বিষয়: পেশাগত শিক্ষা (২য় খন্ড)
২য় অধ্যায়: শিখন শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল
ক্লাস-১৬: প্রতিবন্ধী শিশুর লক্ষণ ও চাহিদা।
ক্লাসের আলোচিত বিষয়:
· শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কী? শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কয়েকটি লক্ষণ লিখুন।
· শারীরিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর কয়েকটি চাহিদা উল্লেখ করুন।
· বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা কী? বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার লক্ষণগুলো লিখুন।
· বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা নিরসনের উপায় উল্লেখ করুন।
· অটিজম কী? কাদের অটিস্টিক শিশু বলা হয়?
· অটিস্টিক শিশুদের লক্ষণসমূহ লিখুন।
· অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা নিরসনে শিক্ষকের করণীয় দিকগুলো আলোকপাত করুন।
· শিখন প্রতিবন্ধিতা কী? শিখন প্রতিবদ্ধিতার লক্ষণগুলো উল্লেখ করুন।
শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কী? শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কয়েকটি লক্ষণ লিখুন।
শারীরিক প্রতিবন্ধিতা
যেসব শিশু স্বাভাবিক মানুষের মতো শারীরিক কর্মকান্ড, চলাফেরা, শরীরের অঙ্গ ব্যবহার বা সঞ্চালন করতে পারে না, তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধী বলা হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে হাত দিয়ে ঠিকভাবে কিছু ধরতে না পারা, ঠিকভাবে বসতে না পারা, ঠিকভাবে হাটতে না পারা, নিজের পরিচর্যা করতে না পারা ইত্যাদি।
শারীরিক প্রতিবন্ধিতার লক্ষণ:
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখে শিশুর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা যেতে পারে-
· অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহারে অসুবিধা হওয়া।
· শরীরের কোন অংশে কাটা বা ক্ষতযুক্ত থাকা।
· শারীরিক সমন্বয়ে সমস্যা যেমন- ভারসাম্যপূর্ণভাবে হাঁটতে না পারা বা শারীরিক সমন্বয়হীনতা থাকা।
· শরীরে কাঁপুনি হওয়া।
· প্রয়োজনীয় কাজ করতে অসুবিধা হওয়া।
শারীরিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর কয়েকটি চাহিদা উল্লেখ করুন।
শিখন শেখানো কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য এ ধরণের শিক্ষার্থীর নিম্নোক্ত ধরনের চাহিদা অনুভূত হয়-
· চলাচলের জন্য শিক্ষক বা সহপাঠীদের সহায়তা।
· বিশেষ ধরণের আসন ব্যবস্থা।
· বিদ্যালয়ে উঁচু-নিচু জায়গায় চলাফেরার জন্য র্যাম্প থাকা।
· হুইল চেয়ার যাতে বিদ্যালয়ের করিডোর ও শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত সহজে ব্যবহার করা যায় এমন ব্যবস্থা রাখা।
· শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ব্যবহার উপযোগী বোর্ড ও উপকরণ ব্যবস্থা থাকা।
· এদের জন্য ব্যবহার উপযোগী টয়লেটের ব্যবস্থা করা।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা কী? বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার লক্ষণগুলো লিখুন।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা
যেসব শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা, বুদ্ধি বিকাশে ধীরগতি, শিক্ষা গ্রহণে অক্ষমতা, গড় বুদ্ধির চেয়ে সুস্পষ্টভাবে কম বুদ্ধি, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো, সামাজিক ও আচরণগত সামঞ্জস্য বিধানের অভাব রয়েছে তাদের বুদ্ধি বা মানসিক প্রতিবন্ধী বলা হয়। সাধারণ মানুষের গড় বুদ্ধ্যাংক ৮০-১০০।
সাধারণত শিশুরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা জন্মেগতভাবে নিয়ে আসে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিশু স্থুল না যাওয়া পর্যন্ত তাদের অসুবিধা চিহ্নিত হয় না। যদিও খুব ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার বেশ কিছু লক্ষণ তাদের মধ্যে প্রকাশ পায়। বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার লক্ষণকে ছয়টি ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে। যদি কোন শিশুর মাঝে এই লক্ষণগুলো দেখা যায় তবে মনে করা হয় যে শিশুটি বুদ্ধির দিক থেকে পিছিয়ে আছে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার লক্ষণ
· শিশুর হাঁটা, চলা, বসা, কথা বলা ইত্যাদি বিকাশগুলো বয়সের তুলনায় কম হয়।
· কোনো বিষয়ে শিশু মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
· কোনো নির্দেশনা সহজে বুঝতে পারে না, একই নির্দেশনা বার বার দিতে হয়।
· শিশুকোনো শিক্ষণ, এমনকি মলমূত্র ত্যাগের শিক্ষণও সহজে গ্রহণ করতে পারে না।
· সূক্ষ্ম কোনো কাজ করতে পারে না।
· অবাঞ্ছিত আচরণ করে।
· সমবয়সীদের সাথে মিশতে পারে না। সামাজিক আচরণ ঠিকমতো প্রদর্শন করতে পারে না।
· ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে যায় বা খিঁচুনি হয়।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা নিরসনের উপায় উল্লেখ করুন।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে শিখন শেখানো কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সেগুলো হলো:
· পড়ালেখার প্রতি বেশি চাপ না দেওয়া।
· প্রশংসার মাধ্যমে উৎসাহিত করা।
· নির্দেশনা প্রদানের জন্য সহজ-সরলতা বজায় রাখা।
· বিমূর্ত বিষয় নয়, বরং বাস্তব সমস্যাভিত্তিক কাজের মাধ্যমে শেখার সুযোগ পাওয়া। এক্ষেত্রে শেখার সুযোগের কাজটি হাতে-কলমে করার মাধ্যমে হবে।
· বড় কাজ নয়, বরং ছোট ছোট ধাপে কাজ করার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে একটি বড় কাজ সম্পন্ন করার বা শেখার সুযোগ পাওয়া।
· সতীর্থ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদানের সুযোগ রাখা।
অটিজম কী? কাদের অটিস্টিক শিশু বলা হয়?
অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (ASD) একটি মানসিক বিকাশ ঘটিত সমস্যা যা স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধন জনিত অস্বাভাবিকতার ফলে হয়। এ এস ডি ধরণের রোগ সাধারণত: শৈশবে শুরু হয় এবং বড় হওয়া পর্যন্ত থাকে। অটিজমে সমস্যাগ্রস্ত শিশুকে বলা হয় অটিস্টিক শিশু।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে অসুবিধা হয়। অটিজমের কারণে কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে আবার অনেকক্ষেত্রে শিশুর মানসিক ও ভাষার উপর দক্ষতা কম থাকে। সাধারনত ১৮ মাস থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যেই এই রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়। কোন কোন শিশুর এটি অতিমাত্রায় দেখা যায়, আবার কাউকে বেশ স্বাভাবিক মনে হয়।
অটিস্টিক শিশুদের লক্ষণসমূহ লিখুন।
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখে অটিস্টিক শিশু চিহ্নিত করা যেতে পারে-
· সমবয়সীদের তুলনায় শিশুর যোগাযোগে পিছিয়ে পড়া।
· সরাসরি চোখের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে বা অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলে।
· খেলাধুলায় সমস্যা যেমন- অন্য শিশুদের সাথে খেলতে অনীহা প্রকাশ করে।
· একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি করে।
·পড়াশুনায় অমনোযোগি থাকে।
· অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ যেমন- থুথু ফেলা, খামচি দেওয়া ইত্যাদি।
· বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অতি প্রতিভাবান যেমন- মুখস্থ করা, ছবি আঁকা, কম্পিউটার দক্ষতা ইত্যাদি।
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা নিরসনে শিক্ষকের করণীয় দিকগুলো আলোকপাত করুন।
অটিজমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শিক্ষক নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন:
· প্রশংসার মাধ্যমে ভাল কাজ ও আচরণকে উৎসাহিত করা।
· সহজ এবং পছন্দের ছবি বা শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা।
· বার বার অনুশীলনের সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো।
· সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।
· দক্ষতার প্রতিটি অংশ পরিপূর্ণভাবে আয়ত্তে না আসা পর্যন্ত বারবার চর্চার সুযোগ পাওয়া।
· সতীর্থ শিখনের ব্যবস্থা করা।
· ব্যবহারিক কাজের সুযোগ রাখা।
শিখন প্রতিবন্ধিতা কী?
কিছু শিক্ষার্থীর সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও শিখতে সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। যে সকল শিক্ষার্থী একই শব্দ বারবার পড়ে বা লিখে, শব্দ বা প্রতীক উলটা করে লিখে, প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে না ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যার কারণে শিখন বাধাগ্রস্থতার সম্মূখীন হয় এমন অবস্থাকে শিখন প্রতিবদ্ধিতা বলে। এ ধরণের সমস্যাকে অনেকেই শিশুর ইচ্ছাকৃত ভুল বা অমনোযোগী শিশু ভাবেন। কিন্তু তা নয় বরং তারা অনিছাকৃতভাবে এবং অবচেতনেই এ ধরনের ভুল করে।
শিখন প্রতিবন্ধিতার লক্ষণ
· শব্দ বাদ দিয়ে, যুক্ত করে বা বারবার পড়া
· সমবয়সীদের তুলনায় অনগ্রসরতা যেমন-সহপাঠীদের মত শিশুর সংখ্যা গণনা করতে না পারা বা শিশুর লেখা বিসদৃশ, অপটু বা ধীরগতি হওয়া।
· অপ্রাসঙ্গিক কাজে মনোযোগ দেওয়া।
· শব্দ বা সংখ্যা উলটা করে পড়া বা লেখা যেমন- ন কে ফ, ৬ কে ৯, ১৩ কে ৩১ ইত্যাদি।
· লিখতে অসুবিধা হওয়া
· শব্দ বা বাক্য বুঝতে সমস্যা হওয়া।
· কথা বলতে সমস্যা হওয়ার কারণে অসম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করে।
