অধ্যায়-০১: শিক্ষার্থীর শিখন: শিখনের ক্ষেত্র ও শিখন তত্ত্ব

সেশন-০৩: শিখন, শিখন তত্ত্ব ও আচরণবাদ

ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:

  • শিখন কী?
  • শিখনের উপাদান বা শর্তসমূহ
  • শিখন তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়?
  • শিখন তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করুন।
  • আচরণবাদ কী?
  • আচরণবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখুন।

শিখন কী?

শিখন হচ্ছে অত্যন্ত জটিল ও গতিশীল প্রক্রিয়া। প্রয়োজনের তাগিদে জীবের আচরণের কাঙ্খিত এবং অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনকে শিখন ‘Learning’ বলে। সাধারণভাবে শিখন বলতে বুঝায় আচরণের তুলনামূলক স্থায়ী পরিবর্তন। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে শিখনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী প্রদত্ত শিখনের কয়েকটি সংজ্ঞা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

থর্নডাইক এর মতে, “সঠিক উদ্দীপক এবং প্রতিক্রিয়ার সংযোজনই হলো শিখন।”

শিখনের বিভিন্ন সংজ্ঞা পর্যালোচনা করে Ruch বলেন, “মনোবিজ্ঞানীগণ শিখনকে আচরণ অথবা সম্ভাবনাসূচক আচরণের পরিবর্তন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা ঘটে পরিবেশগত অভিজ্ঞতার ফলে ক্লান্তি, ওষুধ বা আঘাতজনিত কারণে ঘটে না।”

Buskist এবং Gerbing -এর মতে, “অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সংঘটিত আচরণের তুলনামূলক স্থায়ী পরিবর্তনকে শিখন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।”

প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ,

এ পর্যায়ে আমরা শিখনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও শর্ত সম্পর্কে ধারণা নিব। ডিপিএড শিক্ষার্থী হিসেবে শিখন তত্ত্ব সম্পর্কে ভাল ধারণা নিতে গেলে পরীক্ষার পড়া হিসেবে নয় বরং বিভিন্ন শিখন তত্ত্ব জানতে গেলে শিখনের উপাদানগুলো মূখস্থ না করে মনোযোগ দিয়ে বুঝে নিন। এরপর আমরা ধীরে ধীরে শিখনের বিভিন্ন তত্ত্বগুলো জানব।

শিখনের উপাদান বা শর্তসমূহ

শিখন সংঘটিত হওয়ার জন্য কতগুলো শর্ত বা উপাদানর প্রয়োজন। নিম্নে শিখনের শর্তগুলো আলোচনা করা হলঃ

১. সমস্যা (Problem):

কোন সমস্যাকে কেন্দ্র করে শিখনের সূত্রপাত হয়। সমস্যা না থাকলে আমরা কোন কাজ করতাম না কিংবা কোন কিছু শিখতাম না।

২. সংযোগ বা অনুষঙ্গ (Association):

সংযোগ বা অনুষঙ্গ বলতে বুঝায় কোন স্থান বা সময়ে দু’টি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক বা যোগাযোগ তৈরি হওয়া। দু’টি সম্পর্কযুক্ত ঘটনা পাশাপাশি ঘটলে শিখন ত্বরান্বিত হয়। সংযোগ ২ ধরনের হতে পারে, যেমন-

ক) উদ্দীপক-উদ্দীপক সংযোগ; এবং খ) উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া সংযোগ।

৩. প্রেষণা (Motivation):

প্রেষণা শিখনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা মানুষ বা প্রাণিকে কোন কাজে প্রণোদিত বা চালিত করে তাই প্রেষণা। ক্ষুধার্ত না হলে আমরা খাদ্য সংগ্রহের কৌশল শিখতাম না। এক্ষেত্রে ক্ষুধা হচ্ছে প্রেষণা। প্রেষণা বা তাগিদ না থাকলে প্রাণি কিছুই শিখত না। তাই বলা যায়, শিখনের জন্য প্রেষণা হলো একটি শক্তিশালী উপাদান।

৪. বলবৃদ্ধি (Reinforcement):

বলবৃদ্ধি হল এমন কোন শর্ত বা অবস্থা যা উদ্দীপক-উদ্দীপক সংযোগকে বা উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া সংযোগ প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী করে থাকে। বলবৃদ্ধিকে বলা যায় পুরস্কার। পুরস্কার পেলে প্রাণি কোন কিছু দ্রুত ও আগ্রহ নিয়ে শিখে থাকে। যেমন- শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যদি সঠিক উত্তরের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রশংসা করেন সেটি বলবৃদ্ধির কাজ করবে। এতে শিক্ষার্থী ও অন্যান্যদের শিখার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। তাই বলা যায়, বলবৃদ্ধি শিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

৫. প্রচেষ্টা (Trial):

প্রচেষ্টাও শিখনের একটি উপাদান। কারণ শিখন নির্ভর করে প্রচেষ্টার উপর। আমরা ভুল ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোন কিছু শিখে থাকি। আমরা অনেক সময় একটি প্রচেষ্টাতেই কোন কিছু শিখে থাকি। আবার কখনও কখনও কোন কিছু শিখতে অনেক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়।

৬. নৈকট্য (Contiguity):

শিখনের আরেকটি উপাদান হলো নৈকট্য বা সান্নিধ্য। ঘটনা বা উদ্দীপকসমূহ কতটা কাছাকাছি আছে তার উপর নির্ভর করে শিখন কেমন হবে। যেমন- শিশু কোন ভালো কাজ করার সাথে সাথে পুরস্কৃত করলে তার শিখন দ্রুত ও দৃঢ় হবে। তবে কাজ ও পুরস্কারের মধ্যবর্তী সময় যত বেশি হবে শিখনের হার তত কম হবে।

৭. মনোযোগ (Attention):

শিখনের আর একটি উপাদান হল মনোযোগ। কোন শিক্ষণীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিলে শিখন ত্বরান্বিত হয়। বিপরীতে, মনোযোগ না দিলে শিখনে বিঘ্ন ঘটে।

৮. পরিপক্বতা (Maturation):

পরিপক্বতা হলো ব্যক্তির মাঝে গুণগত পরিবর্তন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর শিখনের হারও বাড়তে থাকে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক জটিল বিষয়ও আমরা সহজে শিখতে পারি। তাই বলা যায়, পরিপক্বতা শিখনের এক অন্যতম উপাদান।

শিখন তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়?

শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় ফলপ্রসূভাবে পাঠদানের জন্য বিশ্বখ্যাত শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী প্রদত্ত বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্বসমূহই শিখন তত্ত্ব বলা হয়। ব্যক্তি কীভাবে শেখে- এ সম্পর্কে অনেক তত্ত্বই রয়েছে এবং এ ধরনের তত্ত্বকে বলে শিখন তত্ত্ব (learning theory)। শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থী কী উপায়ে শেখে এবং শিক্ষক কীভাবে পাঠ দান করেন- এসব ক্ষেত্রে এই তত্ত্বসমূহ প্রয়োগ করা যায় এবং এ থেকে শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অর্থপূর্ণ ধারণা লাভ করা সম্ভব।

শিখন তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যক্তি বা শিক্ষার্থী কীভাবে শেখে বা শিক্ষার্থীর শিখন কীভাবে ঘটে তার ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এটি আমাদের শিখনের প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করে। শিখন তত্ত্ব বর্ণনামূলক। ফলে শিক্ষক বা চর্চাকারীর জন্য তা কাজের উপযোগী হয়।

উইকিপিডিয়ার মতে- “Learning Theory describes how students absorb, process, and retain knowledge during learning.”

বিভিন্ন প্রকার শিখন তত্ত্ব

বিভিন্ন শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবে শেখে। কাজেই বিভিন্ন শিখন তত্ত্বের উদ্ভব হয়। যে সকল শিখন তত্ত্ব শিক্ষাবিদদের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে। মানুষ বা প্রাণী একইভাবে শেখে না। শিখনের তত্ত্বগুলোও মানুষ বা প্রাণীর শিখন প্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এসব ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে শিখনের তত্ত্বগুলোকে মোটামুটি চারটি প্রেক্ষিতে ভাগ করা যায়।

১. আচরণবাদী প্রেক্ষিত (Behavioristic Perspective)

২. জ্ঞানবাদী প্রেক্ষিত (Cognitivistic Perspective)

৩. মানবতাবাদী প্রেক্ষিত (Humanistic Perspective)

৪. সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষিত (Socialistic Perspective)।

শিক্ষাক্ষেত্রে শিখন তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করুন।

  • শিখন তত্ত্ব থেকে আমরা জ্ঞানের প্রকৃতি এবং জ্ঞান অর্জন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে।
  • এটি শিখন প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়তা করতে।
  • কোন কোন উপাদানসমূহ শিখনকে প্রভাবিত করে তা জানতে।
  • শিখনে স্মৃতির ভূমিকা সম্পর্কে অবগত হতে।
  • শিক্ষার্থী মাঝে কীভাবে শিখনের সঞ্চালন ঘটে তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে।
  • তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে শিশুদের বিভিন্ন বয়সের শিক্ষা পরিকল্পনা, নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে।
  • শিশুদের শিখন শেখানোর জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে।

আচরণবাদ কী?

১৯১৩ সালে John Brodus Watson তাঁর ‘Behaviour’ নামক গ্রন্থে আচরণবাদকে উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে  থর্নডাইক, রায়নার, হাল, স্কিনার, লিনিয়ার, কোহলার এন্ড কফকো, অসবোর্ন এবং প্যাভেলভ প্রমুখ আচরণবাদকে সুপ্রতিষ্ঠা করেন। আচরণবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো জীবের আচরণ। তাদের মতে, শিখন হচ্ছে আচরণের পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিবর্তন।

আচরণবাদীরা বিশ্বাস করেন, শিখন সংঘটনের মূল উপাদান হলো উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়া এবং এদের সম্মিলিত ফল। অন্যভাবে বলা যায়, শিখন হলো উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ। প্রতিক্রিয়া বলতে যেকোন আচরণকে বোঝাতে পারে, উদ্দীপক বলতে যে কোন সংবেদনকে বোঝাতে পারে।

তাঁদের মতে, প্রত্যেকটি প্রতিক্রিয়া একটি উদ্দীপক দ্বারা সৃষ্ট। যেমন ধরা যাক, শিশুকে আম দেখিয়ে বলা হলো ‘আম’। কয়েকবার ঐ আম দেখানোর সাথে সাথে ‘আম’ শব্দটি উ‪চারণ করা হলে, পরে ‘আম’ দেখিয়ে কোন শব্দ উ‪চারণ না করলেও শিশু আম বলতে পারবে।

আচরণবাদে শিখন প্রক্রিয়ার এই উপাদানগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক নিম্নের চিত্রে লক্ষ্য করুন:

আচরণবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিখুন।

  • জীবের মানসিক সক্রিয়তাই হলো আচরণের বহি:প্রকাশ।
  • আচরণবাদের দৃষ্টিতে জীবের সংবেদন, প্রত্যক্ষণ, অনুধাবন ও সহজাত প্রবৃত্তি জীবদেহের বিশেষ প্রতিক্রিয়াভুক্ত।
  • চিন্তন ও কল্পনা আচরণের বহি:প্রকাশ ঘটায়।
  • জীবের আচরণ সম্পূর্ণভাবে পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
  • বিশেষ কোন পরিস্থিতিতে অনভূতি ব্যক্ত হয়।
proshikkhon

View Comments

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.