মাতৃভাষা চর্চা: একটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা - Proshikkhon

মাতৃভাষা চর্চা: একটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা

লেখক: সাফিয়া নায়লা শুভ্রা, পেশা: শিক্ষকতা; ইমেইল: shuvrasamad91@gmail.com

একটি দেশে অঞ্চলভেদে মাতৃভাষার কথ্যরীতিতে পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পরিবর্তন হয় না। সুতরাং, এই যে আঞ্চলিকতা হেতু মাতৃভাষার পরিবর্তন, এটা সহজেই বোধগম্য এবং এটি দূষণীয়ও নয়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ভাষণসহ অন্যান্য বক্তৃতা শুনলেও বোঝা যায় যে তাঁর ভাষণেও আঞ্চলিকতার টান ছিল কিন্তু সেগুলো বুঝতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় নি। একই কারণে অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারেও ন্যূনতম বোধগম্য শব্দ ও ভাষার প্রয়োগ করা উচিৎ, সেটি প্রমিত বা পুরো শুদ্ধ না হলেও চলবে। যেমন- খাইসি/খাইচি/খেয়েসি/খেয়েচি/কেয়েচি চলতে পারে কিন্তু কোন অবস্থাতেই খানু নয়। কারণ ‘খানু’ শব্দটি সব অঞ্চলের মানুষের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে।


মুশকিল হচ্ছে মাতৃভাষা মানুষের জন্মপূর্ব নির্ধারিত বিষয়, সংস্কৃতির বাহ্যিক কোনো উপাদান নয় এবং নিয়ত অভ্যাস ও চর্চার ফলে এটি তাঁর রক্তে-অস্থিমজ্জায় মিশে যায়। ফলে এর প্রভাব থেকে বের হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব হয় না। কিন্তু ভবিষ্যত পেশা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে আঞ্চলিক ভাষার এরূপ সম্পূর্ণ প্রয়োগ বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের জন্যই বিব্রতকর এবং কার্যক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। 


এই সমস্যার দুটো সমাধান হতে পারে।  প্রথমত- বিদ্যালয়ে, শিক্ষকদের মাধ্যমে একেবারে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে ছোট ছোট শিশুদের পুরো শুদ্ধ উচ্চারণে অক্ষর ও কথনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করানো এবং প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি শিক্ষকের তাদের বিষয়েও এই প্র্যাকটিস অব্যাহত রাখা। এছাড়াও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বন্ধু-বান্ধব এবং সামাজিক পরিমন্ডলে মোটামুটিভাবে হলেও প্রমিত ভাষায় যোগাযোগের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান ও প্রণোদনা দেওয়া যা আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে শুদ্ধ ভাষায় ডায়ালগ, গল্প বলা, বক্তৃতা প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মাধ্যমে করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত- শিক্ষাক্ষেত্রসহ জনজীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার লিখিত এবং মৌখিক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ইংরেজিকেও একেবারে বাদ না দিয়ে দ্বিতীয় বাধ্যতামূলক ভাষা হিসেবে চর্চা ও প্রয়োগ করা। অর্থাৎ যে কোন রাষ্ট্রীয় বা নির্বাহী আদেশ, কোর্টের নথি এবং রায়, সমস্ত সরকারী ও বেসরকারী অফিশিয়াল আদেশ কার্যক্রম বাংলা এবং ইংলিশ উভয় ভাষাতেই ব্যবহার করতে হবে। এতে যে কেউ, যে কোন প্রয়োজনে তার সুবিধামত কাজ করতে পারবেন। তাছাড়া প্রশাসনের মান উন্নয়নে নানা রকম সরকারী-বেসরকারী গবেষণা, তথ্য প্রাপ্তি, জবাবদিহিতা, সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে বলেও মনে করি। কারণ আমরা মানি বা না মানি, ইংরেজি আমাদের শিখতেই হবে, জানতেই হবে। তা নাহলে আমরা পেশা ও আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমাগত সব দিক দিয়েই পিছিয়ে থাকব। তবে  গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অবশ্যই মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

সবাইকে অমর ২১শে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে রুখে দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি মাতৃভাষা বেঁচে থাকুক। আমরা একে-অপরের ভাষা-সংস্কৃতি-জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বত্তোম উপাদানটি লেনদেন করব, করে নিজেদের সমৃদ্ধ করব কিন্তু একে-অপরের মধ্যে হারিয়ে যাব না, বাংরেজির মত উদ্ভট-উৎকট ভাষার আবিষ্কার ও ব্যবহার করে নিজের এবং ভাষার ব্যক্তিত্ব নষ্ট করবো না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস সফল ও গৌরবমন্ডিত হোক। ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!