বাংলা (এসকে); অধ্যায়-০১ ভাষা ও মাতৃভাষা - Proshikkhon

বাংলা (এসকে); অধ্যায়-০১ ভাষা ও মাতৃভাষা

অধ্যায়-০১: ভাষা ও মাতৃভাষা

 সেশন-১.১: ভাষা ও মাতৃভাষার ধারণা, ভাষার বৈশিষ্ট্য, মাতৃভাষা, মাতৃভাষার বৈশিষ্ট্য ও ভাষা ও মাতৃভাষার গুরুত্ব

১) ভাষা কাকে বলে? ভাষার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করুন।

ভাষা

মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে বিভিন্নভাবে।আর এই ভাব প্রকাশ করার জন্য মানুষ ইশারা-ইঙ্গিত, ধ্বনি, বিভিন্ন সংকেত ও চিত্রকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। ভাষা হল যোগাযোগের মাধ্যম ।

ভাষা সম্পর্কে ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগ যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি দ্বারা নিষ্পন্ন কোন বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দ সমষ্টিকে ভাষা বলে।”

ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, “মনুষ্যজাতি যেসব ধ্বনি বা ধ্বনসমষ্টির সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করে তাকে ভাষা বলা হয়ে থাকে।”

ভাষার বৈশিষ্ট্য:

ভাষার কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেগুলো হলোঃ

১. ভাষা হবে মনোভাব প্রকাশক, অর্থাৎ পরস্পর ভাব-বিনিময় এর একটি মাধ্যম।

২. ভাষা বাগযন্ত্রের সাহায্যে ধ্বনি সহযোগে উচ্চারিত হয়।

৩. ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির অর্থ থাকতে হয়।

৪. বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত হতে হয়।

৫. অর্থবোধক ধ্বনি দিয়ে তৈরি শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হয়।

৬. ভাষা ভাব বিনিময়ের মাধ্যম।

২) মাতৃভাষা কাকে বলে? কেন মাতৃভাষাকে ‘আদি ও অকৃত্রিম ভাব বিনিময়ের ভাষা’ বলার কারণ ব্যাখ্যা করুন।

মাতৃভাষা

মাতৃভাষা হল মানুষের সহজাত বিকাশের ভাষা। সাধারণভাবে মনে করা হয়- মায়ের মুখের ভাষাই হল মাতৃভাষা। প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষা হল শিশুর পরিপার্শ্বে যোগাযোগের সাধারণ ভাষা। অর্থাৎ শিশু জন্মের যে ভাষার সাথে পরিচিত হয়, সে ভাষাই তার মাতৃভাষা। এজন্য মাতৃভাষাকে প্রথম ভাষা বলা হয়। মোটকথা, দেশ-কাল-পাত্রভেদে শিশু যে দেশেই জন্মগ্রহণ করুক, সে যার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হবে তার মুখের ভাষাটিই হলো তার মাতৃভাষা। বাঙালি মাতৃভাষা হলো বাংলা।বিশ্বের প্রায় চব্বিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে।

মাতৃভাষাকে ‘আদি ও অকৃত্রিম ভাব বিনিময়ের ভাষা’ বলার কারণ:

মাতৃভাষা মানুষের সহজাত বিকাশের ভাষা.সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না প্রকাশের একান্ত নিজের ভাষা। এ ভাষা শুদ্ধ করে বলতে পরিশ্রম করতে হয় না। শিশুরা অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমে অতি সহজে মাতৃভাষা আয়ত্ত করতে পারে। মাতৃভাষা আদি ও অকৃত্রিম ভাববিনিময়ের ভাষা, ব্যক্তি মনের একান্ত উপলব্ধি ও অনুভূতির ভাষা। তাই বলা যায়, জন্মের পর মানুষ যারা আশ্রয়েই  বড় হোক তার কাছ থেকে শেখা ভাষাটিই তার মাতৃভাষা।

৩) মানব সমাজে ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করুন।

অথবা, শিশুর ভাষাদক্ষতা বিকাশে ভাষা ও মাতৃভাষার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরুন।

আদিমযুগে যুথবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষকে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপনে সচেষ্ট হতে হয়েছে। সে বিবেচনায় মানুষ ভাষা তৈরি করেছে তার নিজস্ব প্রয়োজনে। এখন পর্যন্ত মানবসমাজেই এই ভাষার অস্তিত্ব, লালন ও বিকাশ। সুতরাং মানব জীবনে ভাষার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। মানব সমাজে ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কয়েকটি কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ভাষা একটি দেশ বা জাতির ইতিহাস-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, উপরন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর হস্তান্তর ঘটে ভাষার মাধ্যমে।

২. মানুষের সকল আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার প্রকাশমাধ্যম হল ভাষা।

৩. সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ইত্যাদি সৃজনশীল বিষয়সমূহ চর্চার মাধ্যমে হল ভাষা।

৪. সভ্যতার অগ্রসরতায় ভাষার ভূমিকা অপরিসীম।

৫. সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ও এর বিকাশে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

৬. দৈনন্দিন যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার হলো ভাষা।

ভাষার উল্লেখিত গুরুত্বসমূহ অনুধাবনের ক্ষমতা এবং প্রয়োগের দক্ষতা একজন ব্যক্তি তার জন্মলগ্ন থেকেই অর্জন করে না। শিশুর ভাষাকে চেনার জগৎ মাতৃভাষার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। কারণ, শিশু যখন প্রথম শব্দটি উচ্চারণের চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের সাহায্যেই তখন সেটি সম্ভব হয়। যেমন শিশু যখন ম-ম- ম ধ্বনিটি দিয়ে উচ্চারণের প্রচেষ্টা চালায়,তখন মা মনে করেন শিশুটি মা বলার চেষ্টা করছে। তখন তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন এবং শিশুটিকে আদর করেন। এতে শিশুটি উৎসাহবোধ করে। এভাবে তাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম বা সম্পর্কবাচক শব্দ শেখাতে সবাই উৎসাহিত হন। তখন শিশুটি ভাঙা ভাঙা শব্দ বলতে শেখে। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যেসব শব্দ বিনিময় করে শিশু তা-ই অনুসরণ করে। পরিবারের সদস্যরা যখন পানিকে পানি বলে চিহ্নিত করে, তখন শিশুটি ও বুঝতে পারে তার ‘মাম’ বস্তুটির নাম আসলে পানি। কিংবা জানালার পাশে দাঁড়ানো প্রাণীটির নাম কাক। অর্থাৎ জগৎ ও জীবনের সবকিছুর সাথে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয় মাতৃভাষার মাধ্যমে।মাতৃভাষার ভেতর দিয়ে অর্জিত এই পারিবারিক অভিজ্ঞতাকে সম্বল করেই সে একসময় সমাজের বৃহত্তর পরিসরে গমন করে। শিশু যে সমাজে মেশে সে সমাজের ভাষা যদি তার মাতৃভাষা হয়ে থাকে, তাহলে শিশুর সামাজিক বিকাশ অত্যন্ত সহজ হয়।

৪) ভাষা ও মাতৃভাষার মধ্যে পার্থক্যসমূহ কী?

ভাষা

১. ভাষা হলো সর্বজনবোধগম্য।

২. ভাষার দুটি রূপ- মৌলিক ও লৈখিক।

৩. ভাষা অধিক ব্যবহৃত হয় লেখ্য ভাষা রূপে।

৪. ভাষা একটি দেশ বা জাতির ইতিহাস-সংস্কৃতি ধারক ও বাহক।

৫. ভাষা হলো আন্তর্জাতিকভাবে সাহিত্য,শিল্প, বিজ্ঞান ইত্যাদি সৃজনশীল চর্চার মাধ্যম।

মাতৃভাষা

১. মাতৃভাষা হলো মানব শিশুর মায়ের ভাষা।

২. মাতৃভাষার এ ধরনের রূপ নেই। শুধু কথা বলায় এই ভাষার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

৩. মাতৃভাষা কথ্য রূপে অধিক ব্যবহৃত হয়।

৪. উপরন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর হস্তান্তর ঘটে ভাষার মাধ্যমে। অপরদিকে মাতৃভাষা শিশুর মনোভাব প্রকাশ করে।

৫. মাতৃভাষার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে এগুলো করা সম্ভব।

৫) শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা বিদ্যালয়ে শেখানোর সুবিধাসমূহ কী?

শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা বিদ্যালয়ে শেখানোর সুবিধাসমূহ: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, শিশুকাল থেকে তারা পরিবার ও শিক্ষকের কাছে যা শেখে তাই পরবর্তী জীবনে প্রয়োগ করে। আর এ কাজটি ঘটে মাতৃভাষার মাধ্যমে।এজন্য শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা চর্চার উপযুক্ত স্থান হল বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে শিশুরা শিক্ষকের সাহায্যে মাতৃভাষার ধ্বনি,বর্ণ,উচ্চারণ,বর্ণজ্ঞান, শব্দজ্ঞান গুলো সঠিকভাবে আয়ত্ত করে। শিক্ষকরাও শিশুকে ব্যাকরণসম্মত উপায়ে ধ্বনির উচ্চারণ, বর্ণের প্রকৃতি সবকিছু সঠিক ও নির্ভুলভাবে শিক্ষাদান করে থাকে। শিক্ষকরা শিশুর সামনে কখনো ভুল উচ্চারণ, আঞ্চলিক ভাষায় কথাবার্তা বলে না। মার্জিত, সহজ-সরল, সাবলীল ভাষা শেখানোই শিক্ষকের কাজ। এজন্য বিদ্যালয়ই হল শিশুর শুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চার উত্তম স্থান।

৬) মাতৃভাষার মাধ্যমে অন্যান্য বিষয়ে পাঠদান অধিক কার্যকর কেন?

মাতৃভাষায় পাঠদান করলে শিশু সবকিছু সহজেই অনুধাবন করতে পারে। অনেকগুলো বিষয় শিশুর কাছে একেবারে নতুন। যেমনঃ মহাদেশের নাম, গ্রহ,নক্ষত্রের নাম, ইত্যাদি।এক্ষেত্রে শিশুর জানার মাধ্যমটি যদি মাতৃভাষা হয় তাহলে সেটা তার জন্য অনেক সহজ হয়। কিন্তু মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোন বিদেশি ভাষায় যদি করানো হত তাহলে বিষয় ও ভাষা মিলিয়ে শিশুর কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। যেমন-শিক্ষক যদি বলেন রাতের আকাশে আমরা যে অসংখ্য তারা দেখি তা আসলে এক একটি নক্ষত্র। সূর্য ও একটি নক্ষত্র। এক্ষেত্রে ‘তারা’ শব্দটি আগে থেকেই শিশুর কাছে পরিচিত কিন্তু নক্ষত্র শব্দটি তার দুর্বোধ্য মনে হবে। এ কারণে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিশুদের শিক্ষার মাধ্যম যদি তার মাতৃভাষা হয় তাহলে শিশু সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিবে। কেননা শিশুরা বিদ্যালয়ে গমনের পূর্বেই ভাষা দক্ষতা অর্জন করে থাকে। শিশুদের কাছে অন্যান্য ভাষার চেয়ে তার মাতৃভাষাই বেশি উপযোগী।

৬) প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে মাতৃভাষা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য সমূহ কী?

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে মাতৃভাষা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যসমূহ হলোঃ

১. মাতৃভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা যতটা সহজ বিদেশি ভাষার মাধ্যমে ঠিক ততটাই কঠিন।

২. মাতৃভাষায় শিশুর ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধি করা সহজ ও সাবলীল।

৩. বিদেশী ভাষায় শিশুর জন্য শিক্ষালাভ করা অত্যন্ত কঠিন এজন্য মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করা হয়।

৪. পারিবারিক, সামাজিক ও শিশুর বিকাশমান জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

৫. মাতৃভাষা শিশুর বিদ্যালয়ে  শিক্ষার মাধ্যমে হলে শিশুর পক্ষে চারটি দক্ষতা অর্জন সহজতর হয়।

৭) মাতৃভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?

মাতৃভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

১. মাতৃভাষা হল মায়ের ভাষা।

২. মাতৃভাষা হল প্রকৃতিগত।

৩. মাতৃভাষার ধ্বনি তরঙ্গগুলো তার পারিপার্শ্বিক ও মায়ের কাছ থেকে আসে।

৪. মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশু বিচিত্র অবয়ব ও বস্তুর নাম তার সাথে আবিষ্কার করে।

৫. মাতৃভাষার প্রথম উচ্চারিত ধ্বনিটি হয় ‘ম’ সংশ্লিষ্ট।

৬. মাতৃভাষা শিশুর পরিপার্শ্বের সাধারণ যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়।

error: Content is protected !!