Characteristics of infants and children

শিশু:

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশ জাতীয় শিশু নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সকল মানব সন্তানকে শিশু বলা হয়৷ প্রতিটি শিশু আলাদা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা৷ শিশুর রয়েছে নিজস্ব একটা জগত্ এবং শিশুর এই জগত্ হলো হাসি ও আনন্দময়৷ শিশুদের সঠিকভাবে বুঝতে এবং সক্রিয় রাখতে হলে তাদের সম্পর্কে আমাদের জানা দরকার৷ শিশুর শেখানো কার্যক্রম ও মূল্যায়নে শিশুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রত্যেক শি¶ক মেন্টরের জন্য অত্যাবশ্যক৷

শিশুদের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য হলো-

  • প্রতিটি শিশু এক নয়৷ প্রত্যেক শিশুই অপর শিশু থেকে আলাদা৷ 
  • শিশুদের পছন্দ, চাহিদা ও শিখনের ধরন আলাদা আলাদা হয়, যা মূলত গড়ে ওঠে তার বেড়ে ওাা পরিবেশের ওপর নির্ভর করে৷  
  • শিশু আদর ও ভালোবাসা পেতে এবং বড়দের কাছে গ্রহণীয় হতে চায়৷
  • শিশুরা অনুসন্ধিত্সু হয়৷ ফলে তারা নানা বিষয়ে অনেক প্রশ্ন করে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করে৷→ নানা রকম কাজ, অভিজ্ঞতা ও কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে নিজস্ব সত্তাকে প্রকাশ করতে পছন্দ করে৷
  • শিশু নিজের মত করে পৃথিবীকে দেখে, বড়দের মত করে নয়৷ তারা কল্পনা প্রবণ৷ শিশু কল্পনা এবং বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনা৷
  • শিশু নিজেকে হাতি, ঘোড়া, ভালুক, প্রভৃতি কল্পনা করে৷ খেলার ভিতর দিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের উপর নানা রকম অভিজ্ঞতা যুক্ত করে৷ 
  • নানা রকম রূপকথার গল্প, ছেলে ভুলানোর ছড়া ইত্যাদি শুনতে খুবই ভালোবাসে৷ এগুলো শিশুর কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে৷
  • শিশু তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করে৷ অন্যের কাজকে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করে৷
  • বিশ্ব জগতের অধিকাংশ সামগ্রীকে সে জীবন্ত মনে করে, কারণ অন্যান্য প্রাণি ও বস্তুর মধ্যে সে নিজের মনের অনুভূতি ও আবেগ আরোপ করে৷ 
  • সাধারণত কোনো কিছুতে বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না৷
  • খেলে এবং নানারকম কাজ করে শেখে৷
  • আত্মকেন্দ্রিক হয়৷ তার চিন্তা-ভাবনা নিজেকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়৷
  • সহজে ভাষা আয়ত্ব করে৷
  • আমিত্ববোধের সৃষ্টি হয়৷
  • প্রচলিত আচার-আচরণ, রীতিনীতির ও সংস্কারের প্রতি সাধারণ বিশ্বাস ও আনুগত্যের সঞ্চার হয়৷
  • বয়ঃসন্ধিকালে অন্যের সঙ্গে নিজের মনোভাবের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়৷ যার ফলে মনে বিদ্রোহের ভাব সৃষ্টি হয়৷
  • শিশুরা চঞ্চল ও প্রাণবন্ত তাই ছুটাছুটি, লাফ-ঝাপ, দাপাদাপি অধিক পরিমাণে করে৷
  • শিশু তার স্বভাবসুলভ কারণেই চারপাশের পরিবেশকে আবিষ্কার করতে চায়৷ পরিবারের সীমান ছাড়িয়ে বিদ্যালয়ে, খেলার মাঠে এবং বন্ধু বান্ধবের দলে নেতৃত্ব দান করে৷ ফলে সে বহির্মূখী জীবনের স্বাদ পায়৷
  • শিশুরা আনন্দপ্রিয় হয়৷ তারা নানা আনন্দজনক কাজ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে ও যুক্ত হতে পছন্দ করে৷
  • খেলা ও খেলনা বেশি পছন্দ করে৷  খেলাই শিশুর প্রধান কাজ এবং খেলার মাধ্যমে শিখতে পছন্দ করে৷
  • শিশুরা কৌতুহলী হয়৷ তার স্বভাবসুলভ কারণেই বিভিন্ন বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করে জানার ও বোঝার চেষ্টা করে৷
  • অনুকরণ প্রিয়৷ তারা তাদের চারপাশের বড়দের ও সঙ্গীদলের সদস্যদের অনুকরণ করে শিখে৷ ৷

তথ্যসূত্র:

১. ‘শিশুর বিকাশ ও খেলাভিত্তিক শিখন’ বিষয়ক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সহায়িকা, (জানুয়ারি ২০২৩); ডিপিই, প্রাগম, ব্র্যাক আইইডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
২. জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (নেপ), ময়মনসিংহ (২০১৯), ডিপিএড পেশাগত শিক্ষা (প্রথম খন্ড)

বয়সভেদে শিশুর বৈশিষ্ট্য

  • পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় সব শিশুই প্রাকৃতিক নিয়মে একটি নির্দিষ্ট বয়সে বসে, দাঁড়ায়, হাঁটে, কথা বলে৷ খুব কম ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম ঘটে৷ শিশুরা একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে এক একটি দক্ষতা অর্জন করে৷ দক্ষতা অর্জনের সময়সীমাকে বিকাশের মাইলফলক বলে৷  যেমন- দেড় মাসে শিশু হাসি দিতে শেখে, ৬ মাসে সাহায্য নিয়ে এবং ৯ মাসে সাহায্য ছাড়া বসতে পারে, ৯/১০ মাসে হামাগুড়ি দেয়, ১২-১৪ মাসে হাঁটে, ২ বছরে ভালোভাবে/স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারে ইত্যাদি৷ গর্ভধারণ থেকে শুরু করে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর  বৈশিষ্ট্য, শিখন এবং বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিশুর জীবনচক্র বয়স অনুসারে বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়৷
  • প্রতিটি স্তরকে বিভিন্ন নামকরণ করা হয়েছে৷ প্রতিটি স্তরেরই রয়েছে কতকগুলো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা বয়সভেদে শিশুরা ঐ নির্দিষ্ট দক্ষতা বা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে থাকে৷ শিশুর জীবনের একেকটি স্তরের দক্ষতা ও বিকাশ পরবর্তী স্তরের শিক্ষা ও বিকাশের ভিত রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷
  • সুতরাং, কোনো একটা স্তরের বিকাশের ধারা কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে তা পরবর্তী স্তরের দক্ষতা ও বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে৷ এভাবেই শিশুর জীবনে ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটতে থাকে যা বয়সের সাথে সাথে পরিপূর্ণতা পায়৷ পূর্বের স্তর পার না করে সাধারণত শিশু পরবর্তী স্তরে প্রবেশ করতে পারে না৷ যেমন- কোনো শিশু হাঁটা না শিখে দৌড়াতে পারে না, বা বলা যায় হাঁটা ভালোভাবে না শিখে কেউ ভালোভাবে দাঁড়াতে পারে না৷ শিশুর জীবনের বিভিন্ন বয়ঃক্রমে তাদের বৈশিষ্ট্য, পছন্দ, চাহিদা ও প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়৷
  • আবার, নির্দিষ্ট একটি বয়সে সকল শিশুর আচরণে বিশেষ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য (মিল) দেখা যায়৷ এক্ষেত্রে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, বিভিন্ন দেশের শিশুদের মধ্যে মোটামুটি একই ধারাক্রম অনুযায়ী বিকাশ ঘটে থাকে৷ সাধারণত একটি শিশু তার সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে না কি পিছিয়ে আছে তা বিকাশের মাইলফলক দেখে বুঝা যায়৷

মানবজীবনের বিকাশ প্রক্রিয়ার সূচনা হয় মাতৃগর্ভ থেকে যা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে  অবিচ্ছিন্ন ধারায় এগিয়ে চলে৷ সামগ্রিকভাবে জীবন বিকাশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য মনোবিজ্ঞানীরা বয়স ও বিকাশের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করেছেন৷ কিন্তু এই বিভাজনে বেশ মতবিরোধও রয়েছে৷ সাধারণত ভ্রুণাবস্থা থেকে প্রারম্ভিক শিশুকাল শুরু হয় তবে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, পারিপাশির্বক পরিবেশ ও অন্যন্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই বয়সসীমা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে৷ শিশুকাল বা শৈশবকে কয়েকটি ছোটো ছোটো পর্বে ভাগ করা হয়; যেমন- প্রারম্ভিক শৈশব, শৈশব ও কৈশোর৷ যেহেতু আমরা প্রাথমিক স্তরের শিশুদের সাথে কাজ করব, তাই  প্রারম্ভিক শৈশব ও  শৈশবকালে শিশুর বিকাশ নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো৷

প্রারম্ভিক শৈশব (Early Childhood):

পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশেই প্রারম্ভিক শৈশব বলতে গর্ভ থেকে শিশুর আট বছর বয়স পর্যন্ত ধরা হয়৷ বাংলাদেশে ‘শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি-২০১৩’ অনুযায়ী প্রারম্ভিক শৈশবকাল গর্ভ থেকে শিশুর আট বছর বয়স পর্যন্ত ধরা হয়৷ এই সমরে মধ্যে মূলতঃ ভ্রুণাবস্থা থেকে ৫ বছর- জীবনব্যাপি শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি গঠনের সাথে সম্পৃৃক্ত এবং ৬-৮ বৎসর- শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের ভিত্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় সহজ ও সাবলীল উত্তরণের সাথে সম্পৃৃক্ত৷

এই সময়ে শিশু লম্বা ও ক্ষীণকায় হয়৷ হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা করা, ধরা ইত্যাদিতে আরও বেশি দক্ষতা অর্জন করে৷ তারা নিজের কাজগুলো করতে পারে৷ যেমন- নিজে খাওয়া, পোশাক পরা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া৷এছাড়া, তারা স্ত্রী পুরুষের বিদ্যমান পার্থক্য করতে শিখে৷ তারা পরিবারের সদস্যদের অনুকরণ করে৷ সমবয়সীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে৷ এ বয়সে তারা কৌতুহলী হয় ও অনেক প্রশ্ন করে৷

শৈশবকাল (Middle Childhood):

সাধারণত প্রাক-কৈশোর থেকে যৌবনাগমন (Adolescence) এর পূর্ব পর্যায়টিকে ধরা অর্থাত্ শিশুর ১১ বছর বয়স সীমাকে বুঝানো হয়৷

এই সময় শিশুর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক চেতনা বৃদ্ধি পায়৷ বর্হিজগতের সাথে যোগাযোগ ঘনিষ্ট হয়৷ এই বয়স হলো দল গঠন করার বয়স৷ লেখাপড়া ও গণনার মৌলিক দ¶তা অর্জন করে৷ তারা সৃজনশীল কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকতে আনন্দবোধ করে এবং ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে৷ লিঙ্গ অনুযায়ী সামাজিক ভূমিকা পালন শিখে৷  

তথ্যসূত্র:

proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.