বিজ্ঞান (এসকে)

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৩ সুষম খাদ্য

অধ্যায়-০৩: খাদ্য ও পুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি

সেশন-৩.৪: সুষম, অসুষম খাদ্য ও খাদ্য সংরক্ষণ

  • আঁশযুক্ত তন্তু বা রাফেল কী?
  • সুষম খাদ্য কাকে বলে? দেহ গঠনে সুষম খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করুন।
  • সাধারণত কী কী নিয়ম মেনে সুষম খাদ্য তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।
  • অসুষম খাদ্য কাকে বলে?
  • পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি কাকে বলে? পুষ্টিহীনতার কারণ ও কুফল বর্ণনা করুন।
  • জাঙ্ক ফুড কী?
  • খাদ্য সংরক্ষণ কাকে বলে? খাদ্য সংরক্ষণের কয়েকটি উপায় লিখুন।
  • খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার ও ক্ষতিকর দিকসমূহ সম্পর্কে লিখুন।

আঁশযুক্ত তন্তু বা রাফেল কী?

শস্যদানা, ফল ও সবজির কিছু অংশ যা হজম বা পরিপাক হয় না এমন তন্তুময় বা আঁশযুক্ত অংশ রাফেজ নামে পরিচিত। ফল ও সবজির রাফেজ মূলত সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর। এটি হজম হয় না, পরিপাকের পরেও অপরিবর্তিত থাকে। তবে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য রাফেজ একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। আঁশযুক্ত খাবার আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রক্ষা করে।

সুষম খাদ্য কাকে বলে?

সুষম খাদ্যঃ

যে সমস্ত খাদ্যবস্তু দেহের ক্যালরি চাহিদা পূরণ করে, টিস্যু কোষের বৃদ্ধি ও গঠন বজায় রাখে এবং দেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলীকে সুষ্ঠভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাকে সুষম খাদ্য বলে। অর্থাৎ সুষম খাদ্য বলতে বোঝায় ৬টী উপাদান বিশিষ্ট পরিমাণ মতো খাবার যা ব্যক্তিবিশেষের দেহের চাহিদা মেটায়।

স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কর্মশক্তি উৎপাদন ও শরীরকে রোগমুক্ত রাখার জন্য নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ আবশ্যক।

দেহ গঠনে সুষম খাদ্যের প্রয়োজনীয়তাঃ

সুষম খাদ্যে খাদ্যের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার পুষ্টি উপাদান পরিমাণ মতো থাকে। কর্মক্ষম থাকার জন্য আমাদের সঠিক পরিমাণ পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। দেহ গঠনে সুষম খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেহ গঠনে সুষম খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা নিম্নে দেওয় হল-

  • সুষম খাদ্য দেহের ক্ষয়পূরণ করে
  • সুষম খাদ্য দেহের গঠন সুদৃঢ় করে।
  • সুষম খাদ্য দেহের শক্তির চাহিদা পূরণ করে।
  • এটি দেহে কোষ ও কলার বৃদ্ধি সাধন করে।
  • এটি দেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • সুষম খাদ্য দেহের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের জোগান দেয়।
  • সুষম খাদ্য গ্রহণ ব্যক্তিকে খাদ্য সচেতন করে।
  • সুষম খাদ্য দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

তাই আমাদের বয়স ও কাজের ধরণ অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সাধারণত কী কী নিয়ম মেনে সুষম খাদ্য তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।

    নিম্নের নিয়ম মেনে সুষম খাদ্য তালিকা তৈরি করা যেতে পারে-

  • প্রথমে খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানগুলো ব্যক্তিবিশেষের বয়স, কর্ম ও শারীরিক অবস্থাভেদে যে বিভিন্ন ধরনের হয় সে দিকে লক্ষ রেখে খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা।
  • খাদ্য তালিকায় কম দামে বেশি পুষ্টিমানের সুষম খাদ্য নির্বাচন করা।
  • খাদ্যের বিভিন্ন পুষ্টিমান ও খাদ্যের শ্রেণিবিন্যাস  সম্বন্ধে সাধারণ জ্ঞান থাকা।
  • পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্যের তালিকা তৈরি করা।
  • দৈহিক প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যের ক্যালরিমূল্য থাকা।
  • তালিকায় যথোপযুক্ত ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানির ব্যবস্থা থাকা।
  • খাদ্য তালিকা প্রস্তুতির সময় খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে চিন্তা করা।
  • খাদ্যের দেহ গঠনের ও ক্ষয় পূরণের উপযোগী আমিষের সরবরাহ রাখা।
  • প্রথমে খাদ্যের মূল বিভাগগুলো থেকে খাদ্য বাছাই করে পরে যে কোনো বিভাগ থেকে খাদ্য বাছাই করা। খাদ্য বাছাইয়ে বৈচিত্র থাকা।
  • ঋতু ও পরিবারের আর্থিক সঙ্গতির দিক ভেবে খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা।

অসুষম খাদ্য কাকে বলে?

কোন খাদ্য তালিকায় ৬টি উপাদানের একটি কম থাকলে বা না থাকলে তাকে অসুষম খাদ্য বা অসম খাদ্য বলে। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকের খাদ্যই অসুষম ।

পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি কাকে বলে? পুষ্টিহীনতার কারণ ও কুফল বর্ণনা করুন

পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি:

খাদ্যে পুষ্টি উপাদানসমূহের কোনটি কম থাকলে কিংবা না থাকলে দেহে পুষ্টির অভাব ঘটে। দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবজনিত ঘটনাকে পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি বলে।

পুষ্টিহীনতার কারণঃ

আমাদের দেশে পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, খাদ্যাআভ্যাস, কুসংস্কার এবং দারিদ্র্য।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সাধারণ কিছু তথ্য সবারই জানা থাকা প্রয়োজন। যেমন- শিশুর খাদ্য হবে অধিক আমিষ, শর্করা ও স্নেহ পদার্থসমৃদ্ধ। কারণ এ সময় তাদের বেড়ে ওঠার সময়। তাছাড়া শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করে প্রচুর শক্তি ক্ষয় করে। তাই এদের খাদ্যে দেহ গঠুনকারী প্রোটিন ও শক্তি উৎপাদনকারী খাদ্য শর্করা ও ফ্যাট যোগান দিতে হবে বেশি।

অন্যদিকে বড়দের দেহের বৃদ্ধি হয় না, কেবল রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষয়পূরণ হয়। এ সময় দেহ গঠণকারী প্রোটিন প্রয়োজন হয় শিশুদের তুলনায় অনেক কম। আবার বৃদ্ধ বয়সে দেহে খনিজ লবণের ভচাহিদা বৃদ্ধি পায়। এসব তথ্য জানা থাকলে খাদ্য পরিকল্পনার সময় তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়। অনেক সময় আমরা জেনেশুনেও শুধু অসচেতনতার কারণে বয়স্কদের চর্বিযুক্ত মাংস, মাছ, তেল ভাজা খাবার, দুধের সর, পনির, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাদ্য ইত্যাদি দিয়ে থাকি। যা তাদের জন্য অনিরাপদ। এভাবে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা আমাদের স্বাস্থ্যহানি বা পুষ্টিহীনতার কারণ হয়।

খাদ্যভ্যাস ও ত্রুটিপূর্ণ রন্ধন পদ্ধতির জন্য খাদ্যের পুষ্টিমান নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যকে মুখরোচক করতে যেয়ে আমরা অতিরিক্ত মসলা ও তাপে খাদ্যকে রান্না করে থাকি। যা খাদ্যের অনেক গুন নষ্ট করে দেয়। দুধ অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য। কিন্তু অনেক সময়ধরে তাপ দিলে দুধের অনেক গুন নষ্ট হয়ে যায়।

খাদ্য সম্পর্কে কুসংস্কারও এদেশে  পুষ্টিহীনতার উল্লেখযোগ্য আর একটি কারণ। নবজাতককে মায়ের দুধের পরিবর্তে মধু বা চিনি পানি দেয়া মারাত্নক ভুল। কারণ, বলা হয়, মায়ের প্রধম দুধই শিশুর প্রথম টিকা। জ্বর হলে ভাত, মাছ, মাংস খেতে না দেয়াও কুসংস্কার। অনেক্ষেত্রে গর্ভবতী মাকে কম খেতে দিয়ে মা ও শিশু উভয়েই অপুষ্টির দিকে ঠেলে দেয়া হয়। ডায়রিয়া বা কলেরা পানি খেতে না দিয়ে মূলত রোগীকে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দেয়া হয়। এসবই নিছক কুসংস্কার।

পুষ্টিহীনতার কুফলঃ

আমাদের দেশে পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টিজনিত উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো হলো-

১) প্রোটিন-ক্যালরি অপুষ্টিঃ আমিষ ও ক্যালরির(শক্তি) অভাবে শিশুদের কোয়াশিওকর ও ম্যারাসমাস রোগ হয়। কোয়াশিওরকর রোগে শিশুর ওজন কমে, বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, শরীর ও মুখে পানি আসে। ম্যারাসমাস রোগে শিধুর বৃদ্ধি মারাত্নকভাবে ব্যাহত হয় এবং শিশু হাড্ডিসার হয়ে যায়।

২) রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়াঃ বিশেষ করে লৌহ (আয়রণ) জাতীয় খাদ্যের অভাবে এনিমিয়া হয়। রক্ত কণীকা গঠনে লৌহ, প্রোটিইন ও অন্যান্য উপাদানের ঘাটতিজনিত কারণে এ রোগ হয়ে থাকে।

৩) ভিটামিন ‘এ’ এর অপুষ্টিঃ ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি থেকে রাতকানাসহ চোখের নানা ধরনের অসুস্থতা দেখা যায়।

৪) রিকেটসঃ খাদ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি এর অভাবজনিত কারণে শিশুর রকেটস রোগ হয়।

৫) গলগণ্ডঃ আয়োডীনের অভাবে গলগণ্ডসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। যেমন- শিশু মৃত্যু, বামনত্ব, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা ইত্যাদি।

এছাড়া পুষ্টিহীনতায় অকাল বার্ধক্য ঘটায়, জীবনী শক্তি ক্ষয় করে দেয়, গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টির অভাব ঘটলে দুর্বল, ক্ষীণ মেধাসম্পন্ন এবং বিকলাঙ্গ শিশু জন্মায়।

জাঙ্ক ফুড কী?

কম পুষ্টিকর উপাদান যেমন-সোডিয়াম, চিনি, শর্করা ও চর্বিজাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরি অত্যন্ত মূখেরোচক খাবারকেই সাধারণত জাঙ্ক ফুড বলা হয়। জাঙ্কফুড এর মধ্যে যেমন দেশি খাবার রয়েছে তেমনি রয়েছে বিদেশী খাবারও।  বিদেশী খাবারের মধ্যে রয়েছে চকলেট, আইসক্রীম, বার্গার, পিৎজা, পটেটো চিপস, বিস্কুট, পেস্ট্রি, কোমল পানীয় (যেমন কোকা কোলা, স্প্রাইট, সেভেন আপ, পেপসি কোলা, মোজো) ইত্যাদি । আবার আমাদের দেশীয় খাবার যেমন আলুর চপ, তেহারী, বিরিয়ানী এগুলোও জাঙ্ক ফুড।

জাঙ্ক ফুড খাওয়ার কুফল:

  • দেহের পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি পায়,
  • মস্তিষ্কের ওপরও খারাপ প্রভাব ফেলে৷ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কগনিটিভ মেমরি৷
  • ওজন বৃদ্ধি বা মোটা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা হতে পারে,
  • এগুলো বেশি খেলে তাই ব্লাড প্রেশার বেড়ে গিয়ে হার্টের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে,
  • কন্সটিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে,
  •  জাঙ্ক ফুড শুধু শরীরের নয় বরং ত্বকেরও ক্ষতি করে ফলে Acne হয়।
proshikkhon

View Comments

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.