অধ্যায়-০২: শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (১ম অংশ)

শিশু বলতে কী বুঝেন?

শিশু:

শিশু হলো অফুরন্ত সম্ভাবনাময় মানবসত্তা। শিশু শব্দটি শুনলেই প্রথমত তার অবয়বগত বা শারীরিক যেমন-শরীর, চেহারা, আকার-আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য এবং দ্বিতীয়ত, তার বিকাশ বা গুণগত দিক অর্থাৎ মন, দক্ষতা ও আচরণিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আমাদের বিবেচনায় আসে।

বাংলাদেশ শিশু নীতি (২০১১) অনুযায়ী প্রদত্ত শিশু সম্পর্কিত সংজ্ঞা অনুসারে –  ‘শিশু বলতে আঠারো বছরের নিচের বাংলাদেশের সকল ব্যক্তিকে বুঝায়।’

জাতিসংঘ শিশু অধিকার নীতিমালায় (UNCRC, ১৯৮৯) শিশুদের বয়স, অধিকার ও আমাদের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। এ সনদের আলোকে (সনদ নং-১) ‘১৮ বছরের নিচে সব মানব সন্তানকে শিশু বলা হবে, যদি না শিশুর জন্য প্রয়োজ্য আইনের আওতায় ১৮ বছরের আগেও শিশুকে সাবালক বিবেচনা করা হয়।’

এছাড়াও মনোবিজ্ঞানীগণ এবং বিকাশ বিশারদগণও জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময়কে শিশু বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠির প্রায় অর্ধেকই (৪৭%) শিশু। ডেমোগ্রাফিকস অব বাংলাদেশ এর তথ্য অনুযায়ী দেশের জনগোষ্ঠির ৩৩.৪% হলো ০-১৪ বছরের শিশু। এই বিরাট শিশু জনগোষ্ঠিকে সার্বিকভাবে বিকশিত করার জন্য বিশ শতক পরবর্তীকালে আইন ও বিভিন্ন বিধিবিধান দিয়ে অধিকতর সুরক্ষিত ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। কারণ অদূর ভবিষ্যতে এরাই দেশ পরিচালনায় বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত হবে। আর তাই পৃথিবীর সব দেশই শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছে।

শিশুর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করুন।

প্রতিটি শিশুই অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।  বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পছন্দ, চিন্তা, আচরণ ও চাহিদার ভিন্নতা ইত্যাদির কারণেই তারা স্বতন্ত্র্য। আর এই স্বাতন্ত্রতার মূলে রয়েছে শিশুর বংশ ও পরিবেশের প্রভাব। শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য কার্যক্রম নির্ধারণ, সঠিক মিথষ্ক্রিয়া, নিয়মিত যোগাযোগ ও বিভিন্ন বয়সে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও সামগ্রিক বিকাশের ধারা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে শিশু সম্পর্কে এসব ধারণা আমাদের বিশেষভাবে সহায়তা করে। শিশুদের নিয়ে কার্যক্রম নির্ধারণ ও পরিচালনার করার জন্যে প্রতিটি শিক্ষকর শিশুদের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো জানা আবশ্যক। নিম্নে শিশুদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হল:

  • প্রতিটি শিশুই অপর শিশু থেকে আলাদা। প্রত্যেকের নিজস্ব সত্তা রয়েছে।  কেউ পড়তে পছন্দ করে, কেউ খেলতে, কেউ বা বেড়াতে, কেউ শান্ত স্বভাবের আবার কেউ চঞ্চল প্রকৃতির।
  • শিশুদের পছন্দ, চাহিদা ও শিখনের ধরন আলাদা আলাদা হয়। শিশুর পছন্দ গড়ে উঠে বিশেষত: তার বেড়ে উঠার পরিবেশের উপর।
  • শিশুরা নিজেদের মতো করে পৃথিবী দেখে, বড়দের মতো করে নয়। তারা পৃথিবীকে অবাস্তবভাবে ফ্যান্টাসী/দিবা স্বপ দেখে।
  • শিশুদের মনোযোগের পরিসর অত্যন্ত সীমিত।
  • শিশুরা খেলতে পছন্দ করে। সাধারনত: শিশুরা স্বত:স্ফূর্তভাবে খেলায় অংশগ্রহন করে। খেলার মাধ্যমে শিশুর মনোযোগ বাড়ে, শিশুর প্রত্যক্ষণ সুস্পষ্ট হয়।
  • শিশুরা সৃজনশীল হয় যে কারণে তারা ছবি দেখতে ও আঁকতে পছন্দ করে।
  • প্রকৃতিগত ভাবে শিশুরা চঞ্চল বা অস্থির প্রকৃতির।
  • শিশুরা আনন্দপ্রিয় ও কৌতূহলী হয়।
  • শিশুরা সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক হয়। তারা নিজেদের বাইরে অন্য কোন দিকে খুব বেশী নজর দেয় না।
  • বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে, ও নিজস্ব সত্তাকে প্রকাশ করে।

শিশুরা কীভাবে শেখে তা বর্ণনা দিন।

জন্মের পর থেকেই মানুষের শিক্ষা শুরু হয়। শিশু নানা উপায়ে নানা মাধ্যমে শিখতে থাকে। প্রতিনিয়ত আমরা অনেক কিছু শিখি। ছোট থেকে বড় হওয়ার পর আমরা হাঁটতে শিখি, সাঁতার শিখি, গাছে চড়তে শিখি, লেখাপড়া শিখি ইত্যাদি। আমাদেরকে হয়তো কেউ এগুলো বলে দেয়নি তবু আমরা শিখেছি। শিক্ষক হিসেবে আমরা যদি বিদ্যালয় ও পরিবারে শিশুতোষ পরিবেশ এবং শিশুদের শিখনের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক উপাদান নিশ্চিত করতে পারি তাহলে শিশুদের শিখন উন্নয়ন সম্ভব। নিম্নে শিশুরা কীভাবে শেখে তা বুলেট আকারে উপস্থাপন করা হল:

  • দেখে শেখে,
  • শুনে শেখে,
  • গন্ধ নিয়ে শেখে,
  • কল্পনা করে শেখে,
  • তুলনা করে শেখে,
  • অংশগ্রহণ করে শেখে,
  • দলে কাজ করে শেখে,
  • স্বাদ নিয়ে শেখে,
  • ছবির মাধ্যমে শেখে,
  • তুলনা করে শেখে,
  • নাড়াচাড়া করে শেখে,
  • ছড়ার মাধ্যমে শেখে,
  • বারবার চেষ্টা করে শেখে,
  • পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শেখে,
  • গল্পের মাধ্যমে শেখে,
  • বই পড়ে শেখে,
  • অভিনয়ের মাধ্যমে শেখে,
  • প্রশ্ন করে শেখে,
  • অনুকরণ করে শেখে,
  • খেলে শেখে,
  • গান করে শেখে,
  • নির্দেশনা থেকে শেখে,
  • একাকী চিন্তা করে শেখে,
  • অনুসন্ধান করে শেখে,
  • নাচের মাধ্যমে ইত্যাদি নানাভাবে শেখে।

শিশু বিকাশের ক্রমধারা উল্লেখপূর্বক বর্ণনা দিন।

মানব জীবনের সূচনা ঘটে মাতৃগর্ভে। এরপর প্রতিটি শিশুকে বিকাশের ক্রমধারার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্র বিকাশ সার্বজনীন ধারা অনুসরণ করে। মাতৃগর্ভে ভ্রুণ থেকে পূর্ণাঙ্গ মানবসত্তা রূপ পেতে যে সকল পরিবর্তনগুলো দেখা যায় তা নিম্নরূপ:

১. আকারের পরিবর্তন: ওজন, উচ্চতা ও দেহের আয়তন বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। একই সাথে আভ্যন্তরীন যন্ত্র-হার্ট, পরিপাকতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রেরও পরিবর্তন হয়।

২. অনুপাতের পরিবর্তন: অতি শৈশবে শিশুর দেহের তুলনায় মাথা ও কপাল বড় এবং ঘাড় ছোট থাকে। বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে মাথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৩. পুরনো বৈশিষ্ট্যের বিলুপ্তি ঘটা: সহজাত প্রতিবর্তী ক্রিয়া (Reflex) চলে যায়, শিশুর চুলের প্রকৃতি, দুধের দাঁত ও অন্যান্য শিশুসুলভ আচরনের বিলুপ্তি ঘটে।

৪. নতুন বৈশিষ্ট্যে অর্জন: বাল্যকালে নতুন দাঁত ওঠা, কৈশোরে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। একটি শিশু মাতৃগর্ভে ভ্রুণ থেকে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে একটি মানবসত্তার রূপ নেয়। স্বাভাবিক নিয়মে চল্লিশ সপ্তাহ মাতৃগর্ভে অবস্থানের পর এই মানবসত্ত্বা পৃথিবীতে আসে। এরপর শিশুটি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়ে জীবনের কতগুলো ধাপ অতিক্রম করে। এক্ষেত্রে যেমন শিশুর শারীরিক পরিবর্তন হতে থাকে তেমনি শিশু নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আচরণিক দক্ষতা অর্জন করতে থাকে।  এই পরিবর্তনসমূহকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা:

১. আকার-আকৃতিগত পরিবর্তন বা বর্ধন (growth) এবং

২. আচরণগত পরিবর্তন বা বিকাশ (development)।

বর্ধন (growth)  কি?

বর্ধন বলতে দৈহিক আকার আয়তনের পরিবর্তনকে বোঝায়। বর্ধন হলো পরিমাণগত পরিবর্তন। নির্দিষ্ট সময় র্পযন্ত মানব জীবনে বর্ধন সাধিত হয়। বর্ধনের গতি ঊর্ধ্বমুখী। এটি প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটে। ব্যক্তির ও সামাজিক অভিযোজনের সাথে বর্ধন সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বর্ধন কেবল শারীরিক দিক নিয়েই আবর্তিত।

জন্ম পরবর্তীকালে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি বা বর্ধন:

উচ্চতা : জন্মের সময় আমাদের দেশে সাধারণত একটি শিশুর উচ্চতা ১৭ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। এরপরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রথম ৭-৮ বছরে শিশুর উচ্চতা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তীতে এর গতি অনেক ধীর হয়ে যায়।

ওজন : জন্মের সময় শিশুর ওজন সাধারণত ৬-৭ পাউন্ড বা তার কম-বেশি থাকে এবং শিশু জন্মের পর প্রথম বছর ওজন অতি দ্রুত বাড়ে। ছয় মাসে শিশুর ওজন দ্বিগুণ হয় এবং এক বছরে তিন গুণ হয়।

আকার : বয়সের সাথে সাথে যেহেতু শিশুর ওজন, উচ্চতায় পরিবর্তন আসে, কাজেই তার সার্বিক আকারেও পরিবর্তন আসে, যা আমরা সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণ করি এবং শিশুর বৃদ্ধি বুঝতে পারি।

বিকাশ (development)কি?

বিকাশ বলতে বোঝায় দৈহিক আকার ও আয়তন, আচরণ ও দক্ষতা এবং কার্যক্ষমতার পরিবর্তন। বিকাশ হলো গুণগত পরিবর্তন। বিকাশ ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। বিকাশের গতি জীবনের শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী, মধ্যবয়সে মন্থর এবং বৃদ্ধ বয়সে নিম্নমূখী। বিকাশ মানবজীবনের বিভিন্ন দিক যেমন- শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়, ভাষাগত বিভিন্ন দিক নিয়ে আবর্তিত।

শিশু বিকাশের সাধারণ নীতিগুলো লিখুন।

বিকাশ হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক, অব্যাহত ও সমষ্টিগত প্রক্রিয়া। জন্মগত ভাবেই মানব শরীর নতুন নতুন উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে। প্রতিনিয়ত উদ্দীপনার ফলে মস্তিষ্ক ও শরীর ক্রমাগত অভিজ্ঞতা লাভ করতে থাকে। দৃষ্টিগ্রাহ্য শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি শিশুর অভ্যন্তরীণ চিন্তা-চেতনার পরিবতর্নের প্রকাশ ঘটে তার আচার আচরণে। এরূপ মানসিক বা আচরণিক গুণাবলীর পরিবর্তনকে শিশুর বিকাশ (Development) বলে।

বিকাশের সাধারণ নীতি:

১. বিকাশ ক্রমধারা এবং পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হয় এবং বিকাশের মধ্যে সহসম্পর্ক রয়েছে: যদিও কোন দুটি শিশুই একরকম নয়, তথাপি সকল শিশুই একটি সাধারণ ক্রমধারা অনুসরণ করে;

২. বিকাশের ধারায় সাদৃশ্য রয়েছে: প্রথমে ঘাড় শক্ত হয়, হামাগুড়ি দেয়, বসে, দাঁড়ায় এবং এরপর হাটে;

৩. বিকাশের ধারা ক্রমসংযোজনশীল বা বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে বিকাশ সম্পন্ন হয়;

৪. বিকাশ প্রক্রিয়া খুবই জটিল: শরীরের বিভিন্ন অংশের বৃদ্ধি বিভিন্ন হারে হয়। মাতৃগর্ভে মাথা দ্রূত বাড়ে।

জন্মের পর ধড়, হাত, পা দ্রূত বাড়ে। শৈশবকালের শেষে শারীরিক বৃদ্ধি মন্থর হয় এবং কৈশোরোত্তরকালে তা আবার দ্রুত হয়। ক্ষুদে শিশুদের মধ্যে কল্পনা প্রবণতা, আত্মকেন্দ্রিকতা দেখা যায়। অন্যদিকে ৯-১০ বছরের কিশোরদের মধ্যে বাস্তবমূখিতা, যুক্তিপূর্ন চিন্তার উন্মেষ ঘটে;

৫. বিকাশ দুটি বিশেষ ধারায় সংগঠিত হয়:

ক) সেফালোকডাল (Cephalocaudal): ভ্রুন অবস্থায়, জন্ম পরবর্তী সময়ে বিকাশের গতি ক্রমশ: মাথা হতে পায়ের দিকে অগ্রসর হয়;

খ) প্রক্সিমোডিস্টাল (Proximodistal): শিশু প্রথমে চোখ,মাথা,ঘাড় এবং পরে বাহু,কনুই অর্থাৎ বিভিন্ন অঙ্গের কাজ কেন্দ্র হতে বাইরের দিকে এই নিয়মে সংগঠিত হয়;

৬. বিকাশ সাধারন থেকে বিশেষ ভাবে ঘটে- প্রথমে পুরো শরীর এগিয়ে দেয় ক্রমে হাত বা পা বাড়ায় । প্রথমে সবগুলো আঙুল মুঠো করে ধরে,ধীরে ধীরে ৩,২ বা ১টি আঙ্গুলের ব্যবহার করতে শেখে;

৭. বিকাশের ধারা প্রথমে বিচ্ছিন্ন ও ক্রমে সমন্বিত হয়: একটি একক ডিম্ব কোষের বিভক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন

অঙ্গের অধিকারী মানব শিশুর রূপ ধারন করে। একই ভাবে মানসিক বিকাশ-বুদ্ধির সাথে আগ্রহ, মনোযোগ,

আবেগ, ইচ্ছা সবই স্বতন্ত্রভাবে পরিবর্তিত হয়। এগুলো পরবর্তীতে একটি অন্যটি দ্বারা প্রভাবিত হয়;

৮. প্রতিটি শিশু অনন্য বা স্বতন্ত্র্য ভিন্ন বংশগতি ও ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে এই স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়;

৯. পরিপক্কতা ও শিখন বিকাশকে প্রভাবিত করে;

১০. বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে সংকটকাল বা বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে, শিশুর জন্মের পর ২৮ দিন, প্রথম ২ বৎসর, বয়ঃসন্ধিকাল; এছাড়াও প্রতিটি পর্যায়ই সঠিকভাবে বিকাশ না হলেই সংকট দেখা দিতে পারে। বিকাশের নীতিগুলো পিতামাতা, অভিভাবক ও শিক্ষক সকলের জানা থাকলে বিকাশের কোথাও অনিয়ম হলে সেটি সুনির্দিষ্ট করে যত দ্রুত সম্ভব চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞের দ্বারা প্রারম্ভিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শিশু, তার পিতামাতা, অভিভাবক, সমাজ সবাই উপকৃত হতে পারে। শিশুকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে শিশুর সাথে সম্পর্কিত সকলের শিশু সম্পর্কে সুগভীর ও সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

সেফালোকডাল ও প্রক্সিমোডিস্টাল এর মধ্যে পার্থক্য কী?

সেফালোকডাল প্রক্সিমোডিস্টাল
সেফালোকডাল বিকাশ হলো মাথা নীচ থেকে শুরু হওয়া বৃদ্ধি এবং বিকাশকে বোঝায়। প্রক্সিমোডিস্টাল বিকাশ হলো শরীরের কেন্দ্র বা কোর থেকে বাইরের দিকে ঘটে।
প্রথমে ঘাড়ের পেশীগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে যা তাদের মাথা স্থির রাখতে সহায়তা করে।   এই বিকাশকালিন প্রথমে মেরুদণ্ড বিকশিত হয়।
মাথা সরাতে পারে ও শিশুর ঘাড় শক্ত হয়। ধীরে ধীরে বাহু, হাত ও হাতের আঙ্গুলগুলি বিকশিত হয়।
সবশেষে মাথা উপরে ধরে রাখতে পারে। সবশেষে পা ও পায়ের আঙ্গুল বৃদ্ধি পায়।

পরিণমন কি?

পরিণমন একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ব্যক্তিজীবনে একটি নির্দিষ্ট সময় বা বয়স পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলে। তারপর এই প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। পরিণমনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতন ও সক্রিয় থাকে না। ইহা একটি স্বাভাবিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়া। এর জন্যে ব্যক্তির অতীত অভিজ্ঞতা অথবা অনুশীলনের প্রয়োজন হয় না।

বংশগতি ও পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? শিশু বিকাশে বংশগতি ও পরিবেশের প্রভাব ব্যাখ্যা করুন।

শিশুর বিকাশে বংশগতি না পরিবেশ কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা জানার আগে আমাদের জানা খুব প্রয়োজন। বংশগতি হল মা, বাবা ও পূবর্ পুরুষের কাছ থেকে জন্মগতভাবে পাওয়া শারীরিক, মানসিক এবং স্বভাবগত কিছু বৈশিষ্ট্য। এই সব বৈশিষ্ট্যের জন্যই একজন ছেলে বা মেয়ে বাবা, মা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো পূবর্ পুরুষের অবিকল এক চেহারা সম্পন্ন হয় অথবা কথাবার্তা, চাল-চলনে ও মন মানসিকতায় একই ধরনের হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ব্যক্তির চারপাশে যা কিছু আছে তা সবই তার পরিবেশ। অর্থাৎ পরিবেশ বলতে বোঝায় তার ঘর-বাড়ি, স্কুল, মা-বাবা, সংস্কৃতি, ধর্ম পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব বিষয়। এককথায়, যা একক অথবা সমষ্টিগতভাবে ব্যক্তির আচরণে প্রভাব ফেলে তাই ব্যক্তির পরিবেশ।

বংশগতি

বংশগতির কারণে মানুষের সন্তান মানুষের মতো দেখতে হয়। আবার উচ্চতা, দেহের গঠন, চুল, চোখ, চামড়ার রং ইত্যাদি দৈহিক গুণাবলি এবং বিভিন্ন মানসিক গুণাবলি বংশগতির কারণে একেক জনের একেক রকম হয়। বংশগতির প্রভাব জীবনের সূচনা থেকে শুরু করে সারা জীবনব্যাপী চলতে থাকে। বংশগতির সূচনা হয় মাতৃগর্ভ  থেকে। কোনো কোনো মনোবিজ্ঞানী বুদ্ধি বিকাশে বংশগতির ধারাকেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি কতটুকু বুদ্ধিমান হবে তা সে জন্মগতভাবেই পেয়ে থাকে। তাঁরা এর স্বপক্ষে নানা রকম যুক্তি ও গবেষণালব্ধ তথ্য প্রকাশ করেছেন। বংশগতিবিদ হিসেবে ফ্রান্সিস গ্যালটনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সমাজের ৯৭৭ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনদের জীবন ইতিহাস পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে তার মধ্যে ৫৩৬ জনই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত অপরদিকে সমাজের অতি সাধারণ ৯৭৭ জন ব্যক্তির বংশের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, এদের মধ্যে মাত্র ৪ জন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ থেকে তিনি বলেন যে, এর মূল কারণ হল বংশধারার প্রভাব।

পরিবেশ

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলে একথাও প্রমানিত হয়েছে যে, শিশুর বিকাশে বংশগতি নয় বরং পরিবেশই প্রধান। মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসনের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।  তিনিই বংশগতিবিদদের বলেছেন যে, “আমাকে একজন সুস্থ স্বাভাবিক শিশু দিন, আমি ইচ্ছামত তাদের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে পরিপূর্ণতা এনে দিতে পারি। জন লক, রবাটর্  আওয়েল এই মতকে সমর্থন করেন। হেলেন ও গ্লাডিস নামে দুই সমকোষী জমজ শিশু ঘটনা চক্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে মানুষ হয়, অনেক বছর পর তাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে সামাজিক, মানসিক ও আবেগের বিকাশে ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।

বংশগতি ও পরিবেশের পারস্পরিক প্রভাব

আমরা বংশগতি ও পরিবেশের প্রভাব নিয়ে পৃথক পৃথকভাবে আলোচনা করলাম। তবে, শিশুর বিকাশে উভয় উপাদানেরই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। একটিকে ছাড়া অন্যটি অচল। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা অবশ্য একথা সমর্থন করেন। ধরা যাক একটি বুদ্ধিদীপ্ত পরিবারের শিশুকে প্রতিক‚ল পরিবেশে রাখা হল। এতে দেখা যাবে যে, উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে তার সুপ্ত সম্ভাবনা বিকশিত হয়নি। একইভাবে, জন্মগতভাবে একটি অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন শিশুকে ভালো পরিবেশে রাখা হলেও দেখা যাবে যে, তার বুদ্ধ্যাংক তেমন বাড়তে পারছেনা।

বংশগতি ও পরিবেশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানাভাবে গবেষণা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা দেখাতে চেয়েছেন যে, ব্যক্তি জীবনের বিকাশ কেবল বংশ ধারার উপরই নিভর্ র করে না বরং পরিবেশের উপরও তার কিছুটা নিভর্ রতা রয়েছে। শিশুর জন্মমুহুর্ত যে সম্ভাবনা থাকে পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পরিবেশের প্রয়োজন। অন্যদিকে পরিবেশ যত উন্নতই হোক না কেন, শিশুর মধ্যে যদি বিকাশধর্মী উপাদান না থাকে, তার জীবন বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। অর্থাৎ শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে বংশগতি ও পরিবেশ উভয়েরই বিরাট ভ‚মিকা রয়েছে। শিশুর মধ্যে তার বংশগত বুদ্ধির সীমারেখা জন্মগতভাবেই থাকে, তা বিকশিত হয় উপযুক্ত পরিবেশের মাধ্যমে।

মস্তিষ্ক কী?

যে তন্ত্রের সাহায্যে প্রাণী উত্তেজনায় সাড়া দিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সর্ম্পক রক্ষা করে এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ সাধন করে তাই স্নায়ুতন্ত্র । মানুষের মস্তিষ্ক স্নায়ুতন্ত্রের অঙ্গ । উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে- ‘মস্তিষ্ক হল কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ, যা করোটির অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং দেহের প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। ভ্রুণ অবস্থায় সুষুম্নাকান্ডের অগ্রবর্তী দন্ডাকার অংশ ভাঁজ হয়ে পর পর ৩টি বিষমাকৃতির স্ফীতি তৈরী করে। স্ফীতি ৩টি মিলেই গঠিত হয় মস্তিষ্ক।’

মতিষ্কের আরেক বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘বুদ্ধি’। সুতরাং বলা যায় যে, মস্তিষ্কের সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার মস্তিষ্কের ১০০ বিলিয়ন কোষ থাকে অন্যদিকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মস্তিষ্কের আয়তন ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটার, গড় ওজন ১.৩৬ কেজি এবং এতে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন থাকে । মস্তিষ্ক আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক কোষ নিয়ে গঠিত যা পৃথিবীর সকল শিশুর ক্ষেত্রে সংখ্যায় প্রায় সমান।

তবে একটি কোষের সাথে অন্য কোষের সংযোগ ছাড়া এই কোষগুলো একা একা কাজ করতে পারে না। বিকাশসংক্রান্ত কর্মকান্ডগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মস্তিষ্কের পরিপক্বতা প্রয়োজন। আর তা করা যায় কেবলমাত্র মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে ব্যাপক সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে। তবে জন্মের সময়ে শিশুর এ কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ খুব বেশি থাকে না। এসময় মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে যত বেশি সংযোগ ঘটবে শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র তত বেশি প্রশস্ত হবে।

আর মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত উদ্দীপনা। মস্তিষ্কের একেকটি অংশ যেহেতু একেকটি কাজে নিয়োজিত থাকে তাই সুসমন্বিতভাবে কাজের জন্য মস্তিষ্কের সকল অংশকে একই সাথে উদ্দীপিত করতে হয়।

শিশুর বিকাশে মস্তিষ্কের ভূমিকা লিখুন।

আমাদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তীয়, আবেগিকসহ সকল কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। তাই এসকল বিকাশ নির্ভর করে মস্তিষ্কের। বিকাশের ওপর। মস্তিষ্কের। বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন:

  • দেখা বা দৃষ্টির জন্য দায়ী মস্তিষ্কের। পেছনের দিকের নিচের অংশ,
  • শোনা ও বলা- মস্তিষ্কের। নিচের অংশের মধ্যভাগ,
  • স্পর্শ বা অনুভব করা মস্তিষ্কের পেছনের দিকের উপরের অংশ,
  • চলন ক্ষমতার জন্য দায়ী মস্তিষ্কের উপরের দিকের (তালুর) মধ্যভাগ,
  • চিন্তা, যুক্তি, সমস্যার সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য দায়ী মস্তিষ্কের তালুর সামনের দিক ও কপালের পেছনে উপরের অংশ,
  • পরিকল্পনা ও অনুশীলন করার জন্য দায়ী মস্তিষ্কের সামনের দিকের নিচের (কপালের পেছনের) অংশ।
proshikkhon

View Comments

    • Thank a lot. Please, visit our other post about DPEd Course. You will fine all the subject's hand-note as well as many other thing like incourse and final exam questionnaires, model test etc.

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.