অধ্যায়-০১: শিক্ষার ধারণা ও শিক্ষক যোগ্যতা
সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন।
‘শিক্ষা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘শাস’ ধাতু হতে যার অর্থ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ করা, শাসন করা, নির্দেশ দান করা, উপদেশ দান করা ইত্যাদি। শাব্দিক অর্থে ’শাস’ কথাটিতে একটি আরোপিত ব্যবহার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে এখানে শাস (শাসন) কে নমনীয়ভাবে দেখা যেতে পারে। এই বিষয়টিকে গভীরভাবে ভাবলে বুঝা যায় যে, একজন ব্যক্তির নিজস্ব, পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কল্যাণের বিষয়গুলো শিক্ষার মাধ্যমে নির্দেশনা প্রদান করা যায়।
Education যার বাংলা অর্থ ‘শিক্ষা’ যেটি ল্যাটিন শব্দ হতে উদ্ভূত হয়েছে। Educare, Educere এবং Educatum শব্দ তিনটির সাথে‘ Education‘ শব্দটির মৌলিক মিল পাওয়া যায়।
অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, ‘education means a process of teaching, training and learning, especially in schools, or colleges, to improve knowledge and develop skills.’
জন মিল্টন বলেছেন, ’Education is the harmonies development of mind, body and soul.’
বিশিষ্ট দার্শনিক সক্রেটিস শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘নিজেকে জানার নামই শিক্ষা’।
প্লেটোর এর মতে- “Education is the capacity to feel pleasure and pain in the right moment.” অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে সঠিক মুহূর্তে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা।
আমেরিকান শিক্ষাবিদ John Dewey বলেছেন, ‘প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তি, আবেগ ও মৌলিক মেজাজ প্রবণতা বিন্যাস করার প্রক্রিয়াই শিক্ষা।’
শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলবার শক্তিশালী ও কার্যকর এবং প্রয়োগযোগ্য সুষ্ঠু সবল শিক্ষা সম্বদ্ধীয় পরিকল্পনা হল শিক্ষাক্রম। ইংরেজিতে ‘Curriculum’ শব্দটির ল্যাটিন শব্দ উৎপত্তি হয়েছে Currer থেকে। ‘Currer’ এর অর্থ হলো ‘Course of study’। আবার কেউ কেউ মনে করে ‘Currer’ এর অর্থ হলো ‘ঘোড় দৌড়ের পথ’।এখানে দৌড়ের মাধ্যমে নিদিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর ধারণা প্রকাশ করা হয়। শিক্ষাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার হল শিক্ষাক্রম।
শিক্ষাক্রমে কোন শিক্ষা পর্যায়ের কয়েক বছরের কর্মসূচি বা কাজের ইঙ্গিত থাকে। এটি গোটা বৃক্ষের মত। এটি শিক্ষার্থীর পঠিতব্য বিষয়াদির সম্মিলিত রূপ। শিক্ষার্থীর সঠিক বিকাশের লক্ষ্যে কখন, কোথায়, কিভাবে, কতটুকু শেখাতে হবে এবং কোন কোন দিক হাতে কলমে শিখবে তারই রূপরেখা হল শিক্ষা ক্রম। এক কথায় শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিখন অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়ে তাদের আচার-আচরণ ও মনোভাবে এমন পরিবর্তন আনে যা তাকে একজন দক্ষ নাগরিক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
হিলডা তাবার মতে- ‘যুগের চিন্তাভাবনার অবয়বহীন ফসলই হলো শিক্ষাক্রম (The amorphous product of generations of thinking)।’
Wheeler এর মতে-‘ শিক্ষাক্রম বলতে শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিখন অভিজ্ঞতা নির্বাচন, বিষয়বস্তু শনাক্তকরণ, বিষয়বস্তু সংগঠন, মূল্যায়ন ইত্যাদির একটি বৃত্তাকার প্রক্রিয়া।’
শিক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত বিস্তৃত। শিক্ষার সাথে শিক্ষা প্রশাসনের পাশাপাশি কতকগুলো অপরিহার্য বিষয় জড়িত থাকে। শিক্ষা একটি অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া জীবনব্যাপী। এর একটি সুসংহত সত্ত্বা আছে যা সামগ্রিকভাবে কাজ করে। কতকগুলো ুগুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সাধিত হয়। বলা যায় যে, শিক্ষাদান প্রক্রিয়াটি অনেকগুলো উপাদানগুলো উপাদানের সমন্বয়ে সাধিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম মৌলিক উপাদান গুলো নিম্নে উল্লেখ করা হল:
| পাঠ্যক্রম | পাঠ্যসূচি |
| ১. শিক্ষাক্রম একটি ব্যাপক ধারণা। | ১. পাঠ্যসুচি শিক্ষাক্রমের একটি অংশমাত্র। |
| ২. শিক্ষাক্রম হলো শিখন শেখানো কাজের কেন্দ্রিয় রূপরেখা। | ২. পাঠ্যসুচি হলো নির্দিষ্ট শ্রেণির নির্দিষ্ট বিষয়াবলির সূচি। |
| ৩. কেন্দ্রিয়ভাবে প্রণীত। | ৩. শ্রেণিভিত্তিক প্রণীত। |
| ৪. বৃহৎ বৃক্ষ সরূপ। | ৪. বৃহৎ বৃক্ষের শাখা স্বরূপ। |
| ৫. অসংখ্য পাঠ্যসূচির সমন্বয়। | ৫. অসংখ্য পাঠের সমন্বয়। |
| ৬. নির্দেশনামূলক | ৬. বর্ণনামূলক। |
| ৭. শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য। | ৭. শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য |
| ৮. প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ | ৮. এটি স্বল্পমেয়াদী। |
সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধরণের শিক্ষাক্রম প্রবর্তিত হয়ে থাকে। কাজেই এর শ্রেণিবিন্যাস করা খুব কঠিন।
শিক্ষাক্রমের শ্রেণিবিন্যাস:
শিক্ষাধারাভিত্তিক শিক্ষাক্রম ৩ প্রকার। যথা:
১. সাধারণ শিক্ষার শিক্ষাক্রম,
২. কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাক্রম এবং
৩. পেশাগত শিক্ষার শিক্ষাক্রম ।
সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণভিত্তিক শিক্ষাক্রম ৩ প্রকার। যথা:
১. কেন্দ্রিভূত শিক্ষাক্রম,
২. আধা-কেন্দ্রিভূত শিক্ষাক্রম এবং
৩. বিকেন্দ্রিভূত শিক্ষাক্রম।
প্যাটার্নভিত্তিক শিক্ষাক্রম বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। যেমন-
১. বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রম: বাংলা, ইংরেজি, গণিত ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রম।
২. মৌলিক শিক্ষাক্রম: নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পরিবেশ সচেতনা বৃদ্ধির শিক্ষাক্রম ইত্যাদি।
৩. সমন্বিত শিক্ষাক্রম: কেন্দ্রিভূত, বিকেন্দ্রিভূত শিক্ষাক্রম।
৪. কর্মতৎপরতামূলক শিক্ষাক্রম: সবুজ বিপ্লব শিক্ষাক্রম, শিল্প বিপ্লব শিক্ষাক্রম ইত্যাদি।
৫. ভাববস্তুভিত্তিক শিক্ষাক্রম: মূল্যবোধভিত্তিক, নৈতিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম।
৬. যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের শিক্ষাক্রম।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রমটি যোগ্যতাভিত্তিক প্যাটার্নে প্রণয়ন করা হয়েছে অর্থাৎ এটি একটি যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম। যোগ্যতা বলতে সুনির্দিষ্ট আচরণকে বোঝানো হয়। যে শিক্ষাক্রমে শিক্ষা শেষে প্রত্যেক বিষয় ও শ্রেণির নির্ধারিত অর্জন উপযোগি যোগ্যতাগুলো ক্রমানুসারে অর্জন করার লক্ষ্যে বিন্যস্ত করা হয়েছে তাকে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম বলে।
প্রাথমিক/যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের বৈশিষ্ট্য:
১. যোগ্যতাগুলো সুনির্দিষ্ট করা থাকে।
২. প্রতিটি যোগ্যতার পরিসর অনুসারে পাঠদান করা হয়।
৩. যোগ্যতাসমূহের নির্বাচনে শিক্ষার্থীর বয়স ও গ্রহণ ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা হয়।
৪. যোগ্যতার কাঠিন্য অনুসারে শ্রেণিভিত্তিক বিন্যাস করা থাকে।
৫. যোগ্যতাসমূহ নির্বাচনে জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়।
৬. বৈচিত্র্যময় শিখন শেখানো পদ্ধতিতে পাঠদানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
৭. শিখন অগ্রগতি যাচাই ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষাক্রমের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা:
শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের গুরত্ব সর্বাধিক। কারণ শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিক্ষাক্রমের গতি প্রকৃতি অনুসারে। বস্তুত শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে উদ্দেশ্যমূখী, সময়োপযোগী, কার্যকরি ও গতিশীল করার একটি পূর্বপরিকল্পিত নীল নকশা। বস্তুত শিক্ষার প্রতি স্তরে শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয়তা বহুবিধ। নিম্নে শিক্ষাক্রমের গুরত্ব বা প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
যে কোন কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন হয়। সাধারণত দুটি উপায়ে আমরা জ্ঞান ও দক্ষতা লাভ করে থাকি। তার একটি হলো শিক্ষা আর অন্যটি প্রশিক্ষণ। শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে স্বল্প পরিসরে এবং স্বল্প সময়ের জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা সরবরাহের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তা-ই প্রশিক্ষণ।
Dale S. Beach প্রশিক্ষণের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা হলো, ‘প্রশিক্ষণ এমন সংগঠিত পদ্ধতি যার মাধ্যমে ব্যক্তির নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে’। সুতরাং প্রশিক্ষণ বলতে বোঝায় যে কোনও প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের নির্দিষ্ট কাজ এবং সংস্থার প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, দক্ষতা এবং মনোভাব অর্জন এবং প্রয়োগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হিসাবে পরিচালিত শিক্ষাদান এবং শেখার কার্যক্রমগুলি বোঝায়।
জরুরি কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক দক্ষতা সরবরাহের প্রয়োজন হলেও প্রশিক্ষণ দরকার হয়। যেমন- হঠাৎ করে কোনো বিশেষ ধরনের রোগ ধরা পড়ল, যার শনাক্তকরণ পদ্ধতি এবং চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশে নেই। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের জরুরি ভিত্তিতে ঐ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে।
প্রশিক্ষণ হচ্ছে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা সরবরাহের জন্য স্বল্পকালীন আয়োজন। শিক্ষকতা পেশার জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা বা দক্ষতা সরবরাহের জন্য স্বল্পকালীন আয়োজনই হচ্ছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষক যেন আবশ্যক শিক্ষণ দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারেন তাতে সমর্থ করে তোলা। স্বল্প সময়ে কোনো বিষয়ে দক্ষতা সরবরাহের প্রয়োজন হলে তখন প্রশিক্ষণ দরকার হয়। আবার কখনো কখনো নতুন একটা বিষয়ে শিক্ষকদের তাৎক্ষণিক দক্ষতা সরবরাহ করার প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষণই সর্বোত্তম ব্যবস্থা। যেমন- সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন করা।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে অর্জন করা যায়। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। যেমন-
শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যসমূহ:
অতিপ্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষকতা সমাজে একটি সুপরিচিত পেশা। প্রত্যেক পেশার মানুষের কিছু পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য থাকে যা তার পেশাগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। একইভাবে যাঁরা শিক্ষক, তাঁদের কিছু পেশাগত বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাগত জ্ঞান অর্জনের জন্য তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রায়োগিক জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াই হলো শিক্ষক শিক্ষা।
শিক্ষকতা পেশার জন্য মানবসম্পদ গঠন এবং তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির উত্তেরোত্তর বিকাশ সাধনের নিমিত্তে যে শিক্ষা পরিচালনা করা হয় তাকে ‘শিক্ষক শিক্ষা’ বলা হয়। উন্নত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন উন্নত শিক্ষক। উন্নত শিক্ষক পাওয়ার জন্য প্রয়োজন উচ্চ মানসম্পন্ন চাকুরি-পূর্ব শিক্ষক শিক্ষা কার্যক্রম। অনেকেই প্রশিক্ষণ ও শিক্ষক শিক্ষাকে এক করে দেখেন; তবে আসলে এই দুটি বিষয় ধারণা বা প্রকৃতিগতভাবে পুরোপুরি আলাদা।
শিক্ষক শিক্ষার জন্য সাধারণত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকে এবং এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার পেশাগত ডিগ্রি প্রদান করে। বাংলাদেশে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট/ অনুষদ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান, যারা শিক্ষা বিষয়ে ৪ বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান), ১ বছর/ ২ বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের পেশাগত শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের পেশাগত শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোতে এ ধরনের পেশাগত শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, যেখানে ১ বছর মেয়াদি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটিতে ৪ বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত এসব পেশাগত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও ডিগ্রি প্রদান করে, যেখানে শিক্ষা সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা ও দক্ষতা দেয়ার পাশাপাশি তার অনুশীলন করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলো এতদিন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচিত হতো। তবে সম্প্রতি এর কার্যক্রমে পরিবর্তনের আনার মাধ্যমে পেশাগত শিক্ষা বা পেশাগত ডিগ্রি প্রদানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতদিন এখানে এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো, যা প্রশিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে বর্তমানে কার্যক্রম ও এর শিক্ষাক্রমের পরিমার্জন সংক্রান্ত বড় ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেড় বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। এখানে কেবল প্রশিক্ষণের পরিবর্তে প্রাথমিক শিক্ষকদের সামগ্রিক পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে।
শিক্ষকের দায়িত্বকে নির্ধারিত ফ্রেমে আবদ্ধ করা যায় না। একজন শিক্ষক হলেন সমাজে আদর্শ ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। শিক্ষকের দায়িত্ব বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ বলা আছে, ‘শিক্ষার্থীদের মনে সুকুমার বৃত্তির অনুশীলনে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি, তাদের মধ্যে শ্রমশীলতা, সহনশীলতা, ক্সধর্য্য, নিজ ও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং অধ্যবসায়ের অভ্যাস গঠন; কুসংস্কারমুক্ত, দেশপ্রেমিক ও কর্মকুশল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকদের প্রধান কর্তব্য।’
একজন আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ মানব সৃষ্টির শৈল্পিক কারিগর। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, নির্দেশনা এবং আদর্শ, স্থান, কাল, পাত্র, জাতি, ধর্ম ও বর্ণভেদের উর্ধ্বে উঠে মানবতার কল্যাণে ব্যাপৃত হয়। তিনি সমাজ এবং রাষ্ট্রের পর্যায়েও বহুবিদদায়িত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করে থাকেন। তাই আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব কর্তব্য বর্ণনা করা হল:
শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য:
শিক্ষকের মূল কাজ হলো তার পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে তাঁকে কঠিন, জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মহান দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন আদর্শ শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্যের কয়েকটি দিক নিচে উল্লেখ করা হলো:
সমাজ সংস্কারক হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য:
একজন আদর্শ শিক্ষক একজন আদর্শ সমাজ সংস্কারক। সমাজ সংস্কারক হিসেবে শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরূপ:
সমাজে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য:
শিক্ষক সমাজেরই একজন প্রভাবশালী সচেতন প্রতিনিধি। সমাজে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরুপ হতে পারে:
পরিশেষে বলা যায় যে, একজন আদর্শ শিক্ষক পেশাগত মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেন। তিনি তাঁর পেশার প্রতি সৎ, দায়বদ্ধ ও দায়িত্ব সচেতন হবেন। শিক্ষক হবেন অত্যন্ত দক্ষ ও কুশলী। তাঁর এই দক্ষতা ও কুশলতার ব্যবহার করে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে জানার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করবেন, তাদেরকে ভাবতে এবং খুঁটিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করবেন। তিনি হবেন ধৈর্যশীল, বিনম্র ও ইতিবাচক জীবনবোধের অধিকারী। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি বিরক্ত না হয়ে বরং ধৈর্য ধরে তাদের কথা শুনবেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন। তাদের ভেতর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দেবেন।
শিক্ষক যোগ্যতা কী? শিক্ষক যোগ্যতার ক্ষেত্র কয়টি ও কী কী?
শিক্ষক যোগ্যতা:
শিক্ষকের জ্ঞান, প্রয়োজনীয়তা দক্ষতাভিত্তিক কাজ করার সু-অভ্যাস এবং কিছু আচরণিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় করার ক্ষমতাকে শিক্ষক যোগ্যতা বলা হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য একজন শিক্ষককে বিদ্যালয় ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বেশকিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেকারণে শিক্ষকের যথাযথ পেশাগত দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতার মধ্যে তাঁর পেশা ও বিষয় সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলন এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধ থাকা অপরিহার্য। মূলত এই তিনটি বিষয়ে সমন্বয়েই শিক্ষক হিসেবে কে কতটা সফল বা যোগ্যতা বিবেচিত হয়।
সারাবিশ্বেই শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শিক্ষক যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় এস্টিম প্রকল্প সর্বপ্রথম বাংলাদেশে শিক্ষক যোগ্যতা নিয়ে কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় এর পরিমার্জন, পুনঃচিন্তন শিক্ষক যোগ্যতাকে একটি নতুন আঙ্গিক ও অবয়ব প্রদান করেছে।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য শিক্ষকযোগ্যতার ৩ টি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো:
১. পেশাগত জ্ঞান ও উপলব্ধি (Professional Knowledge)
২. পেশাগত অনুশীলন (Professional Practice)
৩. পেশাগত মূল্যবোধ ও সম্পর্ক স্থাপন (Professional Values / (Relationship)
পেশাগত জ্ঞান ও উপলব্ধি (Professional Knowledge)
১. প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের পূর্ণ পরিধি কার্যকর ও আস্থার সঙ্গে শিক্ষাদান ও মূল্যায়নের জন্য বিষয়জ্ঞানের পরিকল্পনা;
২. প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের পূর্ণ পরিধি কার্যকর ও আস্থার সঙ্গে শিক্ষাদান ও মূল্যায়নের জন্য
শিক্ষণ বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানের পরিকল্পনা;
৩. জাতীয় প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম, শিক্ষাক্রমের কাঠামো, বিষয়, যোগ্যতাসমূহ এবং মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান থাকা;
৪. কার্যকর ও সামগ্রিকভাবে শিক্ষাদানের জন্য শিশুবিকাশ ও শিক্ষণ তত্ত্বসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান ও উপলব্ধি থাকা;
৫. শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যবহৃত বিধিবিধান ও নীতিমালা সম্পর্কে অবহিত থাকা ।
পেশাগত অনুশীলন (Professional Practice)
১. শিক্ষার্থীদের চাহিদার আলোকে পৃথক পৃথক শিক্ষণতত্ত্ব ও শিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণে পাঠপরিকল্পনা ও পাঠ পরিচালনার সক্ষমতা থাকা;
২. সকল শিক্ষার্থীর উচ্চ-প্রত্যাশা উপলব্ধি করতে পারা;
৩. যোগাযোগ দক্ষতা- সকল শিশু যাতে শিখনের বিষয়বস্তু সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারে সে জন্য উপস্থাপন করতে পারা;
৪. যোগাযোগ দক্ষতা- বিভিন্ন ধরনের কর্মতৎপরতা ও যথাযথ প্রশ্ন করার কে․শল জানা, এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার মাধ্যমে একটি শিখন পরিবেশ (scaffold of learning) তৈরির সক্ষমতা থাকা;
৫. নিরাপদ, যত্নশীল, সৃজনশীল, উদ্ভূদ্ধকরণ ও চ্যালেজ্ঞিং এবং একীভূত শিখন পরিবেশ সৃষ্টির দক্ষতা থাকা;
৬. পাঠসংশ্লিষ্ট ও কার্যকর এবং ICT -সহ শিক্ষোপকরণ পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ব্যবহারের দক্ষতা থাকা;
৭. শিক্ষার্থীদের শিখন এবং একীভূত শিক্ষা সম্প্রসারণে সমর্থন ও সহায়তাদানে পরিকল্পনা জ্ঞান ও মূল্যায়ন পরিচালনা দক্ষতা থাকা।
পেশাগত মূল্যবোধ ও সম্পর্ক স্থাপন (Professional Values / (Relationship)
১. শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীর সংগে ব্যবহারে সমতাবিধান, একীভূতকরণ ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকা;
২. শিক্ষক অনুচিন্তন অনুশীলন ও ধারাবাহিক পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে দায়বদ্ধ থাকা;
৩. শিক্ষক সমাজের সকল সদস্যদের সঙ্গে একত্রে কার্যকরভাবে কাজ করতে দায়বদ্ধ ও সক্ষম হওয়া;
৪. সহকর্মীদের সাথে পেশাগত সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল থাকা।
শিক্ষকমান কী?
শিক্ষকমান হলো শিক্ষকদের পেশাগত পারদর্শিতা মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত কিছু আদর্শ (Standard) এর সমন্বয়, যার মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে শিক্ষকদের পারদর্শিতার অবস্থা যাচাই করা হয়। শিক্ষক তার আত্মমূল্যায়নের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাবেন। এজন্য শিক্ষক নিজ থেকে যেমন সচেষ্ট থাকবেন, তেমনি শিক্ষকের সেই চেষ্টা কতটুকু ফলপ্রসূ তা যাচাইয়ের জন্য শিক্ষকমান মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণত শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তত্ত্বাবধান, পরিবীক্ষণ বা মূল্যায়ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে এক ধরনের মূল্যায়নের কাজ করে থাকে। কখনো কখনো বিদ্যালয় শিক্ষকদের পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে। মূলত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকের অর্জন ব্যবধান ও দুর্বলতা ধরা পড়ে এবং শিক্ষক তা অর্জনে সচেষ্ট হন।
শিক্ষক যোগ্যতার সাথে শিক্ষকমানের নিবিঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ডিপিএড শিক্ষাক্রমে ২৩টি শিক্ষকমান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই শিক্ষকমানগুলো প্রধান তিনটি ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে। যেমন: পেশাগত জ্ঞান ও উপলব্ধি, পেশাগত অনুশীলন এবং পেশাগত মূল্যবোধ ও সম্পর্কস্থাপন। প্রত্যেকটি প্রধান ক্ষেত্রকে কয়েকটি শিখন ক্ষেত্রে ভাগ করে তার আলোকে শিক্ষকমানগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ডিপিএড প্রোগ্রামে ১ম-৪র্থ টার্মের সময়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষকমান (Teacher Standard) মূল্যায়ন করা হয়।
এক্ষেত্রে শিক্ষকমান মূল্যায়ন করা হয় প্রমাণপত্রের মাধ্যমে। সকল শিক্ষার্থীকে ২৩টি শিক্ষকমানেই ৮০% বা তদুর্ধ্ব নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রথম থেকে তৃতীয় টার্ম পর্যন্ত শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অর্জন যাচাই করার জন্য অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক প্রমান সংগ্রহ করা হয়। এই প্রমানের ভিত্তিতে নির্ধারিত ছকে শিক্ষার্থীকে যোগ্যতাভিত্তিক গ্রেড প্রদান করা হয়ে থাকে।
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
This website uses cookies.
View Comments
good
so good
আপনাদের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই
Nice post.