প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীগণের জ্ঞান ও আচরণে পরিবর্তন সাধিত হয়৷ প্রশিক্ষণ হতে পারে শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক বা শিক্ষকগণের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য৷ আবার প্রশিক্ষণের মেয়াদের ভিত্তিতেও প্রশিক্ষণ বিভিন্ন রকমের হতে পারে৷ শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের উপায় হিসেবে চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণ, চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর উপায়৷ পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থাত্ একজন আদর্শ শিক্ষক গড়ে তোলার জন্য এখানে পেশাগত উন্নয়নের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো–
সাম্প্রতিককালে শিক্ষা ও শিখন ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সসেঙ্গতি সাধন করে চলার প্রয়োজনে প্রতিটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিখন–শেখানো কার্যাবলির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে৷ দেশ, জাতি ও জাতীয় আদর্শের প্রতিফলন যেন শিশু কিশোর, তরুণদের আচার আচরণে প্রতিফলিত হতে পারে, দেশীয় ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে তারা যেন দেশের সমৃদ্ধি ও গৌরব বাড়াতে পারে সেজন্য তাদের শিক্ষাদানে নিযুক্ত শিক্ষকগণের পূর্ণ প্রস্তুতির প্রয়োজন৷ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে পূর্বের ব্যাংকিং মেথড যেখানে শিক্ষক সকল জ্ঞানের আধার এবং তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতিতে জ্ঞান বিতরণ করতেন, যা এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গ্রহণযোগ্য নয়৷ বর্তমানে শিক্ষার্থীরা যে পদ্ধতিতে শিখতে চায়, যেভাবে শেখালে তাদের শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হবে শিক্ষক সেই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়৷ এখানে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয় এবং শিক্ষক হবেন সহায়তাকারী (Facilitator)৷ নতুন জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের পছন্দ অনুযায়ী নতুন পদ্ধতিতে পড়াতে হবে৷ তাই নবতর দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে শিক্ষকদের চিন্তা ও কর্মধারা পরিমার্জন করতে হবে৷ এর জন্য শিক্ষকদের বিভিন্ন পেশাগত উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করতে হবে৷ যেমন: প্রশিক্ষণ গ্রহণ, নিয়মিত অধ্যয়ন, ইন্টারনেট ব্যবহার, কর্মশালায় অংশগ্রহণ গবেষণা পরিচালনা ইত্যাদি৷
এখানে শিক্ষকগণের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের পদ্ধতি হিসেবে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
পেশাগত দায়িত্ববোধ সৃষ্টি ও উন্নয়নের জন্য শিক্ষকগণের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে৷ শিক্ষকতাপূর্ব শিখনের ন্যায় শিক্ষকতাকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা ও শিক্ষকদের জন্য আবশ্যক৷ শিক্ষকতাকালীন প্রশিক্ষণ ব্যতীত কোন শিক্ষকই চলমান দুনিয়ার নবতর চিন্তা ও কর্মধারার সাথে পরিচিত হওয়ার এবং সাম্প্রতিক ভাবধারায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ লাভ করতে পারেন না৷ শিক্ষাবিদ মার্গারেট শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে শিক্ষকদের অবিরাম প্রশিক্ষণের প্রয়োজন৷ তাঁর ভাষায় To keep abreast of a changing world…
প্রশিক্ষণের দ্বারা পেশা নবায়নের মাধ্যমে শিক্ষকগণ যেমন নিজেকে সজীব, প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে তেমনি নিজ পেশাকে যুযোগযোগী ভাবধারায় সঞ্জীবিত করার অবকাশ পান৷ শিক্ষার মান উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য৷ পেশাগত উন্নয়নের জন্য ২ ধরনের প্রশিক্ষণ রয়েছে, যেমন:-
চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণ হল পেশার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ৷ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নূন্যতম স্্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়৷ প্রত্যেক পেশার মানুষের কিছু পেশাগত দায়িত্ব–কর্তব্য থাকে যা তাাঁর পেশাগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে৷ একইভাবে যাঁরা শিক্ষক, তাঁদের কিছু পেশাগত বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন৷ যেমন, যিনি যে বিষয়ের শিক্ষক তাঁর সে বিষয়ে গভীর জ্ঞান তাকা বাঞ্ছনীয়৷ আবার শুধু জ্ঞান থাকলেই হবে না, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে৷ যে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চাই, তার থেকেও তা কীভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে সেটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ৷ আবার জ্ঞান ছড়িয়ে দিলেই হবে না, যে বা যারা তা গ্রহণ করছে তারা আদৌ গ্রহণ করতে পারছে কিনা, পারলেও কতটা গ্রহণ করতে পারছে ইত্যাদিও দেখার বিষয়৷ আর তা সার্থকভাবে সম্পন্ন করতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রায়োগিক জ্ঞান৷ শিক্ষকদের সে সকল দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষকগণের মধ্যে শিক্ষক সুলভ আচরণ তৈরি করার জন্য প্রয়োজন চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণ৷ অর্থাত্ দক্ষ শিক্ষক তৈরির জন্য উন্নতমানের শিক্ষক–শিক্ষা কারিকুলাম, শিক্ষক তথা টিচার এডুকেটর, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ–সুবিধাদি, শিখন–শেখানো পদ্ধতি ও কলাকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার ও কারিকুলামের সঙ্গে মেলবন্ধন, তত্ত্বের কার্যকর প্রয়োগ তথা অনুশীলন, মূল্যায়ন এবং সর্বোপরি শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার লক্ষ্যে মনোজগত্ তৈরির জন্য কাঠামোবদ্ধ বলয়ের মধ্যে প্রস্তুতির পূর্ব ধাপই হল চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণ৷
শিক্ষকতাকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্যই চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণ৷ এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণ শিক্ষকতা পেশার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক দক্ষতাসমূহ অর্জন করতে পারেন৷ চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণের গুরুত্বসহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকসুলভ আচরণ তৈরি হয়৷ শিক্ষার্থীদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে, অভিভাবকদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে, কী ধরনের পোশক পরিধান করতে হবে, সমাজে কী ধরনের আচরণ করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে ভবিষ্যত্ শিক্ষকগণ পূর্ব ধারণা লাভ করেন চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে৷
যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী তাদের শিক্ষকতা পেশার বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্য, বিদ্যালয় ও শ্রেণিকাজে শিক্ষকের ভূমিকা তথা শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের উন্নয়নে নিজেকে উত্সর্গ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হয় চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে৷
শিক্ষকের সাফল্য ও জনপ্রিয়তা নির্ভর করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে কতটুকু বুঝতে পারছেন, তাদের আচরণ কতটুকু ইতিবাচকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, তাদের কতটুকু উদ্বুদ্ধ করতে পারছেন, তাদের মনোজগতকে কতটুকু উপলব্ধি করতে পারছেন ইত্যাদির ওপর৷ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকালীন আচরণ অনুশীলন করা এবং শিখন প্রক্রিয়াকে সেইভাবে চালিত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান৷ শিক্ষা মনোবিজ্ঞান প্রয়োগমূলক বিজ্ঞান যেখানে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়৷ শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু শিখন–শেখানোর গতি–প্রকৃতি উপলব্ধি ও পূনর্গঠনের ধারণা, তত্ত্ব, সূত্র ও তথ্য দিয়ে সহায়তা করে৷ শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে – শিশু, প্রেষণা, আবেগ, বুদ্ধিমত্তা, মিথষ্ক্রিয়া ইত্যাদি৷ শিক্ষকতাকে যারা ভবিষ্যত্ পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী তারা চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিখন–শেখানো প্রক্রিয়ার সাথে শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন করার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন৷
শিক্ষা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া৷ কতগুলো উপাদানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়৷ উপাদান গুলো হলো– শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাক্রম, বিদ্যালয়, পরিবেশ, পরিবার ইত্যাদি৷ শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে অর্জনের জন্য প্রয়োজন এগুলোর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন৷ শুধু একটি বা দুটি উপাদান দিয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব নয়৷ শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী, শিক্ষার্থী কোন ধরনের পরিবার ও পরিবেশ থেকে এসেছে, বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশ কী রকম ইত্যাদি সব কিছুর প্রতি গুরচ্ত্ব দিয়ে একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীর প্রতি আচরণ করতে হয়৷ এর জন্য প্রয়োজন পূর্ব প্রস্তুতি৷ চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণকালীন তত্ত্বগত জ্ঞান অর্জন ও অনুশীলনের মাধ্যমে এই প্রস্তুতি নেওয়া যায়৷
চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাকুরিতে যোগদানের পূর্বেই শিক্ষকতা পেশায় যোগাদনে আগ্রহী ব্যক্তিগণ শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতাসমূহ অর্জন করতে পারেন৷ যা পরবর্তীতে তার পেশার ক্ষেত্রে আত্মবিশবাস বৃদ্ধি করবে৷ শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পাঠ পরিচালনা সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ এই প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী একজন নবীন শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অনাকাঙ্খিত পরিবেশ সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন৷ পূর্ব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব সহজেই বিভিন্ন মেধার শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন৷ শিক্ষার্থীদেরকে শ্রেণিপাঠে মনোযেগী রাখার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে পাঠকে আনন্দদায়ক করতে পারেন৷ পাঠের কার্ঙকারিতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি৷ পূর্ব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে খুব অল্প সময়ে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করে শিখনফল অর্জন সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন৷
শিক্ষকগণকে নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা এই দু’টি গুণ খুব ভাােভাবে আয়ত্তে রাখতে হয়৷ এজন্য যারা শিক্ষকতাকে ভবিষ্যত্ পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী তাদের পূর্ব থেকেই নিয়মানুবর্তী ও সময়ানুবর্তী হতে হবে৷ চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়মানুবর্তিতা সময়ানুবর্তিতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীগণ নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন এবং চাকুরিকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে পারেন৷
বিদ্যালয়ের যেসব রুটিনমাফিক বা দৈনন্দিন কার্যাবলি রয়েছে সেগুলো পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন অংশগ্রহণকারী অর্জন করেন যা একজন নবীন শিক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে৷ বিদ্যালয়ে জাতীয় দিবস যেমন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করতে হয়৷ জাতীয় দিবস ও অন্যান্য দিবস উদযাপন সম্পর্কে ভবিষ্যত্ শিক্ষকগণ চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন৷
শিক্ষকগণকে যেকোন পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলার দক্ষতা থাকা আবশ্যক। তা নাহলে বিদ্যালয়ে সৃষ্ট নানা ধরণের অনাকাঙ্খিত পরিবেশ ও ঘটনা মোকাবিল করতে পারবেন না,
ফলে বিভিন্নরকম বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন৷ এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষকগণকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে৷ শিক্ষক এই প্রস্তুতি শুরু করতে পারেন চাকুরি–পূর্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে৷ চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণের পাঠদান অনুশীলন (Teaching Practice) এ সিমুলেশপনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন যা তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনে সহায়তা করে৷
চাকুরিতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে যে প্রশিক্ষণ তাই চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ৷ চাকুরিতে যোগদানের পর পেশাগত বিভিন্ন প্রয়োজনে শিক্ষকগণকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়৷ যেমন– বিষয়ভিত্তিক, পেডাগজি (Pedagogy) বিষয়ক, আইসিটি বিষয়ক, প্রশাসনিক, সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি৷ এসব প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে মূলত শিক্ষকগণকে যুগোপযোগী রাখার জন্য, নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে শিক্ষককে পরিচিত করার জন্য, শিক্ষার পরিবর্তিত লক্ষ্য ও উদ্দে শ্য সম্পর্কে শিক্ষককে অবহিত করার জন্য৷ চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক চাকুরিপূর্ব প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাসমূহ নতুনভাবে পরিমার্জন করে৷ শিক্ষাবিজ্ঞানের নতুন বিষয়বস্তুসমূহ অর্জনের জন্য প্রয়োজন চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণ৷
চাকুরি–কালীন প্রশিক্ষণ শিক্ষকের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ এই সময় শিক্ষক শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকেন এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সাথে মিথষ্ক্রিয়া সম্পন্ন করেন৷৷ ফলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুধাবন করতে এবং নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে সক্ষম হন৷ ফলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ ও নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শনাক্ত করে তাতে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন৷ চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকের নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হবার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয়৷ চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য হলো–
চাকুরিকালীন সময়ে শিক্ষকতা পেশার দায়িত্বসমূহ সূচারূপে পালনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষকের উত্তরোত্তর দক্ষতা বৃদ্ধি৷ পেশা সংশ্লিষ্ট সকল নতুন পরিবর্তনের সাথে শিক্ষককে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নতুন চাহিদা পূরণের পদ্ধতি সম্পর্কেও তাঁকে জানতে হয় এবং এর জন্য প্রয়োজন চাকুরিতে কর্মরত থাকাকালীন প্রশিক্ষণ৷
শিক্ষকতা পেশার জন্য যেসব গুণ ও দক্ষতা অত্যাবশ্যকীয় যেমন নেতৃত্বের গুণাবলি, আইসিটি দক্ষতা, পেডাগজি, আইসিটি ও পেডাগজির সমন্বয়, সৃজনশীল পদ্ধতি, শিক্ষাক্রম ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের জন্যই মূলত চাকুরি–কালীন প্রশিক্ষণ; এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মবিশবাস তৈরি হয়, পেশাগত দায়িত্ববোধ বাড়ে, শিক্ষকদের পেশাগত যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নয়নে অগ্রগামী হন এবং সর্বোপরি মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথ তৈরি হয়৷ শিক্ষকদের জন্য চাকুরি–কালীন প্রশিক্ষণের মেয়াদ হবে স্বল্প সময়ব্যাপী৷ কারণ দীর্ঘ সময় কোন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত করে৷ এর ফলে প্রশিক্ষণের মান ও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ শিক্ষকদের জন্য চাকুরি–কালীন প্রশিক্ষণের মেয়াদ সর্বনিম্্ন ০৩ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিন হলো ভালো হয়৷
আত্মবিশ্লেষণমূলক অনুশীলন
পেশাগত উন্নয়নের জন্য শিক্ষক আত্মবিশেষণ করবেন এবং এর ফলে প্রাপ্ত ত্রটিগুলো সংশোধনের মাধ্যমে পেশাগত উন্নয়নে কাজ করবেন৷ শিক্ষক আত্মবিশেষণের জন্য নিজেকে নিম্্নবর্ণিত প্রশ্নগুলো করতে পারেন৷
কর্মসহায়ক গবেষণা
কর্মকে সহায়তা করার জন্য যে গবেষণা তাই কর্মসহায়ক গবেষণা৷ এটি শিক্ষকের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের একটি মাধ্যম হতে পারে৷ কর্মসহায়ক গবেষণায় গবেষক কোন বহিরাগত পর্যবেক্ষক নন৷ বরং তিনি ঐ কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে কর্ম পদ্ধতির উন্নতি করার চেষ্টা করেন৷ অর্থাত্ শিক্ষক নিজেই গবেষক৷ সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে কর্মপদ্ধতির গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করার চেষ্টা করেন৷ শিক্ষক বিদ্যালয়ে যেসব সমম্যার সম্মুখীন হন সেগুলো সমাধানের জন্য সমস্যা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ও প্রয়োজনে বিদ্যালয়ের সহকর্মীদের নিকট থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করেন৷ এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপকারের পাশাপাশি শিক্ষকগণের বিশেষণাত্মক আচরণের বিকাশ ঘটে৷ শিক্ষক শিক্ষার্থী উপযোগী নতুন পদ্ধতি ও কৌশলের অবতারণ করতে সমর্থ হন, তার পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পায়৷
বর্তমান আধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক পন্থয় শিক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নেই৷ বর্তমান ধারয় শিক্ষকের ভূমিকা হবে সহায়তাকারীর৷ শিক্ষক শিক্ষার্থীর শিখনে সহায়তা করবেন৷ শিক্ষক কীভাবে পড়াবেন তার পরিবর্তে শিক্ষার্থী কীভাবে শিখতে চায় সেটাই মূখ্য বিষয়৷ এজন্য শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন গুরচ্ত্বপূর্ণ৷ কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকের আরো উন্নতি করতে হবে, শিক্ষার্থীরা কী চাচ্ছে, কীভাবে চাচ্ছে, কতটুকু চাচ্ছে ইত্যাদি জানা শিক্ষকের জন্য জরচ্রী৷ শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের নিকট তেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে নিজেকে পরিবর্তিত, সংশোধিত ও শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থান করতে হবে৷
বিদ্যালয়ের সহকর্মীগণ শিক্ষকগণের পারস্পরিক পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারেন৷ সহকর্মীদের দ্বারা ক্লাস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের ফিডব্যাক সংগ্রহ করে সেই অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেন৷ আবার অন্যের ক্লাস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেখান থেকে ভালো দিকগুলো শনাক্ত করে তা নিজের ক্লাসে প্রয়োগ করার মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়৷
পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে তাঁর নিজের কাজের বিশেষণের মাধ্যমে স্ব–মূল্যায়ন করা দরকার৷ এই কাজের জন্য একজন শিক্ষক প্রতিনিয়ত তাঁর নিজের কাজের ভালো ও মন্দ দিক বিশেষণ করে ভালে কাজগুলোর অনুশীলন ও মন্দ কাজ পরিহারের অভ্যাস করবেন৷ এলফলে একজন শিক্ষক ধীরে ধীরে পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভালো শিক্ষকে পরিণত হবেন৷
পেশাগত উন্নয়নের জ্য প্রত্যেক শিক্ষককে শ্রেণি পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি নানাধরনের বই, জার্নাল, পত্রিকা, ইত্যাদি নিয়মিতভাবে পাড়ার অভ্যাস করতে হবে৷ প্রতিদিন নিয়ম করে কিছু সময় অধ্যয়নে ব্যয় করলে ক্লাসের প্রস্তুতি যোমন যথাযথ হবে, তেমনি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপযোগী উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারবেন৷ একজন শিক্ষক সারা জীবনের জন্য শিক্ষার্থী৷ শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতার জন্য তাকে নানাধরনের বিষয় অধ্যয়ন করে জ্হান অর্জন করতে হয়৷
কম্পিউটার বা স্মার্ট ফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজিং এখন শিক্ষকগণের পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে৷ ইন্টারনেটে রয়েছে বিশাল তথ্যভান্ডার৷ ইন্টারনেট ববহার করে শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট থেকে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সামথ্য অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্—রণ করার পাশাপাশি র্সবশেষ তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষক নিজেকে আপডেট রাখতে পারেন৷
| যেভাবে করা যায় | বিদ্যমান সুযোগ | ||
| বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির সাথে আলোচনা | : | বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা Mentoring, চাহিদাভিত্তিক সাব–ক্লাস্টার প্রশিক্ষণ, প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে পাক্ষিক সভা৷ | |
| Face to face কর্মশালা | : | বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, চাহিদাভিত্তিক সাবক্লাস্টার প্রশিক্ষণ, একাডেমিক তত্ত্বাবধান, পাক্ষিক সভা, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ৷ | |
| Online communities | : | শিক্ষক সহায়ক নেটওয়ার্কিং (TSN) | |
| পারস্পরিক সহায়তা | : | একাডেমিক তত্ত্বাবধান, পাক্ষিক সভা | |
| ব্যক্তিগত অধ্যয়ন বা স্ব–শিখন | : | ||
| কার্যোপযোগী গবেষণা | : | ||
| সম্মিলিত গবেষণা | : | পাঠ সমীক্ষা (Lesson Study) | |
| কার্যক্রম পরিচালনা করা | : | শিখন শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা, চাহিদাভিত্তিক সাবক্লাস্টার প্রশিক্ষণ পরিচালনা | |
| লিখন অনুশীলন | : |
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
Skills required in the teaching profession একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে আপনার কী কী দক্ষতা থাকা…
This website uses cookies.