তেমনি একটি চরম মূহূর্ত লক্ষ করা যায়। এই পর্যায়ে পাঠকের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে পরবর্তী পরিণতি জানার প্রত্যাশায়।
ঙ) আকাঙ্ক্ষার অতৃপ্তি: এই বৈশিষ্ট্যটি দৃষ্টিগোচর হয় গল্পের শেষ পরিণতিতে। গল্পটি শেষ হয়ে গেলেও একটি অতৃপ্তি থেকেই যায় এরপর কী হলো কী হতে পারে? এ বিষয়ে পাঠক ভাবতে শুরু করে। এটি ছোটগল্পের সার্থক প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৩. একজন শিক্ষক হিসেবে ছোটগল্প পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশলগুলো আলোচনা করুন।
বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক জনপ্রিয় শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। ছোটগল্প লেখক আত্মসচেতন সৃষ্টি।ছোট গল্পের বর্ণনা ভঙ্গিতে শব্দগুচ্ছ বা বাক্য তার অর্থকে ছড়িয়ে গভীর ভাব ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠে। একজন শিক্ষক হিসেবে ছোটগল্প পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশল:একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ক্লাসে ছোটগল্প পাঠদানের সময় নিম্নলিখিত দিকগুলো বিবেচনায় রাখবো:
১. ছোটগল্পের কাঠামোগত দিক।
২. প্রধান ও পার্শ্ব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য সমূহ।
৩. গল্পের আদর্শগত দিক বা নীতিমালা।
৪. সমধর্মী অন্য গল্পের সঙ্গে তুলনা করা।
৫. গল্পে বর্ণিত শৈল্পিক ও তাৎপর্যমণ্ডিত বক্তব্য ।
৬. লেখক পরিচিতি আলোচনা।
৭. শব্দার্থ ব্যাখ্যা ও টিকা আলোচনা।
৮. বিভিন্ন চরিত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় ।।
৯. লেখকের জীবনানুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি।
১০. সমাজ বাস্তবতার স্বরূপ।
গল্পটি পাঠদানের সময় আমি উপরে উল্লেখিত
বিষয়গুলো মাথায় রাখবো। তবে এটাও খেয়াল রাখব যে গল্পটি পাঠদানের সময় কোন অবস্থাতেই
যেন গল্পের পঠন-পাঠনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়।
পাঠ-৬.১: তোতা কাহিনী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তোতা কাহিনী’ গল্পের মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন– এ মন্তব্যের আলোকে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার পরিচয় তুলে ধরুন।
বাংলা ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘তোতা কাহিনী’ গল্পে রূপকের আড়ালে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। এদেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ নেই। কেবল মুখস্তবিদ্যা এদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রেখেছে। প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলেমেয়েদেরকে কেবল শরবত এর মত বিদ্যা গেলানো হয়। এ শিক্ষাব্যবস্থা অন্তঃসারশূন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচলিত এই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। মানুষের সহজাত এবং সৃজনশীল চেতনা বিকাশে যে ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে ধরনের শিক্ষার পক্ষে। রবীন্দ্রনাথ তার তোতা কাহিনী গল্পে কাহিনী প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তোতা পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার নামে এ গল্পে যেসব ঘটনা উপস্থাপিত হয়েছে তা খুবই মর্মান্তিক। শেষ পর্যন্ত পাখির জীবন প্রদীপই নিভে গেল। মূলত অন্তঃসারশূন্য শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি দেখানো হয়েছে এ গল্পে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন বিদ্যালয়ে সেরকম পদ্ধতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়া দরকার যে পদ্ধতি শিশুর কল্পনাকে প্রসারিত করে যুক্তিকে শাণিত করে, বুদ্ধিকে পরিশীলিত করে। স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দদায়ক পদ্ধতিতে যে শিক্ষা লাভ করা যায় সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতি এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলেছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তায়।
২. ‘তোতা কাহিনী’ গল্পের বিষয়বস্তু সাথে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার যে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় সে বিষয়ে আপনার মতামত লিখুন।
অথবা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’ গল্প অবলম্বনে তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মিল বর্ণনা করুন।
বাংলা ছোটগল্পের সার্থক শ্রেষ্ঠ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।তার জাদুকরী হাতের স্পর্শে সবকিছু স্বর্ণময় হয়ে উঠেছে। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ,দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও ছোটগল্পকার। ‘তোতা কাহিনী’ তার অনন্য ছোট গল্প। এ গল্পে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত উপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার এক নিদারুন হতাশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শিক্ষায় প্রবেশ করেছিলেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সৃজনশীলতাহীন ও মুখস্থনির্ভর।এই মুখস্ত নির্ভরশীল শিক্ষা শিশু রবীন্দ্রনাথকে ব্যতীত করেছিল। তিনি এই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর খুব বিরক্ত হয়ে পালিয়ে বেঁচে ছিলেন। তখন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ ছিল না। কেবল মুখস্থ নির্ভরতা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রেখেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্তঃসারশূন্য এ শিক্ষাব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি এ শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন। ‘তোতা কাহিনী’ গল্প এর প্রতিক্রিয়ায় লেখা।
এই গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় প্রাণহীন মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আমরা একটি প্রাণচঞ্চল পাখিকে সংগীত শিক্ষার নামে খাঁচায় বন্দী করে পুতির শুষ্ক বুলি গিলিয়ে শেষ পর্যন্ত হত্যার চিত্র দেখতে পাই। শিক্ষার এ অবস্থার মাধ্যমে মূলত স্কুল নামক চার দেয়ালে বন্দি শিশুদের মুখস্ত বিদ্যা শেখানোর মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সৃজনশীলতাকে পাখির মতো হত্যা করা হয়। পাশাপাশি রাজদরবারের অপচয়, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির চিত্র ফুটে উঠেছে তোতা পাখি গল্পে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তক এর ত্রুটি কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষাদানের নানা অসঙ্গতি, শিক্ষাখাতে দুর্নীতি সহ নানা কাহিনী এ গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পাঠ-৬.২: পুঁইমাচা (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)
১. মৃত ক্ষেন্তি যেন জ্যোৎস্নারাতে সজীব পুঁইমাচার ভেতর দিয়ে অন্নপূর্ণার সংসারে ফিরে এসেছে ব্যাখ্যা করুন।
প্রকৃতির নানা বিষয় নিয়ে ছোট গল্প রচনাতে কালজয়ী ছোটগল্পকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় । পুঁইমাচা তাঁর একটি বিখ্যাত ছোটগল্প। তাঁর রচনা, প্রকৃতিচেতনা ,সমাজ বাস্তবতা বর্ণনায় বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। গল্পটি এর ব্যতিক্রম নয়।
পুঁইমাচা গল্পে লেখক প্রতীকী রূপে মৃত ক্ষেন্তির ফিরে আসার বিষয়টি অত্যন্ত দক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক এর দৃষ্টিতে মৃত ক্ষেন্তিই আবার পুঁইশাক হয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে ক্ষেন্তির পুনরায় পুঁইশাক রূপে ফিরে আসার কথা বলেছেন।পুঁইশাক ক্ষেন্তির খুবই প্রিয় ছিল। কিন্তু নিত্য অভাব-অনটনে বাবা মায়ের সংসারে ক্ষেন্তির ইচ্ছেপূরণের কোন সুযোগই ছিল না । ক্ষেন্তি রায়দের বাড়ি থেকে উচ্ছিষ্ট পুঁইশাক নিয়ে আসে । ক্ষেন্তির মা এগুলো দেখে ভীষণ রেগে যান। কিন্তু পরক্ষনে মেয়ের করুন মুখখানি মনে পড়ে। পুঁইশাকের প্রতি মেয়ের ভীষণ দুর্বলতার কথা মনে করে মেয়েকে পুঁইশাকের চচ্চড়ি খাওয়ান। ক্ষেন্তি একটা পুই ডাটা রোপন করে পুঁইগাছ জন্মাবে বলে প্রতিদিনই খুব যত্ন করতো। এদিকে ঘটনাক্রমে অল্প বয়সেই ক্ষেন্তির বিয়ে হয়ে যায়।শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ক্ষেন্তির বসন্ত রোগ হয় এবং শ্বশুরবাড়ির অযত্ন-অবহেলায় একসময় বিনা যত্নে এক আত্মীয়র বাড়িতে ক্ষেন্তির করুন মৃত্যু হয় । এদিকে ক্ষেন্তির লাগানো প্রিয় পুই ডাটা থেকে পুঁই গাছের চারা সজীব হয়ে জন্মাতে থাকে।
লেখকের দক্ষতায়, কল্পনার বুনিয়াদি উপস্থাপনায় পুঁইশাকের গজিয়ে ওঠা কে ক্ষেন্তির ফিরে আশার প্রতীক হয়ে পাঠকের মনে সান্ত্বনা জাগায়।ক্ষেন্তির খুবই প্রিয় পুঁইগাছটি যেভাবে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে বেড়ে উঠেছে তাতে পুঁই গাছটিকে দেখে ক্ষেন্তির উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। মনে হয় যেন ক্ষেন্তি মরে গিয়ে পুঁইগাছ হয়ে পৃথিবীতে হাস হাস্যজ্জল ভাবে ফিরে এসেছে। তাই বলা যায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থরূপেই সার্থক।
২. ‘পুঁইমাচা’ গল্পের মূলভাব লিখুন।
কালজয়ী ছোটগল্পকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ছোটগল্প পুঁইমাচা। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে তার প্রকৃতি চেতনা সমাজ বাস্তবতা ও দারিদ্র্যের নিখুঁত বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে গল্পটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। সহায়হরির সহায়হীন হতদরিদ্র পরিবারের করুন কাহিনী,নারীদের প্রতি অবহেলা, যৌতুক প্রথা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ বাস্তবতায় ক্ষেন্তির করুণ মৃত্যু ,হতদরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দারিদ্র্যের নিদারুণ অবহেলায় পুঁইমাচা প্রতীকের ভেতর দিয়ে ক্ষেন্তির ফিরে আসা ইত্যাদি বাস্তবিক বিষয় লেখক অত্যন্ত সমাজ সচেতন ভাবে তার লেখনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘পুঁইমাচা’ গল্পে দরিদ্র সহায়হরির একমাত্র মেয়ে ক্ষেন্তি। অনেক কষ্টে অভাব-অনটনে সংসার চলে সহায় হরির। দারিদ্র্যের সাথে প্রতিদিন চলে তাদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কিন্তু তার আদরের একমাত্র মেয়ে । সহায় সম্বলহীন পরিবারের প্রতি সমাজ এতটাই অসহযোগী আচরণ করল যে অসহায় অসহায় হরি একমাত্র মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। বাবার সংসারে কখনও সুখের মুখ দেখেনি মেয়েটি। ভালো কোন খাবার খায়নি,ভালো কোন কাপড় পরিধান করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। পুঁইশাক ছিলো ক্ষেন্তির প্রিয় খাবার। বিয়ের পর সমাজ-সংসারের অনাদর অবহেলায় শ্বশুরবাড়ি ক্ষেন্তির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ক্ষেন্তির বসন্ত রোগ হয় এবং শ্বশুরবাড়ির অযত্ন-অবহেলায় একসময় বিনা যত্নে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ক্ষেন্তির মৃত্যু হয়।
এ গল্পে বর্ণিত দারিদ্র ও মৃত্যুর পথে লড়াই এবং হতদরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম গ্রামবাংলার প্রেক্ষাপটে পাঠকের মনকে বেদনায় অশ্রুসিক্ত করেছে।মূলত সহায়হরির পরিবারের করুন শূন্যতাই এ গল্পের মূল বিষয়বস্তু। দারিদ্র্যের কারণে অনাদর অবহেলায় ক্ষেন্তির মৃত্যু এবং পুঁই মাচা বা পুইশাকের ভেতর দিয়ে তার পরিবারে ফিরে আসার বিষয়টি ‘পুঁইমাচা’ গল্পের মূলভাব।
পাঠ-৬.৩: নিমগাছ (বনফুল)
১. নিম গাছের উপকারিতা বর্ণনা করুন।
অথবা, নিমগাছ গল্পের মূল বক্তব্য আলোচনা করুন।
অথবা. নিম গাছের সাথে বাড়ির লক্ষী বউটির তুলনামূলক একটি চিত্র অংকন করুন।
বাংলা ছোটগল্প রচনায় বনফুল এক ভিন্ন জগৎ সৃষ্টি করেছেন ।তিনি মূলত রূপক ধর্মী ছোটগল্প রচনা করে সমাজের মানুষের সচেতন করেছেন। বনফুল একজন সমাজ সচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক । নিমগাছ তার একটি রূপক ধর্মী ছোট গল্প । গল্পে নিমগাছটির আবর্জনার স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণ হলো নিমগাছের কেউ যত্ন নেয় না। অর্থসহ নিমগাছ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কত রকমের না কাজে আসে । মানুষ নির্মমভাবে নিম গাছের উপকারি গুণসমূহ কাজে লাগায়। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের কাছে নিমগাছ তাই হয়ে উঠেছে একটি অত্যাবশ্যকীয় গাছ। কিন্তু নিমগাছটি থেকে উপকৃত হলেও এ গাছটির প্রতি মানুষের কোন যত্ন নেই ।গাছটি দারুন অবহেলায় আবর্জনার মধ্যে বেড়ে উঠে ।
নিমগাছটির আবর্জনার স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকার দ্বারা লেখক এ বিষয়টি বুঝিয়েছেন যে, যারা উপকারি তারা সমাজ-সংসারে উপযুক্ত মূল্যায়ন পায়না ।তারা নিজেদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার পায় না। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন একজন গৃহবধূ পরিবারের সকলের কাজে আসেন কিন্তু বিনিময়ে তিনি কোন মূল্য পান না ।সংসারের শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে তাকে পরিবারে থাকতে হয়। উপকারী নিম গাছ থেকে যেমন আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তেমনি পরিবারের সকল সুখের কান্ডারী একজন গৃহবধূর স্থান হয় উচ্ছিষ্ট ভরা রান্না ঘরে।
লেখক মূলত নিমগাছটির প্রতীকের বাংলার গৃহবধূদের দুর্দশা ও বঞ্চনার দিকটি বোঝাতে চেয়েছেন। মোটকথা একজন গৃহবধূ যেমন সংসারের জন্য নানা ত্যাগ স্বীকার করেও শুধু বঞ্চনা আর অবহেলা পান, ঠিক তেমনি নিমগাছও মানুষের শত উপকার করে পায় শুধু অযত্ন আর অবহেলা।
২. নিমগাছ গল্পের সার্থকতা বিচার করুন।
ছোটগল্প লেখক এর আত্মসচেতন সৃষ্টি । শেষ হয়েও হইল না শেষ এর মধ্যে ছোটগল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বৈশিষ্ট্যের আলোকে নিমগাছ সার্থকতা লাভ করেছে। গল্পে নিম গাছ এর শেষ পরিণতি গৃহস্থ বাড়ির গৃহকর্মীর সাথে তুলনা করে লেখক চমক সৃষ্টি করেছেন। তাতে পাঠককুলের যেন আগ্রহের শেষ নেই । ছোট গল্পের বর্ণনা ভঙ্গিতে শব্দ বা বাক্য তার অর্থ কে ছাড়িয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি করে।
‘নিমগাছ’ গল্পে নিম গাছের উপকারিতা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নানা উপকার করে থাকে। নিম গাছের উপকারী গুণ গুলো মানুষ কাজে লাগায়। যেমন: নিম গাছের পাতা , বাকল, কাঠ মানুষের উপকারী । মানুষ তবুও নিম গাছের যত্ন নেয় না বরং অনাদরে নোংরা আবর্জনায় ফেলে রাখে। তদ্রুপ বাড়ির গৃহকর্মী নিপুনা লক্ষ্মী বউটারও একই দশা।গৃহবধূ পরিবারের সকলের কাজে আসে কিন্তু বিনিময়ে পরিবার থেকে কোন ভালোবাসা পায় না। এদিক থেকে নিম গাছ একটি সার্থক ছোটগল্প । ছোট গল্পের চরিত্র গঠন বিন্যাস হয়ে তাকে সুসংবদ্ধ ও সুদৃঢ়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো ঘটনা, চরিত্র একেবারেই থাকে না। এদিক থেকেও নিমগাছ সার্থক ছোটগল্প । ‘নিমগাছ’ ছোটগল্পের ভাষা অত্যন্ত আঁটসাঁট এবং চলিত ভাষা। চরিত্রও খুব একটা বেশি নয় ।
নিমগাছ প্রতীকী চরিত্রের অন্তরালে গৃহবধূর সামাজিক অসঙ্গতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাঠকরা তখনই বুঝতে পারে লেখক শেষ পর্যন্ত কি বলতে চাচ্ছেন । নিম গাছের রূপক এ লেখক একজন বাঙালি বধূর পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছেন। ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য হলো জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পরূপ। এ দিক বিবেচনায় নিমগাছ গল্পটি সার্থক। কেননা নিমগাছ গল্পে নিমগাছের উপকারিতার বদলে সমাজের মানুষের কাছে কোন আদর-যত্ন পায়নি বরং চিরদিন ময়লা-আবর্জনায় রয়ে গেছে। তদ্রুপ গৃহস্থ বাড়ির বউ ও সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারকে সেবা দিয়ে যায় কিন্তু প্রতিদানে পরিবার থেকে সে ভালবাসার পরিবর্তে পায় অবহেলা আর অবজ্ঞা।
ছোটগল্পে জীবনের কোনো এক খন্ডাংশ গড়ে তোলা হয় নিমগাছ গল্পটিতেও বৃহৎ পরিবারের একজন গৃহবধূ পারিবারিক নির্যাতনের চিত্র লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। ছোটগল্পের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে পরবর্তী প্রত্যাশায়। নিমগাছ গল্পেও নিমগাছ এবং গৃহবধূর শেষ পরিণতি কি জানার আগ্রহ রয়ে যায়। ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পাঠকের মনে ব্যঞ্জনার অতৃপ্তি রয়ে যায়। নিমগাছটিও লেখকের সঙ্গে চলে যেতে চায় কিন্তু মাটির সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের কারণে তা পারে না । গৃহবধূও পরিবারের মায়া মমতার বন্ধন এর জন্য পরিবার ছেড়ে যেতে পারেনা ।
পরিশেষে বলা যায় একটি ছোট গল্পের যতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার সব বৈশিষ্টই নিমগাছ গল্পে রয়েছে । তাই ‘নিমগাছ’ নিঃসন্দেহে একটি সার্থক ছোটগল্প।
