অধ্যায়-০১: শিক্ষার্থীর শিখন: শিখনের ক্ষেত্র ও শিখন তত্ত্ব
সেশন-০২: প্রেষণা ও মাসলোর চাহিদা তত্ত্ব
প্রেষণা বলতে কী বুঝায়?
প্রেষণা শব্দটির উৎপত্তি বাংলা ‘প্রেষ’ শব্দ থেকে যার অর্থ চাপ। ইংরেজি Motivation শব্দটির আদি রূপ হলো গ্রিক বা ল্যাটিন শব্দ ‘Movers’ যার দ্বারা জীবের সক্রিয়তা বা নড়াচড়াকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে গ্রিক ‘Movers’ -এর আধুনিক ইংরেজি রূপ ‘Motive’ যার অর্থ নড়ন, চলন বা সক্রিয়তা। ইংরেজি Motivation একটি নামবাচক শব্দ যার অর্থ হল আলোড়ন, তাড়না, নোদনা, সক্রিয়তা বা বল বৃদ্ধিকারক কার্যক্ষমতা ইত্যাদি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Motivation শব্দটিকে প্রণোদনা, তাড়না, নোদনা, প্রেষণা রূপে গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রেষণা হলো মানুষ ও প্রাণির এমন একটি অবস্থা যা তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করে বা কর্মশক্তি দান করে। প্রেষণা থাকার জন্যই মানুষ বা প্রাণীর মধ্যে কর্মস্পৃহা পরিলক্ষিত হয়। প্রেষণাকে আমরা গাড়ি বা রেলগাড়ির সাথে তুলনা করতে পারি। জ্বালানি বা বাষ্প যেমন গাড়ি বা রেলগাড়িকে শক্তি যোগায় ও সামনের দিকে নিয়ে যায়, প্রেষণাও তেমনি আমাদের লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয় আচরণের জন্য শক্তি বা তাড়না প্রদান করে। তাই বলা যায় উদ্দেশ্য দ্বারা প্রণোদিত হলে মানুষ বা প্রাণির মধ্যে যে সক্রিয় বা গতীয় অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকেই বলা হয় প্রেষণা। প্রেষণাকে মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
ই. হাল বলেন, “প্রেষণা হল উদ্দেশ্য হাসিলের ক্রমাগত প্রচেষ্টা।”
Crider, Goethals, Kavanaugh I ও Solomon -এর মতে, “আকাক্ষা, প্রয়োজন এবং আগ্রহ যা একটি প্রাণীকে কর্মে উদ্বুদ্ধ বা সক্রিয় করে তোলে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে তাকে প্রেষণা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।”
উডওয়ার্থ এর মতে, “প্রেষণা হল ব্যক্তির এমন একটি অবস্থা বা গতি যা তাকে কোন আচরণের জন্য বা কোন অভীষ্ট উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।”
সুতরাং আমরা বলতে পারি, যে পরিস্থিতি বা আচরণ আমাদের কোন অভাববোধের চাপ বা তাড়নার পরিস্থিতিতে সক্রিয় করে তোলে এবং উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য অর্জনের দিকে চালিত করে তাকেই প্রেষণা বলা হয়।
প্রেষণা চক্র কী?
প্রেষণা হচ্ছে একটি গতিশীল অবস্থা যা আমাদের মাঝে কোন উদ্দেশ্য লাভের তীব্র আকাঙ্খা বা ইচ্ছা জাগ্রত করে। এই গভীর অবস্থা অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রেষণার কয়েকটি স্তর বা পর্যায় রয়েছে যেগুলো অতিক্রম করে আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করি। এ স্তরগুলো হলো-
১. অভাববোধ (Need)
২. তাড়না (Drive)
৩. করণ আচরণ (Instrumental Behaviour)
৪. উদ্দেশ্য সাধন বা লক্ষ্যবস্তু (Goal)
প্রেষণার স্তরগুলো একসাথে দেখা যায় না, একটির পর আরেকটি পর্যায়ক্রমে আসে। অর্থাৎ স্তরগুলো একটিচক্রের আকারে আবর্তিত হয়। প্রেষণার পর্যায় বা স্তরগুলোর চক্রাকারে আবর্তিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রেষণাচক্র।
নিম্নে প্রেষণা চক্রটি চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
প্রেষণা কয় প্রকার ও কী কী?
প্রেষণার শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও বেশিরভাগ মনোবিজ্ঞানী প্রেষণাকে সাধারণত দু’ভাগে ভাগ করার পক্ষপাতী, যেমন-
১. শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক প্রেষণা (Biological drives) এবং
২. সামাজিক প্রেষণা (Social drives)।
প্রেষণার শ্রেণিবিভাগ উল্লেখপূর্বক বর্ণনা দিন।
প্রেষণার শেণিবিভাগ নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ মনোবিজ্ঞানীদের মতে প্রেষণাকে দু’টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
১. জৈবিক প্রেষণা (Biological drives)
যেসব প্রেষণা প্রাণীর জৈবিক অস্তিত্ব থেকে অর্থাৎ শরীরের বিপাক ক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হয় সেসব প্রেষণাকে বলা হয় জৈবিক প্রেষণা। জৈবিক প্রেষণার কিছু উদাহরণ হলো ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, যৌন প্রেষণা ও মাতৃত্ব ইত্যাদি। এসব প্রেষণার সৃষ্টি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বলে এসব প্রেষণাকে অনেক সময় মূখ্য প্রেষণাও (Primary drive) বলা হয়। ক্সজবিক প্রেষণার কতকগুলি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো হল-
২. সামাজিক প্রেষণা (Social drives)
সামাজিক প্রেষণার উদ্ভব হয় মানুষের সমাজ জীবন থেকে। এসব প্রেষণা মানুষ তার পরিবেশ বা সমাজ জীবন থেকে শিখে থাকে বলে এদের বলা হয় অর্জিত বা শিক্ষালব্ধ প্রেষণা। সামাজিক পরিতৃপ্তি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য নয় বলে এসব প্রেষণাকে গৌণ প্রেষণা (Secondary dirve) বলা হয়। এরূপ কিছু সামাজিক প্রেষণা হলো- যুথচারিতা, স্বীকৃতির চাহিদা, কৃতি প্রেষণা ইত্যাদি। কোন কিছু অর্জনের ওপর ভিত্তি করে প্রেষণাকে আমরা আরও দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন-
শিশুর শিখনে প্রেষণার প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করুন।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সকল কর্মশক্তির মূল উৎস হলো প্রেষণা। প্রেষণা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করে। শিক্ষকদের প্রেষণা সংক্রান্ত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের চাহিদা সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে সহায়তা করে থাকে। শেখার প্রতি আগ্রহের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীই বিদ্যালয়ে ভাল ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষার্থীর মাঝে প্রেষণার সঞ্চার করতে পারেন। নিম্নে শিশুর শিখনে প্রেষণার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হলো:
মাশলোর চাহিদা তত্ত্ব কী?
প্রেষণার বহুল আলোচিত তত্ত্ব হল চাহিদা-সোপান তত্ত্ব। আব্রাহাম মাসলো মার্কিন মনোবিজ্ঞানী মানুষের চাহিদার ঊধ্বর্গামী শ্রেণীবিন্যাসের জন্য তিনি একটি তত্ত্ব পেশ করেন যা ‘Maslow’s hierarchy of needs’ নামে সুপরিচিত। ১৯৪৩ সালে তিনি এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। এ মতবাদটি মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্বের মূলকথা হলো মানুষ প্রথমে তার জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণের চেষ্টা করে এবং তারপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী উচতর চাহিদাগুলো পূরণে সচেষ্ট হয়। মাসলো তাঁর তত্ত্ব চাহিদাগুলোকে পর্যায়ক্রমিকভাবে বিন্যস্ত করেন।
এই তত্ত্বে তিনি মানুষের চাহিদাকে ৫টি ধাপে ভাগ করে দেখিয়েছেন। যথা: জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, স্নেহ-ভালবাসার চাহিদা, আত্মমর্যাদার চাহিদা এবং আত্মপূর্ণতার চাহিদা।
চাহিদা-সোপান তত্ত্ব অনুসারে চাহিদার ধাপ কয়টি ও কী কী বর্ণনা দিন।
মাসলো তাঁর ‘Theory of human motivation’ বইতে ৫টি ধাপের কথা বলেছেন। ধাপগুলো চিত্রসহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
১. জৈবিক চাহিদা:
মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় যে প্রচেষ্টা চালায় তাই মৌলিক চাহিদা। একদম নিচের ধাপটি হলো জৈবিক চাহিদার ধাপ। প্রথমে সে মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা প্রভৃতি পূরণের চেষ্টা চালায় অর্থাৎ এই তত্ত্বে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা ইত্যাদি এই চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। জৈবিক চাহিদার পরিতৃপ্তি না হলে আমরা পরের পর্যায়গুলোতে যেতে পারিনা।
২. নিরাপত্তার চাহিদা:
এটি চাহিদা তত্ত্বের দ্বিতীয় ধাপ। জৈবিক চাহিদা পূরণ হলেই আমাদের মাঝে নিরাপত্তার চাহিদা জাগ্রত হয়। এই চাহিদার মধ্যে রয়েছে আশ্রয়ের নিরাপত্তা, চাকরির নিরাপত্তা, আয় ও সম্পদের নিরাপত্তা, দৈহিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক নিরাপত্তা ইত্যাদি। কারো জৈবিক চাহিদা পূরণের পরে যদি তার নিকট অতিরিক্ত অর্থ থাকে তবে সে প্রথমেই চাইবে তার নিরাপত্তা।
৩. স্নেহ-ভালবাসার চাহিদা:
নিরাপত্তার চাহিদা পূরণ হলে মানুষ ভালোবাসা বা স্নেহের চাহিদা পূরণের জন্য তাড়না অনুভব করে। এই চাহিদা সামাজিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি। এই চাহিদার অভাবে মানুষের মাঝে নিঃসঙ্গতা কিংবা বিষন্নতা দেখা যায়।
৪. আত্মমর্যাদার চাহিদা:
প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আত্মমর্যাদার চাহিদা থাকে। এ পর্যায়ে প্রতিটি ব্যক্তি চায় ভালো চাকরি, দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি প্রভৃতি। অর্থাৎ সে চায় তার সমাজের অন্যান্যদের থেকে নিজেকে একধাপ উপরে রাখতে। মর্যাদাবোধ তখনই আসে যখন মানুষ নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারে। এই মূল্যায়ন যথাযথ না হলে নিজের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যায়, হীনমন্যতায় ভোগে, আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়।
৫. আত্মপূর্ণতার চাহিদা:
প্রথম চারটি ধাপ যথাযথভাবে পূরণ হলেই মানুষ সর্বশেষ চাহিদা অর্থাৎ আত্মপূর্ণতার চাহিদায় যেতে পারে। সবার পক্ষে এ স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ পর্যায়ে ব্যক্তি নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়, নিজের দক্ষতা ও সার্মথ্যের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চায়। তার মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সৃজনশীলতা ও পরিবেশের সাথে পারস্পরিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে। সে নিজেকে ও অন্যকে ভালোবাসে এবং নিজেকে কাজে এমনভাবে নিয়োজিত রাখে যা নৈতিক দিক থেকে সমাজের জন্য কল্যাণকর।
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
This website uses cookies.