কবিতা-মুক্তির মন্ত্রদান - Proshikkhon

কবিতা-মুক্তির মন্ত্রদান

মুক্তির মন্ত্রদান

-এনতাজুর রহমান

নিরন্ন নির্বাস বঞ্চিত লাঞ্চিত যত

নির্জাতনের দগ্ধ ক্ষত

বয়ে প্রাণে বয়ে সারা গায়ে

পিপিলিকার পায়ে শত সহস্র সারে সমাগত

বনানীর মুক্ত মাঠে

গগনদীর্ণ স্লোগানে প্রকম্পিত বনের স্তব্ধ হাওয়া

আজকে হবে গাওয়া

মুক্তির মন্ত্রবাণী মহা উৎসবে

চকিত বায়স ছুটে নিরাপদ দূরে ভীত চিৎকারে

নিজেরে লুকায় ঢেকে বন শাখে ঘন পল্লবে।

অসীম প্রতীক্ষায় লক্ষ লক্ষ বনবাসী—

কখন মন্ত্রদাতা আসিন বেদীতে আসি!

মন্ত্রস্তুতি শুনাবেন কানে কানে

পৌঁছাবে প্রাণে প্রাণে বনময় ভেসে ক্ষুরধার মুক্তির অসি।

তিল ঠাঁই নাই তবু আরো আসে,আসে সারে সারে

আসে দলে দলে ফেলে সব গৃহকাজ মাঠে সংসারে

নিতে হবে মুক্তির মন্ত্রে জীবনের দীক্ষা

অধীর প্রতীক্ষা!

কই সে দীক্ষাদাতা সিদ্ধপুরুষ বিশুদ্ধ নরদেব?

কৃষ্ণবিবর ভেদি বারবার ফিরে আসে

মহাকালের দীপ্ত তারকা

নির্জাতিত লাঞ্চিত যত বঞ্চিত পাশে!

সময়ের সবক’টা কাঁটা থির ঠাঁই বসেছে অনড়

দিনের সূর্যটাও আজ কুতুহলি কিশোর

কী উৎসব আজ বন প্রান্তরে!

চায় না মনে-প্রাণ তার না দেখে ফিরে যায় ঘরে।

তবু ঘরের তাড়ায় বকুনির ভয়ে

হাটে ধীর পায়ে

বারবার ফিরে চায় বনপ্রান্তরে চক্ষু বাঁকায়ে—

কী উৎসব আজ মুক্ত বেদিতে আকাশের ছায়

পাব না কি দেখা পোড়া এ চোখে তারি কিঞ্চিৎ,হায়!

এ বনের যত ফল দূর বন হতে

নিয়ত লুটে লয়

প্রসারিত সুদীর্ঘ কালো অসুর মলিন হাতে

অগাধ ধনে সুসমৃদ্ধ বনে বনবাসীর উপোসে কাটে

লাজের বসন কেড়ে নেয় তারা আপন বন তল্লাটে

প্রতিবাদী ঠোঁট গুলো মুড়ে দেয় কঠিন পেরেক সেটে

শুধু বোবা ক্রন্দন ধ্বনি অস্ফুটে ফিরে

মৃদু ঢেউ তুলে বনের গুমোট তপ্ত বাতাস ঘিরে

এ বনের প্রাণে হয় ওবনের যজ্ঞ-বলি

ওবনের ভণ্ড ভ্রষ্ট দেবতার দল

প্রসন্ন চিত্তে অট্টহেসে খেলে রক্ত-হলি

এ বনের যত ধনরাশি চাতুরি বাহনে ভাসে

ওবনের ভাণ্ডারে গিয়ে জমে রাশে রাশে

এ বনের প্রাণ সব কাঁদে

ধন-মান হারা কাঙালের বেশে

জগতের শাশ্বত রীতি সব অসুর চরণে মেড়ে

এ বনের রক্ত-স্বেদে অর্জিত প্রাণসহ যত ধন রাশি

ওবনের লুটেরা সব নিয়ে যায় কেড়ে——

তারি চূড়ান্ত বিহিতে আজ হবে দীক্ষাদান

হবে মুক্তির মন্ত্রদীক্ষা

জীবন্ত অগ্নিগিরির নাড়া দিয়ে প্রাণে বাজবে মন্ত্রগান!

তবে কই!কই সে মন্ত্রদাতা?

পতিত পাবন বিধাতার দান বনের জীবন ত্রাতা।

লক্ষ কণ্ঠ গর্জে উঠে শুধু বারবার

নিরস্ত্রের অসীম সাহসমোড়া বজ্রধ্বনি

স্তব্ধ বাতাস কাঁপে থরথর,

প্রান্তর ঘিরে বনে দূরে কাছে খাড়া

পলাশ কিংশুক যত যত কৃষ্ণচূড়া

মেলে চেয়ে বসে আছে অমল রাতুল দলে

কী জানি কী শিহরণে কাঁপে দুলে দুলে!

বনবাসী প্রতীক্ষাতে

ভোর হতে সবে রবি হেলে পশ্চিম গগন ভালে

যেন কত যুগ মহাযুগ কেটে যায়

মাত্র ক’টি প্রহর আড়ালে!

সহসা আকাশ বাতাস কাঁপায়ে বেগে

থরত্থর নাড়ায়ে সকল গোটা বনভাগে

উঠল যে হরষ ধ্বনি মেঘগর্জনে

অনন্ত প্রতীক্ষা বুঝি এলো অবসানে।

আসে ঐ!আসে রে আসে

কাজল জোড়া শুভ্র বাসে

সৌম্য কান্তি সিদ্ধপুরুষ আসে ধীর পায়ে

মহাকালের দেবত্ব ভার জড়ায়ে প্রাণে জড়ায়ে গায়ে

শুচি-সুধা-সিন্ধু জলে সিনান শেষে

হিমাচল গায়ে মোড়া নীহার বেয়ে মৌণ ঋষির বেশে

মুক্ত বেদীতে দাঁড়ায়ে ধীরে চারিদিশে চায়,

দীক্ষামন্ত্র পুথি নখের ডগায়

সুদীর্ঘ পথের কষ্ট-গাঁথা গেয়ে যান একে একে

মন্ত্রদান উৎসব ভূমিকায়।

সহসা অবিদ্বেষী ঋষি ফুঁসে উঠে রোষ বশে

হুংকার ছেড়ে কন তর্জনী ঠুসে——

মুক্ত এ বনবাসে

আর একটা অগ্নিবাণ যদি ছুটে আসে

আর একটা প্রাণ পড়ে যদি খসে

শুন হে বনবাসী!মুখ গুঁজে ভয়ে কেউ রবে নাকো বসে

তোমাদের ঘরে তোমাদের কাছে

ক্ষুদ্র তুচ্ছ ভোতা যে ক’টা বাণ অকাজেই আছে

তাই নিয়ে রুখে দেবে পালাবে না পাছে

বুকের রক্ত ঢালার অভ্যেস আমাদের আছে।

ফের এক ফোটা রক্ত ঝরাতে চায় তারা যদি

খুলে দেব বুক—রক্ত ধারায় বয়ে যাক নদী!

তবু আমাদের এই বনভাগ করা হবে মুক্ত

ভুলবনা কভু বিধাতার বড়হাত

আমাদের হাতে আমাদের পাশে আছে সদা যুক্ত!

তবে হ্যাঁ!যদি দুরাচার সুমতি ফিরে পায়

বন্ধুর হাত বাড়াবো হেসে—-দ্বেষ-বিদ্বেষ কোন কিছু নাই।

মন্ত্রমুগ্ধ বনবাসী ফেরে ঘরে ঘরে

শিহরিত তনুমন মুক্তির তরে।

আন বনপোষ্য শকুনের দল ফিরে হতাশায়

এ কেমন মন্ত্রদান উৎসব!পড়লনা লাশ!

বিনিদ্র রাত বুঝি কাটে আজ উপোসি ক্ষুধায়।

এ মন্ত্রদান হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে

বনান্তরে পৌঁছালো শেষে

বনের লতা-পাতা নদী গিরি সাগর মোহনা

ঝর্ণার কোণাকাণি ছাপায়ে নিমেষে।

অষ্টাদশ দিবস-রজনী কাটল গুমোট বায়ে

সংগোপনে শকুনের দল

শাণিত করে চঞ্চু ক্ষুরধার নখর মলিন অসুর পায়ে।

সহসা গভীর রাতে পঙ্গপালের ঝাঁকে

দামিনী বেগে ছুটে আসে অজস্র অগ্নি শর

হতবিহ্বল বনবাসী;বনভাগ কাঁপে থরথর

ভাসে বনভূমি রক্ত-প্লাবন ধারায়

শৃঙ্খলিত মন্ত্রদাতা সিদ্ধপুরুষ বন্দি পাষাণ কারায়

অমোঘ মন্ত্র—যা আছে কাছে যা আছে পাশে

বিক্রমে তাই তুলে নাও হাতে দমবে না ত্রাসে,

এটুকুই করে সম্বল

ফুঁসে উঠে বনবাসী মৃত্যু জয়ে ছুটে চঞ্চল।

কালের দধীচি বাঙালি বীর

অসীম সাহসে উঁচাইয়া শির

বক্ষের ঢাল পেতে রোধিল অগ্নিশর

বনভাগ জুড়ে উঠল গড়ে নতুন রক্তসাগর

দলে দলে শকুনের পা আটকে গেল জমাট রক্তেপাঁকে

ধিক্কার বয়ে কতগুলো তার ফিরল পিছন ডাকে—

শকুনমুক্ত হল এ বন ডাকলে রক্তবান

সার্থক হলো এই বনভাগে

উৎসবে করা মুক্তির মন্ত্রদান!

রচনাকাল: ৬ মার্চ, ২০২১, নীলফামারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!