অধ্যায়-০২: শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (২য় অংশ)
এই ক্লাস শেষে যে বিষয়গুলো জানতে পারবেন:
- শিশু বিকাশের স্তর বা পর্যায়সমূহের বর্ণনা দিন।
- গর্ভকাল কী?
- গর্ভকালে শিশুর বিকাশের ধাপগুলো কী কী?
- নবজাতককাল কী?
- নবজাতকের অভিযোজন (Adjustment) ক্ষমতা সম্পর্কে লিখুন।
- প্রাক-শৈশবকাল কী?
- বাল্যকাল (Early Childhood) বলতে কী বুঝায়?
- হেভিংহাস্টের মতে লেট চাইল্ডহুড এর বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
- বয়ঃসন্ধিকাল কী?
- বয়ঃসন্ধিকালের বৈশিষ্ট্যাবলী লিখুন।
- বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা উল্লেখ করুন।
- বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক পরিবর্তনগুলো কেমন হয় তা উল্লেখ করুন।
- তারুণ্য কী? এ সময়ের বৈশিষ্ট্য লিখুন।
শিশু বিকাশের স্তর বা পর্যায়সমূহের বর্ণনা দিন।
জন্মপরবর্তী শিশুর বিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছুটা পার্থক্য থাকলেও পৃথিবীর সকল দেশের শিশুরা প্রাকৃতিক নিয়মে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিশুরা একটি নির্দিষ্ট বয়সে বসে, দাড়ায়, হাঁটে, কথা বলে। এর ব্যতিক্রমও ঘটে, তবে তা খুবই কম। তাদের এই বৃদ্ধি ও বিকাশ প্রায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ঘটে। পূর্বের স্তর পার না করে সাধারণত শিশু পরবর্তী স্তরে প্রবেশ করতে পারে না। যেমন- কোনো শিশু হাঁটা না শিখে দৌঁড়াতে পারে না, বা বলা যায় হাঁটা ভালোভাবে না শিখে কেউ ভালোভাবে দৌঁড়াতে পারে না।
শিশু বিকাশের বিভিন্ন স্তর বা পর্যায় নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. গর্ভকাল (Intra-uterine embryo and fetus): গর্ভধারণ থেকে জন্মপূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত,
২. নবজাতক (Infancy): জন্মপরবর্তী ২সপ্তাহ,
৩. প্রাকশৈশব (Toddler or Babyhood): ২ সপ্তাহ থেকে ২ বছর,
৪. বাল্যকাল (Early Childhood): ২ থেকে ৫ বছর,
৫. বাল্যকাল (Late Childhood): ৬ বছর থেকে ১০/১১ বছর,
৬. বয়ঃসন্ধিকাল বা কৈশোর (Puberty or Pre-adolescent period): ১০/১১ বছর থেকে ১৩/১৪ বছর,
৭. তরুন বয়স (adolescent period): ১৩/১৪-১৮ বছর।
গর্ভকাল কী?
গর্ভধারণ থেকে জন্মপূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সময়কাল হলো গর্ভকাল। শিশু ভূমিষ্ট হবার মধ্য দিয়ে এ পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এ পর্যায়ে বংশগতসূত্রে পাওয়া সহজাত গুণাবলী সঞ্চালিত হয়, যা পরবর্তী জীবন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে, ছেলে না মেয়ে হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায়। মানব জীবনের সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশ ঘটে এ স্তরে মাত্র নয় মাসে একটি কোষ ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুতে পরিণত হয়। শিশুর শারীরিক ও জ্ঞানীয় বিকাশ শুরু হয় জন্মের পূর্ব থেকে এবং সামাজিক বিকাশ শুরু দেড় মাস বয়স থেকে সামাজিক হাসির মাধ্যমে। এরপর থেকে শিশু যতবেশী মানুষ, প্রানী এবং বস্তুর সান্নিধ্যে আসে সামাজিকতা ততই বাড়তে থাকে।
গর্ভকালে শিশুর বিকাশের ধাপগুলো কী কী?
গর্ভধারণের পর থেকে জন্মপ্রহণ পর্যন্ত সময়কালকে গর্ভকাল বা প্রি-নেটাল পিরিয়ড বলা হয়। অর্থাৎ গর্ভধারণের মূহুর্ত থেকে এ পর্যায়ের শুর হয় এবং ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে এর সমাপ্তি ঘটে। মাতৃগর্ভে যখন থেকে মানব শিশুর ভ্রুণ জন্ম হয় তখন থেকে ৯মাস বা ২৮০ দিন পর্যন্ত এই ধাপ বিস্তৃত। এ সময়ে শিশু ৪টি ধাপে বেড়ে উঠে। সেগুলো হলো:
১. কনসেপশন স্টেজ (Conception Stage)
২. জার্মিনাল স্টেজ (Germinal Stage)
৩. এমব্রায়োনিক স্টেজ (Embryonic Stage)
৪. ফেটাল স্টেজ (Fetal Stage)
নবজাতককাল কী?
ভূমিষ্ট হবার পর থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত এ ধাপ বিস্তৃত । এ সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পূর্ন ভিন্ন একটি জগতের তথা নতুনপরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে শুরু করে এবং খাপ খাওয়ানো না হওয়া পর্যন্ত বিকাশ ব্যাহত হয়। পর্যায়টি নবজাতকের জন্য বিপদজনক। এ পর্যায়ে সঙ্গতিবিধানের অন্যতম বিষয় হলো:
- পরিবর্তিত তাপমাত্রার সাথে সঙ্গতি বিধান (কারণ মার পেটে থাকাকালীন সে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটে থাকে),
- শ্বাস-প্রশ্বাস,
- চোষা,
- গলধকরণ করা কঠিন হবার কারনে এসময়ে ওজন হ্রাস পায়।
- জন্মগতভাবেই নবজাতক যে স্বতন্ত্র এবং পৃথক মেজাজের অধিকারী তা তার কর্মতৎপরতা ও সংবেদনশীলতায় ধরা পড়ে যা পরবর্তীতে তার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতায় প্রভাব ফেলে।
নবজাতকের অভিযোজন (Adjustment) ক্ষমতা সম্পর্কে লিখুন।
শিশুর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জন্ম পরবর্তী প্রথম মাসটি অত্যন্ত সংকটময়। কারণ এ সময় শিশু অতি সহজে যে কোন রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। কেননা নবজাতকের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে সঙ্গত বিধান করার ক্ষমতার যথেষ্ট অভাব থাকে। নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখার সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ৪টি শারীরবৃত্তীয় চাহিদা অপরিহার্য।
১) শ্বাসকার্য,
২) তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা,
৩) খাদ্যগ্রহণ এবং মলমূত্র ত্যাগ এবং
৪) বাহ্যিক পরিবেশের সাথে উপযোজন।
প্রাক-শৈশবকাল কী?
এর সময়কাল শিশু জন্মের ২ সপ্তাহ থেকে ২ বছর পর্যন্ত । প্রাক-শৈশবে শিশুর দৈহিক বিকাশ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দৈহিক বিকাশের সাথে সাথে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে- এর ফলে দৈহিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জনের ফলে স্বনির্ভরতার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।
এসময় শিশুরা মূলত বিভিন্ন ইন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে শেখে এবং চোখে পড়ার মতো কিছু অপরিহার্য দক্ষতা যেমন-গড়াগড়ি দেওয়া, পাশ ফেরা, জিনিস ধরা, হামাগুড়ি দেয়া,বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা, কথা বলা ইত্যাদি দক্ষতা অর্জন করে। শিশুরা তার সেবাদানকারীকে (বাবা/মা) চিনতে পারে ও বিভিন্ন আচরণে সাড়া দেয়।
বাল্যকাল (Early Childhood) বলতে কী বুঝায়?
২ থেকে ৫ বছর এ পর্যায়টি অর্জনের সময়। এ পর্যায়ে শিশুর প্রতি যে সামাজিক প্রত্যাশার প্রভাব তার আগ্রহ, আচরণ, মূল্যবোধে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। সমাজ ও পরিবেশ বিষয়ক সরল ধারণা গড়ে ওঠে। আচরণে ন্যায় অন্যায় বোধের প্রতিফলন সুস্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। এ পর্যায়ে শিশুরা যে সকল ক্সবশিষ্ট্য অর্জন করে তাহলো শক্ত খাবার খেতে শেখে, ভালভাবে হাঁটতে শেখা, মলমূত্র নিয়ন্ত্রণ করা, স্ত্রী পুরুষের বিদ্যমান পার্থক্য করতে পারা, লেখাপড়া শুরু করার জন্য প্রস্তুত হওয়া, সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মাধ্যমে বিবেক গড়ে ওঠা ইত্যাদি। দলের সদস্যপদ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন এ পর্যায়ের শিশুদের অন্যতম বিকাশমূলক কাজ। তাই এপর্যায়কে দলপূর্ব (pre-gang age) বয়স বলা হয়ে থাকে। এ বয়স থেকেই সামাজিক অভিযোজন প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।
হেভিংহাস্টের মতে লেট চাইল্ডহুড এর বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
৬ বছর থেকে ১০ /১১ বছর বাল্যকাল (Late Childhood) মানব জীবনের এপর্যায়ে বিশেষ কিছু দক্ষতা অর্জন করে যা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিযোজনে সহায়তা করে। হেভিংহাস্টের মতে অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
- খেলাধূলার জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক নৈপুণ্য;
- উচ্চতর এবং বিকাশমান প্রাণী হিসাবে যথাযথ মনোভাব;
- সমবয়সীদের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করা;
- লিঙ্গ অনুযায়ী সামাজিক ভূমিকা পালন;
- লেখাপড়া ও গণনার মৌলিক কৌশল অর্জন;
- জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন ধারণা অর্জনের মাধ্যমে নৈতিক বিকাশ সাধন;
- বিভিন্ন জনগোষ্ঠি ও প্রতিষ্ঠান সর্ম্পকে মনোভাব তৈরি;
- স্বাবলম্বিতা ও সক্ষমতা অর্জন।
বয়ঃসন্ধিকাল কী?
১০/১১ বছর থেকে ১৩/১৪ বছর বয়ঃসন্ধিকাল বা কৈশোরকাল (Pre-adolescent period) বলে। জীবন বিকাশের অত্যন্ত ক্সবচিত্র্যপূর্ণ, সুন্দর এবং একই সাথে বিপদজনক একটি পর্যায়। স্বল্পস্থায়ী এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। বয়ঃসন্ধিকাল যেমন- অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিপক্কতা অর্জন করে, সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা লাভ করে। এস্তরে সবচেয়ে বেশি দৈহিক বৃদ্ধি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুপাতের পরিবর্তন হয়। এ পর্যায়ে যতটুকু তথ্য তাদের চাওয়া ততটুকুই দেয়া প্রযোজন। পরিবর্তনের অস্থিরতায় উপযোগী আচরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশণা প্রয়োজন। প্রাপ্ত বয়সে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভের অদম্য ইচ্ছা ও সুখকর প্রত্যাশাই সাফল্যের পথে চালিত করতে পারে।
বয়ঃসন্ধিকালের বৈশিষ্ট্যাবলী লিখুন।
১) বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দৃঢ়তা এবং সতেজতা বৃদ্ধি পায়।
২) তখন ছেলেদের দাড়ি গোঁফ এবং ছেলে-মেয়েদের উভয়েরই বগল ও যৌনাঙ্গের পার্শ্বে পরিপক্ক লোম গজাতে শুরু করে।
৩) এ বয়সে অনুরাগ এবং জানার কৌতূহল বৃদ্ধি পায়।
৪) খুব তীব্রভাবে আনন্দ অনুভূতির প্রকাশ করে থাকে।
৫) সমবেদনার চেয়ে মর্মবেদনা বেশি থাকে।
তারুণ্য কী? এ সময়ের বৈশিষ্ট্য লিখুন।
মানব জীবনের ১৩/১৪-১৮ বছর সময়কালটি হলো তরুণ বয়স (Adolescent period)। এ সময়কালে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিপক্বতা অর্জন করে। মানসিকভাবে সে নিজেকে অনেক বেশি সাহসী মনে করে, আবার কখনো কখনো হতাশা প্রকাশ করে। এমনকি সে যা নয় তাও ভেবে থাকে। এসময় নিজেকে বিভিন্ন পরিবেশে, আবেগিক অনুভ‚তি যেমন, রাগ, দুঃখ, মেজাজ ইত্যাদি বেশ জোরালোভাবে প্রকাশ করে। এসময় ছেলে ও মেয়েদের বিশেষ আবেগিক ও সামাজিক পরামর্শ বেশ গুরুত্বের সাথে প্রদানের প্রয়োজন হয়। তারুন্য প্রাপ্ত বয়সের সূচনা, আত্ম পরিচিতি অর্জনের বয়স। বয়সের দিক থেকে এরা সার্বিকভাবে পরিপক্ক। এপর্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
- সমবয়সী ছেলেমেয়েদের একত্রে নতুন সম্পর্ক তৈরি করা;
- নিজের দৈহিক গঠন স্বীকার করে তার যথার্থ ব্যবহার করা;
- বাবা-মা ও বয়ষ্কদের অযাচিত আদর ভালবাসা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে শেখা;
- অর্থোপার্জনের উপযুক্ত বৃত্তি গ্রহণের প্রস্তুতি, বিবাহ ও পরিবার প্রতিপালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা;
- নিজেকে স্বনির্ভরভাবে পরিচালিত করার নীতিমালা উদ্ভাবন ও আদর্শগ্রহণ তারুণ্যের স্বীকৃতি ভালবাসা ও সাফল্য অর্জনের উপর অভিযোজন নির্ভর করে। তরুণ-তরুণী যদি নিজেদের সমস্যা যথাযথ ভাবে সমাধান করতে সক্ষম হয়, তবে আত্ম প্রত্যয় বৃদ্ধি পায়। বাস্তবসম্মত চিন্তাশক্তি অর্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
