কবিতা

গল্প: শ্বশুর বাড়ীর আমগাছ

শ্বশুর বাড়ীর আমগাছ

-গল্পকার: জনাব মোঃ রাহাত হাওলাদার, শিক্ষক,

বারঘড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।

একবার দুপুরবেলা বৈশাখের ঝড় শুরু হইলো, তা বিকেল পর্যন্ত গড়াইলো। এবং আস্তে আস্তে কমিতে লাগিলো। গোধুঁলির সময় আমি বরিশাল শ্বশুর বাড়ীর উদ্দেশ‍্য যাত্রা করিলাম‌। সন্ধার পরে শ্বশুর বাড়ি পৌছে শাশুড়ি মাকে ছালাম দিয়ে ঘরের মধ‍্য প্রবেশ করিলাম।
বৌয়ের মুখখানা দেখিয়া আমি যে কী আনন্দিত হইয়াছিলাম, তা আমাকে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন উনিই ভালো বলিতে পারিবেন।

বৌ বললো- বসো। বলিয়া লুঙ্গি আনিতে  ঘরের মধ‍্যে প্রবেশ করিলো। আমি পা দুখানি ঝুলাইয়া খাটের উপর বসিয়া দুলিতে লাগিলাম।
হঠাৎ করে  টিনের চালার উপর টন করিয়া পড়িলো, আর টিন ঝন করিয়া উঠিলো। আমি লাফ মারিয়া বুকেঁ ফুঁক দিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম।
বৌ আমার লুঙ্গি নিয়া দাঁড়াইয়া বলিলো- ভয় পাইয়াছো নাকি???

আমি বলিলাম- নাতো…!!! কি পড়িলো?? বৌ বলিলো-আম পড়িলো। তা এত শব্দ হইয়াছে?? হুম একটু বড় হইয়াছে বটে!
রাতের ভোজন করিতে বসিয়া পড়িলাম। যেই না মুখের ভিতর ভাত গুজিয়া  দিলাম, অমনি ঠক করিয়া টিনের উপর শব্দ হইলো। আর মুখের ভাত চারদিকে ছড়াইয়া পড়িলো। লজ্জা ঢাকিবার জন‍্য কাশি দিয়া উঠিলাম। বৌ আমার মাথায় হাত বুলাইয়া কাশি নিবারন করিলো।
খাবার শেষ করিয়া ঘুমাইতে চলিয়া গেলাম।
বৌয়ের বলিতে লাগিলো- কোন গাছের আম টক, কোন গাছের আম মিষ্টি । এই গল্প শুনিতে শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িলাম।
যেই একটু গাঢ় ঘুমে প্রবেশ করিলাম, সেই আবার টন করিয়া উঠিলো। নিমিষেই মনে হইলো, উপর থেকে কোন এক বোমা টিনের চালের উপর ছাড়িয়া দিয়াছে। আমি একলাফে উঠিয়া বসিয়া পড়িলাম। বুকের উপর হাত দিয়া কলিজার কম্পন অনুভব করার চেষ্টা করিলাম।

আমি- কি পড়িল?? কি পড়লো?? বৌ বলিয়া উঠিল- কেনো আ-আ-আম পড়িলো। আমি বলিলাম- ওহ্!!!

একটু জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে শুইয়া পরিলাম।
ঘুমাইয়া গেলাম মধ‍্যে রাতে টিনের উপর একসাথে জোড়ায় জোড়ায় শব্দ হইলো, মনে হইলো পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা ইট মারিয়া দৌঁড়াইয়া পালাইয়াছে!!

আমি- কে কে??? বলে উচ্চশব্দ করিলাম।

বৌ বলিল- কেউ না, আম!!!আম!!! আমি কহিলাম ওহ্!!!
রাতে আর দু চোখের পাতার  মিলন ঘটাইতে পারিলাম না। টন,টন,ঝন,ঝন শুনিয়া কাটিয়া দিলাম।
সকালবেলা গাছটা দেখিবার জন‍্য বাহিরে নামিয়া স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়া থাকিলাম। থোকায় থোকায় গাঢ় সবুজ আম ঝুলিয়া আছে। গাছটা মাথা নীচু করিয়া রহিয়াছে।

এরই মধ‍্যে ঘরের ভিতর থেকে বৌয়ের ডাক পড়িলো। আমি ঘরে প্রবেশ করতেই বৌ কতগুলো কাচেঁর পাত্র দেখাইয়া বলিলো এগুলো বাড়িতে নিয়া যাইবা‌। আমি কহিলাম এগুলো কিসের আচার। বৌ কহিলো এগুলো আমের আচার। তারপর তর্জুনি অঙ্গুলী দ্বারা, এটা টক,এটা মিষ্টি, এটা ঝাঁল, এটা কাশ্মীরি, এটা আজমেরী, এটা  আমের মোরব্বা, আর স্মরণ রাখিতে পারি নাই।
ঐ বার ওগুলো নিয়া খুশিঁতে খুশিঁতে বাড়িতে চলিয়া আসিলাম।
বৈশাখ শেষে জৈষ্ঠ্য পড়িলো । আমি আবার শশুর বাড়ী আসিয়াছি। এরি মধ‍্যে আম তার রুপ  পরিবর্তন করিয়াছে। রঙ্গিন শাড়ি পড়িয়া নববধূর সাজেঁ ঝুলিয়া আছে।

আমার কাকা শ্বশুররা সাত ভাই।
ছোট কাকার উপর আম পাড়ার দায়িত্ব পড়িলো। মেঝ কাকি আর বাড়ির ছোট বাচ্চাদের আম কুড়ানোর দায়িত্ব দেয়া হইলো।
দ্বিপ্রহরে ছোট কাকা লুঙ্গিটা ভাঁঝ করিয়া দুপায়ের ফাক দিয়া পিছন দিকে গুজিয়া দিলেন। এবার মগডালের উদ্দেশ‍্য যাত্রা করিলেন। আমরা দু,পাছায় হাত দিয়া “যাত্রা শুভ হোক” বলিয়া ঠেলিয়া দিলাম।
কাকা গাছের শাখা প্রশাখাদের ভুমিকম্পের মতো নাড়াইতে লাগিলেন। অমনি ঝড় ঝড় করিয়া আম পড়া শুরু হইলো। বাচ্চারা গান জুড়িয়া দিলো-
                           ‘ঝড় এলো, এলো ঝড়।
                              আম পড়,আম পড়।’

আমরা সবাই আম কুড়াইতে ব‍্যাস্ত থাকিলাম।
মেঝ কাকি আম কুড়াঁনোর ফাঁকে ফাঁকে ভালো ভালো আম গুজিয়া ফেলিলেন। আমি কিছুক্ষনের জন‍্য আমার দৃষ্টিশক্তি হারাইয়াছি!!
এবার কাকা নীচে অবতরন করিলেন এবং পানি দ্বারা তৃষ্ণা নিবারণ করিলেন।
যখনি আমের দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাইলেন, তখনি বলিয়া ফেলিলেন রঙ্গিন, ভালো আমগুলো কোথায়া চলিয়া গেলো???
মেঝ কাকি বলিয়া উঠিলো, উপরে বসিয়া অনেক কিছু দেখিতে পাইবা,যা পারিয়াছ তা এখানেই আছে!!!

এই এক কথা, চার কথা মিলে শুরু হইলো তুমুল বিবাদ। যেই কাকা আমার দিকে তাকাইলেন, আমি চোখঁ হাত দিয়া ময়লা গেছে বলিয়া, চক্ষু ডলিতে লাগিলাম।
নিজেকে স্বাক্ষী হিসেবে দ্বার করাইবার দুঃসাহস দেখাইলাম না।

এবার ঘটনাস্থলে মেঝ কাকার আগমন ঘটিলো। মেঝ কাকা কহিলো কি হইয়াছে ছোটো?? বিস্তারিত শুনিয়া ঘরের মধ‍্যে প্রবেশ করি য়া,মেঝ কাকিকে উত্তমভাবে প্রহার শুরু করিয়া দিলেন। মনে হইলো বজ্রপাত শুরু হইয়াছে! কাকিও রাগ করিয়া আমগুলো নিয়া, আর আসিবে না বলে, বাপের বাড়ি চলিয়া গেলেন।

বিকেলে আমিও বাড়ির উদ্দেশ‍্য, ঘর থেকে বহিরে হইয়া, ঘাড়টা কিঞ্চিত বাকাঁ করিয়া আম গাছটার দিকে তাকায়াছিলাম, কী জানি ভেবে ফিঁক করিয়া হাসিঁয়া দিলাম।।।।

********

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon
Tags: গল্প

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.