স্বরবর্ণের উচ্চারণ

Pronunciation of Bangla Vowel

স্বরবর্ণ

অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া অবাধে উচ্চারিত এবং অন্য ধ্বনি যাকে আশ্রয় করে প্রকাশিত হয় তাকে স্বরধ্বনি বলা হয় এবং ঐ স্বরধ্বনির যা প্রতীক তাকে বলে স্বরবর্ণ। স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় তা কন্ঠ বা মুখের ভিতরকার কোন বাক প্রত্যঙ্গে বাধা পায় না অর্থাৎ স্বয়ম্ উচ্চারিত। মূলত: স্বর ধ্বনি অ, আ, ই, উ, এ, ও এই ৭টি হলেও বাংলা স্বরবর্ণমালা ১১টি বর্ণ নিয়ে গঠিত।

স্বরবর্ণের উচ্চারণ

অ এর উচ্চারণ

অ এর প্রকৃত উচ্চারণ ‘অতল’ এর ‘অ’ এর মত । অমলিন বলার সময় ‘অ’ এর প্রকৃত উচ্চারণ রক্ষিত হয়। কিন্তু ‘মলিন’ উচ্চারণে ‘অ’ ও কারান্ত ব্যতিক্রম উচ্চরণে রূপায়িত হয়।

আদ্য-অ

একাক্ষর যদি হন্ত হয় তবে আদ্য ‘অ’ এর প্রকৃত উচ্চরণ রক্ষতি হবে। যেমন বল, জল, খল, মল, ফল, রস ইত্যাদি। হলন্ত বর্ণের সংগে আ যুক্তহলেও প্রকৃত উচ্চারণ বজায় থাকবে যেমন, ফলা, জলা, রসা ইত্যাদি।

সহ শব্দের ‘স’ তে সজল, সকল, সফর সময় সহোদর ইত্যাদি।সম উপসর্গের ‘স’ তেও প্রকৃত ‘অ’ এর উচ্চারণ সঠিক থাকে যেমন, সংগ্রহ, সংগ্রাম সঞ্চয় সমাদর, সম্রাট ইত্যাদি। এ ছাড়া নঞর্থক অ-তে অবিরাম, অমৃত অধীর অস্বস্তি, অবশ্য ইত্যাদিতে । ধ্বনি বাচক শব্দের আদ্য ‘অ’ বজায় থাকে যেমন, বন্-বন্, শন্ –শন্, মড়্ মড়, ঝর্-ঝর্, ছম্-ছম্, গম্-গম্ ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম উচ্চারণ

অ > ও কারন্তরে রূপান্ত

আদ্য অক্ষরের পর ই-ঈ, উ-ঊ, য ফলা থাকলে গতি, যতি, মতি, সতী, ক্ষতি, নদী, যদি, গদি, অতুক্তি, সত্য, গদ্য পদ্য ইত্যাদি। ‘ক্ষ’ বা খ্য পরে থাকলে সখ্য, রক্ষা, যক্ষা, বক্ষ্য ইত্যাদি। আদ্য ‘অ’ র ফলা যুক্ত হলে, ব্রত, ব্রজ, শ্রম, শ্রবণ, শ্রমণ, ভ্রমণ, ভ্রমর, গ্রহণ, প্রকৃত, প্রভু ইত্যাদি। ঋ- ফলা যুক্তবর্ণ পরে হলে মসৃন, প্রকৃষ্ট, বক্তৃতা, প্রসূত, ইত্যাদিতে “ও” কারান্ত উচ্চারণ হবে। মধ্যবর্তী “অ’ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ও’ হয়, যেমন সকল সজল, শরম, বরণ, অনল, অলংকার ইত্যাদি।

অন্ত্য ‘অ’ উচ্চারিত হলে ‘ও’ হবে, যেমন, ছোট, বড়, কাল, ভাল(এগুলো ও কার দিয়েও লেখা যেতে পারে। যত, তত, এত, কেন, যেন, হেন ইত্যাদি।ক্রিয়া বিশেষ্য পদ দেখান, শোনান, পড়ান, বলান; দ্বিরুক্ত বিশেষণ পদ, ছলফল, টলটল, কলকল, ঝলমল তুল্য অর্থে মত ইত্যাদি শব্দগুলোর উচ্চারণ ও কারান্ত; তবে, ও কার দিয়ে লিখলেও মান্য বলে গণ্য হবে।পদান্তে যুক্তবর্ণ বা ‘হ’ থাকলে, সূর্য, অস্ত, মস্ত, ব্যস্ত, বজ্র, দাহ, প্রবাহ,প্রদাহ ইত্যাদি।

ং বা ঃ থাকলে, অংশ, বংশ, ধ্বংশ, হংস, দুঃখ, নিঃস্ব ইত্যাদি। ত, ইত, তম, প্রত্যয়যুক্ত বিশেষণে, গত, শ্রুত, শীত, মহত্তর, ইত্যাদি। ‘ঢ়’ কারান্ত পদে- মূঢ়, রূঢ়, দৃঢ়, গাঢ় ইত্যাদি।

ই কার বা একারের পর ‘য়’ থাকলে-প্রিয়, দেয়, নির্ণয়ে, বিধেয় ইত্যাদি। তন্ত বর্ণের আগে ঋ, ঐ, ঔ, থাকলে তৃর্ণ বৃষ, শৈল দৈব, মৌন, গৌণ, লৌহ, শৈব ইত্যাদি।

অনুচ্চারিত ‘অ’

উপযুক্ত বিষযগুলো ছাড়া “অ’ প্রায়ই অনুচ্চারিত থাকে থাকে, একাক্ষর-ফল, জল ইত্যাদি। দ্যক্ষর-শ্রবণ, দর্শন, পতন ইত্যাদি। এ্যক্ষ-মহাবল, অবশেষ ইত্যাদি। একাক্ষর শব্দ সমাসের পূর্বপদ হলে অ > ও হবে-যেমন ফল-জলযান, লোক-লোকগীতি, লোকভয়, ইত্যাদি।

আ এর উচ্চারণ

‘আমার’ শব্দ ‘আ’ এর উচ্চারণ যেমন ভাবে হয তেমন। উচ্চারণ হ্রাস স্বর। মাতা দু অক্ষর বা দু মাত্রার শব্দ। হলন্ত হলে অবস্থান অনুযায়ী দীর্ঘ ও দুমাত্রার হতে পারে যেমন, ‘আকর্ণ, আশ্চর্য এখানে ‘আ’ ে‘আতা’ মাতার ‘আ’ থেকে দীর্ঘতর , তবে দুমাত্রার হবে কিনা তা বাক্যে আবস্থানের ওপর নির্ভর করে।

উচ্চারণ ইত্যাদির ‘ই’ এর মত। ইংরেজি Big Sick এর ‘i’যেমন ভাবে উচ্চারিত হয তেমন ।

ই এর মতই উচ্চারিত হয়৷ ঈ এর উচ্চারণ পার্থক্য করা দুরূহ৷ যদি শব্দের ‘দি’ এর চেয়ে নদী শরে ‘দী’ এর উচ্চারণ একটু দীর্ঘ৷ তবে দু’মাত্রার হবে কিনা তা প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল৷ ঈগল এর ঈ উচ্চারণ, ইলিশের ই এর চেয়ে দীর্ঘ হলেও পার্থক্য নিরূপণ করার জন্য অভিজ্ঞ কণ্ঠ ও কানের প্রয়োজন৷

উচ্চারণ হ্রস্ব স্বরান্ত৷ চুল, ভুল, কুল, এর উ কারের মত৷ হলন্ত হলে বা এরপর ং থাকলে দীর্ঘ হতে পারে৷  যেমন-  উঃ, উং, উল; মুকুতার কু এর চেয়ে মুকুলের কু এর উচ্চারণ একটু দীর্ঘ৷

উ এর মতই উচ্চারণ এবং উচ্চারণের স্থানও এক৷ হ্রস্বস্বর হলন্ত হলে উ এর মত উচ্চারণ দীর্ঘ হতে পারে৷ অর্থে জোর দেওয়ার প্রয়োজনে দীর্ঘ উচ্চারণ হতে পারে, যেমন- বিমূঢ়, দূর উত্যাদি৷

শব্দের প্রথমে বসলে উচ্চারণে বিকৃতি নেই, যেমন- বৃথা, তৃণ, বৃষ৷ কিন্তু শব্দের মধ্যাঞ্চলে বসলে উচ্চারণে বিকৃতি ঘটে৷ উদাহরণ- অমৃত (অমমৃত), আবৃত্তি (আববৃততি) উত্যাদি৷ এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার মাঝখানে ঋ কার থাকলে দ্বিত্ব না করে আলতোভাবে উচ্চারণ করতে হবে৷

প্রকৃপক্ষে ‘এ’ কারে উচ্চারণ বাংলায় দু’রকম৷

‘এ’ কারে প্রকৃত উচ্চারণ

তৎসম শব্দে আদ্য একারে: লেখা, কেকা, একক, একাকী, কেশ, মেষ, বেদনা ইত্যাদি৷

অভিশ্রুতিজনিত ‘এ’: খেয়ে, নেয়ে, টেকো, মেঠো, গেছো ইত্যাদি৷

সর্বনা: এ, যে, এখানে, সেখানে ইত্যাদি৷

বিদেশী ফরাসী শব্দ উচ্চারণে: বেলভকর, বেদম বেবন্দোবস্ত ইত্যাদি৷

একারের ব্যতিক্রম উচ্চারণ:

ব্যতিক্রম উচ্চারণ নিয়ম সিদ্ধ করা কঠিন৷ ব্যক্তিক্রম উচ্চারণের অনেক শব্দ ‘্যা’ ফলা দিয়েও লেখা যায়৷

এমন, মেন, একলা, এক, একটা, কেন, কেমন, খেপা, খেলনা, ঘেঁসা, চেঁচা, চেপটা, চেলা, ছেনা, জেঠা, টেক, ঠেকা, ঠেঙ, ঠেলা, ভেলা, নেঙড়া, নেকড়া, তেলাপোকা, থেবড়া, দেখা, দেওর, ধেবড়া, নেকা, লেজা, পেঁচা নেপা, ফেটানো, ফেন, ফেনা, ফেলা, বেঙ, বেচা, বেড়া, বেড়ানো, বেলা, বেসাতি, সেঁকা, সেঁকড়া, হেলা, হেস্ত, মেলা ইত্যাদি৷

‘এ’ কারে প্রকৃত উচ্চারণের তত্সম শব্দের সংক্ষিপ্ত তালিকা:

কেন্নো, কেয়ারী, খেয়া, খেয়াল, গেরুয়া, গেলা, এই, এঁদো, এঁড়ে, খেন্না, ঘেরাও, চেনা, চেয়ে, চেরি, চেহারা, চেলি, ছেনি, জের, নেতা, জেরা, জেল, জেলি, টেপা, টের, ডেঁপো, ডেরা, তেজ, তেতো, তেপায়া, থেঁতো, থেলো, দেউল, দেড়, দেদার, দেওয়ালী, দেদার, দেমাক, দেনা দেয়া, দেরাজ, ধই ধেই, নেকড়ে, নেকনজর, নেশা, নেহাত, পেটা, পেটাও, পেয়াদা, পেয়ালা, পেশা, ফেরা, ফেরারী, ফের, বেগুন, বেশ, বেমানান, বেহাত, ভেড়ি, ভেল, মেঠাই মঝে, মেখি, মেনি, মেশা, মেলা,( মিলিত হওয়া), যেত, যেই, রেওয়াজ, বেকার, রেল, রেলিং, রেহাই, লেচি, লেবু, শেয়াল, সেঁউতি, সেগুন, সেতার, সেলাই, হেঁশেল, হেদো, হেঁচকি ইত্যাদি৷

বাংলা স্বরবর্ণে দ্বিস্বর, ত্রিস্বর, চতু:স্বর, পঞ্চস্বরের প্রচলন আছে; যেমন,

দ্বিস্বর-   অয়  : হয়, নয়, কয়, রয়, সয়৷

          আই    : খাই, নাই, পাই, যাই৷

          আউ   : দাউদাউ, ঝাউ, হাউহাউ৷

          আও    : খাও, নাও, যাও, দাও৷

ত্রিস্বর- আউই : হাউই, তাউই৷

        ইয়াও     : দিয়াও, মিঞাও৷

চতু:স্বর-  আওয়াই : খাওয়াই, দাওয়াই, যাওয়াই৷

পঞ্চস্বর- আওয়াইআ : খাওয়াইয়া, নাওয়াইয়া৷

proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.