-জ্ঞান সাগর
বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। বঙ্গাব্দ শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে। বাংলা সন বা বাংলা বর্ষপঞ্জি হল বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্য মণ্ডিত সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, পান্তা ইলিশ খেয়ে বৈশাখ পালনের রীতি বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গাব্দ গণনার শুরুর দিকে পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গাব্দ উৎপত্তির অকাট্য কোন প্রমাণ মেলেনি। তবে লোকমুখে প্রচলিত বিভিন্ন টুকরো টুকরো ঘটনাকে একত্রিত করে বাংলা সনের প্রবর্তনের সিংহভাগ কৃতিত্ব দেওয়া হয় মোঘল সম্রাট আকবরকে।
মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে বাংলা সন তাঁর রাজত্বে প্রচলন করেন বলা হলেও বাদশাহ আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তাঁর সভাসদ জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীর সহযোগিতায় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে ‘তারিখ-এ-এলাহি’ নামে নতুন এক বছর গণনা পদ্ধতি চালু করেন। সে সময় মুঘল সাম্রাজ্যে ‘হিজরি সন’ চালু ছিল। কিন্তু ‘হিজরি সন’, যা চন্দ্রসন হওয়ার প্রতি বছর একই মাসে খাজনা আদায় সম্ভব হতো না। এই সমস্যার সমাধানে এই অঞ্চলে বাংলা সন গণনা প্রবর্তিত হয়। সে সময়ের কৃষক শ্রেণির কাছে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত হয়। পরে এটি ‘বঙ্গাব্দ’ নামেই পরিচিতি পায়।
‘তারিখ-এ-এলাহি’র আগে বাঙালিরা শকাব্দ অনুযায়ী চৈত্র মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ব্যবহার করত। পরে যখন ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস মহররমকে ‘তারিখ-এ-এলাহি’র প্রথম মাস ধরে গণনা করা শুরু হয় তখন তা বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বৈশাখকেই ধরা হয় ‘তারিখ-এ-এলাহি’র প্রথম মাস।
আধুনিক বাংলা সন তথা বঙ্গাব্দকে বর্তমান রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব অবশ্য বাংলা একাডেমির। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি বাংলা সনের বিভিন্ন মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করেন। যার মধ্যে ছিল বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির মতনই ৩৬৫ দিনের। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন থেকে বাংলা একাডেমির সুপারিশ করা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, একটা সময় ছিল যখন কৃষকদের মধ্যে ’ফসলি সন’ হিসেবে প্রচলিত আজকের বাংলা সন শুরু হতো অগ্রহায়ন মাস থেকে। পহেলা অগ্রহায়ন ছিল নববর্ষ।
এবার জেনে নেওয়া যাক, বাংলা মাসগুলোর নামকরণ কীভাবে হলো? শুরু থেকেই বাংলা মাসগুলোর নাম এমন ছিল না। প্রথমদিকে মাসের নাম ছিল ফারওয়ারদিন, খোরদাদ, তীর, মুরদাদ, শাহরিয়ার, আবান, আযার, দে, বাহমান ইত্যাদি। পরবর্তীতে নাক্ষত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নামকরণ রাখা হয়। বিশেষজ্ঞগণের মতে, ৭৮ খ্রিস্টাব্দে নামগুলো সাকা জাতির রাজত্বের সময় প্রচলিত শাকাব্দ থেকে নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে বাংলা মাসের নামগুলো রাখা হয়:
১. বিশাখা থেকে বৈশাখ, ২. জাইষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ্য, ৩. আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, ৪. শ্রাবনা থেকে শ্রাবন, ৫. ভাদ্রপাদা থেকে ভাদ্র, ৬. আশ্বিনী থেকে আশ্বিন, ৭. কৃতিকা থেকে কার্তিক, ৮. পুস্যা থেকে পৌষ, ৯. আগ্রৈহনী থেকে আগ্রহায়ণ, ১০. মাঘা থেকে মাঘ, ১১. ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, এবং ১২. চিত্রা থেকে চৈত্র।
এখন কথা হলো পহেলা বৈশাখ পালনের এত যে ধুম তা কিন্তু ১০০ বছর আগেও তেমন ছিল না। ১৯১৭ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা ও কলকাতায় পহেলা বৈশাখ পালনের খবর পাওয়া যায়। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করা হলেও তা নগরজীবনে কিছুটা ব্যাপকতা পায় ষাটের দশকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিমাতসুলভ বাংলার মানুষকে প্রতিবাদী করে তুলে। মূলত এই প্রতিবাদ করতে গিয়েই ঢাকায় ১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। এর ফলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পরিধিও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ পালনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। নব্বই দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শেষে সেনাশাসনের অবসানের পর বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। এভাবেই পহেলা বৈশাখ আজকের সার্বজনীন রূপ লাভ করেছ। ঢাকায় বৈশাখী উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। তখন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সস্টিটিউটের আয়োজনে প্রতিবছর মঙ্গল শোভাযাত্রাটি পরিচালনা করা হয়। অন্যদিকে রমনার বটমূলে ভোর থেকে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উৎযাপন শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকাসহ সারাদেশব্যাপী পহেলা বৈশাখ উৎযাপন বাঙ্গালীর অন্যতম প্রধান উৎসব হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
