অধ্যায়-০৭: গণিত শিখন মূল্যায়ন
পাঠ-৭.৩: ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ব্যবহৃত অভীক্ষাপদ প্রণয়ন
ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:
১. কাঠামোবদ্ধ অভীক্ষাপদ কত প্রকার ও কী কী?
২. নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ কী? নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।
৩. বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদের অংশ কয়টি ও কী কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলো লিখুন।
৪. গণিত বিষয় মূল্যায়নে রুব্রিকের ব্যবহার ব্যাখ্যা করুন।
৫. মূল্যায়নকারীগণের জন্য রুব্রিকের মাধ্যমে মূল্যায়নের সাধারণ নির্দেশনাসমূহ উল্লেখ করুন।
১. কাঠামোবদ্ধ অভীক্ষাপদ কত প্রকার ও কী কী?
কাঠামোবদ্ধ অভীক্ষা:
কাঠামোবদ্ধ অভীক্ষা সাধারণত ২ প্রকার। যথা:
১. সংক্ষিপ্ত-উত্তর অভীক্ষা এবং
২. দীর্ঘ-উত্তর অভীক্ষা।
১. সংক্ষিপ্ত-উত্তর অভীক্ষা:
যে অভীক্ষায় এমনভাবে প্রশ্ন করা হয় যাতে উত্তর দিতে হয় সংক্ষেপে দেওয়া যায়, তাকে সংক্ষিপ্ত-উত্তর অভীক্ষা পদ বলা হয়। এ ধরণের অভীক্ষাপদে উত্তর লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা তুলনামূলক কম থাকে।
২. দীর্ঘ-উত্তর অভীক্ষা:
যে অভীক্ষায় এমনভাবে প্রশ্ন করা হয় যাতে উত্তর দিতে হয় বিস্তৃত আকারে, তাকে দীর্ঘ-উত্তর অভীক্ষাপদ বলা হয়। এ ধরণের অভীক্ষাপদের জন্য সময় ও নম্বর উভয়ই বেশি দেয়া হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা উত্তর প্রদানের জন্য অপেক্ষোকৃত বেশি স্বাধীনতা পেয়ে থাকে। দীর্ঘ-উত্তর অভীক্ষায় বিভিন্ন ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, পার্থক্য, বর্ণনা জাতীয় প্রশ্ন করা হয়ে থাকে।
২. নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ কী? নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদের প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।
নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ:
যে সব অভীক্ষাপদ বা প্রশ্নে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রভাব রাখার সূযোগ থাকে না, তাকে নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ বলা হয়। অভীক্ষার নৈর্ব্যক্তিকতা বজায় থাকে বলেই নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ বলা হয়। নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা উভয়ই রক্ষিত হয়। সে কারণে গতানুগতিক রচনামূলক প্রশ্নের অসুবিধাগুলো দূর করার উদ্দেশ্যেই মূলত নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছে।
নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষার প্রকারভেদ:
নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ সাধারণত: ৫ ধরণের পরিলক্ষিত হয়। যথা:
১. সংক্ষিপ্ত উত্তর (Short Answer Type Item)
২. শূন্যস্থান পূরণ (Fill-in-the-Blank Type)
৩. সত্য-মিথ্যা নির্ণয় (True -False)
৪. মিলকরণ (Matching Type)
৫. বহু নির্বাচনী (Multiple Choice Item)।
(ক) সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন:
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীকে সরবরাহ করা হয় যেখানে উত্তরটি খুবই সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট হয়। প্রতিটি প্রশ্নের সাথে উত্তরের জন্য জায়গা নির্দেশ করা থাকে। অথবা কোথায় উত্তর লিখতে হবে সে সম্পর্কেও নির্দেশনা দেয়া থাকে।
উদাহরণ: ১২ এর গুণনীয়ক কয়টি? উত্তর: ——-
(খ) শূন্যস্থান পূরণ অভীক্ষাপদ:
শূন্যস্থান পূরণ জাতীয় অভীক্ষাপদে শিক্ষার্থীকে উত্তর সরবরাহ করতে হয়। একটি অর্থপূর্ণ গাণিতিক বাক্য থেকে এক বা একাধিক সংখ্যা/শব্দ তুলে নেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত সংখ্যা/শব্দ ব্যবহার করে বাক্যটি পুর্ণ করতে বলা হয়।
উদাহরণ: উপযুক্ত শব্দ বসিয়ে শূন্যস্থান পূরণ কর-
১. যে সকল পূর্ণ সংখ্যার দুইয়ের অধিক মৌলিক গুণনীয়ক রয়েছে তাদেরকে ———– সংখ্যা বলে।
(গ) সত্য-মিথ্যা নির্ণয় অভীক্ষাপদ:
সত্য-মিথ্যা নির্ণয় প্রশ্নে শিক্ষার্থীকে অর্থপূর্ণ সম্পূর্ণ বাক্য বা প্রদত্ত বিবৃতির প্রকৃতি (সত্য-মিথ্যা) নির্ধারণ করতে বলা হয়। এ ধরনের অভীক্ষাপদ দ্বারাও শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পরিমাপ করা হয়।
উদাহরণ: বাক্য সত্য হলে ‘স’ মিথ্যা হলে ‘মি’ লিখ।
১. চতুর্ভুজের চারটি কোণের সমষ্টি তিন সমকোণের সমান।
(ঘ) মিলকরণ:
এ ধরনের অভীক্ষাপদে দুটি কলাম থাকে। প্রথম কলামে থাকে কোন বিবৃতি বা প্রশ্ন। দ্বিতীয় কলামে থাকে বিবৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ধারণা বা প্রশ্নের উত্তর প্রথম সারিতে ক্রম অনুযায়ী যে ভাবে বিবৃতি বা প্রশ্নে উপস্থাপন করা হয় দ্বিতীয় সারিতে ধারণা বা উত্তরগুলো ঠিক সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না।
উদাহরণ: বাম পাশের সারির প্রশ্নের সাথে ডান পাশের সারির সংখ্যার মিল কর।
| বাম | ডান |
| ক. ঘনকের কয়টি পৃষ্টতল রয়েছে? খ. ঘনকের কয়টি ধার বা কিনার রয়েছে? গ. ঘনকের কয়টি শীর্ষবিন্দু রয়েছে? | ক. ৪টি খ. ৮টি গ. ৬টি ঘ. ১০টি ঙ. ১২টি |
(ঙ) বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদ:
নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদ বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত হয়। কারণ বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদ অন্য যে কোন প্রকার নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষাপদের তুলনায় অধিক নির্ভরযোগ্য। এ ছাড়া জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরের অর্থাৎ জ্ঞান, উপলব্ধি, প্রয়োগ ইত্যাদির উপযোগী বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদ তৈরি করা যায়। যেমন-
উদাহরণ: ১. ঘনকের কয়টি পৃষ্টতল রয়েছে?
ক. ৪ টি
খ. ৫ টি
গ. ৬ টি
ঘ. ৭ টি
৩. বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদের অংশ কয়টি ও কী কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলো লিখুন।
বহু নির্বাচনী প্রশ্নের প্রধানত দুটি অংশ থাকে। যথা:
১. মূল অংশে (STEM) থাকে একটি প্রশ্ন বা সমস্যা এবং
২. স্টেম এর নিচে ৪/৫টি বিকল্প উত্তর (Alternatives or options) দেওয়া থাকে। এই বিকল্প উত্তরগুলোর মধ্যে একটি মাত্র উত্তর সঠিক (Key) এবং বাকিগুলো ভুল উত্তর বা বিচলক (Distracter)।
উদাহরণ:

বহু নির্বাচনী অভীক্ষাপদের বৈশিষ্ট্য:
- স্টেম সরাসরি প্রশ্ন আকারে হবে অথবা একটি সম্পূর্ণ বাক্য বা উক্তি হতে পারে।
- Key -এর মাধ্যমে সঠিক উত্তরটি নিশ্চিত করতে হয়।
- সব বিকল্প উত্তর একই কাঠামোর হতে হবে। (যেমন- বাক্য, শব্দগুচ্ছ সব একই দৈর্ঘ্যের হতে হবে)।
- বিকল্প উত্তরগুলো সমগোত্রীয় হতে হয়।
- উত্তরগুলো যৌক্তিকভাবে সাজাতে হয়।
- উত্তরগুলো প্রশ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।
- না বাচক বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হয়।
- প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে কোন সূত্র রাখা যায় না।
- প্রশ্নের মধ্যে শুদ্ধ উত্তরগুলোর অবস্থান ভিন্ন হতে হয় যাতে কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া না যায়।
- প্রশ্নগুলো যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত হতে হয়।
- দ্ব্যর্থবোধক বা চালাকি প্রশ্ন না করাই ভালো।
৪. গণিত বিষয় মূল্যায়নে রুব্রিকের ব্যবহার ব্যাখ্যা করুন।
গণিত বিষয় মূল্যায়নে রুব্রিকের ব্যবহার:
শিক্ষার্থীদের নম্বর প্রদানে ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য রুব্রিক অত্যন্ত কার্যকরি একটি উপায়। শিখন-শেখানো কার্যক্রম ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ও উপাদানের মূল্যায়ন ও তা উন্নয়নের জন্য পরবর্তীতে ফিডব্যাক প্রদানের জন্য রুব্রিকের মাধ্যমে মূল্যায়ন অত্যন্ত কার্যকরি।
অতীতে গণিত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন একটি ভুলের জন্য পুরো নম্বর কেটে দেওয়া হতো বা কোনো নম্বরই প্রদান করা হতো না। ফলে পুরো নম্বরই কাটা যেত। পরবর্তিতে শিক্ষার্থীদের গাণিতিক দক্ষতা অর্জনের কথা বিবেচনা করে সমস্যা সমাধানের প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সমাধানের জন্য নম্বর প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।
রুব্রিকের মাধ্যমে মূল্যায়ন স্কেলে নম্বর প্রদানের জন্য সমাধান কী রকম হবে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা থাকে ফলে এর মাধ্যমে মূল্যায়ন সঠিক ও ফলপ্রসূ হয়। এক্ষেত্রে নম্বর প্রদানের কারণ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা সহজ হয়।
গণিত শিখন মূল্যায়ন রুব্রিক-এর ব্যবহার:
- ক্যাটাগরি অনুসারে প্রতিটি স্কোরের নিচে প্রদত্ত ব্যাখ্যা মনোযোগ সহকারে পড়া,
- সমস্যা সমাধানের প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সাথে যাচাই করে রুব্রিকের বর্ণনার সাথে মিল রেখে নম্বর প্রদান করা,
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রুব্রিকটির স্কোর আরো ক্ষুদ্র অংশে বিভাজন করে মূল্যায়ন কার্যক্রমকে আরও বেশি পরিমাণে নিঁখুত করা।
৫. মূল্যায়নকারীগণের জন্য রুব্রিকের মাধ্যমে মূল্যায়নের সাধারণ নির্দেশনাসমূহ উল্লেখ করুন।
সাধারণ নির্দেশনা:
১. উত্তরপত্র মূল্যায়নের পূর্বে মূল্যায়নকারী অবশ্যই প্রদত্ত রুব্রিকের মাধ্যমে মূল্যায়ন কৌশল মনযোগ সহকারে পড়বেন। সেইসাথে নিজস্ব মেধা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে প্রশ্নের চাহিদা ও নম্বরের আলোকে নিজেই রুব্রিক মূল্যায়ন টুলস তৈরি করবেন।
২. নিজের তৈরিকৃত মূল্যায়ন টুলস নিয়ে সহকর্মী ও পরে প্রধান শিক্ষকের সাথে মত বিনিময় করবেন।
৩. রুব্রিক মূল্যায়ন ছক প্রস্তুত করার সময় প্রদত্ত প্রশ্নে আলোকে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিকল্প উত্তর বিবেচনা করবেন।
৪. রুব্রিক মূল্যায়ন ছকে হাতের লেখা ভাল-মন্দের জন্য কোনো নম্বর প্রদানের সুযোগ রাখা যাবে না।
৫. রুব্রিকের মাধ্যমে গণিতের মূল্যায়নে বানান ভুলের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে না তবে বানান ভুলের কারণে ভিন্নরূপ অর্থ প্রকাশ পেলে তা বিবেচনা করতে হবে।
৬. গাণিতিক সমস্যা সমাধানে পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ এবং পাঠ্যপুস্তকের বাইরের যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে সঠিক সমস্যা সমাধান বিবেচনা করে মূল্যায়ন করতে হবে।
৭. পরীক্ষার্থীর কোনো প্রশ্নের মূল্যায়নে রুব্রিকের মাধ্যমে সর্বনিম্ন নম্বর প্রদান করার পূর্বে ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে।
৮. মূল্যায়নের সময় কোনরূপ কাটাকাটি কিংবা ঘষা-মাজা কিংবা ওভার রাইটিং করা যাবে না। প্রদত্ত মূল্যায়ন কোন কারণে সংশোধন করার প্রয়োজন হলে একটানে কেটে দিয়ে পরিবর্তিত মূল্যায়ন করতে হবে এবং পাশে অনুস্বাক্ষর করতে হবে।
৯. উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য লাল কালির কলম ব্যবহার করতে হবে।
১০. কোনো অস্পষ্টতা বা মূল্যায়ন সম্পর্কিত যে কোনো জটিলতার জন্য প্রধান শিক্ষক অথবা অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাথে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
