Categories: প্রবন্ধ

ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট

Ukraine-Russia crisis

-মো: মাহফুযূর রহমান

ইউক্রেন বা উক্রাইনা (ইউক্রেনীয়: Україна উক্রায়িনা আ-ধ্ব-ব: /ukraˈjina/) পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। আয়তনের বিচারে রাশিয়ার পরে এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র; এর আয়তন ৬,০৩,৬২৮ বর্গকিলোমিটার (২৭,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ক্রিমিয়া অঞ্চলসহ)। দেশটিতে প্রায় ৪ কোটি ৩৬ লক্ষ অধিবাসীর বাস, ফলে এটি ইউরোপ মহাদেশের ৮ম সর্বোচ্চ জনবহুল দেশ। ইউক্রেনের পশ্চিমে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণ-পশ্চিমে রোমানিয়া ও মলদোভা), দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর, পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে রাশিয়া এবং উত্তরে বেলারুস। দক্ষিণে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অবস্থিত স্বায়ত্বশাসিত ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের সীমান্তের মধ্যে পড়েছে। কিয়েভ ইউক্রেনের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

ইউক্রেন প্রাচীনকালে স্কিথিয়ার অংশ ছিল এবং অভিবাসনের যুগে গেটাইরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। ইউক্রেন অঞ্চলটিতে খ্রিস্টপূর্ব ৩২শ শতক আগ পর্যন্ত মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। মধ্যযুগে ইউক্রেন এলাকাটি প্রাচীন স্লাভিক সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র ছিল। খ্রিস্টীয় ৯ম শতক থেকে ইউক্রেনের উত্তর অংশ কিয়েভান রুশ নামক একটি মুক্ত সংঘের অংশ ছিল, যা পরবর্তীতে ইউক্রেনীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। কিয়েভান রুশ ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব স্লাভীয় রাষ্ট্র।

কিয়েভান রাশরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইউক্রেন প্রকৃত অর্থে ইতিহাসে প্রবেশ করে। কিয়েভান রাশরা মধ্যযুগে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়, কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দীতে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

১৩শ শতকে এটি অনেকগুলি উপরাজ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং এরপর মঙ্গোলদের আক্রমণে অঞ্চলটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এর পর বহু শতাব্দী ধরে ইউক্রেন বিভিন্ন বিদেশী শক্তির দখলে ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান ইউক্রেন তিনটি বহি:শক্তির অধীনে ছিলঃ গোল্ডেন হোর্ড, উসমানীয় খিলাফত, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ড। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চল পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া (১৫৬৯ সাল থেকে) এবং ক্রিমিয়ান খানাতের অধীনে আসে। ১৬৪৮ সালে পোলিশ ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহের পর ১৬৫৪ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় গণপরিষদ (রাদা) পেরেয়স্লাভ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। শীঘ্রই নিপার নদীর পূর্বদিকে অবস্থিত পোলিশ–লিথুয়ানীয় সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ রুশ শাসনাধীনে আসে এবং কয়েক শতাব্দীব্যাপী এতদঞ্চলে রুশ শাসন বজায় থাকে। পোল্যান্ড বিভক্তিকরণের (১৭৭২–১৭৯৫) এবং রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়ান খানাত অধিকারের ফলে ইউক্রেন রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

রুশ বিপ্লবের পর ইউক্রেনে তীব্র অরাজকতার পরিস্থিতি দেখা দেয় এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ শুরু হয়। ইউক্রেনের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী ইউক্রেন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এরপর সোভিয়েত–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং বলশেভিক লাল ফৌজ ১৯১৯ সালের শেষের দিকে ইউক্রেনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ইউক্রেনীয় বলশেভিকরা কিয়েভের জাতীয় সরকারকে পরাজিত করে ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠন করে এবং ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রজাতন্ত্রটি সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যে পরিণত হয়। ইউক্রেনীয় ভাষা ও ইউক্রেনীয় সংস্কৃতির প্রতি প্রাথমিক সোভিয়েত নীতির ফলে সোভিয়েত-ইউক্রেনে ইউক্রেনীয় ভাষা শিক্ষা ও প্রশাসনের সরকারি ভাষায় পরিণত হয়। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে সোভিয়েত সরকার রুশীকরণ নীতি গ্রহণ করে। হলোদোমোর নামে পরিচিত একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ফলে ১৯৩২ ও ১৯৩৩ সালে ইউক্রেনে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে ৬০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়, যাদের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ লক্ষই ছিল ইউক্রেনীয়। ১৯৩৮ সালে নিকিতা ক্রুশ্চেভ ইউক্রেনীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নিযুক্ত হন।

১৯৩৯ সালে নাৎসি(নাজি) জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণের পর সোভিয়েত ইউক্রেনের পরিসীমা পশ্চিম দিকে বিস্তৃত হয়। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ইউক্রেন জার্মান বাহিনীর দখলে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেনিয়ান ইনসার্জেন্ট আর্মি ইউক্রেনকে স্বাধীন করার জন্য জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউক্রেন একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে ক্রুশ্চেভ একটি ইউক্রেনীয় পুনর্জাগরণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য অংশের মতো ইউক্রেনেও কবি, ঐতিহাসিক এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়ন চলতে থাকে। ১৯৫৪ সালে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে ইউক্রেন স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১লা ডিসেম্বর এক গণভোটে এটির প্রতি ইউক্রেনের জনগণ সমর্থন দেয়। ইউক্রেনের এই ঘোষণা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে একটি বড় ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পরে ইউক্রেন নিজেকে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। দেশটি রাশিয়া ও অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রসংঘের (প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র) সাথে সীমিত সামরিক অংশীদারিত্বে যোগ দেয়। কিন্তু একই সাথে এটি ১৯৯৪ সালে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটেও (ন্যাটো) যোগদান করে। ২০১৩ সালে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তি মুলতবি করে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলে দেশটিতে ইউরোময়দান নামক মিছিল-বিদ্রোহ শুরু হয়, এবং এর জের ধরে মর্যাদারক্ষার বিপ্লব নামক একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ঘটনাগুলির পটভূমিতে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইউক্রেনের পূর্বভাগে ডনবাসের যুদ্ধ শুরু করে। ২০১৬ সালে ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের গভীর ও পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য এলাকার অর্থনৈতিক অংশটিতে যোগ দেবার আবেদন করে।

স্বাধীনতা লাভের পর ইউক্রেনে বাজার অর্থনীতি চালু হয়, যার ফলে দেশটি ৮ বছরব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়। তারপর থেকে দেশটির মোট দেশজ আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু ২০০৮ সালে ইউক্রেন আবার অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদন ২০% হ্রাস পায়। ইউক্রেনের অধিকাংশ এলাকা কৃষিকাজের উপযোগী উর্বর সমভূমি নিয়ে গঠিত। ইউক্রেন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। দেশটির অর্থনীতি উন্নত এবং এর কৃষি ও শিল্পখাত যথেষ্ট বড়। ইউক্রেনে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান যেখানে রাষ্ট্রপতি হলেন সরকারপ্রধান।

ইউক্রেন একটি উন্নয়নশীল দেশ; মানব উন্নয়ন সূচকে এর অবস্থান বিশ্বে ৭৪তম। মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদনের হিসেবে এটি ইউরোপের দরিদ্রতম রাষ্ট্র; এখানে দারিদ্র্যের হার ও দুর্নীতির পরিমাণ অনেক উচ্চ। তবে ব্যাপক উর্বর কৃষিভূমির কারণে ইউক্রেন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম শস্য রপ্তানিকারক দেশ। রাজনৈতিকভাবে ইউক্রেন একটি অর্ধ-রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থাধীন এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র যেটিতে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইনপ্রণয়ন বিভাগ তিনটির মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ বিদ্যমান। দেশটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় পরিষদ, ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা, গুয়াম সংস্থা, ত্রিপাক্ষিক সংস্থা (মলদোভা ও জর্জিয়ার সাথে) এবং লুবলিন ত্রিভুজ (পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার সাথে) জোটটির সদস্য।

ইউক্রেন – রাশিয়া সংকট! কেন রাশিয়ান ফেডারেশন ইউক্রেনে আবারও সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে?

বর্তমান সামরিক আগ্রাসন চালানোর কারণ আলোচনা করার আগে জেনে আসি ইউক্রেনে চালানো পূর্বকার রাশিয়ান ফেডারেশনের বেসামরিক/ /সামরিক উপস্থিতি ও আগ্রাসন।

১…

ক্রিমিয়ার রুশ অন্তর্ভূক্তি!

উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ থেকে ১৭৮৩ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে দখল করে নেয়।

রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলের সাথে সাথে রুশরা এই অঞ্চলের ক্রিমিয়ান তাতার মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রথম একশ বছরে তারা সেভাবে ডেমোগ্রাফি বদল না করে অঞ্চলটির উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে।

মূলত ১৮৬০ এর দশকে সংঘটিত ক্রিমিয়া যুদ্ধের (একপক্ষে রাশিয়া অপরপক্ষে তুরস্ক – ব্রিটেন। যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত হয়।) পরপরই রুশরা চড়াও হতে থাকে এখানকার তাতার মুসলমানদের উপর। আর ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর মুসলিম নির্যাতন নতুন মাত্রা পায়।

১৮৫০ এর সময় ক্রিমিয়ায় মুসলমান ছিলো প্রায় ৪০%। ১৮৯৭ সালে তা নেমে আসে ৩৫% এ। আর ১৯১৭ এর পর তা আরো কমে ২০% এ আসে। এসময় অঞ্চলটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে রুশভাষী জনগণ বসতি স্থাপন শুরু করে।

ক্রিমিয়ান মুসলমানদের উপর নির্যাতনের সর্বশ্রেষ্ঠ স্টিমরোলার চালিয়েছে কমিউনিস্ট শাসক স্ট্যালিন। লাল বিপ্লবের ধ্বজাধারী এই ব্যক্তি

(দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রিমিয়ার মুসলিমরা জার্মানদের সহায়তা করেছে, এই অভিযোগ তুলে) মাত্র এক দিনের নোটিশে প্রায় দুই লাখ তাতারী মুসলিমকে ক্রিমিয়া থেকে বিতাড়িত করে। তাতার মুসলিমদের আরেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র উজবেকিস্তানে (বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র) নির্বাসন দেওয়া হয়। ক্রিমিয়া থেকে হুট করে হাজার মাইল দূরের মধ্য এশিয়ার দীর্ঘযাত্রায় মারা যায় ৫০ হাজারের উপর ক্রিমিয়ান তাতার মুসলিম।

১৯৫০ এর দশকে মুসলিম শূন্য হয়ে পড়ে একসময়কার ইসলামী ঐতিহ্যমন্ডিত রাজ্য ক্রিমিয়া। তবে ১৯৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দলে দলে ক্রিমিয়ান তাতাররা ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে। তখন তাদের সংখ্যা আবার বাড়তে থাকে। বর্তমানে ক্রিমিয়ায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৪%। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্রিমিয়ান তাতার উজবেকিস্তানে বসবাস করছে। ক্রিমিয়ায় ফিরে আসার পর থেকে সবসময়ই তাতাররা  রাশিয়ান আধিপত্য গোষ্ঠীর বিরোধীতা করতে থাকে। এই উপলক্ষে তারা প্রতিবছর “১৮ মে” শোক দিবস পালন করতো। উল্লেখযোগ্য ক্রিমিয়ায় বর্তমানে ৬০% রুশ জনগোষ্ঠীর বসবাস আর ইউক্রেনীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে ১০% এর মতো। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রিমিয়ান তাতাররা সমসময় ইউক্রেনকেই পছন্দ করে।

এদিকে ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত শাসনামলে ক্রিমিয়া অঞ্চলটিকে ইউক্রেন প্রদেশের নিকট হস্তান্তর করে সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকার। কেননা রাশিয়ার মূল ভূখন্ডের সাথে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও ইউক্রেনের সংযোগ রয়েছে উপদ্বীপটির সাথে। আর তাই শাসনকার্যে গতি আনতে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাশিয়া এবং ইউক্রেন তখন একই রাষ্ট্র হওয়ায়, এই হস্তান্তরটি স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হয়।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর। তখন স্বাভাবিকভাবেই ক্রিমিয়া চলে যায় ইউক্রেনের সাথে। কিন্তু রুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়ার পাশাপাশি ক্রিমিয়ার লোভনীয় ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে রাশিয়াকে প্রলুব্ধ করতো সবসময়।

২০১৪ সালে আবার ক্রিমিয়া দখলের সুযোগ হাতে আসে রাশিয়ার সামনে। এক পশ্চিমা সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইউক্রেনের রুশ সমর্থিত সরকারের পতন ঘটানোয় ইউক্রেন জুড়ে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ সংঘাত। ক্রিমিয়ার ডেমোগ্রাফিতে রুশ জনসংখ্যার আধিপত্য থাকায় ক্রিমিয়া অঞ্চলটি সেসময় ইউক্রেনের ক্ষমতাসীন পশ্চিমা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরই মাঝে এক গণভোট সম্পন্ন হয় ক্রিমিয়াতে। গণভোটকে সাইনবোর্ড রেখে পিছনে বন্দুকের মাধ্যমে মূলত ক্রিমিয়াকে নিজেদের অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে রুশ সরকার।

রুশ সরকার ক্রিমিয়া দখলের পর সেখানকার তাতার মুসলমানদের সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা বন্ধ করে দেয়। ১৮ মে তে তাতার মুসলমানদের শোক দিবস পালনও বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে ক্রিমিয়ান তাতাররা এক অনিশ্চয়তায় দিন যাপন করছে। অবশ্য ক্রিমিয়ার দখল নিয়ে বর্তমান রুশ ইউক্রেন সংকটে তাতার মুসলিমরা খুবই লঘু একটা পক্ষ। ক্রিমিয়া ইউক্রেন বা রাশিয়া যার দখলেই থাকুক না কেনো, তাতার মুসলিমদের উসমানীয় আমলের অবস্থা আর ফিরবে না।

২…

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। তবে রাশিয়ান ফেডারেশন হামলা শুরু করে ইউক্রেনের রুশ জাতিগোষ্ঠী অধ্যুশিত ডনবাস রাজ্য ভেঙে করে ল্যুহানস্ক ও দনেৎস্ক নামে দুটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করতে।

যে অঞ্চলটিকে এখন ডনবাস বলা হয় তা মূলত আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউক্রেনীয় কসাক হেটমানাট এবং তুর্কি ক্রিমিয়ান খানাতের (উসমানীয় সাম্রাজ্য আশ্রিত রাজ্য ছিলো ক্রিমিয়ান খানাত) নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর আঠারো শতকের শেষে এসে রুশ সাম্রাজ্য হেটমানেট এবং খানাত দখল করে। বিজিত অঞ্চলগুলোর নাম দেয়া হয় “নতুন রাশিয়া” (নভোরোশিয়া)।

ইউরোপ জুড়ে শিল্প বিপ্লবের প্রসারের সাথে সাথে ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডনবাসের বিশাল কয়লা সম্পদ শোষণ করা শুরু হয় রুশ সাম্রাজ্য কর্তৃক। এর ফলে এই অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় মূলত রুশ বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা।

১৮৫৮ সালে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাত লাখ। ১৮৯৭ সালের মধ্যে তা চৌদ্দ লাখে পৌঁছে যায়। ১৮৯৭ সালের রুশ আদমশুমারি অনুযায়ী, এই অঞ্চলে জাতিগত ইউক্রেনীয় ছিল ৫২.৪%, আর জাতিগত রুশ ছিল ২৮.৭%।

তা সত্ত্বেও রুশরা শিল্প এবং বাণিজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনীয়রা গ্রামাঞ্চলে সংখ্যাগুরু ছিলো, কিন্তু শহরগুলিতে বসবাসকারী বেশিরভাগই ছিলো জাতিগত রুশ, যারা মূলত এই অঞ্চলের ভারী ইস্পাত এবং কয়লা শিল্পে কাজ চাইতে এসেছিল। যে জাতিগত ইউক্রেনীয়রা কাজের জন্য শহরে চলে এসেছিলো তাদেরকেও দ্রুত রুশভাষী শ্রমিক শ্রেণীতে আত্মীকৃত করা হয় রুশ সাম্রাজ্যের পরিকল্পনা অনুসারে।

ডনবাসের ইউক্রেনীয়রা ১৯৩০ এর দশকের দুর্ভিক্ষ দ্বারা ব্যাপকহারে দুর্ভোগের স্বীকার হয়। যেহেতু বেশিরভাগ জাতিগত ইউক্রেনীয়রা সোভিয়েত শাসকদের অধীনে গ্রামীণ কৃষক ছিলো, তাই তারা দুর্ভিক্ষের প্রধান শিকার হয়েছিলো। একটি হিসাব থেকে দেখা যায়, ইউক্রেনীয় দুর্ভিক্ষের সময় যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে ৮১% ছিল জাতিগত ইউক্রেনীয়, যেখানে মাত্র ৫% ছিল জাতিগত রুশ। অর্থাৎ দুর্ভিক্ষটি এই অঞ্চলের ডেমোগ্রাফিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। যা রুশদের জন্য সহায়ক হয় এবং ইউক্রেনীয়দের জন্য নেগেটিভ হিসেবে বিবেচিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালীন সময়ে জোসেফ স্ট্যালিনের “রুশীয় করণ” নীতি ডোনবাস অঞ্চলের ইউক্রেনীয়দের বুকে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। ১৮৫০ এর দশকের শেষে এসে সোভিয়েত শিক্ষাগত সংস্কারের মাধ্যমে “রুশীয় করণ” আরো বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ডোনবাসে সমস্ত ইউক্রেনীয় ভাষাশিক্ষা এবং সংস্কৃতি প্রায় নির্মূল হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালের সোভিয়েত জনগণনার সময় পর্যন্ত ডোনবাসের জনসংখ্যার ৪৫% তাদের জাতিসত্তাকে রুশ বলে অভিহিত করে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর, ডনবাসের অর্ধেক অধিবাসী (যারা মূলত জাতিগত রুশ) সাধারণত ইউক্রেনের বাকি অংশের বিপরীতে রাশিয়ার সাথে শক্তিশালী সম্পর্কের পক্ষে ছিল। কিন্তু সেসময় ভঙ্গুর রাশিয়ার সামর্থ্য হয়নি ডনবাস অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সে সুযোগ নতুন করে হাতছানি দিচ্ছে পুতিনের রাশিয়ার সামনে।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী কয়লা সমৃদ্ধ ডনবাস (দনেৎস্ক এবং ল্যুহানস্ক অঞ্চলদ্বয়) অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর থেকে অশান্তি বিরাজ করলেও, পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা শুরু হয় ২০১৪ সালে এসে৷ ইউক্রেনে সরকার গঠন নিয়ে রুশ – ইউক্রেন জাতীয়তাবাদীদের দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে রুশ অধ্যুষিত ডোনবাস অঞ্চলটি ২০১৪ সালেই ইউক্রেন থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। রাশিয়া এতদিন এই অঞ্চলের দেশ দুইটির স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি না দিয়ে গোপনে সহায়তা করতো। কিন্তু ২০২২ সালে এসে সৃষ্ট সংকটের পটভূমিতে অঞ্চলটির স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ইউক্রেনের সাথে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করলো রাশিয়া।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯২০ এর দশকে নভোরোশিয়া অঞ্চলকে (বর্তমান ইউক্রেনের দনেৎস্ক, ল্যুহানস্ক, মিকোলাইভ, ওদেসা ও কারকিভ অঞ্চল) এবং ১৯৫৪ সালে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্ত করে।

এই নভোরোশিয়া অঞ্চলের জনসংখ্যার একটি অংশ জাতিগতভাবে রুশ এবং সিংহভাগ অংশ রুশভাষী। তখন একই দেশের অংশ হওয়ায় অঞ্চলগুলোর ইউক্রেন বা রুশ অধিভুক্ত থাকা না থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা ছিলো না। কিন্তু ১৯৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর অঞ্চলগুলোতে তৈরি হয় জাতীয়তাবাদী নানা মেরুকরণ। বর্তমানে সংঘটিত রুশ ইউক্রেন যুদ্ধটি দনেৎস্ক এবং ল্যুহানস্ক অঞ্চল নিয়ে সংঘটিত হলেও সামনে এই সংঘাত ওদেসা, কারকিভ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

ইউক্রেন ১৯৯১ সালে ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং সেসময় থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দনেৎস্ক ও ল্যুহানস্ক প্রদেশ দুটির সম্পূর্ণ অংশে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো। দনেৎস্ক অঞ্চলটির আয়তন প্রায় ২৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বর্তমান যুদ্ধটি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অঞ্চলটির প্রায় ৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের দখলে ছিলো আর বাকি প্রায় ১৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড ইউক্রেনীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলো।

এছাড়া সংঘাতময় ল্যুহানস্ক অঞ্চলের আয়তন প্রায় ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। ২০২২ সালের যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত অঞ্চলটির প্রায় ৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের দখলে ছিলো। আর বাকি ১৮ হাজার বর্গ হচ্ছে ভূখণ্ড ইউক্রেনীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। অর্থাৎ, ডনবাসের (দনেৎস্ক ও ল্যুহানস্কের) মোট আয়তন প্রায় ৫৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ৩০% রুশ সমর্থিত দনেৎস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্রের বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো (এই মাসের যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত), আর বাকি প্রায় ৭০% অংশ ইউক্রেনীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বেশিরভাগ ভূমিই রুশ সমর্থিত দনেৎস্ক ও ল্যুহানস্কের প্রজাতন্ত্রের দখলে চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া রাশিয়া শুধুমাত্র দনেৎস্ক ও ল্যুহানস্কের দখল নিয়ে শান্তিমতো ঘরে ফিরে আসবে না। রাশিয়ার বর্তমান পলিসি হলো সমগ্র নভোরোশিয়া অঞ্চল তথা ইউক্রেনের দক্ষিণ অংশ পুরোটা দখলে নেওয়া। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের উপর রুশদের ঐতিহাসিক অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে এনে বেশ কয়েকবার ইউক্রেনকে হুঁশিয়ারিও প্রদান করেছে রুশ সরকার।

২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করার পর ইউক্রেন সরকার নর্থ ক্রিমিয়া খালের উপর বাঁধ নির্মাণ করে ক্রিমিয়ার পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। নিপার নদী থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চলে পানি আসে এই নর্থ ক্রিমিয়া খালের মাধ্যমে। ক্রিমিয়ার ৮৫% পানির যোগানদাতা এই খালের মুখ ২০১৪ সালে ইউক্রেন বন্ধ করে দেওয়ায় দখলকৃত ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ বজায় রাখা নিয়ে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হয় রাশিয়া।

ন্যাটো ভীতি

রুশ সীমান্তে ন্যাটোর উপস্থিতিকে রাশিয়া তার অস্তিত্বের জন্য অসহনীয় মনে করে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ন্যাটো জোটের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অ্যাংলো – আমেরিকান জোট ন্যাটো’কে ভেঙে দেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও ন্যাটো জোটের নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেওয়া অঙ্গীকারে বলেছিলেন তারা কখনোই ন্যাটো’কে পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ করবে না। কিন্তু ন্যাটো জোট সেই অঙ্গীকার মেনে চলতে পারেনি। তারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পাঁচ বার ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করেছে। ইতোপূর্বে বাল্টিক সাগরের সাবেক তিন সোভিয়েত রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া ন্যাটোতে যোগদান করায় রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলে কূটনৈতিক পরাজয়ের স্বীকার হয়।

বাল্টিক সাগরের চেয়ে ও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণ সাগর। আর তাই রাশিয়া চাচ্ছে, বাল্টিকে যে ন্যাটো ঝড় এসেছে তা যেনো কৃষ্ণ তে না আসে। সেজন্য যখনই কৃষ্ণ সাগরীয় ইউক্রেন, মলদোভা, জর্জিয়া কর্তৃক পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন অথবা ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আলাপ শুরু হয় ঠিক তখনই রাশিয়া দেশগুলোর সাথে সংঘাত শুরু করে দেয়।

রাশিয়া কোনোভাবেই চায় না, কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর কোনোটিতেই যাতে ন্যাটো ঘাঁটি স্থাপন করতে না পারে।

রুশ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা!

বৃহৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাবেক রুশ সাম্রাজ্যের কারণে পূর্ব ইউরোপ, ককেশাস, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রুশ জনগোষ্ঠী বসবাস করে। অন্য যেকোনো দেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘু রুশ জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হিসেবে নিজেদেরকে রিপ্রেজেন্ট করতে সবসময়ই উন্মুখ রাশিয়া।

কোন আশঙ্কা থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন?

রাশিয়া কি আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ইউক্রেনে আক্রমণ করেছে নাকি আত্মরক্ষার্থে?

আসুন আগে জেনে নেই রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার শুরু কোথায়ঃ-

গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে জানুয়ারিতে  ইউক্রেনকে NATO-তে যোগ দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্‌স্কি। 

NATO  কী?

(North Atlantic Treaty Organisation) বা ন্যাটো হচ্ছে মূলত একটি সামরিক সহযোগিতার জোট। ন্যাটোর আওতায় রয়েছে ৩০টি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানি। আর এই ন্যাটোরই গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে ইউক্রেন।

আর এখানেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যত আপত্তি। পুতিন স্পষ্ট করে বলেছেন যে তার দেশের সীমান্তে কখনোই ন্যাটোর তৎপরতা মেনে নিবে না তারা।  পুতিন পশ্চিমাদের কাছে দাবি করেন, পশ্চিমারা যেন একটি আইনত বাধ্যতামূলক গ্যারান্টি দেয় যে ন্যাটো পূর্ব ইউরোপ এবং ইউক্রেনে কোনও সামরিক তৎপরতা জারি করবে না।

কিন্তু ন্যাটো তথা আমেরিকা সেই দাবি আমলে না নিয়ে ইউক্রেনকে বলে ইউক্রেনের জন্য ন্যাটোর দরজা সব সময়ই খোলা।

আর এর পরপরই অর্থাৎ ২০২১ সালেই ক্ষুব্ধ রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় ১ লাখ সৈন্য জড়ো করে এবং সামরিক মহড়া, অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতে থাকে।

ইউক্রেনের সীমান্তে ন্যাটো যদি সামরিক ঘাটি করে তাহলে রাশিয়ার আকাশ সীমার বিশাল একটা অংশ ন্যাটোর রাডারের কভারেজে চলে আসবে এবং রাশিয়ার নাকের ডগায় সামরিক তৎপরতা চালাবে ন্যাটো! আর রাশিয়া তা মেনে নিবে এটা ভাবা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।

রাশিয়ার যায়গায় যদি আমেরিকা থাকত এবং ন্যাটোর যায়গায় যদি রাশিয়া এমন করতো, তাহলে কি আমেরিকা চুপ করে বসে থাকতো?  কখনোই না। তাই রাশিয়াও চুপ করে থাকেনি।

ন্যাটোকে রাশিয়া বারবার বলেছে ন্যাটো যেন পূর্ব দিকে আর না আগায় এবং ইউক্রেনে কোনও সামরিক তৎপরতা জারি না করে। কিন্তু আমেরিকা এবং ব্রিটেনের প্ররোচনায় ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়ার জন্য উঠে পরে লাগে।

এবং এর পরপরই রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করে বসে।

তাছাড়া ২০১৪ সালে রাশিয়া প্রথমবার ইউক্রেনে প্রবেশ করে। তখন প্রেসিডেন্ট পুতিন সমর্থিত বিদ্রোহীরা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বেশ বড় একটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর থেকেই তারা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছে।

যুদ্ধ বন্ধে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে ২০১৫ সালে এক্টি চুক্তি হয়েছিল। যেখানে প্রধান শর্ত ছিল, পূর্ব ইউক্রেন থেকে সামরিক স্থাপনা, সামরিক সরঞ্জাম ও ভাড়াটে সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়। অঞ্চলগুলোতে নিজস্ব পুলিশবাহিনী ও স্থানীয় বিচারব্যবস্থা নিয়োগের কথাও উল্লেখ হয় চুক্তিতে। তবে সেসব চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি আমেরিকা পন্থী প্রেসিডেন্ট জেলেনাস্কির ইউক্রেন।

তাই পুতিনের দাবি, ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর হাতের পুতুল এবং কখনোই প্রকৃত রাষ্ট্র ছিল না।

অথচ পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া শুধু রাশিয়াকেই ভিলেন হিসেবে প্রকাশ করছে। আমেরিকা এবং ব্রিটেনের একঘেয়েমির কথা তুলে ধরছে না পশ্চিমা মিডিয়া। ফ্রান্স এবং জার্মানি আমেরিকার এই একঘেয়েমিকে উপেক্ষা করে রাশিয়ার সাথে আলোচনা করেছিলো কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি।

তাই বলে রাশিয়ার এই আগ্রাসনকে যে সমর্থন করতে হবে এমনটা না। রাশিয়ার উচিত ছিলো সরাসরি সামরিক অভিযান না করে কূটনৈতিক ভাবে সমস্যার সমাধান করা।

ইউক্রেনের এই অবস্থার জন্য রাশিয়া যতটা দায়ী আমেরিকার ন্যাটোও ঠিক ততটাই দায়ী।

ইউক্রেন সংকট নিরসনে রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের মতামত:

দিন যত যাচ্ছে ততই রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলা বেড়েই চলছে।আর এই হামলার কারণে ইউক্রেন রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে। এই হামলা বন্ধ হবে যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ৩ শর্ত মেনে নেয়া হয়। যা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ফরাসি প্রেসিডেন্টের ফোনালাপে উঠে আসছে।

১. সবার প্রথমে রাশিয়ার দখল করা ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।

৩. ইউক্রেনের নিরপেক্ষ অবস্থান (পশ্চিমাপ্রীতি কাটানো) নিশ্চিত করা।

২. ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ ও নাৎসিবাদের প্রভাবমুক্ত করা। অর্থাৎ ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকা।

proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.