Categories: প্রবন্ধ

সোভিয়েত ইউনিয়নে জাতিগত উচ্ছেদের ইতিকথা

সোভিয়েত ইউনিয়নে জাতিগত উচ্ছেদের ইতিকথা!

-মো: মাহফূযুর রহমান

১. মে ১৯৪৪ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনীর সাথে গুটি কয়েক তাতার মুসলমানদের অংশগ্রহণের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে ক্রিমিয়ার তাতার মুসলমানদের। অথচ তার ১০গুনের বেশি তাতার মুসলমান যোগ দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজে। এই খবর শোনার পর কি করেছিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসক? প্রশ্ন জাগতে পারে, একসময়ের উসমানীয় খিলাফত শাসনকৃত ক্রিমিয়াতে যে তাতাররা একসময় প্রধান ও প্রায় একমাত্র জনগোষ্ঠী ছিল সেই তাতাররা এখন ক্রিমিয়ার জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মাত্র। কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনীর সাথে গুটি কয়েক তাতার মুসলমানদের অংশগ্রহণের অপরাধে জোসেফ স্টালিনের হুকুমে মাত্র তিন ঘণ্টার নোটিশে প্রায় দু লক্ষ ক্রিমিয়ান তাতারকে একের পর এক ট্রাকে বসিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে উজবেকিস্তান সহ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন জনবিরল অঞ্চলগুলিতে। আর ক্রিমিয়ান তাতারদের স্থান দখল করল রুশ জাতিগোষ্ঠীর লোকজন। তাতার মুসলমানদের সাথে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অঘোষিত শত্রুতা। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে মঙ্গল শাসক “বারকে খাঁন” সহ “গোল্ডন হোর্ড”এর অন্যান্য অধিপতি, যারা ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলিম (তাতার – যারা মঙ্গল থেকে মুসলিম হন), তারা সুদীর্ঘ ১০০ বছরের বেশি শাসন করেছে পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এলাকা।

২. কৃষ্ণ সাগরের তীরে কাল্মিকিয়া হল ইউরোপের একমাত্র বৌদ্ধ প্রধান প্রদেশ। ইউরোপের একমাত্র স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী হল কাল্মিক- এরা মোঙ্গোলিয় উৎসের মানুষ। ১৯৪৩ সালে বারো ঘন্টার নোটিশে কাল্মিকিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এক লক্ষ কাল্মিকদের প্রায় প্রত্যেককেই, পাঠানো হয় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্য সাইবেরিয়ার। কয়েক দশক পর অবশ্য তারা মাতৃভূমিতে ফেরার সুযোগ পায়। তাদের ১৭৫টি বৌদ্ধ মন্দির ইতোমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, মারা গেছে উচ্ছিন্ন জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ।

৩. ১৯৩৭ সালে সাইবেরিয়ার পূর্বপ্রান্তে বসবাসকারী প্রায় দুই লক্ষ কোরিয়ানকে সরিয়ে পাঠানো হয় কাজাকিস্তান ও উজবেকিস্তানের জনবিরল অঞ্চলগুলিতে। প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে। একই ভাবে লিথুয়ানিয়ান ও ফিনিশদের রাশিয়ার পশ্চিম প্রান্ত থেকে নিয়ে আসা হয় সাইবেরিয়ার পুব দিককার জনবিরল অঞ্চলগুলিতে।

৪. কাজাকিস্তানে কাজাকরা জনসংখ্যায় কমতে কমতে ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। কারণ ছিল- সোভিয়েতের বিভিন্ন প্রান্তের অন্য জাতিদের বলপূর্বক আনয়ন, রুশদের আগমন, যাযাবর কাজাকদের অপসারণ এবং দুটি বড়মাপের মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ।

এইভাবে ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি মূলতঃ জোসেফ স্টালিনের উদ্যোগে সোভিয়েতের বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতি, উপজাতি ও আদিবাসীদের গণ প্রতিস্থাপন হয়, যাতে প্রায় ষাট লক্ষ মানুষের গণউচ্ছেদ হয়েছিল। এই সংখ্যাটা বিশাল কারণ এরা তুলনামূলক ভাবে ছোট ছোট জাতি, এবং এরা সংখ্যায় খুব ভারি ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই একেকটা জাতির প্রায় কুড়ি থেকে একশ শতাংশ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল তাদের বাসভূমি থেকে। এই ষাট লক্ষ জাতিভিত্তিক উচ্ছেদ ছাড়াও আরো দেড় কোটি মানুষের শ্রেণীভিত্তিক উচ্ছেদ হয়।

অন্যান্য জাতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল – চেচেন ও ইঙ্গুশ (পাঁচ লক্ষ), ইঙ্গ্রিয়ান ফিনিশ (চার লক্ষ), জাপানি ও কোরিয়ান (ছয় লক্ষ), ইউক্রেনিয়ান (দুই লক্ষাধিক), তিনটি বাল্টিক জাতি (দুই লক্ষ), ক্রিমিয়ান তাতার (দুই লক্ষ), কাল্মিক (এক লক্ষ), আজেরি (এক লক্ষ), বিভিন্ন তুর্কী, তাতার, ককেশাস পর্বতীয় জাতি, ইহুদী, বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতি, ইত্যাদি।

উচ্ছিন্ন মানুষদের মৃত্যুহার স্বাভাবিকভাবেই অনেক অনেক বেশি ছিল। দশ থেকে পঁয়তাল্লিশ শতাংশ অবধি মৃত্যুহার ছিল। জাতিভিত্তিক গণউচ্ছেদের ফলে পাঁচ থেকে দশ লক্ষ মৃত্যু হয়েছিল। এর মধ্যে কোনো কোনোটিকে বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারি ভাবে গণহত্যার আখ্যা দেয়া হয়েছে।

জোসেফ স্টালিন পরবর্তী যুগে এই ধরনের গণ উচ্ছেদ বন্ধ হয়। কোনো কোনো জাতিকে তাদের মাতৃভূমিতে ফেরার সুযোগও দেয়া হয়।

প্রশ্ন আসে, এই উচ্ছেদগুলোর তথ্য কিভাবে বাইরের জগতের কাছে আসে? বিশেষ করে যেখানে উচ্ছিন্ন জাতিগুলোর মধ্যে শিক্ষার প্রসার, প্রচারমাধ্যমের ব্যবহার – সবই কম ছিল। আটের দশকের বিভিন্ন সোভিয়েত (মূলত রাশিয়ান) গবেষকদের গবেষণার মাধ্যমেই এগুলো জনসমক্ষে আসে। কেন্দ্রীয় আর্কাইভে কম তথ্য থাকলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক সরকারি আর্কাইভে এই বিষয়ে অনেক তথ্য নথিভুক্ত ছিল। এছাড়া সোভিয়েত সরকারেরই বিভিন্ন নথি। যেমন – জনসংখ্যার পুরোনো রেকর্ড, আলাদা আলাদা সময়ের মানচিত্র এগুলো অনেকটাই সাহায্য করে ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে।

এই উচ্ছেদগুলোর পিছনে উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করেছে? সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়তন তার জনসংখ্যার নিরিখে অনেক অনেক বড়। ঠাণ্ডার জন্য অনেক অংশই জনবিরল, কিন্তু কাঠের একটা বড় উৎস এই অঞ্চলগুলো। কাঠ উৎপাদনের জন্য এই অঞ্চলগুলোতে বসত তৈরির পরিকল্পনা ছিল, আর দরকার ছিল স্বল্পমূল্যের শ্রমের। কাঠ ব্যবহার করে তৈরি হতে শুরু করল রেললাইন, আর তার জন্যও শস্তায় শ্রমিক দরকার। কলকারখানার জন্যও দরকার শ্রমিক, তারজন্যও স্বাধীন চাষীদের পরাধীন বানানোও জরুরি ছিল। যে জাতিগুলোর কাছে চাষের জমি ছিল, তাদের জমির দিকে সরকারের লোভ ছিল। এছাড়া প্রান্তিক ও সংখ্যালঘুদেরকে শোষণ করাও সহজ। এই জাতিগুলোর অনেকের কাছেই বড় রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে লড়বার মত প্রযুক্তি ও রসদ ছিল না।

এছাড়া অন্যান্য অজুহাতের মধ্যে ছিল- এই জাতিগুলোর লাল ফৌজে (রেড আর্মি) যোগ না দেয়ার অভিযোগ (যদিও অনেক রেড আর্মির সদস্য বা তাদের পরিবারেরা বাস্তুহারা হয়েছিল), সীমান্ত খালি করা দেশের নিরাপত্তার জন্য, উচ্ছেদের ফলে খালি হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোর পুনঃজনবসতিকরণ, দেশদ্রোহিতা। জোসেফ স্টালিনের ভয় ছিল যে প্রান্তিক জাতিগুলি আক্রমণকারী অন্য দেশগুলিকে যেমন জার্মানিকে সাহায্য করতে পারে।

আবার এই উচ্ছিন্ন জাতিগুলোর অনেকেই নিকট অতীতে অন্য প্রতিবেশী জাতিদের শাসন করেছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। যেমন – ক্রিমিয়ান তাতার খাঁনেরা দীর্ঘকাল (১০০ বছরের বেশি) পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল এলাকা শাসন করেছে।

এই জাতি-উচ্ছেদ নীতি কিন্তু পুরোনো জার শাসিত রুশ সাম্রাজ্যেরই ধারাবাহিকতা। উনবিংশ শতকেই পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন উচ্ছেদের সূচনা হয়। সেই যুগে সোভিয়েত ইউনিয়নের (মূলত রুশ) সামরিক পরিসংখ্যানবিদরা রীতিমতো এই নিয়ে গবেষণা করে কৌশল অবলম্বন করতেন – বানাতেন, কোথা থেকে কাকে সরানো উচিত! ১৮৯১ সালে মস্কো থেকে ইহুদিদের তিন চতুর্থাংশকে বিতাড়ণ করা হয়।

জোসেফ স্টালিন পরবর্তী যুগে এই উৎপীড়ন বন্ধ হলেও সবাই নিজের স্বভূমিতে ফেরার সুযোগ পায়নি। যেমন মেসকেটিয়ান তুর্কদের মেসকেটিয়ায় ফেরার সুযোগ দেয়া হয়নি, তাদের আজেরবাইজানি বলে চিহ্নিত করে আজেরবাইজানের এক প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কাল্মিকরা অনেকাংশেই ফিরেছে কিন্তু আবার নূতন করে গড়ে তুলতে হয়েছে তাদের বৌদ্ধ শিল্প সংস্কৃতি। ক্রিমিয়ান তাতাররা আংশিকভাবে ফিরেছে, কিন্তু ফিরেছে নিজের মাটিতে সংখ্যালঘু হয়ে। কিন্তু তাতার মুসলমানরা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্য বিড়ম্বিত জাতির মধ্যে একটি। যাদের কিছু নিজ ভূমিতে ফিরতে পারলেও ২০১৪ সালের রাশিয়ান ফেডারেশন কর্তৃক ক্রিমিয়াকে রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে যুক্ত করার পর আবারও জাতিগত উচ্ছেদের মুখে তাতার মুসলমানরা।

তথ্যসূত্র:

১. Against Their Will : The History and Geography of Forced Migrations in the USSR, by Pavel M. Polian (এটি একটি রুশ বই এর অনুবাদ – অনেক খুঁটিনাটি বিশদ এখানে পাবেন)

২. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Population_transfer_in_the_Soviet_Union ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উইকি পেজ

(ছবি: গণপ্রতিস্থাপনের কিছু আংশিক মানচিত্র)

proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.