বিজ্ঞান (এসকে)

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-৩ আমিষ

অধ্যায়-০৩: খাদ্য ও পুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যবিধি

সেশন-৩.২: আমিষ, শর্করা ও স্নেহ বা চর্বি

  • আমিষ বা প্রোটিন কী? আমিষের উৎস, কাজ ও এর অভাবের ফল সম্পর্কে আলোচনা করুন।
  • শর্করা কী? শর্করার উৎস , প্রয়োজনীয়তা ও এর আভাবের ফল সম্পর্কে আলোচনা করুন।
  • স্নেহ বা চর্বি কী? স্নেহ বা চর্বির উৎস এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করুন।
  • খাদ্যে স্নেহ বা চর্বির অভাবে শরীরে কী, কী  ধরনের সমস্যা হয়ে ?

আমিষ বা প্রোটিন কী? আমিষের উৎস, কাজ ও এর অভাবের ফল সম্পর্কে আলোচনা করুন।

আমিষ বা প্রোটিন:

আমিষ আমাদের দেহের গঠন উপাদান। কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও সালফারের সমন্বয়ে আমিষ গঠিত। আমিষে ১৬% নাইট্রোজেন থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানে আমিষ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত  হয়। আমিষ হলো অ্যামাইনো এসিডের একটি জটিল যৌগ। পরিপাক প্রক্রিয়া দ্বারা এটি দেহে শোষণ উপযোগী অ্যামাইনো এসিডে পরিণত হয়। এ অ্যামাইনো এসিড আমাদের শরীরে প্রোটিন গঠন করে।

আমিষ বা প্রোটিনের উৎসঃ

প্রাণী ও উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরনের খাদ্য থেকে আমরা আমিষ পেয়ে থাকি।

প্রাণিজ আমিষঃ প্রাণী থেকে যে আমিষ পাওয়া যায় তাকে প্রাণিজ আমিষ বলে। যেমন-মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ছানা, পনির, শুটকি ইত্যাদি।

উদ্ভিজ্জ আমিষঃ উদ্ভিদ থেকে যে আমিষ পাওয়া যায় তাকে উদ্ভিজ্জ আমিষ বলে। যেমন- মটরশুটি, ডাল, বাদাম, শিমের বিচি, ছোলা ইত্যাদি।

আমিষের প্রয়োজনীয়তাঃ

  • আমিষের কাজ মূলত দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, রক্ত তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা।
  • আমিষ এনজাইমে রূপান্তরিত হয় আর এনজাইম কোষে সংঘটিত সব বিক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
  • আমিষ দেহকোষের প্রটোপ্লাজমের প্রধান ও সাংগঠনিক উপাদান।
  • আমিষ DNA ও RNA তৈরির জন্য অ্যামাইনো এসিড সরবরাহ করে।
  • আমিষ কোষের নানা রকম কার্যাবলির নিয়ন্ত্রক।
  • আমিষ দেহেতে পানি, অক্সিজেন, আয়রণ এবং অন্যান্য জৈবযৌগ পরিবহন করে।
  • এছাড়াও দেহে শক্তির অভাব দেখা দিলে আমিষ ভেঙ্গে গিয়ে শক্তি উৎপাদন করে।

আমিষের অভাবের ফল:

আমিষ দেহ গঠনের ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। দেহের চাহিদা অনু্যায়ী আমিষ কম হলে আমাদের দেহে নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি হয়। যেমন-

  • আমিষের অভাবে নতুন দেহকোষ তৈরি হয় না। তাতে মাংসপেশীর গঠনও সঠিক হয় না। দেহ দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে দেহ দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • শিশুর খাদ্যে আমিষের অভাব হলে তাদের দেহের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দেহের ওজন কমে হ্রাস পায়। মনের বিকাশ ব্যহত হয়। মেধা ও স্মরণ শক্তি কমে যায়।
  • ২-৪ বছর বয়সে শিশুদের প্রয়োজনীয় আমিষের অভাবে কোয়ারশিওকর রোগ হয়। এ রোগে শিশুদের দেহে পানি জমে। হাত,পা ফুলে যায়। ওজন ও উচ্চতা কমে যায়। দেহের বৃদ্ধির বিকাশ ঘটে না।
  • এছাড়া হতে পারে শিশুর হাড্ডিসার রোগ বা ম্যারাসমাস। এ রোগে দেহের মাংসপেশী শুকিয়ে যায়। চামড়া কুচকে যায়। ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয়। ডায়রিয়া হয়। দেহের বৃদ্ধি ব্যাঘাত ঘটে।
  • বয়স্কদের আমিষের অভাবে দেহে পানি আসে। গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত হয় অথবা সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই অপরিণত শিশুর জন্ম দেয়। কখনো রক্ত শূণ্যতা দেখা দেয়।

শর্করা কী? শর্করার উৎস , প্রয়োজনীয়তা ও এর আভাবের ফল সম্পর্কে আলোচনা করুন।

শর্করাঃ

শর্করা হচ্ছে মানুষের প্রধান খাদ্য। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের বিভিন্ন উপাদান গুলোর মধ্যে শর্করার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন এই তিনটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে শর্করা গঠিত। শর্করা সহজপাচ্য। দেহে শোষিত হওয়ার পর শর্করা খুব কম সময়ে তাপ উৎপন্ন করে দেহে শক্তি যোগায়।

শর্করার উৎসঃ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় শর্করা সাধারণত উদ্ভিদ হতে আসে।  যেমন- ধান, ভুট্টা, আলু, সবজি, বীজ, বিভিন্ন ধরনের ফল –আম, পেঁপে, কলা, কমলালেবু, তরমুজ, বাদাম, ইত্যাদি। তবে মাছ ও প্রাণির যকৃৎ ও বৃক্ক হতে অতি সামান্য পরিমাণ শর্করা পাওয়া যায়।

শর্করার প্রয়োজনীয়তাঃ

আমাদের শরীরের পুষ্টিতে শর্করার অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। যেমন-

  • দেহের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাপ শক্তি উৎপাদন শর্করার প্রধান কাজ
  • সেলুলোজ জাতীয় খাদ্য কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করে।
  • গ্লাইকোজেন যকৃত ও পেশীতে সঞ্চিত থাকে যা প্রয়োজনের সময় প্লুকোজে পরিণত হয়ে দেহে অতিরিক্ত তাপ শক্তি উৎপাদন করে এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখে।
  • কোষের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অঙ্গাণু গঠন এবং লিপিড মেটাবলিজমে সাহায্য করে।

শর্করার ঘাটতির প্রভাব:

  • শর্করাজাতীয় খাবার দেহে শক্তি উৎপাদন ও ধরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। খাবারে কম বা বেশি শর্করা গ্রহণ উভয়ই দেহের জন্য ক্ষতিকর।
  • খাদ্যে শর্করার অভাব হলে দেহে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়।
  • শক্তি সঞ্চয় ও ধারণ ব্যাহত হয় বলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • এমনকি পেশিসমূহও সুগঠিত হয় না এবং মানসিক দিক থেকেও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে ও মেজাজ খিটখিটে হয়।

স্নেহ বা চর্বি কী? স্নেহ বা চর্বির উৎস এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করুন।

স্নেহ বা চর্বিঃ

যেসব খাদ্যে তেল বা চর্বি জাতীয় উপাদান বেশি থাকে, এদেরকে স্নেহ জাতীয় খাদ্য বলে। একে শক্তি উৎপাদনকারী উপাদান বলা হয়। স্নেহ পদার্থে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকে।

স্নেহ জাতীয় খাদ্যের উৎসঃ

আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় স্নেহ বা চর্বি উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকার উৎস হতেই আসে। উদ্ভিদজাত বিভিন্ন ধরনের তেল যেমন সয়াবিন তেল, নারিকেল তেল, সরিষার তেল এবং প্রাণীজ দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাদ্যবস্তু যেমন দুধ, ঘি, মাখন, পনির ইত্যাদি স্নেহ বা চর্বিও চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

স্নেহ বা চর্বির প্রয়োজনীয়তাঃ

  • স্নেহ বা চর্বি আমাদের দেহে শক্তি যোগায় এবং দেহের তাপমাত্রা ঠিক রাখে।
  • দেহের প্রোটিনকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
  • দেহে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে-এর যোগান দেয়।
  • দেহের ত্বককে মসৃণ রাখে।
  • খাবার সুস্বাদু করে ও তেল বা চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন শরীরে কাজে লাগাতে সাহায্য করে।

খাদ্যে স্নেহ বা চর্বির অভাবে শরীরে কী, কী  ধরনের সমস্যা হয়ে ??

খাদ্যে স্নেহ বা চর্বির ঘাটতির প্রভাব:

খাদ্যে স্নেহ বা চর্বির অভাব হলে দেহে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। খাদ্যে স্নেহ পদার্থের অভাব ঘটলে দেহের দ্রবণীয় ভিটামিনের অভাব পরিলক্ষিত হয় ফলে ভিটামিনের অভাবজনিত রোগ দেখা দেয়। যেমন-

  • ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে দেহের সৌন্দর্য নষ্ট করে,
  • অত্যাবশ্যকীয় চর্বি জাতীয় এসিডের অভাবে শিশুদের একজিমা রোগ হয় ও বয়স্কদের চর্মরোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়।
  • মানসিক বিষন্নতা দেখা দেয়।
  • এমনকি হৃৎপিণ্ডও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

খাদ্যে স্নেহ পদার্থের আধিক্যের প্রভাব:

  • স্নেহ বা চর্বি দেহে অধিক মাত্রায় শক্তি প্রদান করে। কিন্তু অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণে নানা রকমের দুরারোগ্য ব্যাধি দেখা দেয়।
  • অতিরিক্ত চর্বি কোলেস্টেরল বাড়ায়।
  • হৃদযন্ত্র ও ধমনির ভেতরের আবরণীতে চর্বি জমে শক্ত হয়ে যায়। ফলে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে।
  • হৃদযন্ত্রে অতিরিক্ত চর্বি সঞ্চিত হয়ে হৃদরোগের সৃষ্টি করে।
  • মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্ট্রোক হয়। স্ট্রোকের কারণে মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।
  • মেদবহুল দেহ সহজেই অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়।
  • মেদবহুল মানুষের ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বেশি।
  • এছাড়া ভারী শরীর নিয়ে চলাচল ও কাজ করা কষ্টকর।
proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.