Co-curricular activities in child development
শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম
সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব
সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা: একটা সময় ছিল যখন শরীরচর্চা, খেলাধুলা, সমাজসেবা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সময়ের অপচয় কিংবা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বলে ধারণা করা হতো। কালের বিবর্তনে এসব বিষয়গুলোকে নতুন নামকরন করা হয়েছে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম যা শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ যোগ্য নাগরিক হতে হলে তার শারীরিক এবং মনোসামাজিক বিকাশ প্রয়োজন।
যে সব কার্যবলি শিশুর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি তার শারীরিক এবং মনোসামাজিক বিকাশে সহায়ক এবং তার পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা করে, শিক্ষাক্রমের সহযোগী সেই বিষয়গুলো বা কার্যাবলিসমূহকে সহশিক্ষাক্রমি কার্যক্রম বলে। মনোবিদ এইচ. এন. রিভলিন বলেন, যেসব কার্যাবলি শিক্ষার্থীর বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশের সাথে জীবনবিকাশের অন্য দিকগুলোকেও সার্থক করে তোলে, তাদেরকে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যাবলি বলে।
সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির গুরুত্ব
১। শিশুর দৈহিক এবং মনোসামাজিক বিকাশে সহায়তা করে।
২। সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুর গণতান্ত্রিক মনোভাব বিকাশে সহায়তা করে।
৩। সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুর সমাজ-জীবনের জন্য প্রস্তুত করে।
৪। শিশুর চাহিদাভিত্তিক বিকাশ গড়ে তোলে।
৫। শিশুকে আত্নবিশ্বাসী করে তোলে।
৬। শিশুর সহযোগিতা এবং সমবেদনামূলক মনোভাব গড়ে তোলে।
৭। শিশুকে আত্ননির্ভরশীল করে তোলে।
৮। শিশুকে পাঠের একঘেঁয়েমি দূর করতে সহায়তা করে।
৯। শিশুকে বিদ্যালয় নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে।
১০। শিশুর জীবনে শৃঙ্খলা স্থাপনে সহায়তা করে।
১১। শিশুর সামাজিক বৈশিষ্ট্য গঠনে সহায়তা করে।
১২। শিশুর বিভিন্ন প্রকার সৃজনশীল গুনের বিকাশে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
১৩। শিশুর সেবামূলক মনোভাব বিকাশে সহায়তা করে।
১৪। সহশিক্ষাক্রমিক কার্যাবলি শিশুকে আনন্দ এবং তৃপ্ত করে।
১৫। এটি শিক্ষার্থীর জাতীয় সংহতি বা জাতীয়তাবোধের বিকাশে সহায়তা করে।
১৬। এটি শিশুকে সক্রিয়তাভিত্তিক শিখনে সহায়তা করে, ইত্যাদি।
বিদ্যালয় পর্যায়ে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমসমূহ
ক। বিতর্ক অনুষ্ঠান, কুইক কুইজ, নাচ-গান, নাট্যানুষ্ঠান ইত্যাদি।
খ। খেলাধুলা, বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলা প্রতিযোগীতা, সাঁতার/কাবাডি/লুডু/ক্যারম/দাবা খেলা, স্কাউট/গালস গাইড/হুলদে পাখি ইত্যাদি।
গ। ফুলের বাগান, সবজি বাগান, ফলের বাগান, বৃক্ষরোপন সাপ্তাহ, মত্স চাষ ইত্যাদি।
ঘ। স্বাক্ষরতা সাপ্তাহ, শিক্ষা সাপ্তাহ পালন, উপজেলা পর্যায়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ইত্যাদি।
ঙ। বার্ষিক ম্যাগাজিন, দেয়ালিকা প্রকাশ, শিক্ষা সফর, জাতীয় এবং আন্র্—জাতিক দিবসসমূহ পালন ইত্যাদি।
শিশুর শারীরিক বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম
যেসব শরীর চর্চার কার্যাবলি শিশুর/শিক্ষার্থীর দেহ, মন এবং কর্মদক্ষতাসহ নানান সামাজিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়, সেগুলোই শিশুর শারীরিক বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম বলে পরিচিত।
যেমন, ফুটবল খেলা, ক্রিকেট খেলা, কাবাডি খেলা, ক্যারম খেলা, ব্যায়াম ইত্যাদি।
শারীরিক বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ভূমিকা
১। এটি শিশুর শারীরিক জড়তা নিরসন করে।
২। শিশুর আনন্দ লাভ করতে সহায়ক।
৩। সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম শিশুর বিনোদনের একটি কার্যকর কৌশল।
৪। এটি শিশুর পেশি সঞ্চালনে দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
৫। এটি শিশুর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৬। এটি শিশুর শরীর এবং চলাচলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।
৭। এতে শিশুর সূক্ষ্ম এবং স্থুল পেশির সঞ্চালনের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।
৮। এতে শিশুর কল্পনা বিকাশে সাহায্য করে।
৯। এর মাধ্যমে শিশু তার চোখের এবং হাতের কাজের সমন্বয় করতে পারে।
১০। এটি শিশুকে ঝুঁকি নিতে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবেলা করতে শেখায়।
শিশুর মনো-সামাজিক বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম
যেসব সহশিক্ষাক্রমিক কার্যাবলি শিশুর বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ ও বিকাশের সম্প্রসারণে এবং সামাজিক গুণাবলি বিকাশে সাহায্য করে, সেই সব কার্যাবলৈকে মনো-সামাজিক সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম বলে।
যেমন, শিক্ষা সাপ্তাহ পালন, বৃক্ষরোপণ সাপ্তাহ, হাত ধোঁয়া দিবস পালন, বার্ষিক ম্যাগাজিন, দেয়ালিকা প্রকাশ, শিক্ষা সফর, জাতীয় এবং আর্ন্তজাতিক দিবসসমূহ পালন ইত্যাদি।
মনো-সামাজিক বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম ভূমিকা
১। সবার সাথে মিলেমিশে খেলতে পারবে।
২। সহযোগিতার মনোভাব বাড়াবে।
৩। দ্রুত সিন্ধান্ত নেবার দক্ষতা বাড়াবে।
৪। অন্যের আচরণ অনুকরণ করতে পারবে।
৫। অন্যের সাথে ভাগ করতে শিখবে।
৬। শিশু তার প্রতিদিনের কাজকর্ম ঠিক মতো করতে শিখবে।
৭। শিশু সবার সাথে মিশতে শিখবে।
৮। নিজের আবেগ, আনন্দ, রাগ বুঝতে এবং প্রকাশ করতে শিখবে।
৯। সহপাঠীর সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারবে।
১০। সহপাঠী, শিক্ষক এবং অন্যান্যদের সাথে কার্যকরী যোগাযোগ করতে শিখবে।
১১। সহপাঠী, শিক্ষক এবং অন্যান্যদের প্রতি মূল্যবোধ প্রদর্শন করতে পারবে।
১২। নিজের এবং সহপাঠীর উপর আস্তা এবং বিশ্বাস তৈরি করতে শিখবে।
১৩। অন্যরে চিন্তা, অনুভূতি, মতামত এবং চাহিদার প্রতি সম্মান রেখে নিজের অনুকূলে মত প্রকাশ করা বা সিদ্ধান্ত জানাতে পারবে।
১৪। সুস্পষ্ট এবং দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে।
১৫। অন্যের সাথে অসচেতনভাবে কাজ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে।
সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম অনুশীলন
১। বিতর্ক প্রতিযোগীতা
১ম বক্তা: পক্ষদলের প্রথম বক্তা বিষয়টৈকে সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়ন করবেন, বিষয়ের পক্ষে দলের অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং সম্ভাব্য ১/২টি যুক্তি খন্ডন করবেন। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের প্রথম বক্তা পক্ষদলের প্রথম বক্তার দেয়া সংজ্ঞায়নের মেনে নেয়া অংশ বাদে যদি প্রয়োজন হয় বাকী মূল শব্দগুলোর সংজ্ঞায়ন করবেন। বিষয়ের বিপক্ষে দলের অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং ১ম বক্তার ২/৪টি যুক্তি খন্ডন করবেন।
২য় বক্তা: পক্ষদলের ২য় বক্তা বিপক্ষ দলের ১ম বক্তার দেয়া দলীয় কৌশল এবং অবস্থানের ব্যাখ্যা করবেন এবং তা খন্ডন করে বিভিন্ন তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি এবং উদাহরণের মাধ্যমে ১ম বক্তার মতো তার দলের পক্ষে বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করবেন। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের ২য় বক্তাও পক্ষদলের ২য় বক্তার ন্যায় তার দলের বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করবেন।
দলনেতা: পক্ষদলের দলনেতা তার প্রথম ও ২য় বক্তার বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বিভিন্ন তথ্য, তত্ত্ব, যুক্ত ও উদাহরণ দিয়ে বিষয়টৈকে আরো স্পষ্ট করবেন। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের দলনেতাও তার দলের পক্ষে বিষয়টিকে প্রমাণ করে যাবেন।
যুক্তিখন্ডন পর্ব: পক্ষ দলের দলনেতা বিপক্ষ দলের তিনজন বক্তার প্রদত্ত যুক্তিগুলোর মধ্যে গুর“ত্বপূর্ণ যুক্তিগুলো ধরে ধরে খন্ডন করে তাদের যুক্তিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের দলনেতাও পক্ষদলের প্রদত্ত যুক্তিগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগুলো খন্ডন করে তাদের যুক্তিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করবেন।
মডারেটর: বিতর্কের সময় নির্ধারণ করে দিবেন। প্রত্যেক বক্তাকে ৩-৫ মিনিট কওে (১মিনিট পূর্বে সতর্ক সংকেত বাজাতে হবে) এবং যুক্তি খন্ডন পর্বে উভয় দলের দলনেতাকে ২ মিনিট করে সময় দিবেন। (১.৫মিনিট পূর্বে সংকেত বাজাতে হবে। প্রত্যেক বক্তার সংজ্ঞায়ন, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, তথ্য, তত্ত্ব, এবং উদাহরণ প্রদান করে যুক্তি প্রয়োগ এবং খন্ডন ইত্যাদি বিষয়ে নম্বর প্রদান করবেন।
২। দেয়ালিকা তৈরি
দেয়ালিকা হলো কোনো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, ছড়া, কৌতুক, অংকন ইত্যাদির সমন্বিত একটি সাময়িকপত্র। এটি মাসিক, ত্রৈমাসিক, ঋতুভিত্তিক, ষন্মাসিক, বার্ষিক হতে পারে। এটি শিক্ষকের নেতৃত্বে তৈরি হয়ে থাকে এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক দেয়ালিকার মাঝ বরাবর বা একপাশে সম্পাদকীয় লিখে দিবেন। দেয়ালিকায় প্রবন্ধের পাশে গল্প, গল্পের পাশে স্মৃতিকথা বা ছড়া বা কবিতা, প্রবাদ-প্রবচন, শিক্ষণীয় হাস্যরস, কৌতুক ইত্যাদি শিরোনাম দিয়ে লিখবেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন আঁকাআঁকি বা বিভিন্ন কালারের কলমের ব্যবহার করা যাবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক অবশ্যই বানানের প্রতি বিশেষ নজর দিবেন। স্পষ্ট এবং সুন্দর হাতের লেখা হবে।
৩। গল্প বলার প্রতিযোগিতা
শিক্ষক গল্প বলার প্রতিযোগিতা আয়োজনের ঘোষণা দিবেন। সেখানে কি কি ধরণের গল্প বলা যাবে তার লিস্ট দিবেন। কত শব্দের মধ্যে গল্পটি বলতে হবে সেটা নির্ধারণ করে দিবেন। গল্পে কোনো ধরণের সামাজিক রীতিনীতির বিরোধী বিষয়বস্তু থাকবে না। গল্পের মাধ্যমে কাউকে গালি, বিদ্র“প বা আক্রমণ করা যাবে না। প্রত্যেক প্রতিযোগিকে গল্পে কি কি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হবে সেই জন্য র“ব্রিক দিবেন। সেরা গল্পকার নির্ধারণ করবেন।
৪। বৃক্ষরোপণ সপ্তাহের আয়োজন
বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপন সপ্তাহে কি কি আয়োজন করা যায় তা তালিকা তৈরি করবে। কি কি ধরণের বৃক্ষরোপন করা হবে তার তালিকা তৈরি করবে। কতগুলো বৃক্ষরোপন করবে তার তালিকা করবে। কোন স্থানে কি ধরণের গাছ লাগবে তার তালিকা প্রণয়ন করবেন। গাছে নিরাপত্তার জন্য কি কি পদক্ষেপ নিবে তার তালিকা করবে।
৫। বিজ্ঞানমেলার আয়োজন
বিজ্ঞানমেলার আয়োজনের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিবেন। আমন্ত্রণপত্র তৈরি করবেন। কত স্টল দেয়া যাবে তার জন্য প্রয়োজনী স্থান বাছাই করবেন। বিচারক কমিটি গঠন করবেন। বিচারকার্যের জন্য র“ব্রিক নির্ধারণ করে দিবেন। মেলায় প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি ঘোষণা করবেন।
তথ্যসূত্র:
১। https://www.classghar.com/2022/08/write-the-characteristics-co-curricular-activities.html
২। http://debatejudo.blogspot.com/p/blog-page_7.html
৩। শিশুর বিকাশ ও খেলাভিত্তিক শিখন বিষয়ক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সহায়িকা (জানুয়ারি ২০২৩); ডিপিই, প্রাগম এবং ব্র্যাক আইইডি
একজন আয়ার দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য কি??