শিশুর সার্বিক মঙ্গল ও উন্নতি সাধনের জন্য পড়া দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। পড়ার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পড়া শিশুর ব্যক্তিগত অর্জন, সামাজিক উন্নতি কিংবা শিক্ষায় সাফল্য সর্বোপরি ভবিষ্যত পেশাজীবনে উন্নতির পিছনে পড়া দক্ষতা ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখে। বিশেষত পড়া দক্ষতা ব্যতীত ভাষাশিক্ষার অর্জন ও খ্যাতি অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়। পড়া দক্ষতা শিশুর সামনে জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় এবং মানুষ হিসেবে সীমাবদ্ধতাসমূহ দূরীভূত করতে সহায়তা করে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিসহ প্রাথমিক স্তরে পড়া দুটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে হয়– প্রথমত পড়ার জন্য শিখন এবং দ্বিতীয়ত শিখনের জন্য পড়া। প্রথম পর্যায়ে শিশু কীভাবে পড়তে হয় তা আয়ত্ত করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে শিশু তার অর্জিত দক্ষতা ব্যবহার করে বিষয়জ্ঞান লাভ করে। প্রথম স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হতে পারাটাই হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিসহ প্রাথমিক স্তরের শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ অর্জন।
প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিসহ প্রাথমিক স্তরে শিশুর পড়ার দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করা তথা পড়ার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেননা এই ধারণা শিশুর পড়ার দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিক্ষকের স্বীয় ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করবে যা তার পরবর্তী শ্রেণীভিত্তিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ রয়েছে The more you read, the more you learn অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যত বেশি পড়বে সে তত বেশি শিখবে। পড়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তাঁর ধারণা, জ্ঞান, উপলব্ধিকে আরও শাণিত করে। শিশু পড়ার মাধ্যমে বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য আহরণ করে এবং ভবিষ্যতের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
জাতি তাঁর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সমর্পণ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজস্ব ঐতিহ্য গড়ে তোলে। পরবর্তী প্রজন্ম পড়ার মাধ্যমে লিপিবদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জানতে পারে। পাশাপাশি পড়ার মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভে সামর্থ্য অর্জন করতে পারে।
পড়ার সময় শিশু অজানা শব্দের সন্ধান লাভ করে। আবার কবি সাহিত্যিকগণ সাহিত্য নির্মাণে প্রয়োজনে জানা শব্দকেই ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করতে পারে। শব্দের এই ভিন্নমাত্রিক ব্যবহার সম্পর্কে অবগত হবার একমাত্র উপায় হলো পড়া।
শিশুর সামগ্রিক অর্জন নিরূপণের ক্ষেত্রে পড়ার দক্ষতা একটি কার্যকর মাপকাঠি হতে পারে। যে শিশুর পড়ায় দুর্বলতা রয়েছে তার পরীক্ষার ফলাফলও আশানুরূপ নয়।
পড়া অবসর বিনোদনের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ উপায়। আনন্দের সাথে পড়লে পাঠক নতুন তথ্য অর্জনের পাশাপাশি যথেষ্ট বিনোদনও লাভ করে। এভাবেই বিনোদনের মধ্য দিয়ে শিশু জ্ঞান অর্জনের দিকে ধাবিত হয়।
মনীষীদের জীবনী পড়ার মাধ্যমে মূল্যবোধ, নান্দনিকতা, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে শিশুর পরিচয় ঘটে । যা তার মানসিক সীমানা বৃদ্ধি ও ব্যক্তিত্ব গঠনের মাধ্যমে ক্রমশ তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
পঠিত বিষয়কে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা শিশুর সীমাবদ্ধ গন্ডির বাইরে চিন্তা করতে সহায়তা করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু বিচিত্র বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করে কোনো একটি বিষয়ের প্রতি অধিকতর পড়ায় মনোনিবেশ করে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশু কোনো একটি বিশেষ পেশার প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে যা পরবর্তী পেশাজীবনে তার বিষয় নির্বাচনে সহায়তা করে।
পঠনের মধ্য দিয়ে শিশু সামাজিক পরিবেশ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করে যা পরবর্তীতে তাকে সামাজিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে সহায়তা করে।
পাঠাভ্যাস শিশুকে নিজের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে সমর্থ করে তোলে এবং সে স্বশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
পড়ার মাধ্যমে শিশু এবং লেখকের মধ্যে এক প্রকার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। লেখকের মানস, চিন্তা, দর্শন ইত্যাদি তার লেখার মধ্যে নিহিত থাকে। ফলে লেখকের মনোদর্শন জানা ও পাঠের মর্মার্থ অনুধাবনের জন্য শিশুকে পাঠের অন্তর্নিহিত অর্থকে উপলব্ধি করতে হয়। এই মর্মার্থ উপলব্ধির সফলতা শিশুকে নান্দনিকতা বোধ, দর্শন এবং ভাষাশৈলী সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে।