অধ্যায়-০৫: প্রাকৃতিক সম্পদ
সেশন-৫.১: প্রাকৃতিক সম্পদ
ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:
১) প্রাকৃতিক সম্পদ কাকে বলে? বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ্গুলো বর্ণনা সহকারে লিখুন।
২) 3R কৌশল ব্যবহার করে কিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা যায়?
৩) প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর জনসংখ্যার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করুন।
৪) জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে বিজ্ঞান শিক্ষার ভূমিকা আলোচনা করুন।
১) প্রাকৃতিক সম্পদ কাকে বলে? বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ্গুলো বর্ণনা সহকারে লিখুন।
প্রাকৃতিক সম্পদঃ
সাধারণত প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে প্রকৃতি থেকে প্রদত্ত সকল সম্পদকে বুঝানো হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, মৃত্তিকা, নদ-নদী, কৃষিজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, বনজ সম্পদ, বজন সম্পদ, প্রাণী সম্পদ এবং সৌরশক্তি প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদের অন্তর্ভূক্ত। এই সম্পদ মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। তবে মানুষ আহরণ এবং ব্যবহার করতে পারে। দেশের উন্নয়নে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদ পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদঃ
বাংলাদেশ আয়তনের বিবেচনায় পৃথিবীর ছোট একটি দেশ। এর প্রাকৃতিক সম্পদও কম। বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ্গুলো হলো পানিসম্পদ, ভূমিসম্পদ, বনজসম্পদ, সৌরশক্তি, বায়ুসম্পদ ও খনিজসম্পদ।
পানি সম্পদঃ
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা পানি ব্যবহার করে থাকি। যেমন- আমরা পানি পান করি, গোসল ও গৃহস্থালী কাজে আমরা পানি ব্যবহার করি, কৃষিকাজেও অয়ানি অপরিহার্য। ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্প কারখানায় প্রচুর পানি ব্যবহার করা হয়। পানিপ্রবাহ ব্যবহার করে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। নদী ও সমুদ্রের পানির উপর নির্ভর করে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও পানিতে মাছসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ বেঁচে থাকে । ব্যাপক ব্যবহারের জন্য পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।
ভূমিসম্পদঃ
ভূমি/মাটি বাংলাদেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। এদেশের সমতল ভূমি খুবই উর্বর। মাটিতে আমরা বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপন্ন করে থাকি। বেশির ভাগ এলাকায় বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন হয়। মাটি মানুষসহ অন্যান্য সকল জীবের আবাসস্থল।
খনিজসম্পদঃ
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর মধ্যে খনিজ সম্পদ অন্যতম। উল্লেখযোগ্য খনিজ দ্রব্যগুলো হলো- প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চীনা মাটি, কঠিন শিলা, সিলিকা বালি, তামা, ইউরেনিয়াম, গন্ধক ও লবণ ইত্যাদি। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও পেট্টোলিয়াম জ্বালানী হিসেবে বেশ ভালো। এগুলো পুড়িয়ে যে তাপ পাওয়া যায় তাতে কলকারখানা চলে, যানবাহন চলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, এবং রান্না করা হয়। বাংলাদেশে চুনাপাথর মোটামুটি পরিমাণে পাওয়া যায়। চুনাপাথর সিমেন্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
বনজসম্পদঃ
সাধারণত যে সকল ভূমিতে ছোট, মাঝারি ও বড় ইত্যাদি অসংখ্য বৃক্ষের সমাবেশ ঘটে তাকে বনভূমি বলা হয়। আবার বনভূমি থেকে প্রাপ্ত সম্পদকে বনজ সম্পদ বলা হয়। কোনো একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে আমাদের দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ ১৭.০৮%। বাংলাদেশের বনজ সম্পদ দেশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার সাথে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বায়ুসম্পদঃ
বায়ু সম্পদ বলতে মূলত বায়ু প্রবাহকেই বুঝায়। বায়ু প্রবাহকে ব্যবহার করে বড় চরকা বা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। বায়ু প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে গ্রামে ফসল ঝেড়ে ময়লা দূর করা হয়।
সৌর শক্তিঃ
সৌরশক্তি আরেকটি প্রাকৃতিক সম্পদ। বায়ুমন্ডলের তাপ ও শক্তির প্রধান উৎস হলো সূর্য। সূর্যের আলোকে সৌর প্যানেলের সাহায্যে সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সৌরশক্তি নবায়নযোগ্য বা এর সরবরাহ কখনো ফুরাবে না।
মৎস্য সম্পদঃ
মৎস্য সম্পদ বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বাংলাদেশকে নদী মাতৃক দেশ বলা হয়। এ দেশে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল এবং হাওর রয়েছে। আর এই সকল জলাশয়গুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এছাড়াও বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চলের লোনা পানিতেও প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের পরিকল্পিত উপায়ে চিংড়ি মাছের চাষ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে চিংড়ি মাছের সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল হবে বলে আশা করা যায়।
এগুলোই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। যদিও জনসংখ্যার তুলনায় কোনো কোনো সম্পদ যথেষ্ট পরিমাণে নেই। তবে সুষ্ঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগুলো ব্যবহার করতে পারলে সীমিত সম্পদ দিয়েই দেশ সমৃদ্ধ হতে পারে।
২) 3R কৌশল ব্যবহার করে কিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা যায়?
প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া জরুরী। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সাধারণ কিছু কৌশল আছে। তবে তিনটি কৌশলের কথা বলা যায়, তা হলো ব্যবহার কমানো (Reduce) বা মিতব্যয়ী ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার (Reuse) এবং পুনরুৎপাদন(Recycle)। এগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে ইংরেজিতে একসাথে বলা হয় 3R।
প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের কৌশল নিম্নে বর্ণনা করা হলোঃ
১. প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের প্রথম উপায় হচ্ছে তা কম ব্যবহার করা। যেমন-
২. জ্বালানি কম ব্যবহার করা।
৩. এসি ব্যবহার না, করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহার করে ও প্রয়োজন শেষে সাথে সাথে বৈদ্যুতিক পাখা, বাল্ব এগুলো বন্ধ করে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে পারি।
৪. বিদ্যুতের ব্যবহার কমালে কয়লা, পেট্রোলিয়াম বা প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমবে। একইভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের সচেতন হতে হবে।
৫. রান্না করার পরে গ্যাসের চুলা বন্ধ করা দিতে হবে। আর রান্না ব্যতীত অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহার করা উচিৎ নয়।
সম্পদের পুনর্ব্যবহারঃ
জিনিস ব্যবহারের পরে তা পুরনো হয়ে গেলে আমরা তা ফেলে দেই। পুরনো জিনিস ফেলে না দিয়ে অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেয়া ভালো। আবার পুরানো জিনিস অন্য কাজেও ব্যবহার করা যায়। যেমন-
১. টিনের কৌটায় বাজার থেকে গুঁড়ো দুধ কিনে আনা হয়। দুধ খাওয়া শেষ হলে কৌটা ফেলে না দিয়ে চাল, ডাল, মুড়ি বা মসলা রাখা যায়।
২. কাঠের তৈরি কোনো চেয়ার পুরনো হয়ে গেলে ফেলে না দিয়ে অন্য কাউকে দেয়া ভালো। এতে গাছ কাটা কমে যাবে।
পুনরুৎপাদনঃ
ফেরিওয়ালারা টিনের কৌটা, অ্যালিমিনিয়ামের ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, পুরনো লোহা ও কাচের জিনিস কিনে নেয়। পুরনো কাঁচ গলিয়ে নতুন কাঁচের সাথে মিশিয়ে কাচের জিনিস তৈরি করা হয়। একইভাবে পুরনো লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, টিন এগুলো গলিয়ে নতুন জিনিস তৈরি করা যায়। এতে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম বা টিনের আকরিক খনি থেকে কম তোলা হবে। খনিজ সম্পদ সংরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতের জন্য।
৩) প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর জনসংখ্যার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করুন।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। নিম্নে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর জনসংখ্যার প্রভাব দেওয়া হলো-
- জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়তি জনসংখ্যার জন্য অধিক খাদ্য প্রয়োজন। বাড়তি শস্য উৎপাদন এবং পশুপালনের জন্য মানুষ বন উজাড় করছে।
- বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং কলকারখানা তৈরিতেও জমি ব্যবহার করছে।
- বনভূমি ধ্বংসের ফলে বাস্তুসংস্থান পরিবর্তন হচ্ছে। জীবের আবাসস্থ ধ্বংস হয়, এমনকি জীব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। এছাড়া বনভূমি ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয় এবং ভূমিধ্বস হয়।
- কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভিদের ভাল বৃদ্ধি এবং অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে মাটি ও পানি উভয়ই দূষণের শিকার হচ্ছে।
- জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কলকারখানায় পন্য তৈরি হয়। মানুষ যাতায়াতের জন্য যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে। কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস বায়ু দূষিত করছে। এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এসিড বৃষ্টি হচ্ছে।
৪) জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে বিজ্ঞান শিক্ষার ভূমিকা আলোচনা করুন।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জনসংখ্যাকে সম্পদের পরিণত করতে বিজ্ঞান শিক্ষার ভূমিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
- বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নে দ্রুত সময়ে বেশি কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করা,
- অনেক ভারী ভারী কাজ স্বল্পসংখ্যক জনব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ করা,
- বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের আচরণ পরিবর্তনে এবং বিজ্ঞানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সমাধান,
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা,
- এত অধিক জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষি বিজ্ঞানের গবেষণা দ্বারা অধিক ফসল উৎপাদন করা,
- দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বিজ্ঞান শিক্ষারই অবদান।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার অবদানে আজ ঘরে বসেই কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস ম্যানেজমেন্ট, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা সুবিধাভোগের ফলে প্রতিটি মানুষ সম্পদে পরিণত হচ্ছে যার ফলে প্রতিটি মানুষের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপরোক্ত আলোচনান্তে বলা যায় যে, জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে বিজ্ঞান শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম।
