অধ্যায়-০১: আমাদের পরিবেশ
সেশন-১.১: পরিবেশ ও পরিবেশের উপাদান, জীব ও জড়ের বৈশিষ্ট্য এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য
- পরিবেশ কাকে বলে? পরিবেশের উপাদানগুলো কী কী? পরিবেশের উপাদান গুলোকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
- জীব কাকে বলে? জীবের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখুন।
- ‘বেঁচে থাকার জন্য মানুষ জড়বস্তুর উপর নির্ভরশীল’ কথাটির স্বপক্ষে আপনার যুক্তি তুলে ধরুন।
- প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
পরিবেশ কাকে বলে? পরিবেশের উপাদানগুলো কী কী? পরিবেশের উপাদান গুলোকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
পরিবেশঃ
উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রয়োজন, সে অবস্থাকে পরিবেশ বলে। পরিবেশ শব্দটির উৎপত্তি জার্মান শব্দ environ থেকে, যার অর্থ en অর্থে in অর্থাৎ মধ্যে এবং ‘viron’ অর্থে ‘circuit’ অর্থাৎ ‘পরিবেষ্টন’। অর্থাৎ পরিবেশ বলতে পরিবেষ্টনকারী পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বুঝায়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বলতে বোঝায় প্রকৃতির সমস্ত দান, যেমন-পাহাড়-পর্বত, নদী, বন-জঙ্গল, কীটপতঙ্গ, পানি, মাটি, বাতাস, জীবজন্তু ও মানুষ।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে পরিবেশের সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেমন- ১৯১৪ সালে আর্মস নামক এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স গ্রন্থে বলা হয়েছে- “ জীব সম্প্রদায়ের পারিপার্শ্বিক জৈব এবং প্রাকৃতিক অবস্থাকে পরিবেশ বলে।
আর্মস যাকে জৈব অবস্থা বলেছেন, পরিবেশ বিজ্ঞানী বট্কিন ও কেলার তাকেই সাধারণভাবে জৈব কারণ বলেছেন। তেমনি অজৈব কারণ আর প্রাকৃতিক অবস্থা প্রায় একই জিনিস।
পরিবেশের উপাদানঃ
আমাদের চারপাশের বিভিন্ন ভৌতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রকরণের সামগ্রিক মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে ওঠে আমাদের পরিবেশ। আমরা চারপাশে যা দেখি যেমন-বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মাটি, পানি, বায়ু, নদীনালা, গাছপালা, জীবজন্তু, পোকামাকড় ইত্যাদি সবই আমাদের পরবেশের এক একটি উপাদান।
পরিবেশের উপাদানের প্রকারভেদঃ
পরিবেশের উপাদানগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১) প্রাকৃতিক বা ভৌত পরিবেশ এবং
২) মানবসৃষ্ট বা সামাজিক পরিবেশ।
জীব কাকে বলে? জীবের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখুন।
জীব:
জীববিজ্ঞানের ভাষায় যার জীবন আছে তাকে জীব বলে। যেমনঃ মানুষ,পশু,পাখি,জীবজন্তু,পোকামাকড়। কতগুলো বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এদেরকে জীব বলা হয়-নড়ন ও চলন, অনুভূতি, খাদ্য গ্রহণ, বৃদ্ধি,শ্বসন, প্রজনন বা বংশবৃদ্ধি, রেচন ও মৃত্যু।
জীবের বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
কতকগুলো বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মানুষ, পশু, পাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়, গাছ এদের জীব বলা হয়। যেমন-
১) নড়ন ও চলন:
জীব নড়াচড়া করে। জীবের এ নড়াচড়াকে নড়ন বলে। জীবের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়াকে চলন বলে। প্রাণীর চলন সহজে দেখা যায় কিন্তু উদ্ভিদের চলন দেখা যায় না। উদ্ভিদ মাটিতে এক স্থানে স্থির থাকলেও এদের দেহের অংশবিশেষ যেমন-শিকড়, ডালপালা, আকর্ষী ইত্যাদি নড়াচড়া করে আণুবিক্ষণিক খাদ্য গ্রহণ, বাসস্থানের সন্ধান, আত্নরক্ষা ইত্যাদির জন্য জীবকে নড়াচড়া করতে দেখা যায়।
২) অনুভূতিঃ
জীব সাড়া দেয় অর্থাৎ তাদের অনুভূতি আছে। যেমন-শিশু পড়ে যেয়ে ব্যথা পেলে কান্না করে, লজ্জাবতীর পাতা স্পর্শ করলে নুয়ে পড়ে, শামুককে স্পর্শ করলে দেহকে খোলসের ভিতরে গুটিয়ে নেয়। অনুরূপভাবে জীব আলো ও তাপের উপস্থিতি বুঝতে পারে।
৩) খাদ্য গ্রহণঃ
জীব খাদ্য গ্রহণ করে এবং তা থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে।উদ্ভিদ সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে।কিন্তু প্রাণী নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না। প্রাণী খাদ্য গ্রহণের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল।
৪) বৃদ্ধিঃ
গাছপালা,মানুষ,পশু-পাখি সকলেই ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়। দেহের আকার ও ওজন বৃদ্ধি পায়। জীবের এরূপ আকার এবং ওজন বেড়ে যাওয়াকে বৃদ্ধি বলে। যেমন-উদ্ভিদ্দের ক্ষেত্রে প্রথমে বীজ থেকে চারা তারপর বড় গাছে পরিণত হওয়া।আবার জন্ম থেকে শিশু বড় হয়ে পূর্ণ বয়স্ক মানুষে পরিণত হওয়া।
৫) শ্বসনঃ
শ্বসন একটি বিপাকীয় ক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া চলাকালে প্রতিটি জীব পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে ও কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে।শ্বসন প্রতিটি জীবের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট । শ্বসন ছাড়া কোন জীব বেঁচতে পারে না।
৬) প্রজনন বা বংশবৃদ্ধিঃ
প্রজনন জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জীবের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে প্রজনন বলে। প্রজননের মাধ্যমে জীবনের ধারা বজায় থাকে।
৭) রেচনঃ
শক্তি এবং বৃদ্ধির প্রয়োজনে জীব খাদ্য গ্রহণ করে । খাদ্যদ্রব্যগুলোর পরিপাক এবং বিপাক এর কালে কিছু অপ্রয়োজনীয় পদার্থ সৃষ্টি করে । অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর বস্তুগুলো একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেহ থেকে নিষ্কাষিত হয় । এই প্রক্রিয়াকে রেচন বলে। যেমন-মানুষ রেচন প্রক্রিয়ায় প্রস্রাবের মাধ্যমে ইউরিয়া বের করে দেয়।
৮) মৃত্যুঃ
জীব চিরদিন বেঁচে থাকে না।বেশিরভাগ জীবের জীবনকাল সীমিত। জীবের জীবনকাল জন্মের মাধ্যমে শুরু হয়ে মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়।
‘বেঁচে থাকার জন্য মানুষ জড়বস্তুর উপর নির্ভরশীল’ কথাটির স্বপক্ষে আপনার যুক্তি তুলে ধরুন।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষ জড়বস্তুর উপর নির্ভরশীল:
পরিবেশে কোন জীবই এককভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য জীব বিভিন্নভাবে তার চারপাশের পরিবেশের উপর নির্ভর করে। পরিবেশের সকল অজীব বা জড় উপাদানের সাথে জীব উপাদানসমূদের সবসময়ই পারস্পরিক ক্রিয়া,আদান-প্রদান চলছে। উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর মতো মানুষও বেঁচে থাকার জন্য জড় বস্তুর উপর নির্ভরশীল।জড় বস্তুর উপর মানুষের নির্ভরশীলতার কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো:
- মানুষ শ্বাস গ্রহণের জন্য বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে।
- মানুষ বেঁচে থাকার জন্য পানি পান করে।
- মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টি ও খাবার প্রয়োজন।
- ফসল ফলানো ও বাসস্থান তৈরির জন্য মানুষের মাটি প্রয়োজন।
- জীবন যাপনের জন্য মানুষের বাসস্থান,আসবার,পোশাক,যন্ত্রপাতি ইত্যাদির প্রয়োজন হয়।
- দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে মানুষ সূর্যের আলো ব্যবহার করে। যেমন- সৌরবিদ্যুৎ জড় বস্তুর উপর মানুষের নির্ভরশীলতার উপরিউক্ত উদাহরণ থেকে বলা যায় যে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য জড় বস্তুর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল।
প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য:
| প্রাণী | উদ্ভিদ |
| ১. প্রাণীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আছে। | ১. উদ্ভিদের কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই। |
| ২. প্রাণী চলাফেরা করতে পারে। | ২. উদ্ভিদ চলাফেরা করতে পারে না। |
| ৩. প্রাণী নিজের খাদ্য নিজে তৈরী করতে পারে না। খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। | ৩. উদ্ভিদ নিজের খাদ্য নিজেই তৈরী করতে পারে। |
| ৪. এরা দেখতে পায়, শুনতে পায়, গন্ধ নিতে পারে। | ৪. এরা দেখতে পায় না, শুনতে পায় না, গন্ধ নিতে পারে না। |
| ৫. নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত প্রাণী বৃদ্ধি পায়। | ৫. মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উদ্ভিদ বৃদ্ধি পায়। |
| ৬. উদ্ভিদের কোষ প্রাচীর আছে। | ৬. প্রাণীর কোষ প্রাচীর নেই। |
